মশিউরের খেরোখাতা

শেয়ারবাজার ও তথ্যপ্রযুক্তি

ড. মশিউর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার বাজার নিয়ে আমাদের অনেকের মধ্যে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই শেয়ার বাজারে টাকা বিনিয়োগ করছেন। তবে বাংলাদেশের বেশীরভাগ বিনিয়োগকারিই জানেন যে, শেয়ার বাজার শুধুমাত্র আন্দাজ বা ভাগ্যের উপরেই চলেনা। অনেক পদ্ধতি ব্যবহার করে বাজারের অবস্থান ও ভবিষ্যত সমন্ধে ধারণা করা যায়। আজকের প্রবন্ধে শেয়ারবাজারে তথ্যপ্রযুক্তি কিভাবে আপনাকে সহায়তা করতে পারে সেই ব্যাপারে আলোচনা করব।

শেয়ার বাজারে কোন শেয়ারটি কিনবেন সেই সংক্রান্ত সীদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে দুই ধরনের কৌশল রয়েছে। একটি হল Fundamental Analysis এবং অন্যটি হল Technical Analysis। ফান্ডামেন্টাল বলতে বোঝায় একটি কম্পানি মূলধন কি, কি ধরনের ব্যবসা করে, তার লাভ কেমন হচ্ছে ইত্যাদি অর্থসংক্রান্ত বিষয়গুলি গবেষনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। আর টেকনিক্যাল মূলত তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে শেয়ারটি সমন্ধে ধারণা করা যায়। কোন সময়ে শেয়ারটি কেনা উচিত এবং কোন সময় বিক্রি করা উচিত তা টেকনিক্যাল এনালাইসিস করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আজকের আলোচনায়   টেকনিক্যাল এনালাইসিস সমন্ধে দৃষ্টিপাত করব।

একটি শেয়ারের বর্তমান অবস্থা ও তার অতীতে দামগুলি নিয়ে যাচাই করবার জন্য দুই ধরনের সলিউন রয়েছে, (১) ডেস্টটপ সলিউশন (২) ওয়েবসলিউন।

(১) ডেস্টটপ সলিউশন আপনার কম্পিউটারে ইন্সটল করে নিতে হবে, এবং তা আপনার ইচ্ছেমত পরিবর্তন করতে পারবেন। বিভিন্ন ধরনের ডেস্কটপ সফটওয়্যার রয়েছে যেগুলি ব্যবহার করে আপনি শেয়ারগুলির দাম কেমন বাড়ছে বা কমছে তা বুঝতে পারবেন। বাংলাদেশে শেয়ার ব্যবসায়ীদের মধ্যে Amibroker সফটওয়্যারটি বেশী ব্যবহৃত হয়। এছাড়া MetaStock সফটওয়্যারটি বিদেশে বেশ ব্যবহৃত হয়। এমিব্রোকার মূলত ভারতীয়রা বেশী ব্যবহার করে আর সেই থেকে বাংলাদেশেও এর চলন বেশী। আজকে এমিব্রাকার নিয়েই আলোচনা করব। এমিব্রোকার তৈরী করেছে Tomasz Janeczko যা amibroker.com থেকে কিনতে কিংবা ডাউনলোড করতে পারবেন।

এমিব্রোকারে বাংলাদেশের ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্চ এবং চট্রগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের শেয়ার বাজারে তথ্য ঢুকাতে পারবেন। যখন ডাটা নিয়ে কাজ করলাম, তখন সবথেকে ভয়ংকর যে জিনিসটি টের পেলাম তা হল আমাদের স্টক এক্সচেঞ্চ কোন স্টান্ডার্ড ফরম্যাটে তথ্য দেয় না। এলোমেলোভাবে কোন মতে ওয়েবসাইটে শেয়ারের তথ্যগুলি দিয়েছে। যদি স্টক এক্সচেঞ্জের কেউ এই প্রবন্ধটি পড়েন, তবে অনুরোধ করব অনুগ্রহ করে আন্তর্জাতিক মানের কোন স্টান্ডার্ড অনুয়ায়ী আমাদের শেয়ার বাজারের তথ্যগুলি দিন। এর জন্য কারিগরি সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত (বিদেশী কনসালটেন্ট এর প্রয়োজন নেই)। কোন স্ট্যান্ডার্ড ফরম্যাট মেনে চললে এটি টেকনিক্যাল এনালাইসিসের জন্য সহায়তা করবে। তবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের তুলনায় চট্রগ্রাম এক্সচেঞ্জের তথ্য অনেক ভাল। চট্রগ্রামের এর থেকে ঢাকা পিছিয়ে কেন?

