মশিউরের খেরোখাতা

রাজনীতির মোগলাই পরোটা

তারিখ: ৩১ আগস্ট ২০২৫

মোদির চীন সফর: রাজনীতির মোগলাই পরোটা

মোদি সাহেব সাত বছর পর আবার চীন সফরে নামছেন—এইটা শুনে মনে হইল যেন সাত বছর পর পাড়ার এক মামা হঠাৎ হাজির হইছে বাপের বাড়ি, হাতে নিয়া দুইটা কলা আর মুখে ভর্তি 'আমি এবার বিদেশ থেকে আইছি' টাইপের গপ্পো। বিমানবন্দরে লাল গালিচা বিছানো, ব্যান্ড বাজনা, একেবারে বরযাত্রা নামছে। মোদি সাহেব নেমে ভাবতেছেন—"আমার আগমনে এশিয়া কাঁপতেছে।" ঠিক যেমন আমাদের পাড়ার কবির উদ্দিন চাচা নতুন চপ্পল পইরা রিকশায় উঠলে ভাবেন পুরো ঢাকা শহর তারে চিনতেছে। অথচ রিকশাওয়ালা কইতেছে, "চাচা, আপনার বাসা কোনদিকে?"

প্রথমে গেছেন জাপানে, সেখানে টোকিওর রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নিশ্চয়ই ভেবেছেন, "এইসব রোবট বানানো মানুষগুলা কেমনে এতো নিয়মকানুন মেনে চলে?" জাপানিরা বিনয়ী জাত—খুব হাসি হাসি করে কইছে, "আমরা রকেট বানাই, আপনারা কি বানান?" মোদি সাহেব গর্বের সাথে কইছেন, "আমরা বানাই জনসংখ্যা আর বলিউড ছবি।" জাপানিরা একটু মুখ শুকায়ে গেছে। মহাকাশে যান পাঠানো আর দুপুরের খাবার ঠিকমতো পাঠানো—দুইটাই কঠিন কাজ, তাই আলোচনা হইছে সিরিয়াস।

এখন চীনে গিয়া শি জিনপিং আর ভ্লাদিমির পুতিনের লগে বসবেন। ব্যাপারটা একেবারে আমাদের বাসার তিন ভাইয়ের মতো—সবাই বাপের জমিজমার ভাগ চায়, কিন্তু কেউ মায়ের সেবা করতে চায় না। শি জিনপিং হইলেন বড় ভাই, সব সময় কইতে থাকেন, "আমি বড়, আমার কথা শোনো।" পুতিন হইলেন মেজো ভাই, টিভিতে দেখলেই বুঝা যায় যে উনি একদিন রেসলিং এ নামছিলেন। আর মোদি সেজো ভাই—চালাক টাইপের, ভাবেন, "দুই ভাইয়ের মাঝামাঝি থাকলেই সবচেয়ে বেশি ফায়দা।" সীমান্তে কে কত পাথর সরাল, কোন পাহাড়ে কারা হাঁটল—এইসব নিয়ে কথা হবে। পাহাড় নিয়া ঝগড়া দেখতে অনেকটা আমাদের গ্রামের দুই বাড়ির মাঝের আমগাছ নিয়া ঝগড়ার মতো। দুইজনেই কয়, "আমগাছটা আমার!" কিন্তু আম খায় পাড়ার সবাই।

চীন বহুদিন ধরেই এসসিও বানাইছে যেন পশ্চিমাদের বিকল্প "গলির ক্লাব।" আর ভারতও গলা খাঁকারি দিয়া বসতেছে—"আমরাও আছি।" ব্যাপারটা অনেকটা এরকম—চায়ের দোকানে আমাদের রহিম চাচা, করিম ভাই আর রফিক মিয়া প্রতিদিন বসে আছে। সবাই আসন গরম করছে, হালকা গল্পগুজব চলতেছে। আজকে ক্রিকেট ম্যাচ কে জিতল, কাল কার মেয়ের বিয়ে—এইসব। তখন হঠাৎ মোদি ঢুকে কইলেন, "চা আমারে দাও, বিল অন্যেরা দিবে। আর হ্যাঁ, এই আড্ডার সিদ্ধান্তে আমারও ভোট আছে।" রহিম চাচা (শি জিনপিং) আর করিম ভাই (পুতিন) চোখাচোখি করতেছেন, মনে মনে ভাবতেছেন, "এইটা আবার কেমন অংক?" আর চায়ের দোকানের মালিক (আমেরিকা) দূর থেকে চোখ পাকাইয়া তাকাইতেছে, ভাবতেছে, "আমার কাস্টমাররা অন্য দোকানে চলে গেল নাকি?"

