মশিউরের খেরোখাতা

ডিজিটাল বাংলাদেশ ও নিরাপত্তা (টেন্ডারের ইমেইল ঠিকানা নিরাপদ কি?)

ড. মশিউর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

সম্পাদক, biggani.org

২০০৯ থেকে বাংলাদেশের জনগন "ডিজিটাল" শব্দটির সাথে নতুন ভাবে পরিচিত হয়েছে। পূর্বে ডিজিটাল শব্দটি শুধুমাত্র প্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে তা সরকারের আফিস আদালত থেকে শুরু করে রাজনীতির মাঠেও ব্যবহৃত হচ্ছে। সরকার তার বিভিন্ন অবকাঠামোগুলিকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যেমে উন্নয়নের চেষ্টা করছে এবং তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর অনেক প্রকল্প বর্তমানে চলছে। যখন বাংলাদেশের বিভিন্ন সেক্টরগুলিকে ডিজিটালে রূপান্তর করার জন্য চেষ্টা চলছে তখন এর বিপদজনক দিক- বিশেষ করে "নিরাপত্তা" (security) এর বিপদজনক দিকগুলো তুলে ধরার জন্য আজকের এই প্রবন্ধের অবতারণা। নিরাপত্তা যে শুধুমাত্র ভবিষ্যতের সমস্যা বর্তমানে নয়, তা একেবারেই ভ্রান্ত ধারণা। বর্তমানেই আমাদের বিভিন্ন ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন এবং তারই কিছু উদাহরণ আপনাদের কাছে তুলে ধরব।

যে সমস্ত জিনিস আমরা চোখেই দেখতে পারি তার নিরাপত্তা আমরা খুব সহজেই নিতে পারি। আর তার গুরুত্ব যদি খুব বেশি হয়ে থাকে, কিংবা তিনি যদি ভিআইপি হয়ে থাকেন, সেক্ষেত্রে আমরা নিরাপত্তার ব্যবস্থা একটু বাড়াবাড়ি রকমেরই করে থাকি। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারগুলি যেহেতু সরাসরি চোখে দেখা যায়না, সেগুলো কম্পিউটারেরর হার্ড ডিস্কে কিংবা ইন্টারনেটেই থাকে, তাই এর নিরাপত্তা গ্রহণে আমরা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ব্যার্থ হই। অন্তত আমাদের সরকারের তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলো সেইক্ষেত্রে একেবারেই উদাসিন।

তথ্যপ্রযুক্তি এর নিরাপত্তা কি?

তথ্যকে অনাকাঙ্খিত কারো কাছ থেকে সুরক্ষা করাই তথ্যপ্রযুক্তির নিরাপত্তার কাজ। নিম্নে ডিজিটাল পদ্ধতির সমস্যাগুলি আলোকপাত করা হল।

১. দ্রুত কপি করা সম্ভব:

তথ্যপ্রযুক্তিতে তথ্যকে বাইনারিতে সংরক্ষিত করা হয় তাই খুব সহজেই অনেক বড় তথ্যভান্ডারকে খুব দ্রুত গতিতে কপি করা সম্ভব। উদাহরণ হল, আপনাকে যদি বলি সাধারণ ফটোকপি মেশিন দিয়ে শাহাবাগের পাবলিক লাইব্রেরীর সমস্ত বইগুলি ফটোকপি করতে হবে, তবে এই কাজটি করতে আমাদের মাসখানেক লেগে যাবে আবার সেই সাথে বিশাল জনবলের প্রয়োজন হবে। কিন্তু অপরদিকে যদি এই লাইব্রেরীটি ডিজিটাল আকারে থাকে তবে এই কাজটি করতে কয়েক সেকেন্ড থেকে শুরু করে কয়েক মিনিট পর্যন্ত লাগতে পারে, আর কোন জনবলেরই প্রয়োজন হবেনা।

২. দূর থেকে একসেস:

সাধারণ জিনিসপত্র চুরি করতে হলে চোরকে সেই জায়গাতে তাকে উপস্থিত হতে হবে কিন্তু ইন্টারনেটের কল্যানে আমাদের কম্পিউটারগুলো নেটওয়ার্কে সংযুক্ত থাকার ফলে ডিজিটাল তথ্য চুরি করার জন্য সেই জায়গাতে উপস্থিত থাকার কোন প্রয়োজন নেই। কম্পিউটারগুলি ইন্টারনেট প্রোটকল নামে একটি পদ্ধতিতে একে উপরের সাথে সংযুক্ত থাকে। আর এরই কল্যাণে আমরা ঢাকাতে বসেই আমেরিকায় অবস্থিত কোন কম্পিউটারে সাথে সংযুক্ত হতে পারি।

৩. ভাইরাস ও স্পাইওয়্যার:

