মশিউরের খেরোখাতা

সুরের সেতুবন্ধন: সিঙ্গাপুরে রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী সন্ধ্যা (২৬ জুলাই ২০২৫)

উষ্ণ আর্দ্রতার আবরণে ঢাকা সিঙ্গাপুরের এক গোধূলিবেলা। সূর্য তখনও আকাশের প্রান্তে লালচে আভা ছড়িয়ে শেষ বিদায় জানাচ্ছে। শহরের এক কোণে, এনটিইউ অ্যালামনাই ক্লাবের সজ্জিত প্রবেশদ্বারে ছোট ছোট দলে জড়ো হচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কারও পরনে রঙিন জামদানী শাড়ি, কারও পাঞ্চাবী ও ফতুয়া; সবার চোখে আজ অন্যরকম উদ্দীপনা। কারণ এই সন্ধ্যায়, ২৬ জুলাই ২০২৫, সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটি আয়োজন করেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

প্রবেশপথে স্বেচ্ছাসেবকরা হাসিমুখে সবাইকে স্বাগত জানাচ্ছিলেন। অডিটোরিয়ামের বাহিরে মনে হলো যেন এক টুকরো বাংলাদেশে পা রেখেছি। অডিটোরিয়ামের অন্দরে বাংলা সুরের মূর্ছনা আর নিজস্ব আবহের আমন্ত্রণ। দেয়ালে দেয়ালে রঙিন আলপনায় লেখা কবিতা থেকে উদ্ধৃতি, মঞ্চের পেছনে ঝুলছে এক বিশাল ব্যানার—তাতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও কাজী নজরুল ইসলামের ছবি পাশাপাশি, উপরে বড় অক্ষরে লেখা 'রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী'। মঞ্চের এক কোণে হারমোনিয়াম আর তবলা সাজানো, অন্যপাশে কয়েকটি তানপুরা দেয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা; সামনে মাইক্রোফোনগুলো পরীক্ষা করে দেখছেন সাউন্ড টেকনিশিয়ান। অনুষ্ঠানের শুরু হতে আর মাত্র কিছুক্ষণ বাকী। আসনগুলো ধীরে ধীরে পূর্ণ হয়ে উঠছে। সামনের সারিতে একদল শিশু দেশীয় পোশাকে ফিসফিস করে লাইন ধরে বসেছে – তাদের চোখে-মুখে মিশে আছে উত্তেজনা আর একটু নার্ভাস হাসি। পাশের দর্শকসারিতে এক মধ্যবয়স্ক দম্পতি কথা বলছেন চাপা স্বরে – "অনেক দিন পর এমন আয়োজন, মনে হচ্ছে বাংলাদেশের কোন অনুষ্ঠানে বসে আছি," ভদ্রলোকের কণ্ঠে নস্টালজিয়া। তার স্ত্রী হাসি মুখে সায় দিলেন, "হ্যাঁ, আমাদের ছেলেবেলার স্মৃতিগুলো আবার জেগে উঠছে।" ঠিক তখনই মাইক্রোফোনে হালকা টোকা দিয়ে সাউন্ড চেকের সুর শুনে চারপাশ চুপ হয়ে গেল। সবাই অপেক্ষার প্রহর গুনছে – কখন শুরু হবে সেই প্রতীক্ষিত পরিবেশনা। মঞ্চে এসে দাঁড়ালেন এমডি কামাল হোসেন সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির জেনারেল সেক্রেটারি। তিনি শান্তস্বরে সবাইকে শুভ সন্ধ্যা জানিয়ে তার সংক্ষিপ্ত উদ্বোধনী বক্তব্য শুরু করলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে, সম্প্রতি বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া মাইলস্টোন স্কুল ট্র্যাজেডিতে অকালপ্রয়াত শিশুদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। তিনি বলেন, “এই নীরবতা শুধু শোক প্রকাশ নয়, বরং আমাদের এক প্রতিজ্ঞা— ভবিষ্যতে যেন এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আর না ঘটে, তার জন্য আমরা সকলে সচেতন ও দায়িত্বশীল হব।” তারপর মঞ্চে এলেন সিঙ্গাপুর বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি সানোয়ার ডিটো। তার সংক্ষীপ্ত বক্তব্যের পরেই শুরু হল মূল অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সূচনা হল সম্মেলক কণ্ঠে নজরুল সঙ্গীতের মাধ্যমে। একদল তরুণ-তরুণী মঞ্চের উপর সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে গাইলেন "ও ভাই খাঁটি সোনার চেয়ে খাঁটি আমার দেশের মাটি"। শিল্পী ছিলেন সোহেল রানা, প্রীতম সরকার, শেখ শাহিন, শুভ্রজিৎ বড়ুয়া, মানী চৌধুরী , আদৃতা বড়ুয়া, শারমিন