মশিউরের খেরোখাতা

ন্যানো-মেডিসিন: চিকিৎসাক্ষেত্রে ন্যানোপ্রযুক্তির প্রয়োগ

তারিখ: ডিসেম্বর ২০১১

৯০ এর শতকে ন্যানোপ্রযুক্তি তার যাত্রা শুরু করার পরে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিটিকে ব্যবহার করা শুরু করেন। ন্যানোমিটার হল দৈর্ঘ্য মাপার একটি একক। এক মিটারের ১,০০০,০০০,০০০ (নয়টি শূন্য) বা ১০০ কোটি ভাগের এক ভাগকে এক ন্যানোমিটার বলা হয়। ন্যানোপ্রযুক্তি মূলত ন্যানোমিটার স্কেলের প্রযুক্তি। ১৯৯৬ এর দিকে যে ন্যানোপ্রযুক্তি যাত্রা শুরু করে তার পরে তা বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা শুরু করে।

ন্যানো-মেডিসিন কি? ন্যানোপ্রযুক্তি বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার হলেও বেশি গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে চিকিৎসাক্ষেত্রে। চিকিৎসাক্ষেত্রে ন্যানোপ্রযুক্তির ব্যবহার করাকে ন্যানো-মেডিসিন নামে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ন্যানো-মেডিসিন শব্দটির সাথে আমরা পরিচিত হওয়া শুরু করি ২০০৫ সনের দিকে। তখন দেখা যায় যে ন্যানোপ্রযুক্তি ঔষধ তৈরিতে, রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা শুরু হচ্ছে। এরপরে বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে একত্রিত হয়ে কাজ করা শুরু করেন। প্রাচ্যের দেশগুলিতে ন্যানো-মেডিসিন সংক্রান্ত গবেষণা পত্রিকা ও কনফারেন্স আয়োজিত হওয়া শুরু করে। প্রতিবছরই এই ন্যানো-মেডিসিন এর প্রয়োগের ক্ষেত্রটি বড় হচ্ছে। ২০০৫ সনের দিকে দেখা যায় ২০০ টি কোম্পানি ও ৩৮ টি বাণিজ্যিক পণ্য রয়েছে যা ন্যানো-মেডিসিন কে ব্যবহার করেছে।

কিভাবে শুরু হল ন্যানো-মেডিসিন: আমাদের চারপাশের যে জীবজগত রয়েছে তার সবকিছুই ন্যানোমিটারের মত ক্ষুদ্র। ডিএনএ থেকে শুরু করে, জীব কোষ, রোগ জীবাণু এমনকি আমাদের শরীরের সব কিছুই এই ন্যানোমিটার স্কেলে খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ দিয়ে তৈরি। ন্যানো-মেডিসিনের কল্যাণে জীবজগত এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে কাজ করা প্রযুক্তিবিদগণ একটু নতুন মাত্রায় তাদের কাজ শুরু করলেন। এইদিন পর্যন্ত জীবজগতের অনেক কাজই এই ক্ষুদ্র আকারে না জেনেই করা হয়েছে। প্রযুক্তিবিদগণ সরাসরি এই ক্ষুদ্র আকারের অংশগুলিকে না দেখেই কাজ করে এসেছেন। কিন্তু ন্যানোপ্রযুক্তির কল্যাণে সেই জীব জগতের ক্ষুদ্র অংশগুলিকে দেখার এবং সরাসরি কাজ করার সম্ভব হল। ন্যানোপ্রযুক্তির কল্যাণে জীব জগতের ও চিকিৎসাক্ষেত্রের বিজ্ঞানীরা তাদের অজানা জগতকে আরও ভালোমতো বুঝতে সক্ষম হলেন। আর এর ফলেই ন্যানো-মেডিসিন নামে একটি নতুন ক্ষেত্র তার যাত্রা শুরু করলো।

ন্যানো-মেডিসিনের প্রয়োগের কিছু উদাহরণ নিম্নে দেয়া হল:

ক্যান্সারের ক্ষেত্রে: ক্যান্সার (কর্কট রোগ) হল আমাদের কোষগুলির অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি রোধ করার জন্য ও ক্যান্সার নিরাময় করার জন্য আমাদের সনাতন যে সমস্ত পদ্ধতি রয়েছে তা শুধুমাত্র শরীরের ক্যান্সার দ্বারা আক্রান্ত খারাপ কোষগুলিকেই ধ্বংস করে তাই নয়, সেই সাথে ভালো কোষগুলিকেও মেরে ফেলে। কিন্তু ন্যানো-মেডিসিন পদ্ধতি দিয়ে বিজ্ঞানীরা এখন বিভিন্ন পদ্ধতি আবিষ্কার করতে সক্ষম হচ্ছে যার ফলে শুধু মাত্র ক্যান্সারের কোষগুলিকেই মারা সম্ভব হবে। ন্যানো-মেডিসিন যেহেতু অণু পরমাণু আকারে কাজ করে তাই ক্যান্সারে নিরাময়ে এটি বেশী ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হয়।