আপনি আপনার কম্পিউটারে কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রেখেছে এবং যথেস্ট সাবধনতা অবলম্বন করেছেন তারপরেও আপনার কম্পিউটার নিরাপদ নাও হতে পারে। কেননা আপনার অজান্তেই হয়তোবা কোন ভাইরাস কিংবা স্পাইওয়্যার লুকিয়ে আছে। এইগুলি আপনাকে না জানিয়েই আপনার কোন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাঠিয়ে দিতে পারে অন্য কোন কোথাও। তাই সাধারণত এইগুলো থেকে রক্ষা পাবার জন্য আমাদের এন্টিভাইরাস এবং সিকিউরিটির সফটওয়্যার ব্যবহার করতে হয়।

কম্পিউটার বা ডিজিটাল তথ্যভান্ডারকে এই সমস্ত সমস্যা থেকে রক্ষা করার জন্য বিভিন্ন লেয়ারে সিকিউরিটি সিস্টেম রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল সেই সিকিউটি পদ্ধতিগুলি নিয়ে আমাদের সচেতন থাকার প্রয়োজন, নতুবা আমরা যে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি বা যে দিকে এগুচ্ছি তা ব্যার্থ হয়ে যেতে পারে। নিম্নে তেমনই কিছু উদাহরণ দিব যেগুলির দিকে আমাদের সরকারকে খুব শীঘ্রই গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে দেখা প্রয়োজন।

টেন্ডার ও নিরাপত্তা:

গতবছর থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচী শুরু হবার পরে আমাদের গতানুগতিক টেন্ডার সিস্টেমটিকে ডিজিটাল করবার প্রয়াস ও উদ্দ্যোগ বর্তমান সরকার নিয়েছেন। কিন্তু সেরকম কোন পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম আমাদের সামনে দেখা না দিলেও  কিছূ কিছু প্রতিষ্ঠান ইমেইলের মাধ্যমে টেন্ডার জমা নিচ্ছে। এইখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন সাধারন ইমেইলের মাধ্যমে জমা নেওয়ার পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। আর তারপরেও ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার হচ্ছে সাধারণ Yahoo, Gmail এর মত ফ্রি ওয়েবভিত্তিক ইমেইল ঠিকানায়। আর এটি মারাত্মক বিপদজনক অবস্থা! এই সমস্ত ইমেইল ঠিকানায় তথ্যগুলি জমা হচ্ছে বাংলাদেশে নয়, বেশীরভাগ ক্ষেত্রে আমেরিকায়। সাধারণ ছোটখাট টেন্ডার হলে আমি উচ্চবাচ্য করতামনা। কিন্তু সমস্যা হল এমন কিছু টেন্ডারের ক্ষেত্রেও এই সমস্ত সাধারণ অনিরাপদ ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার হচ্ছে যেটি সরকারের পলিসিগত খুবই বড় বড় টেন্ডার। শুধুমাত্র ডিসেম্বর ২০০৯ এর পত্রপত্রিকাতে প্রকাশিত  কিছু টেন্ডারের উদারহণ দেয়া হল:

প্রতিষ্ঠানের নাম তারিখ ইমেইল ঠিকানা
Padma Multi-purpose Bridge Project 8 Dec 2009 engr_rafiqul_rhd@yahoo.com
Privatization Commission 9 Dec 2009 pb@bdonline.com
Ministry of Fisheries & Livestock 10Dec 2009 natpdof@yahoo.com
Ministry of Information 21 Dec 2009 bfarchive@yahoo.com
Rural Electrification Board 27 Dec 2009 reborocure@yahoo.com
University Grants Commission 23 Dec 2009 pd_heqep@yahoo.com

কোন ইমেইল ব্যবহার করব এবং কিভাবে নিরাপদ করব?

এই সমস্ত সমস্যা থেকে নিরাপদ থাকার প্রথম উপায় হল কম্পিউটারের নিরাপত্তার ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া। অফিসিয়াল কাজের জন্য অফিসের ইমেইল ব্যবহার করা প্রয়োজন, যেটি সেই প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তত্ত্বাবধানে রয়েছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের নিজস্ব ওয়েবসাইট রয়েছে যার ঠিকানা হল, www.pc.gov.bd । সুতরাং তারা যদি তাদের কোন ইমেইল যেমন info@pc.gov.bd ব্যবহার করতো তবে সেটি বেশী নিরাপদ হত। প্রাইভেটাইজেশন কমিশন তার নিজের কোন ইমেইল ঠিকানা ব্যবহার না করে bdonline এর ইমেইল সিস্টেম ব্যবহার করেছে যা একটি ইন্টারনেট সংযোগ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের সিস্টেম ম্যানেজমেন্টের লোকজন ইচ্ছে করলেই pb@bdonline.com ইমেইল ঠিকানার তথ্যগুলি দেখতে পারবে, কেননা সেটি তাদের তত্ত্বাববধানে রয়েছে।  bdonline এর লোকজনের পক্ষে খুব সহজেই বলে দেয়া সম্ভব কারা কারা সেই টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে। চিন্তা করে দেখুন কিরকম ভয়ংকর ধরনের ভুল আমরা করছি। টেন্ডার যেহেতু সরকারের অর্থনীতি বিষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাই এটি আমেরিকার কোন ফ্রি ইমেইল কিংবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার করা উচিত নয়।