এবং দিলমেরা রনি। হারমোনিয়ামের সুর আর তবলায় মৃদু তালের সঙ্গে তাদের কণ্ঠ মিলিয়ে সৃষ্টি হল অপূর্ব এক সুরসম্মিলন। গানটি যেন প্রেক্ষাগৃহের প্রতিটি হৃদয়কে ছুঁয়ে গেল – শ্রোতারা নিমগ্ন হয়ে গেলেন সুরের মাধুর্যে। শেষ নোট ঝংকার তুলতেই উপস্থিত সবাই করতালিতে ফেটে পড়লেন। কারো কারো ঠোঁট নড়ে উঠল শেষ সুরের সঙ্গে সঙ্গে, যেন বহুদিন পর প্রিয় এই দেশের গানটি তারা একসাথে গাইলেন মনে মনে। এরপর একক সংগীত, কখনও বা দ্বৈত সংগীতের সুরের মূর্ছনায় অবগাহন করলাম, সুরের মাদকতা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। কিছু গানের পরে কহন আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র সিঙ্গাপুর মঞ্চে আসলো এবং তারা নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের “মানুষ” ও “পৃথিবী” কবিতা দুটি আবৃত্তি করলেন। কবিতার প্রতিটি চরণ তাদের কন্ঠে প্রাণ পেয়ে উঠল; কন্ঠে তারা ফুটিয়ে তুললেন মানবিক চেতনা। " গাহি সাম্যের গান - মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান” – যখন এই অমর পংক্তিগুলো উদাত্ত কণ্ঠে ধ্বনিত হলো, দর্শকরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা গ্রহণ করলেন। আবৃত্তি শেষ হলে কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। তারপর ধীরে ধীরে করতালির ঝড় উঠল, হলভর্তি মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানালেন এই অনবদ্য পরিবেশনাকে। কারো চোখে জল, কারো মুখে বিস্ময়ের হাসি – মনে হল নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের আত্মা সেই সন্ধ্যায় প্রত্যেকের মধ্যে জাগ্রত হল। ভারী আবেগের গানের মাঝে মধ্যে মঞ্চে রঙের ছটা আর নৃত্যের ঝলক নিয়ে আবির্ভূত হচ্ছিলেন নৃত্যশিল্পীরা। তাঁদের নুপুরের ঠমক আর হাতের মুদ্রায় ফুটে উঠতে লাগল কবিগুরুর সুরের কোমলতা আর বিদ্রোহীর ছন্দের উদ্দীপনা। নৃত্য শিল্পীদের পদচারণায় মঞ্চে কখনো তরঙ্গ তুলছে বসন্তের জোয়ার, কখনো বা উদ্ভাসিত হচ্ছে শক্তির আগুন। আলোর রং পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছিল নৃত্যের মেজাজ – নীল আলোয় অভিমান আর কমলা আলোয় উৎসবের আবহ। পুরো অডিটোরিয়াম নিঃশ্বাস আটকিয়ে লক্ষ্য করল তাঁদের অভিনব পরিবেশনা। নাচের শেষ ভঙ্গিতে তাঁরা মাটিতে প্রায় লুটিয়ে পড়তেই উপস্থিত দর্শক একসাথে জোর হাততালিতে ফেটে পড়ল। মুগ্ধ শিশুরা চোখ বড় করে দেখল আর প্রাপ্তবয়স্করা অবাক হয়ে ভাবলেন, দেশে না থেকেও কতটা যত্নে লালিত হচ্ছে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। মঞ্চে আসীন হলেন সঙ্গীতশিল্পী মিলিয়া ইসলাম সাবেদ । তিনি গাইলেন – " শাওন আসিলো ফিরে সে ফিরে এলো না "। তাঁর কণ্ঠে সুরের বিচরণ কখনো নীচে, কখনো উপরে উঠতে লাগল, গানটি হল প্রাণবন্ত। সঙ্গীতের করুণ রাগিণীতে হলঘরটা আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। শেষ অন্তরার টানা মীড় শুনে পেছনের সারির এক প্রবীণ শ্রোতা নিঃশব্দে চোখের জল মুছে নিলেন। গান শেষ হলে এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর উষ্ণ অভ্যর্থনায় আবার করতালিতে ফেটে পড়ল প্রেক্ষাগৃহ। সবশেষে মঞ্চে শিল্পীরা আবার জমায়েত হলেন। অনেকগুলো কণ্ঠ এক হয়ে গেয়ে উঠল সঙ্গীত "আগুনের পরশমনি"। একই সাথে গাওয়া অনেক কণ্ঠের সম্মিলিত সঙ্গীতে যেন প্রবাসের হলঘরে জন্ম নিল এক টুকরো বাংলাদেশ। সঙ্গীতের শেষ শব্দ ঝরে পড়তেই মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা, তারপর দীর্ঘ করতালিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠল চারদিক। পর্দা নামার আগে আয়োজকরা সকল শিল্পীকে মঞ্চে ডেকে নিয়ে এসে ধন্যবাদ দিলেন। অনুষ্ঠান শেষ হলেও কারো তাড়া নেই ঘরে ফেরার। