মশিউরের খেরোখাতা

আমেরিকায় বাফি-এর অনুষ্ঠান থেকে ফিরে (২০০৭)

তারিখ: ২৬ জুলাই ২০০৭

আমেরিকাতে বাংলাদেশীদের যেসব সংগঠন আছে তার মধ্যে অন্যতম বড় একটি সংগঠন হল BAFI (Bangladeshi-American Foundation, Inc.)। এটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান (Not Profit Organization) হিসাবে আমেরিকাতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং পাশাপাশি বাংলাদেশে বিভিন্ন সমাজসেবা ক্ষেত্রগুলিতে প্রত্যক্ষভাবে ভূমিকা রাখছে। আমি এবারই প্রথম বাফি’র অনুষ্ঠানে যোগ দিই। আমেরিকা থেকে প্রকাশিত পড়শী পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুল হাসান এর মাধ্যমেই বাফি’র সাথে যোগাযোগ। তাঁর পড়শী’র বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিভাগে আমি নিয়মিত লিখি। এবারের বাফি’র অনুষ্ঠানে কিছু সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিলো। বাফি’র সেমিনারগুলোর কোঅর্ডিনেটর হিসেবে মাহমুদুল ভাই কাজ করছিলেন এবং তাঁর আমন্ত্রনেই আমি বাফি’র অনুষ্ঠানে যোগ দিই। মাহমুদুল ভাই আমাকে ও ড. বদরুল খানকে আমন্ত্রণ করেছিলেন বাংলাদেশে ই-শিক্ষা এর সম্ভাবনার উপর একটি প্রেজেন্টেশন দিতে। আমরা বাফি’র এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করি। আমি প্রবাসে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছি এবং নিজেও কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি, কিন্তু এবারের বাফি’র অনুষ্ঠানটা দেখে মনে হল এটির ব্যাপকতা অনেক বড় এবং এর মানও বেশ ভাল। সেমিনারে যারা অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের নিজ নিজ বিষয়ে খুব দক্ষ। সেমিনারের মাধ্যমে বেশ কিছু জানার ও তাঁদের সাথে পরিচিত হবার সুযোগ হলো। সেজন্য বাফি’কে আমার একান্ত ধন্যবাদ। বিশেষ করে মাহমুদুল হাসান ভাইকে যিনি এই পরিচয়টি এনে দিয়েছেন। মূল অনুষ্ঠান ছিলো ৬ ও ৭ জুলাই। ৬ তারিখ সন্ধ্যায় মূল অনুষ্ঠান শুরু হলো যেখানে স্থানীয় বাংলাদেশীরা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো এবং ৭ তারিখ সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বিভিন্ন সেমিনার ছিলো। ৭ তারিখ সন্ধ্যায় ছিলো কয়েকটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। উল্লেখ্য যে আমি ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার হান্টিংটন নামে একটি ছোট শহরে থাকি। এটি বাফি’র অনুষ্ঠান যেখানে আয়োজিত হয়েছিলো সেই ওয়াশিংটন থেকে গাড়িতে প্রায় সাত ঘন্টা দূরে। ৬ তারিখ শুক্রবার দুপুরে একটু তাড়াতাড়ি অফিসের কাজ শেষ করে ড্রাইভে বের হলাম। সাথে আমার স্ত্রী মিতু ও পুত্র মেহরাব। দীর্ঘ পথ ড্রাইভ করে বেশ ক্লান্ত থাকলেও সন্ধ্যাবেলায় যখন বাফি’র অনুষ্ঠানে পৌছলাম তখন ক্লান্তি সব দূর হয়ে গিয়েছিলো। ওয়াশিংটন এলাকাতেই আমার ছেলেবেলার বন্ধু ওয়াসিউল ইসলাম গোর্কি এর বাসাতে ছিলাম। গোর্কিকে আপনারা অনেকেই চিনেন ভয়েস অব আমেরিকাতে রেডিও’র উপস্থাপনায়। সন্ধ্যায় হলরুমে ঢুকে দেখলাম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি চলছিল যেখানে স্থানীয় বাংলাদেশী শিল্পীরা গান গাইছিলেন। পুরো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি বেশ উপভোগ করলাম। বিশেষ করে হায়দারের গান বেশ ভাল লাগল। তাঁর গানে অন্য এক ধরনের আলাদা একটি আকর্ষন আছে। তাঁর ‘আমি ফাইস্যা গেছি..’ গানটা অনলাইনে বেশ কয়েকবার শুনেছি। ইচ্ছা ছিলো যে, হায়দারের গান সরাসরি শুনব। সব থেকে মুগ্ধ করলো, সেটা তাঁর গিটারের কাজ। আমার ধারনা ছিলো যে, এরা হঠাৎ উঠে আসা শিল্পী। কিন্তু হায়দার প্রমাণ করলো যে সে আসলেই যোগ্য। অনেক আগে কার্বনন্যানোটিউব আবিষ্কারক জাপানী বিজ্ঞানী সুয়োমো ইজিমা বলেছিলেন, “প্রভু প্রতিটি মানুষের জীবনে কখনো না কখনো সুযোগ এনে দেন কিন্তু সেই সুযোগটাকে ব্যবহার করার জন্য আমাদেরকে প্রস্তুত থাকতে হয়”। বাংলাদেশে অনেক শিল্পীরা হঠাৎ করে নাম করে, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, সে হয়তো প্রস্তুত না। আসলেই যদি লম্বা সময়ের জন্য কেউ থাকতে চায়, বিশেষ করে সংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই বলুন আর আমাদের বিজ্ঞানের জগৎ বলুন, তাঁকে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং অনেক কাঠ খড়ি পুড়াতে হবে। হায়দারের গলা শুনে মনে হলো যে, সে প্রস্তুত। আমার কাছে মনে হল ভবিষ্যতে হায়দার আমাদের অনেক কিছু উপহার দিবে। আমেরিকা একটি বিশাল দেশ এবং এর বিভিন্ন জায়গায় বাংলাদেশীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। দূর-দূরান্তের বাংলাদেশীদের সাথে মুখোমুখি পরিচয় হবার সুযোগটা একটু কম। বাফি এর অনুষ্ঠানের আগে টেলিফোনে ও ইমেইলে অনেক বাঙালীর সাথে পরিচয় ছিল কিন্তু সরাসরি দেখার সুযোগ হয়নি। বাফি’র অনুষ্ঠানে সেরকম অনেকের সাথেই দেখা হল। দেখা হবার পরে মনে হয়েছে উনাকে তো আমি চিনি, আচ্ছা উনি দেখতে এইরকম। যেমন পড়শী’র মাহমুদ ভাইয়ের সাথে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করলেও সরাসরি তাঁর সাথে দেখা হয়নি। বাফিতে সেই সুযোগটি হলো। অনেকের সাথেই প্রথম যখন দেখা হচ্ছিল তখন “ওহ! আচ্ছা, আপনিতো উনি....” জাতীয় কথা হল। বেশ মজা লাগছিলো এই জিনিসটি। পরিচয় হল চেঞ্জবাংলাদেশের (http://ChangeBangladesh.com) এর কাওসার ভাইয়ের সাথে। ইনার সাথেও অনেক কথা হয়েছে, টেলি কনফারেন্স হয়েছে; কিন্তু কখনো মুখোমুখি দেখা হয়নি কেননা আমরা থাকি আমেরিকার দুপ্রান্তে। বাংলাদেশী শিল্পীদের সাথেও পরিচয় হলাম। বাংলাদেশে হয়তোবা এই সুযোগটা থাকতো না। খুব উপভোগ করলাম শুক্রবারের রাতটা। আমরা ফিরতে ফিরতে প্রায় রাত দু’টা বেজে গিয়েছিলো। অনেকটা পথ ড্রাইভ করে গিয়েছি বলে বেশ ক্লান্ত ছিলাম, তাই বিছানায় যেতে যেতই ঘুমিয়ে গেলাম। সেদিন রাতে ছিলাম আমার বন্ধু ওয়াসি এবং নাইমা ভাবীর বাসাতে। তাঁরা খুবই আপ্যায়ন করেছিলেন। প্রবাসে যতবারই বাংলাদেশীদের বাসায় থাকার সুযোগ হয়েছে ততবারই তাঁদের অকৃত্রিম অতিথেয়তায় উপলব্ধি করেছি যে বাংলাদেশীরা খুবই অতিথিপরায়ণ।

