ডিজিটাল ক্যামেরা কীভাবে কাজ করে
ড. মশিউর রহমানবিজ্ঞানী, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুর (NUS), সিঙ্গাপুর
যখন এই প্রবন্ধটি লিখতে বসেছি, তখন আমার দুই বছরের ছেলেটি ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে খটখট করে একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছে। ভাবলাম, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে হয়তো আমাদের বাবা-মায়েরা এমন দৃশ্য কল্পনাও করতে পারেননি।
এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল ক্যামেরা খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়। কোথাও বেড়াতে গেলে আমাদের হাতে ক্যামেরা থাকবেই, আর ক্যামেরা না থাকলেও হাতের মোবাইল ফোন দিয়েই চমৎকার ছবি তোলা যায়। ডিজিটাল ক্যামেরা এখন এতটাই সহজে ব্যবহারযোগ্য যে শিশুরাও অনায়াসে সুন্দর ছবি তুলতে পারে। কিন্তু কয়েক বছর আগেও এই দৃশ্য ছিল না—তখন আমাদের নির্ভর করতে হতো সাধারণ ফিল্মের ক্যামেরার ওপর, যেখানে একটি ফিল্মে সর্বসাকল্যে ২৪টি কিংবা ৩৬টি ছবি তোলা যেত। খুব সাবধানে ও প্রস্তুত হয়ে তবেই শাটারে চাপ দিতে হতো।
বর্তমানে ডিজিটাল ক্যামেরার কল্যাণে যত ইচ্ছা তত ছবি তোলায় কোনো বাধা নেই। এ ছাড়া অতীতের সাধারণ ক্যামেরায় ছবি তোলার পরপরই দেখা যেত না ছবিটি কেমন হয়েছে। তখন অপেক্ষা করতে হতো, ফিল্মটি কবে ডেভেলপ হবে এবং তারপর ছবি ওয়াশ বা প্রিন্ট করা পর্যন্ত। কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরায় যেহেতু ছবি তোলার সঙ্গে সঙ্গেই ক্যামেরাতেই তা দেখা যায়, তাই কোনো ছবি পছন্দ না হলে সঙ্গে সঙ্গেই আবার ছবি তোলা সম্ভব হয়।
ডিজিটাল ক্যামেরার প্রধান অংশ: সেন্সর
ডিজিটাল ক্যামেরার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো এর সেন্সর—যেখানে আলো এসে পড়লে তা বৈদ্যুতিক চার্জে রূপান্তরিত হয়। এই চার্জই পরে ছবির তথ্য হিসেবে মেমরি কার্ডে সংরক্ষিত হয়।
বর্তমানের ডিজিটাল ক্যামেরায় মূলত দুই ধরনের সেন্সর ব্যবহৃত হয়:
-
সিসিডি (CCD – Charge-Coupled Device)
-
সিমস (CMOS – Complementary Metal-Oxide Semiconductor)
সাধারণ ডিজিটাল ক্যামেরায় সিসিডি সেন্সর বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি দিয়ে বেশি ভালো ও নিখুঁত ছবি তোলা যায়। অন্যদিকে, সিকিউরিটি ক্যামেরায় সিমস সেন্সর বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি দিয়ে কম বিদ্যুৎ খরচে দীর্ঘক্ষণ ধরে ছবি ধারণ করা যায়।
ক্যামেরা কীভাবে রং বোঝে
সমস্যা হলো, আলোর এই সেন্সরগুলো নিজে থেকে কোনো রং বুঝতে পারে না—অর্থাৎ সিসিডি বা সিমস সেন্সর কেবল সাদা ও কালো বুঝতে পারে। কিন্তু ছবি তো আমরা রঙিন হিসেবেই চাই।
এই সমস্যা সমাধানের জন্য সেন্সরের ওপর লাল, সবুজ ও নীল রঙের ফিল্টার ব্যবহার করা হয়, এবং এই তিনটি রঙের তথ্য বিশ্লেষণ করেই ছবির প্রকৃত রং নির্ণয় করা হয়।
ছবির তথ্য সংরক্ষণ