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনের বাইরে এই কয়েক ঘণ্টা সবাই মিলে কাটালেন এক টুকরো বাংলাদেশকে ঘিরে। হলঘরের বাইরে তখন সবার মিলনমেলা। কেউ একজন প্লেট হাতে সমুচা আর চা বিতরণ করছেন, পাশে দাঁড়িয়ে দুই প্রবাসী বন্ধু প্রাণখোলা হাসিতে গল্প করছেন পুরনো দিনের স্মৃতি নিয়ে। এক কোণে ছোট্ট একটি মেয়ে, যে সন্ধ্যার শুরুতে নৃত্যদলের সঙ্গে মঞ্চে নেচেছিল, বাবার হাত ধরে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলছে, "বাবা, আমি আবার নাচবো পরের অনুষ্ঠানে!" বাবা হেসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। চারপাশে বাংলা ভাষার মিষ্টি কথোপকথনে বিদেশের মাটিতেও যেন ঘরের স্বাদ পেল সবাই। সবার চোখে মুখে তৃপ্তির ঝিলিক, হৃদয়ে নিজের সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের সাথে জুড়ে থাকার গর্ব। রাত বাড়ার সাথে সাথে অবশেষে সবাই ফিরতে শুরু করলাম নিজ নিজ গন্তব্যে। সিঙ্গাপুরের শহরের আলো ঝলমলে পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, আজকের এই সন্ধ্যা আমাদের হৃদয়ে এক অনির্বাণ প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছে। সুর আর সাহিত্য যেভাবে আমাদের সবাইকে একসাথে বেঁধেছে, তার রেশ মনের মধ্যে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি। আকাশের তারাগুলো যেন আজ একটু বেশিই ঝলমল করছে – হয়তো তারা সাক্ষী রইল আমাদের সাংস্কৃতিক মিলনের। প্রবাসের মাটিতে থেকেও সেই গানের সুর, কবিতার বাণী আর হাসি-আড্ডার মুহূর্তগুলো একটা সিনেমার দৃশ্যের মতো মনের পর্দায় স্থায়ী হয়ে গেল। সেদিন হলঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময়ে মনে হয়েছিল, মাঝে হয়তো সমুদ্রসম দূরত্ব, তবু এই রবীন্দ্র-নজরুল সন্ধ্যার মাধ্যমে আমরা সবাই আবার একটু করে বাংলাদেশকে ছুঁয়ে দেখতে পেলাম। গল্প, গান আর স্মৃতির এক অপূর্ব স্রোতে ভেসে সেই রাতে প্রতিটি হৃদয় বুঝতে পারল – যেখানে বাংলার সুর, সেখানে আমরা কেউ কখনো সত্যি পরবাসে নেই। অনুষ্ঠানে যারা সংগীত ও নৃত্য পরিবেশ করলেন তারা হলেন, "তুমি রবে নিরবে হৃদয়ে মম ": স্বাগতা ভট্টাচার্য নৃত্য "ও জোনাকি কি সুখে আজ ডানা দুটি মেলেছো ": নৈঋতা ও অনুষ্কা "শুভ্র সমুজ্জল হে চির নির্মল শান্ত অচঞ্চল ধ্রুব জ্যোতি": আহিল ফারজাদ, সারাহ মাহজাবীন , আরহাম, কিশোর, অম্বিকা , আনাহিতা "সখী ভাবনা কাহারে বলে সখী যাতনা কাহারে বলে" : ফারহানা সোহেনী নৃত্য " মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি": নাহিদা আক্তার স্বর্না "কেন মনোবনে মালতী বল্লরী দোলে জানি না": আনাহিতা আনসারী "আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে": সুব্রত সাহা ও কাকলি সাহা "মাধবীলতার আজি মিলন সখী": সুচেতা ভট্টাচার্য কহন আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র সিঙ্গাপুর: হায়দার, রঞ্জন, সৈকত, মিতু, নৈরীতা, শবনম আকতার স্বাতী, মৌসুমি " গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ": সোহেল রানা নৃত্য "বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে দিস নে আজি দোল": আরাত্রিকা মান্না "আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন দিল ও্যহি মেরা ফাস্ গ্যয়ি": শেখ শাহিন নৃত্য "মন মোর মেঘের সঙ্গী": নিজামুল হক অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা ও সঞ্চালনা: তৌহিদা রহমান টিনা, এ কে এম মাজহারুল আবেদীন