মশিউরের খেরোখাতা

১৬: কোন জিনিসকে কিভাবে উপস্থাপন করি তাই গুরুত্বপূর্ণ এবং তার মাধ‍্যমেই মূল্য নির্ধারিত হয়

বৈজ্ঞানিক থেকে ইন্ডাস্ট্রিতে আসার পরে অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখলাম তা হল, কিভাবে কোন জিনিসকে আমরা কিভাবে উপস্থাপনা করি তা দিয়েই তার ভ‍্যালু/দাম বা মূল্য নির্ধারিত হয়। ব্যাপারটা আমার বসের মুখে প্রায় শুনতাম এবং উনি কথা প্রসঙ্গে প্রায়শই এই কথাটি বলতেন। প্রথমদিকে আমি কথাগুলো বুঝতে পারতাম না। তবে একটি প্রোজেক্টের কাজ করতে যেয়ে আমি এর মর্মার্থ উপলব্ধি করলাম।

আমি সেই সময়ে একটি স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতাম। খুব কম বেতনে সেখানে যোগ দিতে খুব দ্বিধা ছিল। পরে আমারই এক মেন্টর বললেন, কম বেতন হলেও সেখানে যে অভিজ্ঞতা হবে তার অনেক মূল্য এবং সেটিকে কাজে লাগিয়ে আমি আরো ভালো অবস্থানে যেতে পারবো। পরে বুঝেছি তার কথাটা খুব মূল্যবান ছিল। এমন সব পরামর্শ-কারিকে পাওয়াটাও বেশ সৌভাগ‍্যবানের কথা। এই সিরিজে যে লেখাগুলো লিখছি তার সবাই সেই সময়ে শেখা, ইন্ডাস্ট্রিতে আমার অভিজ্ঞতা। মূল প্রসঙ্গে আসা যাক, উপস্থাপনা কেন গুরুত্বপূর্ণ।

সেই স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠানটিতে একটি প্রোডাক্ট ছিল যা আমরা অনেক বছর ধরে অনেক কষ্ট করে অনেক ইঞ্জিনিয়ারদের দিয়ে তৈরি করা। সেই প্রোডাক্টটি ব্যবহৃত হবে একমন একটি বড় দরপত্রে অংশ নেবার জন্য যৌথভাবে আমরা একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে কাজ করি। দরপত্রের প্রায় ৯৯% কাজই আমাদের করা, কিন্তু দরপত্র জমা দেবার কাগজপত্র ও অনুসঙ্গিক কাগজপত্রগুলি সেই প্রতিষ্ঠান করেছিল। পরিশেষে আমরা যৌথভাবে আমরা কাজের দরপত্রটি দিই। কাজ আমাদের, প্রোডাক্ট আমাদের, কিন্তু দরপত্রের কাগজপ্রত্রগুলো শুধু তারা সাজিয়ে জমা দিয়েছিল তাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে। এই দরপত্রের জন্য সব কারিগরি কাগজপত্র আমি সহ আমাদের প্রতিষ্ঠানের সবাই মিলে তৈরি করে তাদের দিয়েছিল। বড় প্রতিষ্ঠানটি শুধুমাত্র তাদের মোড়কে সাজিয়ে দিয়েছিল। ব‍্যাপারটাতে আমি এতে খুব মনক্ষুন্ন করি। পুরো প্রোজেক্টটির প্রযুক্তিগত দিকটা আমি দেখাশুনা করছিলাম। কিন্তু এই কাজটি সম্পূর্ণভাবে অন্যের নামে দিতে হবে তা মানতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল বড় প্রতিষ্ঠানটি আমাদেরকে ব্যবহার করছে। আর যেহেতু আমিই ব্যবহৃত হচ্ছিলাম তাই মেনে নিতে পারিনি।

