বাজেট প্রসঙ্গ : বঞ্চিত অবহেলিত বিজ্ঞান প্রযুক্তি
তারিখ: ১২ জুলাই ২০০৬
আমাদের বর্তমান অর্থ বছরের বাজেটে অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যতটুকু জায়গা পাওয়া উচিত তা না পেয়ে বরং রাজনীতিই বেশি ভূমিকা রাখছে। অথচ আমাদের মতো দেশের জন্য অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই বেশি ভূমিকা রাখা উচিত। আমরা মানি, তা স্বীকার করি। কিন্তু সেই দুর্যোগী অবস্থা কি এতটাই পরিবর্তন করা যায় না?
আমাদের অর্থনীতি মান্দা দেশের অর্থনীতি। কিন্তু তারপরও সেটাকে নিয়ে কাজ করতে পারি। নির্বাচনকে সামনে রেখে ভোট কিনে দেওয়ার জন্য খরচ-সাশ্রয় করে সঠিক দেশের অর্থনীতির জন্য যা ভালো হবে তা কি করা যায় না?
মানবিক বিশ্ব যখন নতুন নতুন আবিষ্কৃত বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে তাদের দখল নেওয়ার জন্য ছুটে পড়ছে, তখন আমরা তা পিছিয়ে গিয়ে প্রত্যাশা করছি। উদাহরণ হিসেবে নজর দেওয়া যাক তাইওয়ানের দিকে। তাইওয়ান ২০০২ সালে ৬ বছরের মেয়াদে ৬৩০ মিলিয়ন ডলারের ন্যানোপ্রযুক্তি সম্পর্কিত বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ করে। তাদের এই কর্মসূচির নাম Taiwan National Nanotechnology Program। শুধু টাকা খরচ করেছে আর ফেলে দিয়েছে তা নয়, প্রতি বছরই তাইওয়ান এভাবে বাজেটে এর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এই অবস্থায় থাকতে পারত না। পাশের দেশ ভারত এ বছরের শুরুর দিকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে ১৬ শতাংশ বাজেট বাড়িয়ে ৪.৫ বিলিয়ন ডলারে পরিণত করেছে। ভারত প্রতিষ্ঠিত করেছে Nanotechnology Research and Innovation Foundation, যা সংক্ষেপে India Nano নামে পরিচিত। ভারত যে ন্যানোপ্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে এবং ভারতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নিয়ে গবেষণা করলে বোঝা যায়, ২০১০ থেকে ২০৮১ সাল পর্যন্ত ন্যানোপ্রযুক্তি গ্রহণ হবে আর তাতেই রয়েছে বিশাল বাজার। আমরা যদি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বেশি গুরুত্ব না দিই, তাহলে পিছিয়ে থাকব। আমরা যথাযথভাবে তথ্য প্রযুক্তি খাত গুলোতে গুরুত্ব না দেওয়ায় তথ্য প্রযুক্তিতে এখন ভারতীয়দের ভূমিকা বেশি। আমরা সেই সুযোগটি হাতছাড়া করে দিয়েছি। প্রথম থেকেই আমরা যদি গুরুত্ব দিতাম, তাহলে ভারতের সাথে প্রতিযোগিতায় না পারলেও কিছুটা তার পিছনের সারিতে থাকলেও আমাদের অর্থনীতি অনেক ভালো হতো। এ সুযোগ গুলোকে ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় আমি 'ট্রেনের মডেল' দিয়ে ব্যাখ্যা করি। আমরা প্রতিযোগিতার কোনো একটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দিয়েছি। আমাদের সামনে ট্রেন আসছে, একটির পর একটি সংযোগ সহ চলে যাচ্ছে। আমরা তার কোনোটাতেই উঠতে পারছি না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি ট্রেন গুলো চলে যাচ্ছে... আর ট্রেনটি চলে গেলে... আমরা হাহুতাশ করছি। আর রোগ ও দুঃখে পড়ে যাচ্ছি। এখন তথ্য প্রযুক্তিতে ভারতীয়রা ভালো করায় আমরা আতিশয্যে জ্বলছি।
আমাদের সামনে এমনই ট্রেন যাচ্ছে, আমাদের এখনও সুযোগ রয়েছে তে গুলোতে উঠার এবং সেই সুযোগ গুলো ধরার। সেইসব সুযোগ গুলোর মধ্যে দুটি প্রযুক্তির নাম প্রথমেই বলতে হয়- ১. বায়োটেকনোলজি এবং ২. ন্যানোপ্রযুক্তি।
বায়োটেকনোলজি কিছুটা হলেও এগিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে কৃষিসংশ্লিষ্ট জীবন-প্রযুক্তিতে আমাদের বিজ্ঞানীরা কিছুটা হলেও নাম রাখতে পারছে। তার মূল কারণ কিন্তু এই সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশে ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু তার তুলনায় ন্যানোপ্রযুক্তির কোনো প্রভাব নেই। অথচ আমাদের এটিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আর এই প্রযুক্তিতে ভালো করতে পারবে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বাজারে তারাই থেকে যাবে।
