মশিউরের খেরোখাতা

আমরা তাই দেখি যা আমরা দেখতে চাই

শুক্রবারে গল্প দিয়েই আজকের লেখা শুরু করি। আজকাল তো গল্প শোনা হয়না। ফেসবুকে সবার বেহুল্যপনা আর সুখি থাকার অভিনয়ের ছবি দেখে ঈর্ষা কাতর হয়ে বাঙ্গালিদের দীর্ঘস্বাস যেভাবে মোবাইলে পড়ে আর মনে হয় কোন জাতির এমনটি হয়না। অন্যের ভালো দেখে- আমরা দীর্ঘস্বাসও ফেলি, আবার একটু পরে দেখি উঁকি মেরে দেখি আর, আরোও-ও দীর্ঘস্বাস ফেলি। ছবির পেছনের কষ্টগুলি আমরা কেউই শেয়ার করিনা, আর তাই সেইগুলি অজানাই থেকে যায়। সেই সব ছবির পাশাপাশি গল্পের ফাঁদ পেতে বসেছি যদি তাতে আমার এই বন্ধুমহলের কিছুটা হলেও অবসর হয়। শুক্রবার সকালে বেশ আলেস্য করে অফিসে যাওয়া হল। এই আলস্যের কারণটি হল, জাপান থেকে এক টিম এসেছে তারা একটু দেরী করে মিটিং এর টাইম ঠিক করেছে। এই দেরী করার সুযোগে পরিবারের সাথে সাত সকালে আলস্যের এক সকাল কাটল। বিশেষ করে আমার ছেলেদের এখন গরমের ছুটি, তাই তারা বাসাতেই আছে। তাই তাদের সাথে একটু সময় করা গেল। বাসা থেকে যখন বের হচ্ছি- তখন সকালটা বেশ রোদেলা বলে মনে হলেও পরে বৃষ্টি হতে পারে। আমার এখনও আকাশ দেখতে ভালো লাগে, আর ভালো লাগে সেটি দেখে আবহাওয়া কেমন হবে তা ভাবা। এই কাজটির জন্য সিঙ্গাপুর এক মজার দেশ। এই কারনে যে, এই রোদ তো একটু পরেই ঝমঝম করে বৃষ্টি। আজ যদি একটু গরম বলে মনে হয় তবে খুবই সম্ভাবনা যে কয়েক ঘন্টার মধ্যে বৃষ্টি হবেই। আমার এক পরিচিত সেদিন সিঙ্গাপুরে আসার আগের কি কি আনতে হবে তা জানতে চাইছিলেন। আমি উপদেশ দিলাম যেন হাত-ছাতা আনেন। বাঙালীরা অন্যকে উপদেশ দিতে যেমন ভালোবাসে, তেমন ভাবে সেই উপদেশগুলি উহ্য করতে আরো ভালোবাসে। যথারীতি উনিও আমার উপদেশ এড়িয়ে গেলেন। বেশ কিছুদিন পরে দেখা হবার পরে স্বীকার করলেন যে আসলেই এই দেশে বসবার করতে গেলে অবশ্যেই ব্যাগে হাত-ছাতা রাখা দরকার। সিঙ্গাপুরে পথে বের হলে দুটি জিনিস সবাই নিয়ে যেতে ভুলেনা। একটি হল ছাতা, আর অপরটি হল পানির বোতল। অন্যান্য দেশের মতন যেখানে সেখানে পানি চাইবার সুযোগ নেই। একবার বাংলাদেশের এক অজপাড়াগায়ে হাটতে হাটতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। অপরিচিত এক কৃষকের বাড়িতে যেয়ে পানি চাইলে, পানির গ্লাস ও এর সাথে এক টুকরো গুড় দিয়েছিল। এখনও তার অতিথেয়তা কথা আমার মনে রয়েছে। তবে আধুনিক মেট্রোপলিটন শহর সিঙ্গাপুরে সেটি হবার সুযোগ নেই। অনেক