পরেরদিন সকালবেলা, আমি এবং ওয়াসি বের হয়ে যাই। ওয়াসি’র ভয়েস অব আমেরিকাতে একটি রেকর্ড ছিলো। মূল কনফারেন্স যদিও দশটার দিকে শুরু হওয়ার কথা তথাপি আমি সাত সকালেই এসে হাজির। তার কারণ এই সমস্ত জায়গায় অনেকের সাথে কথা বলার ও পরিচিত হবার সুযোগ থাকে। তারপর মূল সেমিনার শুরু হলো দশটার দিকে। প্রথমেই আমি অংশ নিলাম বেগম রোকেয়া’র উপরে একটা সেমিনারে। বেগম রোকেয়া কি ধরনের কাজ করেছিলেন, বিদেশে বেগম রোকেয়াকে কিভাবে স্বরণ করা হয় এবং তাঁর উপর গবেষনাকর্ম বক্তারা আলোচনা করলেন। তাঁদের বক্তব্য খুব ভালো লাগলো। নারী জাগরনের জন্য বেগম রোকেয়া যেভাবে কাজ করেছিলেন, সেটা সত্যিই অতুলনীয়। আমাদের দেশে নারীরা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। নারীদের আরো সামনে এগিয়ে আসা উচিত। কিছুক্ষন পরে সকাল এগারোটা থেকে আর্সেনিকের উপর একটি সেমিনারে অংশ নিই। মূল বক্তা ছিলেন ড. আবুল হুসসাম যিনি বাংলাদেশে আর্সেনিক নির্ণয় ও প্রতিরোধের জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। উনি বাংলাদেশের আর্সেনিক সমস্যার উপর কথা বললেন। বিজ্ঞানী.org এ ড. হুসসাম এর একটি সাক্ষাতকার নিয়েছিলাম এবং আর্সেনিক বায়োসেন্সর তৈরীর সম্ভাবনার উপর আমরা যৌথভাবে গবেষনা করছি। একই সাথে মুহিত রহমানের একটি সেমিনার ছিলো পাশের রুমে তাই আমি মিস করলাম। দুপুরে লাঞ্চ সেরে আমরা আরেকটা সেমিনারে যোগ দিই। তবে সেমিনার না বলে এটিকে খোলা সংলাপ বলা যায়। বক্তারা ছিলেন ড: জাহাঙ্গীর খান, ড: আবুল মোমেন ও ড: ইন্তেখাম চৌধুরী। তাঁরা ইমিগ্রেশন ইস্যু নিয়ে আলোচনা করলেন। এটি পরিচালনা করেন ভয়েস অব আমেরিকার ইকবাল বাহার চৌধুরী। পাশের রুমে অবশ্য মানবাধিকারের উপর একটি আলোচনা চলছিলো, কিন্তু আমি খোলা সংলাপে যোগ দিই। এই সেমিনারটি আমি খুব উপভোগ করি, এই কারনে যে এইখানে বক্তারা যে সমস্ত কথাগুলো বলছিলেন, তার সাথে আমি খুবই একমত। প্রবাসে বাংলাদেশীরা যে রাজনীতি করেন, সেটা একটি ভিন্নধর্মী রাজনীতি। আমরা বাংলাদেশে রাজনীতির কোন একটা শাখা বিদেশে চালু করছি, যেটি হয়তো প্রবাসী বাংলাদেশীদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনছে না এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতেও তেমন একটা প্রভাব রাখছে না। শুধুমাত্র কিছু অর্থ সহায়তা করা ছাড়া, সরাসরিভাবে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কোন ভূমিকা রাখছে না। এখানে বক্তারা বলছিলেন, আমরা যারা আমেরিকাতে প্রবাসী তাদের এখানে আমেরিকার মূল ধারার রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে। বক্তাদের মধ্যে অনেকেই আমেরিকার ডেমেক্রেটিক ও রিপাবলিকানের রাজনীতির সাথে সক্রীয়ভাবে জড়িত। তারা বললেন, আমেরিকার মূলধারার রাজনীতি করেই