মশিউরের খেরোখাতা

তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে ঢুকতে আমাদের করণীয় (২০০৭)

তারিখ: ৭ এপ্রিল ২০০৭


বেশ কয়েক বছর ধরেই দেখছি, যখনই বাংলাদেশর আইটি নিয়ে কথা হয়, তখনই কথায় কথায় সবাই বলে, আমাদের দেশের ছেলেরা কম্পিউটার প্রতিযোগিতায় ভাল করেছে। অথচ বিশ্বাজারের প্রতিযোগিতায় নামতে হলে আমাদেরকে বিশ্বমান অর্জন করতে হবে ও তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে।

কোনো কম্পিউটার প্রতিযোগিতায় ভাল করা এক কথা, আর ব্যবসায় সফল হওয়া আরেক কথা। আজকাল বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী, মন্ত্রী ও আমলারা প্রায়শই বলে বেড়াচ্ছেন আমাদের আইটি সেক্টরের ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল। কত কোটি টাকার রফতানী হবে তাই নিয়ে হিসাব কষেন তারা।

এ দেখি হাসির ডিমের সেই গল্পটার মতো। মনে মনে শুধু লাভের হিসাব আর কিছু দূরদূ যাওয়ার পরে ডিমগুলোই ভেঙে সব বরবাদ! আমরাও একই ধরনের ভুল হিসাব কষছি এই কথা শুনছি অনেক বছর ধরেই।


আমাদের দেশের মেধাবী ছেলেরা

আমাদের দেশের মেধাবী ছেলেরা যে সব প্রতিযোগিতায় জিতেছে তা অবশ্যই সংশোধনীয়, কিন্তু কম্পিউটার জগতের বাজারে যদি দেশের পরিচিতি বাড়াতে চাই, তবে শুধু প্রতিযোগিতায় নয় বরং ভাল সফটওয়্যার তৈরি করে, সুন্দর কোনো বাণিজ্যিক আইডিয়া বের করতে হবে। বিশ্বের বাজারে নামতে হলে আমাদেরকে আরো প্রফেশনাল হতে হবে।

আর আমাদের দেশের সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কোনো সফটওয়্যার তৈরি করা কিংবা প্রোগ্রামারের কোনো কোড লেখাকেই শুধু আইটি সেক্টর বলে অনেকেই ভুল করেন। আসলে আইটি ব্যবসায়ের সাথে প্রোগ্রামারের কোড লেখার পাশাপাশি প্রজেক্ট ম্যানেজার, বিপণন, অর্থ, ব্যবস্থাপনা এগুলো জড়িত। সব গুলির এক্সপার্ট দরকার।

এই ক্ষেত্রে আমার পরিচিত এক প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু দিন ধরে বাংলাদেশে প্রজেক্ট ম্যানেজার খুঁজছে, কিন্তু এরা যোগ্য কোনো প্রার্থী পাচ্ছে না। এবার বুঝুন আমাদের অবস্থার টা।


আমরা কি দেশের ছোট গণ্ডি থেকে বের হয়ে আরো বড় কিছু করতে পারি না?

আমরা কি দেশের ছোট গণ্ডি থেকে বের হয়ে আরো বড় কিছু করতে পারি না? অবশ্যই পারি। আমাদের যে বেসমেন্ট আছে, তাকে পক্ত করতে হবে। পক্ত না করেই আগেই প্রচারণায় নামলে যা হওয়ার তাই হয়।

মনে করা যাক, একজন শিল্পী, যার কিছু প্রতিভা আছে। তাকে প্রফেশনালভাবে কাজ করাতে চাইলে অনেক ঘষামাজা করতে হয়। তা না করেই যদি প্রথমেই প্রচারণার জন্য টিভি, সিনেমায় নেমে পড়েন, ফলে দীর্ঘ যাত্রায় তিনি আর টিকে থাকেন না।

যে সব শিল্পীরা এখনো প্রফেশনালভাবে সমাদৃত, তারা কিন্তু ঘেষে মেজে অনেক কষ্টে নিজেদেরই তৈরি করেছেন। আমি আইটির ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। আমাদের মধ্যে হয়তো প্রতিভা আছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ভাল করছে, তবে তাকে আরো ঘেষে মেজে বিশ্বাজারের উপযোগী করে তুলতে হবে আমাদের টিকে থাকার জন্য।


