ডিএনএ কি ভবিষ্যতের হার্ডডিস্ক? (২০০৭)
তারিখ: ১৭ আগষ্ট ২০০৭
ডিএনএ হলো আমাদের শরীরের তথ্য সংগ্রহ করে রাখার একটি ভান্ডার। বংশপরম্পরায় শারীরিক গঠন, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যাবলীসহ অনেক তথ্য পরবর্তী প্রজন্মের কাছে বাহিত হয় এই ডিএনএর মাধ্যমে। ডিএনএর একটা বড় অংশই মা ও বাবার কাছ থেকে সন্তানের কাছে বাহিত হয়।
প্রকৃতিতে ডিএনএর ভেতর তথ্যগুলো সংগৃহীত থাকে এবং সেই তথ্যগুলোকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি দিয়ে পড়া সম্ভব। এটা বিজ্ঞানীরা এখন হরহামেশাই করছেন। গবেষণাগারে আমরাও এ কাজটি করে থাকি। আমরা সাধারণত একটা ডিএনএকে কপি করি বা সেটাকে আরও পরিবর্ধন করি। যেভাবে লোকেরা দিয়ে ঘর-বাড়ি তৈরি করে, আমরা সেভাবে ডিএনএ দিয়ে ইচ্ছামতো জীব তৈরি করি। অবশ্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে আমরা সরাসরি মানুষের ডিএনএ ব্যবহার করি না, বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়া থেকে তৈরি করা কৃত্রিম ডিএনএ ব্যবহার করি। কিছু কিছু গবেষণাগার আবার সরাসরি মানুষের ডিএনএ-কে ব্যবহার করে।
জিনোম প্রকল্প
আজ থেকে অনেক বছর আগে জিনোম প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প বিজ্ঞানীদের কাছে খুব জনপ্রিয় ছিল। জিনোম প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল, মানুষের যে ডিএনএ আছে, তার তথ্যগুলোকে সংগ্রহ করা। জিনোম প্রকল্প শেষ হয়েছে এবং এখন আমরা জানি আমাদের ডিএনএর গঠন এবং এতে কী আছে।
ডিএনএর তথ্য ধারণক্ষমতা
ডিএনএর ভেতর কতখানি তথ্য থাকতে পারে?
ডিএনএ মূলত চারটি উপাদান নিয়ে গঠিত। সেগুলো হলো অ্যাডেনিন (Adenine), থাইমিন (Thymine), সাইটোসিন (Cytosine) এবং গুয়ানিন (Guanine)। ডিএনএ-তে এই এ, টি, সি এবং জি-গুলো বিভিন্নভাবে সাজানো থাকতে পারে এবং সাজানোর এ ক্রমের মাধ্যমে বা বিন্যাসের মাধ্যমেই তথ্যকে সংগ্রহ করে রাখা হয়। আমাদের শরীরের ডিএনএ থেকে তথ্যগুলো ব্যবহৃত হয়ে শরীরের প্রয়োজনমাফিক প্রোটিন তৈরি হয়। আপনার ত্বক সাদা কিংবা কালো হবে কি না, তা নির্ধারণ করে এই ডিএনএ।
নতুন পদ্ধতি
এত দিন পর্যন্ত ডিএনএ-তে তথ্য সংগ্রহ থাকত এবং ডিএনএ থেকে আমরা তথ্য বের করতাম। মজার ব্যাপার যে কিছুদিন আগে জাপানের কোয়ো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক মোশারো তামিপা একটা নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন, যেখানে ডিএনএর ভেতের তথ্য সংরক্ষণ করে করে রাখা যাবে। তারা তথ্য সংরক্ষণ বা ঢোকানোর জন্য 'e=mc²' সূত্র এবং '১৯০৫' বছর নিয়েছিলেন। প্রথমটি আলবার্ট আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র। আর '১৯০৫' মানে এই বছর তিনি সূত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন। ড. তামিপার গবেষক দল এই তথ্য দুটি একটি ব্যাকটেরিয়ার ভেতের লিপিবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিল। পরে সেই লিপিবদ্ধ তথ্য থেকে তথ্য দুটি আবার পড়তে পেরেছিল।
আজ পর্যন্ত কেউ কোনো কিছুর ভেতর ডিএনএ দিয়ে এভাবে তথ্যকে রাখার পদ্ধতি আবিষ্কার করতে পারেনি। এ থেকে প্রমাণিত হলো ডিএনএর ভেতরেও আমরা বিভিন্ন সংকেত সংগ্রহ করে রাখতে পারি।
কেন এত হইচৈ?
