গাড়ির নতুন জ্বালানী - ইথানল
তারিখ: আগষ্ট ২০১১
একটি কল্পনিক ভ্রমণ কল্পনা করা যাক। আপনি গাড়ি নিয়ে একটি গ্রামে বেড়াতে গেছেন। আজকের দিনের আধুনিক গ্রাম নয়- বিদ্যুত, গ্যাস, তেল কিছুই নেই। সেই গ্রামের রাস্তায় এসে আপনার গাড়ির তেল শেষ হয়ে গেছে কোন একটি মাঠের পাশে। মহা সমস্যায় পড়লেন আপনি। কিন্তু হটাৎ গ্রামের কৃষক তার ক্ষেতের ভুট্টার গাছ থেকে আপনার গাড়ির জন্য তেলের পরিবর্তে একটি জ্বালানী তৈরী করে দিল। কাল্পনিক হলে্ও ব্যাপারটি একদিন হয়তো সত্যি হবে। মিডিলইস্ট কিংবা উন্নত বিশ্বের জ্বালানী আমদানি সরবরাহের উপর নির্ভর না করে গ্রামে উত্পাদিত কৃষিপণ্য দিয়েই তৈরী করা যাবে তেলের বিপল্প জ্বালানী। এই জ্বালানীর নাম হল, ইথানল জ্বালানী। বর্তমানে বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত ডিজেল, পেট্রল কিংবা অকটেনের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর জন্য মানুষ অনেক বছর ধরেই বিপল্প জ্বালানীর খোঁজ করছে। বিভিন্ন ধরনের বিপল্প জ্বালানীর মধ্যে মানুষ এখন সবথেকে বেশী আশাপ্রদ হল ইথানলের ব্যাপারে। তবে এই ব্যাপারে পৃথিবীর মধ্যে সবথেকে বেশী এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। তারা ১৯৭৮ সন থেকেই গাড়িতে ইথানল ব্যবহার করছে।
ব্রাজিলে সাধারণ পেট্রোল জ্বালানীর মত গাড়ির জন্য বাণিজ্যিক ইথানল জ্বালানী বিক্রি হয় সাধারণ গাড়ির ইঞ্জিনেই ৫% থেকে ১০% পর্যন্ত ইথানল মিশ্রণ করে ব্যবহার করা যায়। তবে এই ইথানলের পরিমান বাড়লে গাড়ির সাধারণ ইঞ্জিনের একটু পরিবর্তন করতে হয়, অনেকটা আমাদের দেশে যেরকম সিনএজি করার জন্য পরিবর্তন করা হয়। বিশেষ ধরনের এই গাড়িগুলিকে Flex গাড়ি বলা হয়। বর্তমানে টয়োটা থেকে শুরু করে অনেক গাড়ি প্রস্তুতকারীই বর্তমানে এইধরনের ফ্লেক্স গাড়ি তৈরী করছে।
কিভাবে কাজ করে? এবার দেখা যাক কিভাবে এই ইথানল জ্বালানী হিসাবে কাজ করে। আমরা জানি যে গাছপালা সালোকসংশ্লেন প্রক্রিয়ায় সূর্যের আলোর শক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাতাসর অক্সিজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে গ্রুকোজে রূপান্তর করে। সহজভাবে লিখলে রাসয়নিক বিক্রিয়াটি এইভাবে আমরা লিখতে পারি। CO2 + O2 🡪 গ্রুকোজ ইথানল তৈরী: গাছের এই গ্রুকোজকে ফার্মেন্টেশন প্রক্রিয়াতে ইথানল তৈরী করা হয়। গ্রুকোজ 🡪 ইথানল + CO2 + তাপ ইথানল যখন জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করা হয় তখন অক্সিজেনের সাথে জ্বলন বিক্রিয়ার মাধ্যমে তাপ, সাথে কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও পানি তে রূপান্তরিত হয়। তার মানে পুরো প্রক্রিয়াটি যদি আমরা সরল ভাবে দেখি তাহলে দেখবো এখানে সূর্যের আলোক শক্তি তাপে পরিণত হচ্ছে যা গাড়ি চালাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। আমরা যদি ইথানলকে এইভাবে গাড়ির জ্বালানী হিসাবে ব্যবহৃত করি তবে পেট্রোল জাতীয় জ্বালানীর উপর আমাদের নির্ভরতা কমাতে পারবো।