ন্যানোপ্রযুক্তি কি?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে ন্যানো মাপের একটি একক। এক মিটারের ১০০ কোটি ভাগের (১০⁻⁹) ১ ভাগকে এক ন্যানোমিটার (Nanometer) বলা হয়। এই ন্যানোমিটার স্কেলে যে প্রযুক্তি সম্পর্কিত, সেগুলোকে ন্যানোপ্রযুক্তি বলে। আপনারা নিশ্চয় জানবেন, প্রতি বছরই আমাদের ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র ছোট হচ্ছে। আর এই সবই হচ্ছে এই ন্যানোপ্রযুক্তির কল্যাণে। ন্যানোপ্রযুক্তি কিন্তু একটি নতুন কোনো প্রযুক্তি নয় যে একটি ভিত্তি থেকে শুরু করতে হবে। পুরনো পদার্থবিজ্ঞান, ফলিত পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি বিষয় গুলোর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং এই সব বিষয়ের গবেষক এবং শিক্ষার্থীরা ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে পারে।
আমরা কি করতে পারি?
আমাদের বাজেটে R&T-র (Research and Technology, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি) আরও ভূমিকা রাখা উচিত। যে সব প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দিলে আমাদের লাভ হবে সেই গুলোতে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। Basic Research বা বিজ্ঞানের মৌল গবেষণা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি ভূমিকা না রাখলেও কিছু কিছু গবেষণা রাখা উচিত। তবে আমাদের মতো দেশের জন্য বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত ফলিত বিজ্ঞান এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ক্ষেত্র গুলোতে। এই সব কাজের জন্য আমাদের প্রয়োজন দুটি জিনিসের- একটি হলো পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয়টি হলো অর্থ। যারা এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তাদের নিয়ে আমরা দীর্ঘ-মেয়াদী এবং স্বল্প-মেয়াদী পরিকল্পনা করতে পারি। কোন কোন প্রযুক্তিতে আমরা গুরুত্ব দিলে আমাদের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে, সেই গুলোকে চিহ্নিত করতে পারি। আর সেই সাথে প্রয়োজন অর্থ। ভালো কিছু প্রতিষ্ঠান আমাদের গড়ে তোলা উচিত এবং সেই সাথে স্থানীয় কোম্পানি গড়ে তোলার সুযোগ দেওয়া উচিত। তার জন্য চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থের ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সূচি মাধ্যমে এই বিষয় গুলোতে আমরা ভালো করতে পারি। এ জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করা অত্যন্ত জরুরি।
এই সব প্রযুক্তিতে ভালো করতে চাই শিক্ষিত ও দক্ষ বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ার। আর তার জন্য চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অত্যাবশ্যক কার্যকরী পড়াশোনার সুযোগ। ন্যানোপ্রযুক্তি সম্পর্কিত বিষয় গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়ানো উচিত। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এই কাজে এগিয়ে আসতে পারে। সচেতনতা গড়ে তোলার মাধ্যমে আমরা দেশের মানুষদের অবহিত করতে পারব, কত সম্ভাব্য বাজার রয়েছে আমাদের সামনে।
আমরা কি সেই দেশের স্বপ্ন দেখতে পারি না, যখন দেখব বিদেশ থেকে লোক আসছে বাংলাদেশে প্রযুক্তি শিখতে? এ কথা বলছি এই কারণে যে, কিছুদিন আগে আমাদের ল্যাবে একটি নতুন যন্ত্র বসানো হলো। সেই যন্ত্রটি কোন দেশ থেকে এসেছিল, শুনব? ইসরায়েল।
ন্যানোপ্রযুক্তিতে তারা এতটাই দ্রুত অগ্রগতি করেছে যে সত্যিই অবাক হতে হয়। এর পিছনে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা হয়তো থাকতে পারে কিন্তু প্রযুক্তি গুলো তো কল্পনা থেকে আসছে না? তারা সত্যিই সত্যিই কাজ করছে ও চেষ্টা করছে। ইসরায়েলের ইঞ্জিনিয়ার বলেছেন, ১৯৯০-র পর থেকেই ইসরায়েল ন্যানোপ্রযুক্তিকে তাদের দেশের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে এবং এর পিছনে সম্পূর্ণ ইসরায়েলের বিজ্ঞানীরা ছুটে পড়েছেন। তিনি হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে ছুটে পড়েছেন। এরপর ইসরায়েলই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যানোপ্রযুক্তি সম্পর্কিত অনেক কোম্পানি।