চিত্র: এমিব্রোকারে একটি শেয়ার সমন্ধে অনেককিছু জানতে পারবেন।

তবে সমস্যা নেই আমাদের দেশের ছেলেরাও পিছিয়ে নেই। তারা বাংলাদেশের এই দুটি স্টকের তথ্য এমিব্রোকারে ইমপোর্ট করবার বেশ কিছু টুলস তৈরী করেছে। নিম্নে তেমন কিছু টুলসের উদাহরণ দেয়া হল:

  • QtDSExporter: এটি নাসিমুল হক তৈরী করেছেন যা http://github.com/nsmgr8/qtdsexporter/ থেকে ডাউনলোড করতে পারবেন। এটি python ল্যাঙ্গুয়েজে লেখা, যে কারণে আপনার কম্পিউটার পাইথন ইন্সটল করে নিতে হবে।

  • DSE EOD data capture tool: সারিম খান তৈরী করেছেন যা http://www.sarim.cz.cc/ থেকে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। এটি জাভা দিয়ে তৈরী করা, তাই জাভা থাকলেই যে কোন অপারেটিং সিস্টেমেই এটি চলবে। এই সফটটি প্রতিদিন দিনের শেষে শেয়ারবাজারের ডাটা csv ফাইল ফরম্যাটে ডাউনলোড করে দিবে যা খুব সহজেই এমিব্রোকারে ইমপোর্ট করে নিতে পারবেন।

  • PyDSnap: নাসিমুল হক এবং আরো একজন প্রোগ্রামার পাইথন দিয়ে এটি তৈরী করেছেন।

ক্যান্ডল স্টিক

টেকনিক্যাল এনালাইসিসে ক্যান্ডল স্টিক দিয়ে খুব সহজেই একটি স্টকের দিনের উত্থান পতনকে চিহ্নিত করা হয়। ২শ বছর আগে জাপানে তকুগাওয়া আমলে মুনেহিসা হোমা নামের এই মেধাবী চাল ব্যবসায়ী চালের মূল্যের উত্থান পতন দেখবার জন্য একটি অসাধারণ পদ্ধতি আবিষ্কার করেন - দেখতে মোমবাতির মত, তাই নাম রাখা হলো ক্যান্ডল স্টিক।

চিত্র:  ক্যান্ডল স্টিক

ক্যান্ডল স্টিক চার্টের আবিষ্কারের বদৌলতে তিনি জাপানে একজন লেজেন্ডারী ট্রেডার হিসাবে এখনো সমাদৃত। এমনকি তখনকার সম্রাটও তাঁকে অনারারী সামুরাই উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন, যা  আজকের দিনের নোবেল জয়ের মত সম্মান। শুধু ক্যান্ডল স্টিক না, তিনি ট্রেডিং সাইকোলজী নিয়েও অনেক বই লিখেছিলেন। এখন যে বুল বা বেয়ারিশ মার্কেট বলা হয়, সেই ধারণাও তিনি তাঁর বইতে লিখেছিলেন - চাইনীজ য়িন এবং ইয়াং-এর সাথে তুলনা করে। ৮০-র দশকে স্টীভ নিসন জাপানে যেয়ে এটি দেখে চমত্কৃত হন এবং পরবর্তিতে তিনি এটি প্রাচ্যে জনপ্রিয় করেন।

(২) ওয়েবসাইটে স্টকমার্কেট

এমিব্রোকার একটি ডেস্টটপ সলিউশন কিন্তু আপনি অনলাইনেও বিভিন্ন শেয়ার নিয়ে গবেষনা করতে পারবেন। এর মধ্যে নিম্নের দুটি সাইট উল্লেখযোগ্য:

যারা টেকনিক্যাল এনালাইসিস করতে চান তাদের কয়েকটি জিনিস প্রথমেই শিখে নিতে বলব MACD, RSI এবং WMA। ওয়েবসাইটেই এইগুলির উপর অনেক তথ্য রয়েছে এবং এইগুলি ব্যবহার করে একটি শেয়ারের বর্তমান অবস্থান সমন্ধে আপনি অনেক কিছু জানতে পারবেন।

পরিশেষে কিছু কথা আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলব। টেকনিক্যাল এনালাইসিসের অনেক পদ্ধতি রয়েছে। যে কোন একটির উপর ভিত্তি করে কোন শেয়ারের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিবেননা। বরং অনেক কিছু যাচাই বাছাই করুন। হুজুগের বশে কোন শেয়ার কিনবেন না। কোন শেয়ার কিনবার আগে কম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থা সমন্ধে ভাল মত জেনে নিন। কেনার আগে গবেষনা করুন, কেনার পরে নয়।