ব্যথা-বিহীন ইনজেকশন: ছেলেবেলায় নিশ্চয় মনে আছে ইনজেকশনের কথা শুনলে কিরকম ভয়ে দৌড় দিয়ে পালাতেন। এখনকার শিশুদের আর সেই ভয় দেখাতে পারবেনা, কেননা ন্যানো-মেডিসিনের প্রয়োগের ফলে ব্যথা মুক্ত ইনজেকশন তৈরি হচ্ছে। কিভাবে ব্যথা না দিয়েও ইনজেকশন দেয়া সম্ভব? আমাকের কোষগুলির উপরিভাগে যে অসংখ্য স্নায়ু থাকে। এই স্নায়ুগুলি ইনজেকশন দেবার সময় সংবেদনশীল হল এবং ব্যথার বার্তা আমাদের মস্তিষ্কে পৌঁছে দেয়। ন্যানো-মেডিসিন প্রযুক্তিতে এমন ইনজেকশন তৈরি করা হচ্ছে যার সূচগুলি খুবই ক্ষুদ্র। ন্যানো আকারের ক্ষুদ্র হবার কারণে তা স্নায়ুগুলি থেকেও ক্ষুদ্র। অর্থাৎ স্নায়ুগুলি জানতে পারেনা ইনজেকশনের সূচের অস্তিত্ব। এই স্নায়ুগুলিকে আঘাত না করেও ইনজেকশন দেয়া সম্ভব হয়। শুধু ব্যথা-বিহীন তাইনা, এই ইনজেকশনের মাধ্যমে সুচ ঘটিত অন্যান্য রোগ হবার সম্ভাবনা কম। এই প্রযুক্তিকে বলা হচ্ছে non-invasive drug delivery technology।

ন্যানো-মেডিসিনের প্রয়োগ: ব্যথা মুক্ত ইনজেকশন

ঔষধ প্রয়োগ বা Drug delivery: আমরা যে ঔষধ গ্রহণ করি তা সহজে টার্গেট কোষগুলির কাছে পৌঁছানই হল এই পদ্ধতি। ন্যানোপ্রযুক্তির ফলে বিভিন্ন ধরণের ন্যানো আকারের কণিকা তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে যা ন্যানোপার্টিকেল (Nanoparticles) বলে। এই নতুন ন্যানোপার্টিকেল দিয়ে নতুন ঔষধ তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে যা দিয়ে এতদিন সম্ভব হয়ে উঠেনি। মজার ব্যাপার হল এই ন্যানোপার্টিকেলগুলি নতুন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা আমাদের সনাতন উপকরণে এতদিন দেখা যায়নি। যে সমস্ত রোগগুলির ঔষধগুলি এতদিন তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠেনি, তাও এই ন্যানোপার্টিকেল দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হয়ে উঠছে। বর্তমানে লক্ষাধিক ন্যানোপার্টিকেল আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ঔষধ তৈরির ক্ষেত্রে এই সমস্ত নতুন উপাদান ব্যবহার করে আরও ভালো কার্যকর ঔষধ তৈরি করা সম্ভব হবে।

কিছু ন্যানোপার্টিকেল এর ছবি

নিউরো-ইলেকট্রনিক ইন্টারফেস: আমাদের শরীরের নিউরন বা স্নায়ুগুলি বিভিন্ন পদ্ধতিতে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। এই যোগাযোগ ব্যবস্থার বিপর্যয় ঘটলে অনেক ধরনের স্নায়ুবিক রোগ থেকে শুরু করে প্যারালাইসিস বা পক্ষাঘাত হয়ে যায়। ন্যানো-মেডিসিন এর মাধ্যমে কোষের এই যোগাযোগ ব্যবস্থাকে বুঝা যাবে এবং এই সংক্রান্ত রোগগুলি নিরাময় করা যাবে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃত্রিম চোখ, কান তৈরি করা সম্ভব হবে।

উল্লেখ্য যে এই লেখকের গবেষণার বিষয় হল ন্যানোপ্রযুক্তি নিয়ে। বর্তমানে আমরা ন্যানো-মেডিসিনের নিউরো-ইলেকট্রনিক ইন্টারফেস প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছি। আমরা যখন এই সংক্রান্ত কাজ শুরু করলাম, তখন দেখা গেল কাজটি যতটা সহজ হবে ভাবা হয়েছিল ততটি নয়। কেননা প্রকৃতি জগতের সব কিছুর সাথে ন্যানোপ্রযুক্তি সহজে প্রয়োগ করা যায়না। একটি উদাহরণ দেয়া যাক, একটু আগে যে ইন্টারফেস এর কথা বললাম। আমাদের জাপানের ল্যাবে সেইরকম একটি ডিভাইস তৈরির কাজ আমরা শুরু করলাম যেটি দিয়ে সাধারণ কোষদের মধ্যের যোগাযোগের সিগনালগুলি আমরা ন্যানোপ্রযুক্তির ডিভাইস দিয়ে পড়তে বা বুঝতে পারবো। কিন্তু কিছুদিন কাজ করার পরে বুঝতে পারলাম যে আমরা যে যন্ত্রটি বা ডিভাইসটি তৈরি করলাম তার উপর কোষ বা জৈবিক পদার্থগুলি সহজে সংযুক্ত হচ্ছেনা কিংবা মরে যাচ্ছে। পরে অনেক গবেষণার পরে আমরা তার সমাধান করতে পারলাম এবং কোষগুলির সিগনাল পড়তে পারলাম।

লেখকের তৈরি করা যন্ত্র দিয়ে কোষের সিগনাল পড়া সম্ভব হচ্ছে

ন্যানো-মেডিসিন ক্ষেত্রগুলির সবথেকে চ্যালেঞ্জ হল এখনও এর অনেক কিছুই আমরা জানিনা। এই অজানা ক্ষেত্রগুলি সহজে বুঝার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রের বৈজ্ঞানিকদের এক সাথে কাজ করা শুরু করতে হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞানীদের সাথে চিকিৎসক থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তির লোকজনকে নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। ন্যানো-মেডিসিনের কল্যাণে চিকিৎসা বিজ্ঞান আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে মানুষ রোগ-জরাকে জয় করতে পারবে।

ফিডব্যাক: mashiur.rahman@gmail.com