১১: ম্যানেজমেন্ট এর কৌশল (৪ নভেম্বর ২০১৯)
বিজ্ঞানী কিংবা শিক্ষক হিসাবে কাজ করার সময় সরাসরি টিম বা মানুষকে ম্যানেজ করার সুযোগ হয়নি। তবে ২০০৮ এর দিকে একটি স্টার্টআপ করার অভিজ্ঞতা ছিল সেই সময়ে অভিজ্ঞতা ও ভুলগুলিকে আবার নতুন করে ঝালানোর সুযোগ পেলাম প্রোজেক্ট ম্যানেজার হিসাবে কানেকটেড হেলথ এ কাজ করতে যেয়ে। আমরা সফটওয়্যার তৈরীর সময়ে এজাইল বা স্ক্রাম বেশ বহুল ভাবে ব্যবহৃত হয়। যদিও আগে বেশ কিছু সফটওয়্যার তৈরীর প্রোজেক্টের টিমে কাজ করেছিলাম তাই ধারণাটি ছিল কিন্তু যখন এটিকে দৈনন্দিন কাজে প্রয়োগ করা শুরু করলাম, তখন এটির মূল ব্যাপারগুলি শিখতে পারলাম। একটি সফটওয়্যারের প্রোজেক্ট কিভাবে ম্যানেজ করতে হবে তার মূল তত্বগুলিকে শেখা ও প্রয়োগের মাধ্যমে ভুল ত্রুটি গুলি জানতে পারলাম। প্রথম দিকে বেশ কিছু ভুল করলাম। এবং এই ভুল থেকে শেখার সুযোগ হল। তবে এই ক্ষেত্রে হাতে নাতে শেখার সুযোগ হল প্রতিষ্ঠানটির প্রধান এর কাছ থেকে। শুধু মাত্র ম্যানেজমেন্টই নয়, ভালো ডকুমেন্ট কিভাবে করতে হয়, কিভাবে টিমকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হয় তার সবই হাতে নাতে তার কাছ থেকে শেখার সুযোগ হল। এটা ঠিক যে স্টার্ট আপে যেহেতু ছোট প্রতিষ্ঠান তাই এখানে বেশী বেতন পেতাম না, তবে যা শেখার সুযোগ হল তা অর্থ ব্যয় করলেও কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিখতে পারতাম না। সেই সময়ে আমি সিঙ্গাপুর ও ভারতে টিমগুলিকে ম্যানেজ করতাম। তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দেয়া থেকে শুরু করে কে কেমন পারফর্ম করছে কিভাবে কাকে ম্যানেজ করতে হবে সেই কৌশলগুলি শিখলাম। পরবর্তিতে এই অভিজ্ঞতা আমার জন্য এক বিশাল সম্পদে পরিণত হয়েছিল। সেই সময়ে শেখা জিনিসগুলি একটি বিস্তারিত ভাবে নিম্নে ডকুমেন্ট করছি। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে শেখা পয়েন্টগুলি নেহাতই আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতামত ও পর্যবেক্ষণ। তার সাথে অনেকেই দ্বিমত হতেই পারেন। আবার আমার শেখা জিনিসগুলি আমার পারিপার্শিক পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত। সেটা আপনার পরিবেশ থেকে অন্য রকম হবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে নিজের মতন করে পর্যবেক্ষন ক্ষমতা আপনাকে প্রয়োগ করতে হবে। তবে এইসব ব্যাপারগুলির চিরন্তন সত্য বলে কথা নেই। স্থান, কাল পাত্র এর সাথে পরিবর্তনশীল। আমার অভিজ্ঞতা রেফারেন্স