আমাদের আমেরিকার প্রশাসনের কাছে আমাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারবো এবং বাংলাদেশেও রাজনীতিতে আমরা কিছু কন্ট্রিবিউশন করতে পারবো। ইকবাল বাহার চৌধুরীর গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতা দেখে চমৎকৃত হলাম। বক্তারা বলছিলেন, অন্যান্য দেশে যেমন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানেরও কোন রাজনৈতিক শাখা প্রবাসে নেই, শুধুমাত্র বাংলাদেশেই এই সংস্কৃতিটি দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশীরা বিদেশের মাটিতে বসেই যে রাজনীতির শাখা খুলে তাই নয়, দ্রুত সেগুলোর মধ্যে এতো বেশি বিভাজন হয়ে যায় যে সেগুলো নিয়ে বেশ সমস্যা হয়। এমনকি মারামারি কাটাকাটিও পর্যন্ত হয়েছে প্রবাসী এই সমস্ত রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে কেন্দ্র করে। আমি তাদের সাথে একদম একমত যে, আমাদের উচিত এখানকার মূলধারার রাজনীতির সাথেই করা। সেমিনারগুলিতে প্রশ্ন-উত্তর ও আলোচনার জন্য সময়গুলি বেশী করে ব্যয় হওয়াতে আয়োজকরা অনুষ্ঠানগুলি পরিচালনা করতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। এরপর আমার এবং ড: বদরুল খানের সেমিনার ছিলো। যেটা দুপুর দুটায় শুরু হবার কথাছিল সেটি দুপুর তিনটায় শুরু হলো। আমাদের বিষয় ছিলো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-শিক্ষা (e-learning) সম্ভব কিনা। সহজ ভাষায় ই-শিক্ষা হলো শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তিকে ব্যবহার করার কৌশল। পৃথিবীর অনেক দেশেই ই-শিক্ষা প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-শিক্ষা কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে তাই ছিলো আমাদের আলোচনার মূল বিষয়। ড. বদরুল তাঁর উদ্ভাবিত ই-শিক্ষা’এর মডেলের কথা বললেন এবং সেই মডেলটি যে বাংলাদেশেও প্রয়োগ করা যেতে পারে তার সম্ভাবনার কথা বললেন। আমি মূলত ই-শিক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে সমস্ত প্রযুক্তির ব্যবহৃত হতে পারে সেগুলি নিয়ে আলোচনা করলাম। বিশেষ করে মুক্ত সফটওয়্যার (Open Source Software) ও অপেন কোর্স ওয়ার্ক (Open Coursework) নিয়ে আলোচনা করলাম। যেকোনো দেশে ই-শিক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের ভালো শিক্ষার উপকরণ (যেগুলি আমরা learning object বলি) প্রয়োজন। আমেরিকাসহ অনেক দেশেই শিক্ষা বিস্তারের সুবিধার জন্য শিক্ষার উপকরণ বা learning object গুলি সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ গড়ে তুলছে এবং অন্যের সাথে শেয়ার করছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা একটা আর্কাইভ গড়ে তুলতে পারি এবং সেগুলি ব্যবহার করে ছাত্র/ছাত্রীদের শিখাতে পারি।

