মশিউরের খেরোখাতা

আমরা কি নিজেদের গন্ডী ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে পারি না?

প্রবাসে আপনি অনেক বাঙালীকেই পাবেন যারা “ব্যবসা” শুরুর কথা ভাবলে প্রথমেই চিন্তা করেন দেশী একটি দোকান দেবার কথা। লাভ হবে কি ক্ষতি হবে তা না চিন্তা করেই ব্যবসাতে নেমে পড়েন। আমাদের চিন্তার দৌড় মনে হয় এই মুদির দোকান দেবার মত। শুধু মাত্র প্রবাসেই নয় বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতেও আমি একই দৌন্যতা দেখতে পাচ্ছি। প্রথমে সবাই শুরু করছে নিজেদের ওয়েবসাইট তৈরীতে। এত রঙ-চঙ মিলিয়ে ওয়েবসাইট তৈরী করেন যে মনে হয় তাঁদের রঙ নিয়ে কান্ডজ্ঞান কিচ্ছু নেই। তাদেরকে অনুরোধ করব Jim Krause এর Color Index বইটি পাশে রাখতে। এরপরে তাঁরা কিছুদিন পরে দেশী আড্ডা, বন্ধু, মিলনমেলা ইত্যাদি নিয়ে কমিউনিটি ভিত্তিক ওয়েবসাইট তৈরীতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আমরা এই দৌনতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছিনা। আমি অনেক ভাল ভাল প্রযুক্তিবিদকে জানি, যাদের ইর্ষা করার মত দক্ষতা রয়েছে। তাঁরাও যখন দেখি শেষ পর্যন্ত এইরকম আড্ডাখানা তৈরী করতেই সময়গুলি নষ্ট করেন তখন একটু আফসোস হয় বৈকি। আর এই সমস্ত সাইটগুলি কিছুদিন পরে হারিয়ে যায়। হয়তো সম্পাদক আর আগের মত উৎসাহ পাননা, নতুবা অর্থের অভাবে ডমেইনটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়ে যায়।

আমাদের এই দৌনতা থেকে বেরিয়ে আরো বড় কিছু চিন্তা করা উচিত। আমাদেরকে আমাদের প্রোফেশনাল কাজ দিয়েই দেশের ও দশের সেবা করা উচিত। নিউইয়র্কে এক বাঙালী আছেন যিনি পেশায় একজন ডাক্তার অথচ বাংলাদেশী মহলে তিনি পরিচিত কোন এক সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে। এই যে তিনি তাঁর মূল্যবান সময়গুলি এইখানে ব্যয় করছেন, সেই সময়টি তিনি যদি বাংলাদেশকে তাঁর পেশাগত কাজ দিয়েই কিছু দেবার চেষ্টা করতেন, তবেই আমারা বেশী উপকৃত হতাম, যেমনটি করেছেন ড.আবুল হুস্সাম (http://biggani.com/content/view/418/125/)। তিনি যদি তাঁর গবেষনা দিয়ে সনো ফিল্টার আবিষ্কার না করে কোন সংগঠনের সভাপতি বা অন্যকিছু হয়ে সেবা করার চেষ্টা করতেন, তবে বাংলাদেশ অনেক কিছুই থেকেই বঞ্চিত হত।

তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা বলব। যারা তথ্যপ্রযুক্তিতে ভাল তারা এই রকম “দেশী” সংস্কৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক ভাবে বড় কিছু করার চেষ্টা করতে পারেন, যেমনটি করেছেন vmukti এর প্রতিষ্ঠাতা Hardik Sanghvi (http://www.vmukti.com)। তাঁরা চমৎকার একটি ভিডিও সিস্টেম তৈরী করছেন, যেটি দিয়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্স করা যাবে। কিছুদিন আগে এটি ছিল অপেনসোর্স কমিউনিটিতে সবথেকে বেশী সক্রিয় একটি প্রোজেক্ট। হার্দি যে কাজটি করেছেন তা হলে আমাদের পাশের দেশ ভারতের কোন এক শহরে বসে কিছু প্রযুক্তিবীদরা মিলে একটি সুন্দর ভিডিও কনফারেন্স সিস্টেম তৈরী করার গঠনমূলক একটি আইডিয়া নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাদের সাথে যোগ দিলেন সারা বিশ্বের নামকরা অনেক প্রোগ্রামরা। সবাই তাঁদের সিস্টেমটি উন্নত করবার জন্য প্রযুক্তিগত পরামর্শ দিলেন একদম বিনামূল্যে। অর্থাৎ ভারতে বসেই হার্দি পেলেন বাঘা বাঘা প্রোগ্রামদের এবং এই জন্য তাঁর ব্যায় হল “০” টাকা।

হার্দি যেভাবে তথ্যপ্রযুক্তি দিয়ে সারা বিশ্বকে সেবা করার কথা ভেবেছেন, সেইরকম কিছু করার শিক্ষা আমরা পেতে পারিনা কি? তথ্যপ্রযুক্তিতে অপেনসোর্সে বাংলাদেশীরা যে সমস্ত প্রোজেক্টগুলিতে কাজ করছে তার সিংহভাগই হল কোন প্রোগ্রাম বা সিস্টেমের বাংলা অনুবাদ। এটিকে আমি ছোট করে দেখছিনা, এটিতে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি উপকৃত হবে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমরা “বাংলা অনুবাদ” এর সীমা ছেড়ে বিশ্বের জন্য কোন সলিউশন দেবার চেষ্টা করি তবে vmukti এর মত আমরাও বিশ্বের দরবারে আমাদের নাম দৃঢ় ভাবে স্থাপন করতে পারব। হার্দি কিছুদিন আগে আমেরিকার একটি মোবাইল কম্পানির কাছ থেকে ভাল অংকের ইনভেস্টমেন্ট পেয়েছেন। আমাদের ছেলেমেয়েরা এইরকম বড় মাপের কিছু চিন্তা করতে পারছেনা কেন? আমাকে বলতে পারেন আমাদের কি নেই যা ভারতীয়দের আছে?

তাই বলছি আমাদেরকে আমাদের এই গন্ডী থেকে বেরিয়ে এসে বড় কিছু করার কথা ভাবতে হবে। শেষ পর্যন্ত আড্ডা জাতীয় ক্ষেত্রেই নয় পাশাপাশি বিশ্ব জগতে আমাদেরকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে হবে। আমাদের যে যোগ্যতার অভাব নেই তা প্রমাণ করতে হবে। আমরা বাংলাদেশীরা হার্দি ও ড. হুস্সাম এর কাছ থেকে শিক্ষা নিব, সেটিই কামনা করছি।


লেখক আমেরিকার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে নানোটেকনলজি বৈজ্ঞানিক হিসাবে কর্মরত। লেখকের ইমেইল ঠিকানা mashiur@ymail.com । লেখকের সম্পাদিত বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রবন্ধের জন্য পড়ুন http://biggani.org

ওয়েস্টভার্জিনিয়া, আমেরিকা ৬ সেপ্টেম্বর ২০০৭