হইচইয়ের মূল কারণ হলো, কম্পিউটার জগতে বিভিন্ন হার্ডডিস্ক ড্রাইভ যেভাবে তথ্য সংগ্রহ করে রাখা যায়, ঠিক একইভাবে অন্য কোনো মাধ্যমে, জৈব জিনিসপত্রের মধ্যেও রাখা যায় কি না, তা নিয়ে অনেক গবেষণা চলছিল। ডিএনএর ভেতের এত তথ্য রাখার ধারণক্ষমতা আছে দেখে মানুষ আশ্চর্য হয়েছিল এবং তারা মনে করেছিল যে ডিএনএ-ই পারে মানুষের সেই ইচ্ছা পূরণ করতে।
তথ্য সংরক্ষণের এই পদ্ধতিটি যখন জাপানের বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করলেন, তখন অন্য বিজ্ঞানীরা পরামর্শ দিচ্ছেন শুধু ব্যাকটেরিয়াই নয়, প্রয়োজন হলে টেলোপোকাকেও ব্যবহার করতে। অথবা টেলোপোকার মধ্যে ডিএনএ সংগ্রহ করে রাখা যায় কি না, সেটা নিয়ে ভাবছেন। এত কিছু থাকতে এই কুঁজিত পোকা কেন? কারণ হলো, টেলোপোকা চরম দুর্বিষহ পরিবেশেও বেঁচে থাকতে পারে। দেখা গেছে যে পৃথিবী যদি আকস্মিক তেজস্ক্রিয় বা পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যায়, তার পরও টেলোপোকা বেঁচে থাকবে। এ ছাড়া উচ্চ তাপমাত্রায়ও টেলোপোকা বেঁচে থাকতে পারে। এমনকি কোনো রাসায়নিক বিস্ফোরণ হলেও তাতে টেলোপোকা বেঁচে থাকতে পারে। যে কারণে মনে করা হয় পরিবেশের সবচেয়ে দুর্বিষহ অবস্থায়ও টেলোপোকা টিকে থাকতে পারে।
টেলোপোকার ক্ষমতা
টেলোপোকার একটি ডিএনএর ভেতর থাকে প্রায় দুই দশমিক নয় বিলিয়ন ক্রম, যা প্রায় ৭৫০ মেগাবাইট তথ্য হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, একটি টেলোপোকার ডিএনএর ভেতর যদি তথ্য সংগ্রহ করে রাখা যায়, তাহলে যুগ যুগ ধরে এই তথ্য টিকে থাকবে।
জাঙ্ক ডিএনএ
তবে ডিএনএর একটি মজার ব্যাপার হলো, এতে যেসব তথ্য থাকে, তার সবই যে খুব গুরুত্বপূর্ণ তা কিন্তু নয়। এর মাত্র তিন শতাংশের ভেতের থাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। যেমন টেলোপোকার ২৯০ কোটির তিন শতাংশ তথ্য সংগ্রহ থাকে। আর বাকি ৯৭ শতাংশ যে তথ্য থাকে সেগুলোকে সাধারণত বলা হয় বিভিন্ন ধরনের অজানা তথ্য। হার্ডডিস্কের পরিভাষায় খালি এলাকা বা জাঙ্ক (অপ্রয়োজনীয়) তথ্য।
ডিএনএর ভেতর এসব অজানা তথ্য কী, তা আমরা এখনো কিছু জানি না। তবে এটা নিয়ে বেশ কিছু মজার গল্প আছে বিজ্ঞানীদের মধ্যে। যেমন, এই ডিএনএর ভেতরেই কোনো অজানা তথ্য লুকানো আছে কি না, সেটাও বের করার চেষ্টা চলছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জিল বেজেরানো বলেন, ডিএনএর মধ্যে এখন অনেক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যেটিকে অনেকেই অনেকভাবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে এটা কাকতালীয় ব্যাপার মাত্র। আসল তথ্যের সাথে এটার কোনো সম্পর্ক নেই। যেভাবে অনেকে বাইবেলের ভেতর বিভিন্ন ধরনের গোপনীয় সংকেত খুঁজে পান। হয়তোবা ওটার মূল লক্ষ্য সেটা নয়, কিন্তু অনেকেই জোর করে যোগসূত্র বের করার চেষ্টা করছেন।
ভবিষ্যত সম্ভাবনা
তবে ডিএনএ-কে তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যবহার করা যায় কি না, সেটাই হচ্ছে এখন অগ্রগামীর বিষয় এবং সংরক্ষণ করে রাখা গেলেও তা কত দিন পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে? ডিএনএর সবচেয়ে একটা বড় সমস্যা হলো, এখান থেকে খুব সহজে তথ্য পরিবর্তিত বা হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে জাপানি বৈজ্ঞানিক ড. তামিপা তথ্য সংগ্রহ করার যে পদ্ধতিটি উদ্ভাবন করেছেন, সে পদ্ধতিতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত তথ্য যদি পরিবর্তিত হয়েও যায়, সেটাকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
অনেকের কাছে এই ১৫ শতাংশ অডিট একটো কম বলে মনে হলেও ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে এই ১৫ শতাংশ পরিবর্তন হতে সময় লাগবে এক মিলিয়ন বছর। তাই সময় অনুযায়ী এটা হচ্ছে খুব কম পরিমাণের পরিবর্তন, যা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।
লেখক ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যানোবায়োটেকনোলজি বৈজ্ঞানিক হিসেবে কর্মরত।