ছবির লাল, সবুজ ও নীল রঙের তথ্যগুলোকে সংখ্যাগত মান দিয়ে ছবির ডিজিটাল তথ্যে রূপান্তর করা হয়। এই তথ্য ক্যামেরার সঙ্গে সংযুক্ত মেমরি কার্ডে সংরক্ষণ করা হয়। মেমরি কার্ডে ছবি সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধরনের ফাইল ফরম্যাট ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে JPEG ফরম্যাট সবচেয়ে বেশি প্রচলিত।
JPEG ফরম্যাটে সংরক্ষণ করলে ছবির তথ্য সংকুচিত (কমপ্রেসড) হয়ে সংরক্ষিত হয়, ফলে জায়গা কম লাগে। কিন্তু পেশাদার আলোকচিত্রীরা যখন ছবির সমস্ত তথ্য অবিকৃতভাবে রেখে দিতে চান, তখন তাঁরা RAW ফরম্যাট ব্যবহার করেন। এই ফরম্যাটে ছবির সম্পূর্ণ তথ্যই সংরক্ষিত থাকে বলে পরবর্তীতে ছবি এডিট বা প্রসেস করার সময় অনেক বেশি নমনীয়তা পাওয়া যায়—তবে এতে জায়গা অনেক বেশি লাগে।
এ ছাড়া ছবি তোলার সময় ছবির বিভিন্ন তথ্য—যেমন ছবির বর্ণনা, ক্যামেরার নাম, অ্যাপারচার ও শাটার স্পিডসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—Exif (Exchangeable Image File Format) নামের একটি বিশেষ ফরম্যাটে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। প্রায় সব ডিজিটাল ক্যামেরাতেই এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়।
ফিল্ম ক্যামেরা ও ডিজিটাল ক্যামেরার মূল পার্থক্য কী
অতীতের ফিল্মের ক্যামেরায় আলোক-সংবেদনশীল ফিল্ম ব্যবহৃত হতো। ফিল্মের ওপর আলো পড়লে তাতে থাকা আলোক-সংবেদনশীল রাসায়নিক কণিকাগুলো আলোর তথ্য ধরে রাখত। এই কারণেই ফিল্মগুলোকে অন্ধকার ঘরে বা আলো প্রবেশ করে না এমন কালো প্যাকেটে সংরক্ষণ করতে হতো।
বর্তমানের ডিজিটাল ক্যামেরার লেন্সের গঠন ও আলো গ্রহণের মূলনীতি অনেকটা একই রকম, তবে এখানে আলোক-সংবেদনশীল রাসায়নিক ফিল্মের বদলে ব্যবহৃত হয় সেমিকন্ডাক্টর সেন্সর। এই সেন্সর আলোর বিভিন্ন অবস্থানকে ইলেকট্রনিক সিগন্যালে রূপান্তরিত করে, যা পরে সংখ্যাগত তথ্যে বদলে মেমরি কার্ডে সংরক্ষিত হয়।
আধুনিক দেখতে হলেও ডিজিটাল ক্যামেরার মূল গঠন পুরোনো ফিল্ম ক্যামেরা থেকে খুব একটা আলাদা নয়—লেন্সের মধ্য দিয়ে আলো এসে সেন্সরের ওপর কেন্দ্রীভূত হয়, শুধু আলোকে ধরে রাখার মাধ্যমটাই পাল্টে গেছে।
অটোফোকাস কীভাবে কাজ করে
সাধারণ ফিল্মের ক্যামেরার তুলনায় ডিজিটাল ক্যামেরার আরেকটি বড় সুবিধা হলো এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবির ফোকাস ঠিক করতে পারে। অতীতের এনালগ ফিল্ম ক্যামেরায় ছবি তোলার সময় লেন্স ঘুরিয়ে হাতে ফোকাস করতে হতো, কিন্তু ডিজিটাল ক্যামেরায় সেই ঝামেলা নেই—ইচ্ছেমতো যেকোনো কিছুর ছবি তুলতে চাইলে সেদিকে তাক করে শাটারে চাপ দিলেই ক্যামেরা নিজে থেকে দূরত্ব নির্ণয় করে লেন্স সঠিকভাবে সমন্বয় করে নেয়।
অটোফোকাস মূলত দুই ধরনের হয়ে থাকে:
-
অ্যাক্টিভ অটোফোকাস: ক্যামেরা থেকে একধরনের ইনফ্রারেড (লাল) সিগন্যাল বেরিয়ে বস্তুতে গিয়ে প্রতিফলিত হয়ে ফিরে আসে। এই সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে ক্যামেরা বস্তুর দূরত্ব নির্ণয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফোকাস ঠিক করে।
-
প্যাসিভ অটোফোকাস: এখানে ক্যামেরা ছবির বিভিন্ন অংশ পর্যবেক্ষণ করে এবং কনট্রাস্ট বা তীক্ষ্ণতা বিশ্লেষণ করে সবচেয়ে স্পষ্ট বিন্দুটি খুঁজে বের করে ফোকাস নির্ধারণ করে।
