মশিউরের খেরোখাতা

তথ্য প্রযুক্তি কি দারিদ্রতা নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারে?

ড. মশিউর রহমানসহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

দারিদ্রতা শুধু আমাদের দেশ, বাংলাদেশেরই সমস্যা নয়। বর্তমানে বিশ্বের সব নেতা-নেত্রীরা এই দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পাবার উপায় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০০৩ সনের তথ্য সূত্রে দেখা যায় বিশ্বের মোট ৯০০ মিলিয়ন জনগণ দারিদ্র এবং বর্তমানে এই সংখ্যা নিশ্চয় বেড়ে অনেক হয়েছে। নিম্নের চিত্রে জাতিসংঘের উদ্ভাবিত Human Poverty Index তে দেখা যায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দারিদ্রতার অবস্থান দেখা যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের অবস্থা খুবই দু:দুখজনক।

দারিদ্রতা কিভাবে দূরদূ করা যায়?

দারিদ্রতা দূরদূ করবার জন্য আমি মনে করি নিম্নের জিনিসগুলি ভূমিকা রাখতে পারে,

শিক্ষা: একজন দরিদ্র মানুষ শিক্ষার অভাবে তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে না। তাই দরিদ্র মানুষের কাছে শিক্ষা সহজলভ্য করা দরকার।

অর্থনীতি: একজন দরিদ্র মানুষ তাঁর অবস্থান পরিবর্তন করার জন্য প্রয়োজন অর্থ আর এই অর্থ তাঁর কাছে সহজলভ্য হওয়া প্রয়োজন। মাইক্রোক্রেডিট বা ক্ষুদ্রঋণ এই ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে। অবশ্য ক্ষুদ্রঋণ ব্যবহার করে দরিদ্ররা সেই ঋণের বোঝা থেকে সত্যিই বেরিয়ে আসতে পারে কিনা তা এখনও সম্পূর্ণ প্রমাণ হয়নি। যদিও আমাদের দেশের ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন আছে, তারপরও বলা যায় যে ক্ষুদ্রঋণ কিছুটা হলেও দারিদ্রতা নিরসনে ভূমিকা রাখে।

তথ্য: যদিও এতদিন পর্যন্ত দারিদ্রতা নিরসনে তথ্যকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়নি, তবে এখন অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সঠিক তথ্য একজনের অবস্থান পরিবর্তন করতে ভুমিকা রাখতে পারে।

এছাড়াও সামাজিক কাঠামো সহ অনেক কিছুই ভূমিকা পালন করে। তবে আজকের এই প্রবন্ধে "তথ্য" কে কেন্দ্র করে আলোচনা করব।

আমাদের সভ্যতার শুরুর দিকে প্রযুক্তি উন্নয়নের চাবি-কাঠি হলেও বর্তমানে আমরা দেখতে পাচ্ছি অন্যান্য প্রযুক্তির মধ্যে তথ্য প্রযুক্তি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। "তথ্য প্রযুক্তি" মূলত যোগাযোগের মাধ্যম, তথ্য সংরক্ষণ, এবং তথ্যকে নিয়ে সহজে কাজ করার একটি প্রযুক্তি হিসাবে দেখতে পারি। তথ্য প্রযুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল "ইন্টারনেট, যাকে আমরা জনগণের নেটওয়ার্ক বলতে পারি এবং এইখানে জনগণই তথ্যের উৎপাদন বা সংযোগ করেন এবং তা অন্যের সাথে শেয়ার করেন। ইন্টারনেটকে আমরা একটি বিশাল তথ্যভান্ডার বলতে পারি। যেহেতু এই তথ্যভান্ডারে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকে, তাই সেই তথ্যকে ব্যবহার করে দারিদ্রতা দূরদূ করা সম্ভব। এইবার দেখা যাক, তথ্য কিভাবে দারিদ্রনিরসনে ভূমিকা পালন করে।

দরিদ্র জনগণের কাছে তথ্য পৌছে দেবার উপায়

দারিদ্রতা বিমোচনের উপায়, কিংবা যেসব তথ্যগুলি ব্যবহার করলে দারিদ্রতার থেকে মুক্তি পেতে পারে সেই তথ্যগুলি আমরা তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে দরিদ্র লোকের কাছে পৌছে দিতে পারি। কিন্তু এইক্ষেত্রে সমস্য হল আমাদের দারিদ্র মানুষগুলি অশিক্ষিত, যার ফলে তথ্য প্রযুক্তি সরাসরি তাদের উপকারে আসতে পারবে না। এইক্ষেত্রে তিনটি উপায় রয়েছে যা আমরা বর্তমানে প্রয়োগ করছি, (১) কমিউনিটি সেন্টার ও (২) কমিউনিটি রেডিও এবং (৩) টেলিসেন্টার।