ওয়েবসাইটে তথ্য উপস্থাপনা

ওয়েবসাইটকে আমরা বিজ্ঞাপনের বিকল্প হিসেবেই দেখি, সেখানে কোম্পানিগুলো কি ধরনের কাজ করছে, কী কী বিষয়ে তারা এক্সপার্ট তার খুটিনাটি তথ্য উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে আইটি সংক্রান্ত কোনো কোনো কোম্পানি সেই ধরনের কোনো তথ্য উপস্থাপন না করে ভাববাচ্য অনেক কথা লিখে থাকেন।

যেমন হয়তো লেখা আছে মাল্টিমিডিয়া এক্সপার্ট। এটি অনেক কিছুই বোঝাতে পারে। আর মাল্টিমিডিয়া ক্ষেত্রটিও বিশাল। মাল্টিমিডিয়ার কী ধরনের কাজ তারা করেন? কী ধরনের সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি করেন, কতজন এক্সপার্ট সেই কোম্পানিতে আছেন? কী কী কাজ তারা করছেন তার উল্লেখ থাকা প্রয়োজন, তা যতই সাধারণ হোক না কেন? তবেই যারা কাজ করাতে চাইবে, তারা এগিয়ে আসবে।

যেমন আমার শহরে খুব ছোট একটা কোম্পানি আছে, তারা শুধু লোগো তৈরি করে। তাদের ওয়েবসাইট দেখলে বুঝতে পারবেন তারা কী কী লোগো তৈরি করেছে, কত দিন সময় লাগে লোগো তৈরি করতে এবং তার জন্য কীরকম খরচ হয় তার খুটিনাটি সব তথ্যই আছে। সেই ওয়েবসাইটটি দেখে যারা লোগো তৈরি করিয়ে নিতে চান খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন।

অথচ বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠানই লোগো তৈরি করে। কত খরচ? কত দিন লাগবে, কি কাজ করেছে এ সব অনেক সময় উল্লেখ করেন না। হোক তা দুটি বা তিনটি কাজ। যারা কাজ করিয়ে নিতে চাইবে, তারা তাদের উদাহরণ দেখেই বুঝতে পারবে কেমন প্রফেশনাল তারা।


ওয়েবসাইট তৈরির অভিজ্ঞতা

এই সম্পর্কে একটি অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি। কিছু দিন আগে আমরা একটা ওয়েবসাইট তৈরি করার কাজ পেয়েছিলাম। ভাবছিলাম বাংলাদেশের কোনো কোম্পানি দিয়ে কাজটি করাব। আমাদের দেশের ছেলেরা কাজ পাবে। ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে অনেক কোম্পানি পেলাম, যেখানে সবাই বলছে, তারা ওয়েবসাইট তৈরিতে এক্সপার্ট এবং অনেক বড় বড় কোম্পানির কাজ তারা করেছে।

এই "অনেক" শব্দটির মানে কিন্তু অনেককিছুই হতে পারে। দুটি বা তার বেশি হলেও অনেক বলা যায়। সংখ্যার উল্লেখ নেই কেন? উদাহরণ থাকা প্রয়োজন। কয়েকজনকে ই-মেইল দিলাম। বুঝতেই পারছেন, কোনো উত্তর নেই। আর যাদের সাথে যোগাযোগ হলো, তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতেই পারলাম তারা কতটুকু প্রফেশনাল। তারপরে বাইরের এক জুনিয়রকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিলাম।


আমাদের আরো প্রফেশনাল হতে হবে

আমাদের আরো প্রফেশনাল হতে হবে। যারা বাইরে আছেন, বিভিন্ন আইটি কোম্পানিতে কাজ করছেন, তারা এই ক্ষেত্রে গাইড দেওয়ার কাজ করতে পারেন। কেননা, এরা জানেন বিশ্বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের কী করতে হবে।

আর আমাদের ছেলেমেয়েরা আইটির প্রযুক্তিগত দিকগুলো যতটা শিখছে, ম্যানেজমেন্টের জিনিসগুলো ততটা শিখছে না। যেমন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কিভাবে করতে হয়, প্লানিং কিভাবে করতে হয়, এই জিনিসগুলো আমাদের ছেলেমেয়েদের শেখা খুবই প্রয়োজন।


উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরামর্শ

যারা উঠতি বয়সের কিশোর-কিশোরী বাংলাদেশে বসে আছেন, হাতের কাছে ভাল রিসোর্স পাচ্ছেন না কিংবা দিকনির্দেশনা পাচ্ছেন না, তারা দুটি কাজ করতে পারেন।

প্রথমত: বাইরের প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগান

বাইরের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা আপনাদের গাইড করার জন্য হাত বাড়িয়ে আছেন। তাদের সাথে যোগাযোগ করে বুদ্ধিপরামর্শ নিতে পারেন। কিভাবে বিশ্বাজারের কাজ পাবেন সেই সম্পর্কে এরা সাহায্য করতে পারেন।