একদিন লাঞ্চের সময় আমি ফুডকোর্টে বসে খাচ্ছিলাম, তখন প্রতিষ্ঠানের টপ ম্যানেজমেন্টের অনেকেই এসে আমার সাথে যোগ দিলেন। সিঙ্গাপুরে চাকুরীর পদ বা পজিশন অনুযায়ী একত্রে বাহিরে খাবার আয়োজন নেই। এইখানে সবাই সমান, ভুল ইগো নিয়ে এখানে চলেনা। আমি বড় অফিসার, তাই আমি ছোট অফিসারদের সাথে খেতে পারবোনা, সেই রকম ইগো এর সমস্যা এইখানে নেই। সবাই মিলে গল্প করতে করতে লাঞ্চ করছিলাম। কথা প্রসঙ্গে আমার মনক্ষুন্ন হবার কথাটা তাদের সাথে শেয়ার করি।

তখন একজন ডিরেক্টর বলেন, “আমরা তাদের সাথে এই প্রোজেক্টটির দরপত্র দিলে এটি পাবার সম্ভাবনা বেশী। কেননা তারা খুবই নামকরা একটি প্রতিষ্ঠান, এবং তাদের বিশ্বাসযোগ‍্যতা (Credibility) বেশী। আমরা যদি একই প্রোজেক্ট নিজেরা জমা দিই তখন সেটির মূল্য এক ধরনের আবার একই জিনিস যদি তাদের সাথে জমা দিই তবে তার মূল্য আরেক ধরনের।”

তখন আরেকজন ডিরেক্টর বললেন যে, “ মনে করা যাক রাস্তায় আপনি একটি ইট দেখছেন। এটির মূল্য কত? খুবই সামান্য। অথচ সেই একই ইট যখন আর্ট গ্যালারিতে অন্য কোন ইটের সাথে সাজিয়ে সেটি দিয়ে কোন আর্ট তৈরি করা হয়, তখন তার মূল্য অন্যরকম হয়।”

পরে ব্যাপারটা নিয়ে অনেক ভেবেছি কিন্তু মেনে নিতে পারিনি। পরে অন্যান্য কর্পোরেটের সাথে কাজ করতে করতে এই জিনিসটা এখন বুঝতে পেরেছি।আসলে আমরা যতই ভালো পণ্য তৈরি করিনা কেন, তা কাস্টোমারদের কাছে গ্রহণযোগ‍্য হবার জন্য তেমন ভাবেই উপস্থাপন করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রেক্ষাপটে ব্যাপারটা আলোচনা করা যাক। একজন যখন বড় রেস্টুরেন্টে খেতে যান, তখন খাবার পরে বড় অংকের বকশিশ দিতে কার্পণ্য করে না। কিন্তু সেই একই ব্যক্তি বাজার করতে গেলে কিংবা রিকশাওয়ালার সাথে খুবই ছোট অংকের টাকার জন্য কার্পণ্য করেন। কেন এমনটি হয়। আসলে রেস্টুরেন্টের পরিবেশে আমরা একজন বেয়ারাকে অন্যরকম ভাবে মূল্যায়ন করি। আবার হয়তবা সেই একই লোক অন্য কোন দোকানের সেলসম‍্যান হিসাবে কাজ করলেও আমরা তার সাথে অন্য আচরণ করি। এইখানে পরিবেশটি বিরাট ভূমিকা পালন করে। আমি যখন একটি কথা বলছি, তখন তা এক ধরনের মূল্য পায়। আবার আমি যদি সেই একই কথা একজন রাষ্ট্রপতির পাশে নিয়ে বলি তখন ব্যাপারটি অন্যরকমের হয়। আমি যে কথা বলবো তা হয়তবা একই। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একজন লোককে পাশে নিয়ে বললে তার গুরুত্ব বাড়ে, বৈকি।

তাই আমরা নিজেকে কিভাবে অন্যের কাছে উপস্থাপন করছি তা খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটির মাধ্যমেই আমার ভ‍্যালু প্রকাশ পায়। আবার অপরদিকে যখন একটি পণ্য বা সার্ভিসকে অন্যের কাছে তুলে ধরছি, তা কিভাবে কার সাথে ও কোন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করছি, সেই কনটেক্সট বা প্রসঙ্গ টি গুরুত্বপূর্ণ। কর্পোরেটে এসে এই মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গিটি শিখতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। ধীরে ধীরে অনেক প্রোজেক্ট, পণ্য কিংবা সার্ভিস উপস্থাপনার ক্ষেত্রে কাজ করতে করতে এটি আমি শিখেছি।