বিশ্লেষকদের চোখে জাপান সফরের পর চীনে মোদির আগমন একেবারে দাবার হাতির চাল। লম্বা, ভারী, কিন্তু মারবে কাকে সেটা এখনো ধোঁয়াশা। শি, পুতিন আর মোদি—এই তিনজন এক টেবিলে বসলে, আন্তর্জাতিক সংবাদদাতা গুনে রাখেন কে কয়বার দাঁত দেখাইয়া হাসল, কে কয়বার কপালে ভাঁজ ফেলল, কে চায়ের কাপ কয়বার ধরল। একেবারে আমাদের পাড়ার হাজী সাহেবের বিয়ের দাওয়াতের মতো—কে কার পাশে বসল, কে কারে কত টুকরা গোশত দিল, কে আগে ভাত খাইল, কার প্লেটে বেশি পোলাও পড়ল—সব হিসাব আছে। আর যদি কেউ ভাতের বদলে রুটি চায়, তাহলে পুরো দাওয়াতে হৈচৈ পড়ে যায়।

রাজনীতির খবর অনেক সময় একেবারে সিনেমার কাহিনির মতো—হিরো ভিলেনের সাথে হাত মিলাইতেছে কিনা, নাকি ভিলেনের সাথে যুদ্ধ করতেছে, দর্শকরা শেষ পর্যন্ত না দেখলে বুঝেই পারে না। মোদি সাহেব এখন ভাবতেছেন—চীন আর রাশিয়ার সাথে হাত মিলাইলে আমেরিকা কি কইবে? কইবে, "তুমি আমাদের সাথে না তাদের সাথে?" আবার আমেরিকার সাথে বেশি ভাব দেখাইলে চীন-রাশিয়া কইবে, "এই যে, তুমি আমাদের ভুলে গেলা?" অবস্থা হইছে আমাদের পাড়ার সেই আব্দুল কাদের মিয়ার মতো—দুই পক্ষের সাথেই ভাব রাখতে চায়। রমজানে একদল বইলে, "কাদের ভাই, আমাদের সাথে ইফতার করো।" অন্যদল কয়, "না না, আমাদের সাথে করো।" বেচারা কাদের মিয়া দুই জায়গাতেই যাইতে পারে না, শেষে বাসায় বসে একা একা ইফতার করে।

চীনারা কিন্তু চালাক জাত। তারা জানে মোদির দরকার আছে তাদের। সীমান্তে ঝগড়া থাকলেও, ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না। ভারতীয়রা চীনা মোবাইল কিনে, চীনারা ভারতীয় চা খায়। দুই দেশের সম্পর্ক হইছে আমাদের বাসার স্বামী-স্ত্রীর মতো—সকালে ঝগড়া, "তুমি আমার কথা শোনো না!" দুপুরে নীরবতা। আর রাতে একসাথে বসে টিভি দেখা। স্ত্রী রান্না করে, স্বামী খায়। পরদিন আবার একই খেলা।

সব মিলাইয়া, মোদির এই সফরটা একেবারে মোগলাই পরোটার মতো। বাইরে দেখতে গোলগাল, ঝকঝকে, মাইক্রোওয়েভে গরম করলে আরও ভালো লাগে। কিন্তু ভেতরে লেয়ার একটার পর একটা—রাজনীতি, কূটনীতি, সীমান্ত, অর্থনীতি, আর গোপনে গোপনে অহংকার। আমরা চা-দোকানে বসে খালি বলি, "ওরে বাবা, বড়লোকদের রাজনীতি খাইতে মিষ্টি জিলাপি, কামড় দিতেই দেখি ভেতরে কাঁচা মরিচ আর লবণ দুইটাই আছে।"

শেষ কথা হইল, রাজনীতিটা অনেকটা আমাদের পাড়ার লুডু খেলার মতো। কে কখন কোন ঘর দখল করবে, কে কারে মারবে, কে ঘরে পৌঁছাবে—সব ছক্কার উপর নির্ভর। আর মোদি সাহেব এখন ছক্কা ছুঁড়তেছেন, দেখেন কত নম্বর উঠে!

আইজ শনিবার ১৫ই ভাদ্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ তে ঢাকাইয়া কবি মশিউর এই কথাটি লিখিল। এই কিস্তি খানি কেমন লাগিল, জানাইয়েন কিন্তু।