সেমিনার: বাংলাদেশের ই-শিক্ষা সম্ভব কি? -ড. বদরুল খান ও ড. মশিউর রহমান এবং ড. বদরুল খানের উদ্ভাবিত ই-শিক্ষার মডেল

আমাদের সেমিনারটির চেয়াপার্সন ছিলেন প্রফেসর সাইফুর রহমান। উনি ভার্জিনিয়াটেকের ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর। আমাদের সেমিনারের পরে আমরা সমাপ্ত টানলাম এই বলে যে, আমাদের বাংলাদেশে ই-শিক্ষা সম্ভব। তবে এটা ঠিক যে শুধু মাত্র প্রযুক্তি কোন কিছুর সমাধান দিতে পারে না। আমাদেরকে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে চিন্তাভাবনা করতে হবে। প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয় এবং প্রযুক্তি যেগুলো আমাদের হাতের কাছে আছে সেগুলো দিয়েই সম্ভব। বাংলাদেশের প্রক্ষাপটে ই-শিক্ষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে খুব অর্থের প্রয়োজন নেই এবং আমরা ক্ষুদ্র পরিসরেই শুরু করতে পারি। সেমিনারের পরে শ্রোতারা বিভিন্ন প্রশ্ন করলেন এবং আমরা তাঁদের উত্তর দিলাম। এরপর প্রবাসে বাংলাদেশীরা মিডিয়াতে কিরকম ভূমিকা রাখছেন তার উপর একটি সেমিনার হল। সেমিনারের শেষে বাহিরের করিডরে অনেকের সাথেই ই-শিক্ষা নিয়ে কথা হলো। চ্যানেল আই আমার একটি সাক্ষাতকার নিল। পাশাপাশি আমি বিজ্ঞানী.org কে সবার কাছে তুলে ধরলাম। বিজ্ঞানী.org হল ইন্টারনেটভিত্তিক একটি সংগঠন যেখানে আমরা বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কথা তুলে ধরছি। দুইবছর আগে আমরা মাত্র যাত্রা শুরু করেছি, আমাদের আরও অনেক পাঠক ও লেখক দরকার। সবার সহায়তার মাধ্যমে আমরা সুন্দর একটা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলতে পারবো এবং সেজন্য আপনাদের সহায়তা কামনা করছি। বিস্তারিত এর জন্য দেখুন http://biggani.org । খুব ভাল লাগল যখন জানলাম অনেকেই বিজ্ঞানী.org কথা জানেন। তাঁরা সবাই সাধুবাদ জানালেন আমাদের উদ্দ্যোগকে এবং অনেকেই আমাদের সাথে ভবিষ্যতে কাজ করবেন বলে কথা দিলেন। বাফি’তে বিভিন্ন পেশার মানুষের সাথে পরিচিত হবার, তাঁদের কথা জানার এবং আমাদের কার্যক্রম তুলে ধরবার একটা বিরল সুযোগ পেলাম। এরপরে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। মূল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সাতটায় শুরু হবার কথা থাকলেও প্রায় নয়টার দিকে শুরু হলো। জর্জ ম্যাসন (George Mason) বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল স্টেডিয়াম দেখে ভেবেছিলাম এত বাংলাদেশী কি আসবে? কিন্তু অনুষ্ঠান শুরু হলে প্রচন্ড ভীড় থেকে বুঝলাম যে আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাংলাদেশীরা বাফি’র অনুষ্ঠানে যোগ দেবার জন্য ছুটে এসেছেন। প্রবাসে এত বড় বাংলাদেশীদের সমাগম আমি আগে কখনও দেখিনি। অনুষ্ঠানের শুরুতেই জুয়েল ও হায়দার গান শোনালেন। এরপরে অপি এবং মাহফুজ একটি সুন্দর ছোট একটা নাটিকা করলেন। ফেরদৌস এবং পূর্নিমা সিনেমার গানের সাথে নাচ প্রদর্শন করলেন। যদিও অনেকটা বলিউডের সিনেমার মতো কিন্তু মান মোটামুটি ভালোই লাগলো। এরপর কনক চাঁপা কিছু গান শোনালেন। শিবলী মোহাম্মদ একটা নাচ প্রদর্শন করলেন। সব থেকে মনে রাখার মতো হলো, রুনা লায়লার সঙ্গীত। অন্যান্য সমস্ত শিল্পী থেকে উনি যে একেবারেই আলাদা সেটা উনি প্রমাণ করলেন। অন্যান্য শিল্পীদের পারফরমেন্সকে আমি ছোট করে দেখছি না। তবে সবাই একমূখীভাবে তাদের পারফর্মেন্স দেখিয়েই চলে যাচ্ছিলেন, কিন্তু রুনা লায়লা শ্রোতা/দর্শকদের সাথে একটা যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলেন। তিনি গানের মাঝে দর্শকদের মাঝ থেকে শিশুদের নিচ্ছিলেন এবং শ্রোতাদের সাথে একটা অদ্ভুত যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। বিষয়টা খুবই উপভোগ করছিলাম। উনি যে একজন খুব বড় মাপের দক্ষ শিল্পী সেটাই উপলব্ধি করলাম। সবার শেষে হাবিব এবং ফেরদৌস ওয়াহিদ গান শোনালেন। অনুষ্ঠান শেষ হল বারোটার দিকে। যদিও সবাই আরো কিছুক্ষণ উপভোগ করতে চাইছিলেন কিন্তু প্যাট্রিয়ট সেন্টার ১২ টায় বন্ধ হয়ে যাবে বলে সেই আশা ছাড়া আমাদের বের হয়ে আসতে হল। যদিও সময় স্বল্পতা ছিল এবং যারা আয়োজক ছিলেন তাদেরও ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ছিলো, তারপরেও বলব খুব ভাল লাগল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানটি। আমি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলো যেভাবে উপভোগ করেছি তেমনিভাবে সেমিনারগুলোও উপভোগ করেছি। সর্বপরি বাফি’র অনুষ্ঠানটি আমার কাছে বেশি সার্থক। আমি আশা করবো বাফি ভবিষ্যতে এইরকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সবকিছুর জন্য বাফির পেছনে যারা নিরলসভাবে কাজ করেছেন এবং এই রকম একটি বিশাল অনুষ্ঠানকে সার্থক করেছেন ও আমাদের উপহার দিয়েছেন তাদের সবাইকে আমার ধন্যবাদ রইল।

ওয়েস্টভার্জেনিয়া, আমেরিকা

২৬ জুলাই ২০০৭

লেখকের সম্পাদিত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রবন্ধের জন্য পড়ুন http://biggani.org