তাদের এই ছোট কোম্পানিই এখন সমগ্র বিশ্বের ২০০টির মতো জায়গায় কাজ করছে। তার মূল কারণ হলো প্রথম থেকেই ন্যানোপ্রযুক্তিকে ইসরায়েল সব থেকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করেছে। কল্পনা করলাম, এমন দৃশ্য কি হতে পারে না যে বাংলাদেশের প্রযুক্তিবিদরা বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে তাদের প্রযুক্তি নিয়ে? ইসরায়েল যা করেছে আমরা চেষ্টা করে সেরকম জিনিস হয়তো দ্রুত তৈরি করতে পারব না। কারণ আমাদের দেশের প্রযুক্তিবিদরা উন্নত বিশ্বের তুলনায় কম বেতন পাবেন। এ রকম অনেক ক্ষেত্রই রয়েছে যেখানে আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারদের কাজ করার সুযোগ রয়েছে। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আমরা হয়তো সামনের সারিতে থাকতে পারব না, কিন্তু কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ক্ষতি নেই। তা আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে।
আমি সব থেকে সম্ভাব্য বাজার দেখছি মেডিক্যাল সম্পর্কিত ইলেকট্রনিক্স যন্ত্র গুলোতে। ন্যানোপ্রযুক্তি ও বায়োটেকনোলজির সমন্বয়ে ভবিষ্যতে সম্ভাব্য বাজার রয়েছে। এ গুলোতে ভালো কোনো যন্ত্র তৈরি করে আমরা বাজার দখল করতে পারি। এখন ভারত এই বিষয় গুলোতে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। নিজে কিছু কিছু ন্যানোপ্রযুক্তির যন্ত্র এখনই তৈরি করছে। এ ছাড়া অনেক বড় বড় কোম্পানির R&D (Research And Development) বিভাগ এখন ভারতে। সেখানে তুলনামূলকভাবে কম বেতনে ইঞ্জিনিয়ার পাওয়া যায় এবং তারা সেখানে কাজ করছে। এতে ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী হচ্ছে। আমরা এই ধরনের কোম্পানি গুলোকে বাংলাদেশে R&D বিভাগ খোলার জন্য উৎসাহিত করতে পারি। যেমন ধরা যাক, ভেকো (Veeco) ন্যানোপ্রযুক্তিতে একটি অন্যতম বিখ্যাত কোম্পানি। তাদের গবেষণাগার রয়েছে চীন ও ভারতে।
শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ই নয়, প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা। যারা রাজনীতির সাথে জড়িত, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেন, যারা দিকনির্দেশনা দেন তাদের এই বিষয়ে সচেতন করা উচিত। এই বিষয়ে আমার পরিচিত একজন আমেরিকান গবেষকের কথা খুব মনে পড়ছে (পেশাদার কারণে নাম উল্লেখ করছি না)। তিনি ন্যানো-প্রযুক্তিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন। শুধু কাজই করেন না, প্রতি বছর তার ল্যাবে একটি বড় পরিমাণের ফান্ড নিয়ে আসেন। তার সফলতার মূল কারণ হলো, তিনি যখন রাজনীতিবিদদের সাথে কথা বলেন তখন একজন বিজ্ঞানী হিসেবে জটিল সূত্র দিয়ে বোঝান না, সহজ ভাষায় রাজনীতিবিদরা যেভাবে বোঝে বলেন।
আমার মনে হয়, আমাদের উচিত প্রথমে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের বোঝানো, কেন বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে আমাদের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কি কি প্রযুক্তিতে আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ রয়েছে। আমি যেহেতু ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করি, আমি জানি, কি অসাধারণ সম্ভাবনা রয়েছে এই বিষয়টিতে। এ ছাড়া অন্যান্য বিষয়ের বিজ্ঞানীরা বলতে পারবেন তাদের বিষয়ে কি কি সুযোগ-সুবিধা রয়েছে।
তাই মূল কথা হলো, আমাদের উচিত অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমিয়ে তা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বাড়ানো। কারণ সেটাই আমাদের টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। বড়লোকদের ট্যাক্স কমিয়ে আর গরিবদের ট্যাক্স বাড়িয়ে কোনোভাবেই তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে না।
ড. মশিউর রহমান, আমেরিকা