এ ছাড়া কিছু সাধারণ ক্যামেরায়—বিশেষ করে মোবাইল ফোনের ক্যামেরায়—একটি স্থায়ী ও স্থির লেন্স ব্যবহার করা হয়, যাকে বলা হয় ফিক্সড ফোকাস ক্যামেরা। এই ধরনের ক্যামেরায় ফোকাসের কোনো ঝামেলা নেই এবং তা মোটামুটি সবকিছুরই মোটামুটি স্পষ্ট ছবি তুলতে পারে। তবে সমস্যা হলো, এই ধরনের ক্যামেরা দিয়ে খুব কাছ থেকে ছবি তোলা সম্ভব হয় না।
পিক্সেল কী
ডিজিটাল ক্যামেরার কর্মক্ষমতা বোঝানোর জন্য পিক্সেল এককটি ব্যবহার করা হয়। ১ মেগাপিক্সেল বলতে বোঝায় একটি ক্যামেরার সেন্সরে মোট ১০ লাখ (১০ লক্ষ) আলোক-সংবেদনশীল বিন্দু বা সেল রয়েছে। বর্তমানে বাজারে ১২ থেকে ১৬ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা সহজলভ্য। ডিজিটাল ক্যামেরা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে আরও কম দামে, আরও স্পষ্ট ও বেশি পিক্সেলের ক্যামেরা বাজারে আনতে। এই প্রতিযোগিতার কারণেই ডিজিটাল ক্যামেরার দাম ক্রমশ কমছে এবং নতুন নতুন প্রযুক্তি সংযুক্ত হচ্ছে।
বাজার ও ইতিহাস
ডিজিটাল ক্যামেরা প্রযুক্তি অত্যাধুনিক হলেও এর মূল গঠন পুরোনো ক্যামেরা থেকে খুব একটা পরিবর্তিত হয়নি—বরং প্রযুক্তি এগিয়েছে সেন্সর, প্রসেসর ও তথ্য সংরক্ষণের দিক দিয়ে। বর্তমানে ডিজিটাল ক্যামেরায় কম্পিউটারের মতো শক্তিশালী মাইক্রোপ্রসেসর থাকে, যা ছবিকে আরও সুন্দরভাবে বিশ্লেষণ করে ছবির বিভিন্ন অংশের ওপর নির্ভুলভাবে ফোকাস করতে সাহায্য করে।
প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার কারণে ডিজিটাল ক্যামেরার আকার ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে, এবং এখন বেশিরভাগ মোবাইল ফোনেই ডিজিটাল ক্যামেরা যুক্ত থাকে।
১৯৮৮ সালে ফুজিফিল্ম প্রথম বাণিজ্যিক ডিজিটাল ক্যামেরা বাজারে নিয়ে আসে। প্রথম দিকে তারা পুরো ডিজিটাল ক্যামেরার বাজারের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছিল, কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ক্যামেরার বাজারে প্রবেশ করে। এর প্রায় এক দশক পর ফুজিফিল্ম ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) ছবি তোলার বিশেষ ক্যামেরা বাজারে আনে, যা তখন বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। (এই প্রবন্ধের মূল কপি থেকে সাল দুটি স্পষ্টভাবে উদ্ধার করা যায়নি বলে নির্দিষ্ট বছর উল্লেখ করা হলো না।)
ত্রিমাত্রিক ছবিতে একটি দৃশ্যের গভীরতা বোঝা সম্ভব হয়—তবে এই ধরনের ছবি দেখার জন্য বিশেষ ধরনের থ্রিডি টিভি বা চশমার প্রয়োজন হয়।
ভবিষ্যতে কী আসছে
ভবিষ্যতে আমরা আশা করছি, বর্তমানের দামি ও পেশাদার ডিজিটাল ক্যামেরাগুলোর দাম আরও কমবে এবং এর আকার আরও ছোট হবে। এ ছাড়া থ্রিডি বা ত্রিমাত্রিক ছবি তোলার প্রযুক্তি নিয়ে জোরেশোরে গবেষণা চলছে। বাজারে খুব শিগগিরই আরও অনেক থ্রিডি ডিজিটাল ক্যামেরা আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে আমরা আরও নিখুঁত ও প্রাণবন্ত ছবি তুলতে পারব।
লেখক ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে (NUS) বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত।
টেকনলজি টু ডে, নভেম্বর ২০১১