মশিউরের খেরোখাতা

১২: মেন্টর তৈরী করুন (১২ নভেম্বর ২০১৯)

ব্যাক্তিগত ও পেশাগত জীবনে বুদ্ধি পরামর্শ নেবার জন্য ভালো মেন্টর এর খুব প্রয়োজন আছে। আপনি যখন পথ হারিয়ে ফেলবেন তখন এই মেন্টররা তাদের অভিজ্ঞতা থেকে আপনাকে আলো দেখিয়ে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ইংরেজীতে মেন্টরের আভিধানিক অর্থ হল: an experienced and trusted adviser। তাই অভিজ্ঞ এবং সেই সাথে উনি বিশ্বাসী কিনা তা গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বাংলাভাষায় মেন্টরকে “বড় ভাই” বলতে পারি‍। সনাতন ভাবে যে‌ভাবে আমরা বড় ভাইদের কাছে বুদ্ধি পরামর্শ নিতাম, এই মেন্টররা তেমনই, তবে একটু পার্থক্য হল এরা আপনার পেশাজীবন সমন্ধে জানেন এবং আপনাকে খুব ভালো মতন চিনেন। মেন্টরাও পেশাজীবনে অভিজ্ঞ। এইখানে উল্লেখ্য যে আমি অভিজ্ঞ শব্দটি ব্যবহার করেছি, সফল নয়। অভিজ্ঞ মানে হল যার অভিজ্ঞতার ভান্ডারটি ভরপুর‍।

মেন্টরদের লিস্ট:

আমি কর্পোটে ঢুকে আমি তেমন কিছু মেন্টরদের লিস্ট তৈরী করলাম যারা পেশাজীবনের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা শেয়ার করতো। কখনও ফোনে, কখনও স্কাইপে, কখনও বা কফির দোকানে। কিন্তু কখনই বাসাতে দাওয়াত খেতে খেতে না। সেখানে ফোকাস করে কথা বলার অবকাশ কম। আমার একটি মেন্টরের লিস্ট রয়েছে যাদের সাথে আমি প্রায়ই গল্প করি এবং তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি। বিভিন্ন বুদ্ধি পরামর্শ আমি প্রায়ই নিয়ে থাকি তাদের কাছ থেকে। এই মেন্টর রা আমার একটি বড় সম্পদ। এদেরকে আমি খুব গুরুত্ব দিই, সম্মান দিই এবং তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করি। আমার মনে হয়েছে, এইভাবেও আপনিও আপনার একটি মেন্টরের লিস্ট তৈরী করে নিতে পারেন। আমি কোন নতুন লেখা লিখলে, নতুন কিছু শিখলে তাদের সাথে শেয়ার করি এবং তাদের পরামর্শ নিই। অনেকেই যে আমার থেকে বড়, তা নয়। মজার ব্যাপার হল আমার এই মেন্টরের লিস্টে অনেক কনিষ্ঠ, এমনকি আমার ছাত্রছাত্রীরাও রয়েছে। তাদের চিন্তা ভাবনা ও পর্যবেক্ষণ আমাকে অনেক শক্তি দেয়। জীবনে চলার পথে এমন মেন্টরদের খুব প্রয়োজন। ছেলেবেলায় একটি গল্প পড়েছিলাম যে মাকড়সা তা সন্তানদের খাদ্য খোঁজার জন বিভিন্ন দিকে পাঠিয়ে দেয়। তারপরে তারা ফিরে আসে। আমি তেমনি আমার ছাত্র/ছাত্রীদের বিভিন্ন দেশে রয়েছে। তাদের মাধ্যমে অনেক কিছু শেখার চেষ্টা করি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে ক্যারিয়ার জীবনে তারা কি শিখছে, সেখান থেকেও শেখার চেষ্টা করি। একটি একটি মানুষ আমার কাছে বইয়ের মতন। বই যেমন ভাবে আগ্রহী হয়ে পড়ি,তেমনিভাবে এই মানুষগুলিও গুরুত্বপূর্ণ।

একটি স্পেডশীটে তৈরি করেনিন আপনার মেন্টরদের ‍লিস্ট। কলামে রাখতে পারেন, নাম, যোগাযোগ, কখন যোগাযোগের জন্য ভালো, তার এক্সপার্ট বিষয়, শেষ কবে যোগাযোগ করেছেন‌, ইত্যাদি। একটি লিস্ট এর গুরুত্ব আছে এই কারণে যে, এই মেন্টরদের আপনি হারিয়ে ফেলবেন না। মেন্টররা কিভাবে হারিয়ে যায়? সোজা উত্তর হল, সঠিকভাবে যোগাযোগের অভাবে‌। শুধু মাত্র প্রয়োজনেই যে তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন, তা নয়, আপনার আপডেট, ইন্ডাস্ট্রি এর খবরাখবর দিয়েও মেন্টরদের সাথে যোগাযোগটি অটুট রাখতে পারেন।