এই প্রবন্ধটি যখন সমাপ্ত করতে যাচ্ছি তখন আজকের পত্রিকা, ২০ জানুয়ারী ২০১০ এর জনকন্ঠে দেখলাম সয়ং সেনাসদর একটি দরপত্রের আহবান করেছেন যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে wksdte@yahoo.com । এই দরপত্রের ব্যাপারে অন্যকেউ কতটুকু জানুক কিংবা না জানুক, Yahoo ইচ্ছে করছে সব জানতে পারবে। এছাড়া আরো ভয়ংকর যে এই সমস্ত ওয়েবভিত্তিক ইমেইলগুলো বেশীরভাগ সময়ই নিরাপদ নয় কেননা এইগুলো Cookie নামে একটি পদ্ধতি ব্যবহার করে, যা ব্যবহার করে অন্য কেউ আপনার ইমেইল পড়ে ফেলতে পারে। বিস্তারিত এর জন্য পড়ুন privacy.yahoo.com

মাল্টি লেভেল সিকিউরিটি:

পেশাগত কারণে সরকারের অনেক প্রতিষ্ঠানের সাথেই কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কম্পিউটারগুলো দেখাশোনা করার জন্য সেসব বিভাগে কম্পিউটার অপারেটর বা IT টিম রয়েছে। সবথেকে ভয়ংকর ব্যাপার হলো আমাদের সরকারী কম্পিউটারের সিকিউরিটি বা পাসওয়ার্ডগুলি রয়েছে এই IT টিমের। উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজেও জানেন না, তার পাসওয়ার্ডটি কি! উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অনেক সময়ই কম্পিউটার অপারেট বা ইমেইল ব্যবহার করতে জানেন না। ম্যানেজমেন্টের খাতিরে কোন তথ্য নিম্ন কর্মচারীদের একসেস না থাকার কথা থাকলেও IT টিমের কল্যানে তথ্যগুলি অন্যকেউ জেনে যেতে পারে, যা কাম্য নয়। আমাদের সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলি নিরাপদ করার জন্য অনেকগুলি লেভেলে বা স্তরে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। যেমন গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল শুধুমাত্র top layer এর লোকজন দেখতে পারবে। স্পর্শকাতর তথ্যগুলি দেখার জন্য top layer বা ম্যানেজমেন্টের অনুমতি নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে ID card, finger print ডিভাইসগুলি ভূমিকা রাখতে পারে।

সরকারী প্রতিষ্ঠানের ব্যবহৃত সফটওয়্যার ও অপেনসোর্স:

গতবছরে ডিজিটাল বাংলাদেশে স্লোগান হলেও পূর্বেও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। সমস্যা হলো যে সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো এই সিস্টেমগুলো তৈরী করেছে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাঁরা সোর্সকোডগুলি সরকারকে দেয়নি বা কিংবা সরকারও কোন প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সফটওয়্যারগুলির নিরাপত্তা যাচাই করে নেয়নি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা জানিনা সেই সিস্টেমগুলি আসলেই কিভাবে কাজ করছে। এমনও হতে পারে সেই সফটওয়্যারগুলিতে নিরাপত্তার ব্যাপারগুলি দেখায় হয়নি, কিংবা আমাদের অজান্তে তা অন্যকোথাও তথ্য পাঠাচ্ছে (আশা করছি তেমনি হবে না)। কিন্তু যদি সিস্টেমগুলি অপেন সোর্স বা কোডগুলি উন্মুক্ত থাকতো তবে আমরা এই অসুবিধা হতে রক্ষা পেতে পারতাম। নিদেনপক্ষে অন্য কোন প্রতিষ্ঠানগুলি দিয়ে সরকারের ব্যবহৃত সোর্সকোডগুলি পর্যবেক্ষণ করে দেখা প্রয়োজন সেগুলো নিরাপদ কিনা।

সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের তথ্যসমূহ যেহেতু ডিজিটাল করার যে উদ্দ্যোগ নিচ্ছে, তাকে আমরা সাধুবাদ জানাই। কোন সন্দেহ নেই যে, এর ফলশ্রুতিতে আমরা বিভিন্ন ধরনের নাগরিক সুবিধা দ্রুত পাব। কিন্তু সেই সাথে ডিজিটাল পদ্ধতি হলে নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের অনেক সচেতন হবার প্রয়োজন। ডিজিটাল পদ্ধতির নিরাপত্তা ঠিকমত গ্রহণ না করা হলে, ভবিষ্যতে কোন ভুল ধরে পড়ে স্ক্যান্ডাল হলে আমাদের সরকারের এই উদ্দ্যোগ ব্যার্থ হবে। বিশেষ করে আমি ভয় পাচ্ছি, আমাদের সমাজের অশিক্ষিত অংশ যারা এই প্রযুক্তিগুলি বোঝেনা, ভবিষ্যতে এই ডিজিটাল পদ্ধতির উপর তাঁরা আস্থা হারাবে।

বসুন্ধরা, ঢাকা

২০ জানুয়ারী ২০১০