(১) কমিউনিটি সেন্টার বা তথ্য কেন্দ্র: এটি মূলত একটি সেন্টার যেখানে তথ্য সহজে পাওয়া যেতে পারে। সাধারণত কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেট, ওয়েবক্যামেরা ইত্যাদি কমিউনিটি সেন্টারে থাকে। দরিদ্র জনগণ নিজে সরাসরি না পারলেও কমিউনিটি সেন্টারের লোকজনের সাহায্য নিয়ে তথ্য নিতে পারে। আবার কমিউনিটি সেন্টারগুলি তথ্য সরবরাহ- "একটি সার্ভিস প্রদান" হিসাবে কাজ করে এটি অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বি হতে পারে।

(২) কমিউনিটি রেডিও: বাংলাদেশে রেডিও আকারে ছোট, সহজে বহনযোগ্য এবং দামেও সস্তা। সেদিক দিয়ে এটি বেশ সহজলভ্য। কমিউনিটি উন্নয়ন কনসেপ্টকে ব্যবহার করে কমিউনিটি বেতার এর মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত এলাকার জনগণের চাহিদামাফিক তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এলাকাভিত্তিক লাগসই ও টেকসই কৃষি প্রযুক্তি সমপ্রসারণ ও স্থানীয় উন্নয়নের মাত্রিক উন্নয়ন করা সম্ভব। বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের মাধ্যমে কমিউনিটি রেডিওগুলি স্বাবলম্বি হতে পারে।

(৩) টেলিসেন্টার: এটি একটি কলসেন্টারের মত যেখানে টেলিফোনের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস দেয়া হবে। বিনামূল্যে প্রদান না করে সামান্য ফি এর বিনিময়ে তথ্য প্রদান করে টেলিসেন্টারগুলি সাবলম্বি হতে পারে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেহেতু কৃষকরাই বেশী এবং তাদেরই বেশী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া দরকার তাই আজকে মূলত কৃষকদের নিয়েই আলোচনা করব।

কৃষকের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় বিষয়টি হচ্ছে সময়োনুযায়ী সঠিক তথ্য প্রাপ্তি। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য না পেলে কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয় এবং কাংক্ষিত উৎপাদন ও বাজারমূল্য পায় না। কৃষকদের কৃষি সংক্রান্ত তথ্য দেবার জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি তথ্য কেন্দ্র ভুমিকা রাখতে পারে। এখানে কৃষকরা ফসল ও কীটনাশক সংক্রান্তু তথ্য সহজে পেতে পারে। কোন ফসল চাষ করলে তা অর্থনৈতিকভাবে বেশী উপাকার আনবে তা জানা থাকল কৃষকরা সেই দৃষ্টিদৃষ্টিভঙ্গিতে চাষ করতে পারবে। এছাড়া একটি ফসল তুলবার পরে, কোথায় বিক্রি করলে তা সুবিধাজনক হবে তা জানলে কৃষকরাও উপকৃত হবে।

চিত্র: ekrishok কমিউনিটি সেন্টারে একজন কৃষক তথ্য সেবা নিচ্ছে

কৃষি তথ্য কেন্দ্র তৈরীর প্রথম উদ্যোগ দেখা যায় ভারতে। সেখানে মধ্য প্রদেশ জ্ঞানদূতদূ (GyanDoot) ও দৃষ্টিদৃষ্টি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকরা তাদের কৃষি সংক্রান্ত তথ্য পাচ্ছে। এছাড়া নেপালে MahilaWeb মহিলাদের তথ্য প্রযুক্তি সেবার মাধ্যমে তাদের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও কৃষকদের জন্য নিম্নের প্রতিষ্ঠানগুলি কাজ করছে:

  • http://www.agrobangla.com

  • http://www.ruralinfobd.com/

  • http://www.ekrishok.com/

  • গ্রামীণফোন কমিউনিটি ইনফরমেশন সেন্টার (জিপিসিআইসি) প্রকল্পের আওতায় বিআইআইডি এবং জানালা বাংলাদেশ যৌথভাবে বাতিঘর নামক ই-তথ্য কেন্দ্র চালু করেছে। http://www.gpcic.org