আমার মেন্টর মোহাম্মদ আলি

আমি কর্পোরেটে ঢোকার পরে আমাদের টিমের কাছে এই ডকুমেন্ট তৈরীর কৌশল গুলি নতুন করে শিখলাম। তবে এইক্ষেত্রে আমি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে চাই আমার মেন্টর “মোহাম্মদ আলি” এর কথা। তিনি একটি উপজেলার প্রকৌশলী ছিলেন এবং কৈশরে আমি তার কাছেই বড় হয়েছি। সেই ছেলেবেলা থেকেই শিখেছি তিনি কিভাবে মিটিং করে ডাইরিতে লিপিবদ্ধ করতেন। একটি গ্রামের কোন সভা হয়েছে কিংবা হাটে কিছু লোকের সাথে আলোচনা হয়েছে। তারপরেই তিনি ডাইরিতে রিভিউ করে লিখতেন সেটিতে আলোচিত বিষয় গুলি। কৈশরে তিনি শিখিয়েছিলেন কিভাবে ডকুমেন্ট তৈরী করতে হয়। একদিনের কথা খুব মনে আছে- আমাকে নিয়ে তিনি পুরান ঢাকায় গিয়েছিলেন তার মেয়ের জন্য একটি পাত্র দেখার জন্য। ফেরার পথে রিকসাতেই তিনি টুকটুক করে পয়েন্টগুলি একটি ছোট কাগজে লিখে নিলেন। আমি কথা বলতে গেলাম। উনি ইশারায় কথা বলতে নিষেধ করলেন। বুঝলাম তিনি গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলি লিখে নিচ্ছেন। এরপরে আমাকে একটি মিস্টির দোকানে নিয়ে যেয়ে কিছু নাস্তার অর্ডার দিলেন। তখন দেখি তিনি তার মূল ডাইরিটি বের করলেন। এবং আলোচিত পয়েন্টগুলি পুরো বাক্যে লিখে নিচ্ছেন। এইখানে গুরুত্বপূর্ণ হল, পূর্ণ বাক্যে পয়েন্টগুলি লেখা। অনেক সময়ই আমরা শুধু শব্দ দিয়ে লিখে রেখে দিই। পরে আর রিভিও করিনা। কিন্তু পরে রিভিও করে পুরে বাক্যে তিনি লিখতেন। এর ফলে অনেক পরে হলেও সেই নোটগুলির গুরুত্ব থাকতো। এই দুটি প্রোসেস (প্রথমের সর্ট নোট এবং পরে বিস্তারিত বাক্যে নোট) তিনি সব সময়ই ব্যবহার করতেন। কোন কাগজে লিখছি, বা তা কম্পিউটারে লিখছি কিনা - তা খুব একটি গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই প্রোসেসটি গুরুত্বপূর্ণ। তার প্রোসেসটি হল: [১] আগে থেকে প্রিপারেশ (হোমওয়ার্ক) ⇒ [২] আলোচনার সম‍য় কুইক নোট (পয়েন্টগুলো) ⇒ [৩] পরে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুরো বাক্যে লিপিবদ্ধ করা ⇒ [৪] ফিডব্যাক

এছাড়া তার কাছে শেখা আরো একটি সমস্যা সমাধানের কৌশল আমি শে‍য়ার করতে চাই।

তিনি বলতেন, “কোন সমস্যা আমরা প্রোসেস দিয়েই সমাধান করতে পারবো”

যে কোন সমস্যা সমাধানের জন্য তিনি সম্ভ্যাব্য সমস্ত সমাধানের একটি লিস্ট তৈরী করতেন। খুব ভালোমতন হোমওয়ার্ক করে তিনি এই লিস্টটি তৈরী করতেন। তারপরে সেই লিস্টগুলিকে একটি অগ্রাধিকার দিয়ে সাজাতেন। এরপরে একটি একটি করে অপশন কে টাস্কে পরিনত করে সেটি নি‌য়ে কাজ করতেন। মনে করা যাক, তিনি কারো চাকুরির জন্য চেস্টা করেছেন। তখন তিনি একটি লিস্ট করতেন কাকে বলে এই ব্যাপারে তিনি সাহায্য পেতে পারেন। তারপরে সেই লিস্টটি থেকে অগ্রাধিকার অনুযায়ী সাজাতেন। এরপরে গুরুত্ব অনুযায়ী উপর থেকে তিনি যোগাযোগ করা শুরু করতেন‌। কখনও ঢাকা আসতেন সেই কাজগুলি সমাধান করার জন্য। আমি তার সেই লিস্টটি বানাবার কৌশলটি শিখলাম। এরপরে আমিও এই পদ্ধতিতে যে কোন সমস্যাকে সমাধান করতাম। খুব ছেলেবে‌লা থেকেই এইভাবেই এইসমস্ত প্রোসেসগুলির উপর তার কাছে প্রচুর ট্রেনিং পেয়েছি।

তার মৃত্যুর পরে গ্রামের বাড়িতে যেয়ে আবিষ্কার করলাম তার ডাইরিটি। যে কোন পাতা উল্টিয়েই খুব সহজেই বুঝতে পারলাম কি আলোচনা করেছেন। কেননা সব কিছুর পরেই তিনি একটি সারাংশ লিখে রেখেছেন। হয়তো আজ সেই সব আলোচনার বিষয়গুলির কোন গুরুত্ব নেই, কিন্তু এই যে ডকুমেন্ট করার কৌশল তার কাছে শিখেছিলাম তাই আমি নিজের জীবনে সরাসরি জীবনের শিক্ষকদের কাছে শিখেছিলাম। আসলে এমন অনেক বিষয়ই আছে যা আমরা জীবন থেকে শিখি যা কোন বই্য়ে লেখা থাকেনা। এই মেন্টর ও শিক্ষককে যে কি পরিমানে ভালোবাসতাম তা বোঝান যাবেনা। এখন তার স্মৃতিচারণ করছি আর চোখ সিক্ত হয়ে যাচ্ছে। আজকের লেখাটি এইখানেই সমাপ্তি টানছি।

Posted on 12 Nov 2019