রেসটুরেন্টে সাধারণ গ্লাসে পানি দেবার চল এখন অনেকটায় চলে গেছে। সেখানে চলে এসেছে প্লাস্টিকের বোতলে মিনারেল পানি দেবার চল। পানি বিক্রি করে টু পায়েস উপার্জন করা। যাই হোক মূল গল্পে আসি। অফিসে যাবার ট্রেনে উঠলাম। এইখানে সকালের সময়টাতে অফিসে যাবার ব্যস্ত সময়টাতে সবথেকে ভীড় থাকে, কিন্তু তার একটু পরে যাবার কারণে অপেক্ষাকৃত ভীড় কম। ট্রেনে ঢুকে দেখি সবার হাতে মোবাইল। সবাই ট্রেনে ঢুকে কোনমতে একটা জায়গা পেয়ে প্রথমেই এই নতুন বিশ্বের চুম্বকটা বের করে সেখানেই সবার চোখ। আমি অবাক হয়ে দেখলাম আমার কামরাতে সবাই মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত। আমি মোবাইল ছাড়া চুপচাপ বসে বসে আকাশ দেখছি। আমার দিকে এক বৃদ্ধ কটমট করে তাকাল যেন মোবাইলকে ফাকি দিয়ে আকাশ দেখে আমি খুব অন্যায় করে ফেলেছি। আর আমি ভাবছি- আহা, কি অপরূপ সুন্দর দৃশ্য। একদম বিনামূল্যে প্রকৃতি অদ্ভুত ক্যানভাসে কি মজার মজার ছবিই না একে চলেছে। এদিক সেদিক দেখছি আর ট্রেনের যাত্রীদের অবলোকন করছি। একটা সময় ছিল বাসে ট্রেনে ভ্রমন করার সময় আমার বন্ধুদের সাথে বসে গল্প করতাম কোন যাত্রী কেমন। কি তার পেশা, ইত্যাদি। সেই ছেলেবেলায় এই পূঙ্খানারুপ দেখার অভ্যাসটা ছেলেদের মধ্যে ঢুকানোর চেষ্টা করেছি। অবলোকন করা - আমার মনে হয় একজন লেখকদের জন্য খুব জরুরী। ট্রেনের ভিতরে দেখার কিছু নেই। তারপরেও দেখি এক্জিট বা বের হবার একটি লগো সবসময় দরজার উপরে আঁকা আছে। একটু ভালো মতন লগোটা দেখছিলাম আর ভাবছিলাম- কেন দৌড়ে বের হবার আইকন টি এমন হল। আর সব সময় বেরিয়ে মাঝের দরজার বাহিরে অংশটি কেনই বা সাদা রঙে থাকে। আমি নিজেই নিজের মতন একটি ব্যাখ্যা দাড় করলাম। আমার ব্যাখ্যাটি হল। সাধারণত কোথায় আগুন লাগলে, বা অন্ধকার হয়ে গেলে বেরিয়ে যাবার রাস্তা আমরা খুজি। সেই ক্ষেত্রে বাহিরে থাকে আলোকিত অংশ। যেমন মনে করা যাক সিনামে হলের ভিতরে অবস্থাটা। প্রাকৃতিক ভাবে অন্ধকারকে আমরা ভয় পাই। আর আলো দেখলে সেই ভয়টা কেটে উঠে। মাঝরাতে আমাদের ঘুম ভেঙ্গে গেলে আমরা তাই হুড়মুড় করে আলো জ্বালাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। আর আমাদের সেই মনস্তাত্বিক অবস্থাটা এই আইকনে প্রকাশিত হয়েছে। গ্রাফিক্স ডিজাইনার বা আর্টিস্টরা যে ছবি আকেন তাতে আমাদের ও আমাদের সমাজের চিন্তার অনুভুতির সাথে সামঞ্জস্য থাকে এবং প্রকাশ

থাকে। তাই লগোতে দরজার অপাশের বেরিয়ে যাবার অংশটি সবসময়ই আলোকিত সাদা বা উজ্জ্বল রঙের হয়ে থাকে। আজকে ট্রেনে বসে এই লগোটিই ছিল আজকে আমার ভাবনার অংশটি। যানিনা আমার এই ব্যাখ্যাটি সঠিক কিনা। যারা এটি জানেন তারা বলতে পারেন। তবে সেদিন এক বিজ্ঞানী বলছিল, আমরা তাই দেখি - যা আমরা দেখতে চাই। আমাদের চোখের সামনে অনেক কিছু দেখলেও, যেটিতে আমাদের মন দিয়ে দেখার প্রয়োজন হবে, আমাদের মস্তিষ্ক শুধু সেটাকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখায়। এই অবলোকন বা দেখার গল্প করতে যেয়ে আমার ছেলেবেলার ক্যাডেট কলেজের এক শিক্ষক জয়নাল আবেদিন স্যারের কথা মনে পড়ে গেল। স্যার আমাদের বাংলা পড়াতেন। কবিতা এত সুন্দর করে ব্যাখ্যা করতেন যে সেই বয়সেই আমরা সবাই কবিতার প্রেমে পড়ে গেলাম। যেই কবিতা পড়ি, সেই কবিতার মর্মবাণীগুলি ব্যাখ্যা করার জন্য চেষ্টা করতে লাগলাম। এই অভ্যাস আজো ছাড়তে পারিনি। একদিন জয়নাল স্যার আমাদের সবাইকে দাড় করিয়ে বললেন আমরা কেউই পিছনে তাকাতে পারবোনা। আমাদের বলতে হবে পিছনের বোর্ডে কি কি আছে? ক্যাডেট কলেজের ক্লাশরুমগুলির সাথে যারা পরিচিত তারা জানেন যে, পিছনের বোর্ডে বিভিন্ন ধরনের নোটিস, কোন ছবি ও টুকটাক অনেক কিছুই লাগান হয়। আমরা সবগুলি বলে যেতে লাগলাম। কিন্তু কি অবাক। সেই বোর্ডে একটি বিশাল পৃথিবীর ম্যাপ ছিল। অদ্ভুত হল আমরা কেইই সেই ম্যাপের কথাটি বলতে পারলামনা। এত বিশাল ম্যাপ কিভাবে আমাদের চোখে পড়লনা। সেটা সেই কিশোর বয়সে আমরা বুঝতেই পারলামনা। স্যার বললেন, দেখলতো আমরা প্রতিদিন এই ক্লাসে বসি। দিনের পরে দিন, মাসের পরে মাস। অথচ আমরা ঠিক মতন সেটাও দেখিনা। তাই আমি বলি, চারিদিক দেখুন। অবলোকন করুন, আর সেই দৃশ্যপটগুলি উপলব্ধি করুন। মোবাইলের ক্রিণে নিজেকে আটকে রাখবেননা। আমরা তাই দেখি যা আমরা দেখতে চাই

তারিখ: ২৩ জুন ২০১৯