হিসাবে নিতে পারেন। পর্যবেক্ষন করা কেন গুরুত্বপূর্ণ: আমরা অনেক সময়ই শেখার জন্য অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জনের দিকে গুরুত্ব দিই। কিন্তু এর পামাপাশি পর্যবেক্ষন এর মাধ্যমেও অনেক কিছু শেখা যায়। আপনারা যারা বিভিন্ন চাকুরির সাক্ষাতকারে গিয়েছেন, তারা হয়তো লক্ষ করেছেন যে বোর্ডে একজন লোক থাকেন, যিনি কোন প্রশ্ন করেনা। শুধু মাত্র পর্যবেক্ষণ করেন। আপনি কিভাবে উত্তর দিচ্ছেন, আপনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ কি, তা তিনি যাচাই করেন। তার কাজই হল পর্যবেক্ষণ করা। অনেকক্ষেত্রে আমাদের এই পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে ও বুঝতে পারি। আমার বাবা প্রায়ই একটি কথা বলতেন- “চোখ কান খোলা রেখে কাজ করতে হবে“। তিনি হয়তো পর্যবেক্ষন করার কথাই বলতেন। অন্যান্য বাবারা যেমন বই নিয়ে বাচ্চাদের পড়াতে বসে, আমি তেমনটি করিনা। আমি বাচ্চাদের নিয়ে বসে বসে পিপড়ে দেখি, তারা কি কাজ করছে, কেন করছে এইগুলি ব্যাখ্যা করি। বাচ্চাদের পর্যবেক্ষন ও সেখান থেকে তাদের উপলব্ধি এর ট্রেনিংটা সব সময়ই দেই। এটা নিয়ে গিন্নির মহা রাগ। কেননা তাদের পড়াই না। আমার কথা হল, স্কুলে তো অসব ছাইপাস পড়ায়। এই পর্যবেক্ষন করার ট্রেনিং কেউই দিবে না। মূল প্রসঙ্গে আসি। কর্পোরেটে কাজ করতে যেয়ে আমি খুব পর্যবেক্ষন করতাম। আমার উপরের ম্যানেজার রা কিভাবে কাজ করছে তাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করার মাধ্যমে প্রচুর শিখেছি। তবে শুধু দেখলাম, তাই নয়। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে কি শিখলাম। কি উপলব্দি হল, learning points, take away সেগুলি লিখতাম। পরে রিভিও করে শেখা জিনিসগুলি ঝালিয়ে নিতাম।
ভালো ডকুমেন্টেশন গবেষনাগারে যেরকম ডকুমেন্টের প্রতি আমরা জোর দিতাম, তার থেকে কর্পোরেটে ডকুমেন্ট এর বিশাল ব্যবধান দেখতে পেলাম। বৈজ্ঞানিকেরা তাদের প্রাপ্ত ফলাফল বিশ্লেষণ করে পরিশেষে একটি বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ এর প্রতি জোর দিয়ে থাকে, কিন্তু কর্পোরেটে পুরো টিম ওয়ার্ক করার জন্য প্রচুর ডকুমেন্ট করার প্রয়োজন হয়। প্রতিটি মিটিং মিনিটস থেকে শুরু করে প্রোজেক্ট এর কাজ পুরোটাই পুঙ্খানুরূপ ভাবে লিপিবদ্ধ করতে হয়। তবে সবথেকে বেশি বিস্তারিত ডকুমেন্ট করতে দেখেছি আমেরিকার প্রতিষ্ঠানগুলিতে। কর্পোরেটে এত বেশী ডকুমেন্ট তৈরী করতে হয় যে অনেক সময়েই বেশ বিরক্ত ধরে গিয়েছিল। পরে বুঝতে পারলাম যে কর্পোরেটে টিম এর পুরো কাজকে গুরুত্ব দেয়া হয়। টিমের কোন একজন সদস্য এর অনুপস্থিতির কারনেও যেন প্রোজেক্ট থেমে না থাকে, তাই ডকুমেন্টে লিপিবব্ধ করে রাখতে হয় যেন, অন্য যে কেউ ফলোআপ করতে হয়।