ইথানল দিয়ে চলা বিভিন্ন ব্রান্ডের ফ্লেক্স গাড়ি বায়ো-ইথানল: জ্বালানী হিসাবে ইথানল ব্যবহার চমকপ্রদ হলেও সমস্যা হল এই ইথানল তৈরীর জন্য আমাদের বিভিন্ন কৃষি পণ্যের উপর নির্ভর করতে হয়। ইথানল সাধারণত আখ, আলু, ভুট্টা থেকে তৈরী হয়। কৃষিপণ্য থেকে এইভাবে তৈরী করা হয় বলে একে বায়ো-ইথানল বলা হয়। কৃষিপণ্য থেকে উত্পাদিত হবার কারণে এই সমস্ত কৃষিপণ্যের দাম বেড়ে যাবার সম্ভাবণা রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদগণ বেশ সতকর্তা দিচ্ছেন। আর এই কারণে বিজ্ঞানীরা অন্যান্য উদ্ভিদ থেকে তৈরীর জন্য গবেষনা করে যাচ্ছেন যা সরাসরি আমাদের খাবার বা কৃষিপণ্য হিসাবে ব্যবহৃত হয়না।
বিভিন্ন দেশের ইথানল তৈরীর পরিমাণ যেমন বিজ্ঞানীরা বর্তমানে গাছের অপ্রয়জনীয় অংশ যেমন কান্ড, পাতা থেকে তৈরী করতে পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। গাছের সেলুলোজ থেকে ইথানল তৈরীর এই প্রক্রিয়াকে সেলুলোসিক ইথানল বলে। এছাড়া কমলার খোঁসা ও পুরনো পত্রিকা থেকে তৈরী পদ্ধতি নিয়ে কাজ করেছেন। তবে সবথেকে যেটি নিয়ে এখন আলোচনা হচ্ছে তা হল শৈবাল থেকে তৈরী করা। ব্রাজিলে এ্যালজি শৈবাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে ইথানল তৈরী হচ্ছে। শৈবাল থেকে ইথানল তৈরী করলে সাধারণ ইথানলের থেকে ৪০ গুণ কম খরচ পড়ে।
এ্যালজি শৈবাল থেকে তৈরী হচ্ছে ইথানল বাংলাদেশেও ইথানলকে গাড়ির জ্বালানী হিসাবে ব্যবহার করার কাজ চলছে। চুয়াডাঙার দর্শনাতে কেরি এন্ড কম্পানি ইথানল প্লান্ট তৈরী করার কাজ শুরু করেছে ২০০৭ সনে। এছাড়া আরো দুটি কারখানা তৈরীর প্রক্রিয়া চলছে। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইথানল ব্যবহারের উপর গবেষনা চলছে। এছাড়া আমেরিকাতে আমাদের আরেকজন কৃতি বিজ্ঞানী ড. আতাউল করিমের টিমও এটির উপর গবেষনা করছে। সেইদিন মনে হয় খুব একটি বেশী দিন নয় যখন পেট্রোল জাতীয় জ্বালানীর উপর আমাদের নির্ভরতা কমবে এবং ইথানল দিয়ে আমাদের গাড়িগুলি চলবে, তখন মনে হয় প্রথমে বলা কল্পকাহিনী বাস্তব হবে।
লেখক বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তি বিষয়ক পোর্টাল biggani.org এর সম্পাদক। ইমেইল mashiur.rahman@gmail.com এবং ওয়েবসাইট facebook.com/rahmanmashiur