এমন কিছু সংস্থা হলো:

বাংলা আইটি উদারভাবে হাত বাড়িয়ে রয়েছে পরামর্শ দেওয়ার জন্য। এছাড়াও রয়েছে Bangladesh Association of Software & Information Services (BASIS)।

মেইলিং লিস্টে যোগ দিন

আর ই-মেইলে পরামর্শের জন্য কিছু মেইলিং লিস্টে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেব। এই সব মেইলিং লিস্টে অনেক প্রজেক্টের জন্য লোক খোঁজা হয়। এছাড়াও অনেক রিসোর্স পাবেন এই মেইলিং লিস্টগুলিতে, যা আপনার জীবনকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

মেইলিং লিস্ট:

এগুলিতে যোগ দেওয়ার জন্য উপরের ই-মেইলগুলিতে ই-মেইল করুন।

দ্বিতীয়ত: ওপেন সোর্স প্রজেক্টে অংশগ্রহণ করুন

আরেকটি সহজ উপায় হলো ওপেনসোর্সের কোনো প্রজেক্টে অংশ নিয়ে কিভাবে প্রজেক্ট হয়, কিভাবে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট হয় তা শিখতে পারেন।

ওপেনসোর্সের ক্ষেত্রে সব ধরনের রিসোর্স, ডকুমেন্ট ও প্রোগ্রামিংয়ের কোড উন্মুক্ত ও সহজেই পাওয়া যায়। তাই এভাবে শেখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

আপনি হয়তো সরাসরি কোড লিখতে পারছেন না, চিন্তা করবেন না। প্রথমে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন এরা কিভাবে কাজ করে। ওপেনসোর্সের ক্ষেত্রে আরেকটি সুবিধা হলো, আপনার যদি ভাল কোনো আইডিয়া থাকে, সেটা দিয়ে নিজেই শুরু করতে পারেন কোনো প্রজেক্ট। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখবেন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক বাঘা বাঘা প্রোগ্রামার আপনার প্রজেক্টে অংশ নিচ্ছেন।

এভাবে ওপেনসোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম ছড়াতে পারেন। আইটির জগতে কাজ পাওয়ার জন্য সবাই জানতে চাইবে আপনি কি করেছেন। "আপনি কি করতে পারবেন" তা নিয়ে কারো মাথাব্যথা নেই। আপনার আগের কাজগুলো দিয়েই আপনাকে নতুন কাজ যোগাড় করে নিতে হবে।

ওপেনসোর্সে যোগ দেওয়ার জন্য নিচের সাইটগুলি বেশ তথ্যবহুল:


বাংলাদেশ ওপেনসোর্স নেটওয়ার্ক

এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ওপেনসোর্সকে জনপ্রিয় করার জন্য সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ ওপেনসোর্স নেটওয়ার্ক, যাদের ওয়েবসাইট হলো http://www.bdosn.org/


সমাপনী

তাই বাংলাদেশের উদীয়মান কিশোর-কিশোরী, যারা তথ্য প্রযুক্তিতে কাজ করতে চায় তাদের আহ্বান জানাই, আসুন আমরা ওপেনসোর্স প্রজেক্টে অংশ নিয়ে নিজেদের আরো প্রফেশনালভাবে গড়ে তুলি।

একজন বাংলাদেশী হিসেবে কোনো ওপেনসোর্স প্রজেক্টে অংশ নিয়ে দেশ-বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম আরো বাড়াতে পারবেন আপনারাই। যখনই কোনো প্রজেক্টে আপনি ভাল কাজ করবেন তখনই দেশ-বিদেশ থেকে কাজের আহ্বান পাবেন।

প্রশ্ন তুলতে পারেন বিনামূল্যে কাজ করে কি পাবেন? পাবেন "অভিজ্ঞতা", যা বাংলাদেশের সীমিত পরিসরে পাবেন না। অর্থ দিয়ে যদি কোচিং সেন্টারগুলিতে শিখতে পারেন তবে, বিনামূল্যে এভাবে কাজ শেখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন?

বিশ্ব বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের অনেক দূর পথ চলতে হবে। অনেক কাজ করতে হবে। কোনো কাজ না করেই, ফাঁকা মাঠে বুলি ছড়িয়ে হয়তো রাজনীতিবিদ হওয়া যাবে। আইটিতে কোনো কাজ পাওয়া যাবে না।

আমার বিশ্বাস সামনে সুন্দর আইডিয়া নিয়ে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে আসবে।