ভালো ডকুমেন্টের ব্যাপারে কিছু টিপস হল, ডকুমেন্ট টির পাঠক কে? কে এটি পড়বে বলে মনে করেন। যদি এমন কেউ পড়ে যে আপনার সেই প্রোজেক্ট সমন্ধে জানে না তবে একটু সূচনা লিখুন, যেখানে সক্ষিপ্ত আকারে প্রোজেক্টটি সমন্ধে বলুন। অনেক সময়ই ইঞ্জিনিয়ার রা এই অংশটি লিখে না, ফলে পরবর্তিতে যখন কেউ তার সেই ডকুমেন্টটি পড়ে তখন পাঠক বুঝতে পারেনা এটি কিসের ডকুমেন্ট। তাই কোন ডকুমেন্ট এর লাইভসাইকেল বা মেয়াদ বাড়াবার জন্য একটি ছোট সারাংশ খুব প্রয়োজন। ডকুমেন্ট টির উদ্দ্যেশ্য কি? এটি পাঠককে কি ব্যাপারে সাহায্য করবে এটি সেই ডকুমেন্ট বা লেখকের জন্য জানা খুব প্রয়োজন। অনেক সময় একটি ডকুমেন্ট কয়েকজন মিলে তৈরী করতে হয়, সেই ক্ষেত্রে আগেই বসে নির্ধারণ করে নিন লক্ষ্যটি কি? ডকুমেন্ট সংরক্ষণ: অনেক সময়েই প্রযুক্তিবিদদের ধারণা হল, প্রোজেক্টটি শেষ হয়ে গেলে সেই ডকুমেন্ট এর কোন মূল্য নেই। আসলে একটি ডকুমেন্ট হল এর পিছনে সেই মানুষগুলির অর্থ, সময় ও কর্মফল। তাই যে কোন ডকুমেন্ট এর গুরুত্ব অনেক আছে। মনে করুন আপনি একটি প্রতিষ্ঠান ভিজিট করে এসেছেন। তারপরে সেই ভ্রমণের উপর আপনি কিংবা আপনারা একটি রিপোর্ট লিখলেন। যদিও সেটি আপনার বস বা সংশ্লিষ্ট লোকজনের সাথে ইমেইলে শেয়ার করলেন, কিন্তু সেই ডকুমেন্টটি কোথায় সংরক্ষণ করুন। প্রিন্ট করে ফাইলে আর্কাইভ করতে পারেন, অথবা ডিজিটাল আকারে গুগল ড্রাইভ, মাইক্রোসফট ড্রাইভ কিংবা ড্রপবক্সে সংরক্ষণ করতে পারেন। অনেক অফিসে নিজস্ব ফাইল সার্ভার ব্যবহৃত হয় ফাইল সংরক্ষণের জন্য।
মাইন্ড ম্যাপ বিভিন্ন তথ্যকে সহজে সাজিয়ে তা প্রদর্শন করার জন্য মাইন্ড ম্যাপ নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। সাধারণত নোট নেবার জন্য এই পদ্ধতি ছাত্রছাত্রীরা ব্যবহার করে। এই পদ্ধতি অনেক আগে থেকে ব্যবহৃত হলেও Tony Buzan এটিকে জনপ্রিয় করেন। আমাদের মস্তিষ্কে যেভাবে বিভিন্ন তথ্য আমরা ক্যাটাগরি করে সাজিয়ে রাখি, সেভাবে এই পদ্ধতিতে তথ্যকে সাজিয়ে রাখা হয়। অনেক সময় তথ্যপ্রযুক্তিবিদগণ মাইন্ড ম্যাপ ব্যবহার করে একটি প্রডাক্ট এর কি কি করতে হবে এবং টাস্ক ম্যানেজমেন্টের জন্য এটি ব্যবহৃত করেন।
চিত্র: একটি মাইন্ড ম্যাপের চিত্র (সূত্র উইকিপিডিয়া)
Posted on 8 Nov 2019