  • বাংলাদেশ সরকারের কৃষি তথ্য সার্ভিস http://www.ais.gov.bd/

যেহেতু কৃষকরা কম্পিউটার, তথ্য প্রযুক্তি কিংবা ইন্টারনেটে কিভাবে তথ্য খুঁজতে হবে তা জানে না তাই এইধরনের কৃষি তথ্য কেন্দ্র এর প্রয়োজন রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে যখন কৃষকরা নিজেরাই তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করতে শিখবে তখন আরো ব্যাপকভাবে তথ্য প্রযুক্তি ভুমিকা রাখতে পারবে। তথ্য প্রযুক্তি যে শুধুমাত্র কম্পিউটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বর্তমানে যেহেতু মোবাইল ব্যাপকভাবে আমাদের কাছে সমাদৃতদৃ হচ্ছে তাই অদূরদূভবিষ্যতে মোবাইল ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি। এছাড়া কমিউনিটি রেডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কৃষি সেবা লাইন/ফোন ইন সুবিধা: বর্তমানে মোবাইল কৃষকের হাতে সহজলভ্য হচ্ছে তাই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে কৃষকদের হেল্প লাইন সার্ভিস চালু হয়েছে। বাংলাদেশে বাংলালিংক এই সার্ভিস নিয়ে এনেছে। তাঁরা কৃষকদের সমস্যার সমাধান, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও বিরূপ আবহাওয়ায় করণীয় বিষয়ে তথ্য প্রদানের মাধ্যমে কৃষকরা উপকৃত হচ্ছে। টেলিকমিউনিকেশ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই সুবিধাগুলি দেয়া সম্ভব এবং এক্ষেত্রে IP telephony ভূমিকা রাখতে পারে।

ক্ষুদ্র ঋণ ও তথ্য প্রযুক্তি:

দারিদ্র দূরদূকরার ক্ষেতে ক্ষুদ্র ঋণ বেশ ভূমিকা পালন করছে। ক্ষৃদ্রঋণ এর ক্ষেত্রেও তথ্য প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে। তার একটি সহজ উদাহরণ হল কিভা (Kiva http://www.kiva.org)। কিভা একটি অনলাইন প্লাটফর্ম যেখানে নতুন উদ্দ্যোগী (যারা ক্ষুদ্র ঋণ নিতে চান) তাঁরা তাঁদের নতুন ব্যবসার কথা এইখানে লিখবেন।

চিত্র: কিভা যেখাবে কাজ করে।

অপরপ্রান্তে যারা ক্ষুদ্র ঋণের টাকা বিনিয়োগ করতে চান তাঁরা কিভা-এর কোন প্রোজেক্টে টাকা বিনিয়োগ করে। কিভা মূলত ক্ষুদ্রঋণগ্রহীতা ও প্রতিষ্ঠানিক কোন সংগঠন ছাড়াই ব্যক্তিদের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে কিভা। আমাদের দেশে যারা ক্ষুদ্রঋণ চায় তারা কোন গ্রামীন বা কোন ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কাছে যায়, কিন্তু এইখানে সরাসরি তারা অনলাইনে বিশ্বের যেকোন প্রান্ত থেকে ক্ষুদ্রঋণ নিতে পারে।

ই-শিক্ষা: দারিদ্রতার অন্যতম একটি কারণ হল শিক্ষা। তাই তথ্য প্রযুক্তিকে আমরা কাজে লাগাতে পারি শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে। তথ্য প্রযুক্তির এই ব্যবহারকে বলা হয় e-learning বা ই-শিক্ষা। ই-শিক্ষাকে ঠিকমত কাজে লাগালে আমরা দেশের প্রতন্ত অঞ্চলেও শিক্ষাকে ছড়িয়ে দিতে পারব। শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রয়োজন ভাল শিক্ষক ও শিক্ষার উপকরণ। ই-শিক্ষার মাধ্যমে আমরা ভাল শিক্ষকদের লেকচার, বই, মাল্টিমিডিয়া ভিত্তিক শিক্ষা উপকরণ প্রতন্ত অঞ্চলেও ছড়িয়ে দিতে পারব।

আমরা যখনই তথ্য প্রযুক্তিকে সামাজিক উন্নয়নের কথা বলি তখন প্রায়সই প্রযুক্তি বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি। কিন্তু আমরা এখন উপলব্ধি করেছি যে, process is more important than access, and content is more important than machines।