মশিউরের খেরোখাতা

গ্রীড কম্পিউটিং

ড. মশিউর রহমান, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

মানুষের ব্যবহারযোগ্য অপরিসীম সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই বর্তমান তথ্য প্রযুক্তি বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়নের পেছনে মূল উৎসাহ হিসেবে কাজ করে। এমন এক চিন্তা থেকেই জন্ম নেয় “গ্রিড কম্পিউটিং” এর ধারণা যা আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের মানুষের জন্য নিয়ে এসেছে সুপার কম্পিউটার ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা অর্জনের সম্ভাবনা। আসলে সম্ভাবনা বললে মনে হতে পারে এটা এখনো সায়েন্স ফিকশন বা বৈজ্ঞানিক কোন পরিকল্পনার দূরবর্তী বাস্তবায়নের স্বপ্ন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে “গ্রিড কম্পিউটিং” কনসেপ্ট কাজে লাগিয়ে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন হিসাব নিকাশের প্রয়োজনে ভার্চুয়াল সুপার কম্পিউটার ব্যবহার করা এখন শুধুই একটি ছোট্ট উদ্দ্যোগ এর ব্যাপার।

চিত্র: গ্রীড কম্পিউটিং যেভাবে কাজ করে

গ্রীড কম্পিউটিং:

গ্রীড কম্পিউটিং বলতে আমরা বুঝি যেখানে অনেকগুলি কম্পিউটারের রিসোর্স আমরা ব্যবহার করে সুপার কম্পিউটারের মত পারফরমান্স পেতে পারি। বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকা কম্পিউটারকে সমন্বিত করে এর রিসোর্স শেয়ারিং এর মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারীর কাছে দৃশ্যত একটি ভার্চুয়াল সুপার কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়াই গ্রিড কম্পিউটিং এর মূল উদ্দেশ্য। গ্রীড কম্পিউটার এর সংঙ্গা উইকিপিডিয়াতে এইভাবে দেয়া হয়েছে, Grid computing is the combination of computer resources from multiple administrative domains for a common goal। বিক্ষিপ্ত ভাবে ছড়িয়ে থাকা কম্পিউটারকে সমন্বিত করে এর রিসোর্স শেয়ারিং এর মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারীর কাছে দৃশ্যত একটি ভার্চুয়াল সুপার কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়াই গ্রিড কম্পিউটিং এর মূল উদ্দেশ্য। আমাদের ল্যাব, অফিস, ঘরে ব্যবহৃত অসংখ্য পার্সোনাল কম্পিউটার আছে যার প্রসেসিং ক্ষমতার খুব সামান্যই ব্যবহৃত হয়। বেশীরভাগ সময়েই দেখবেন আপনি আপনার কম্পিউটারের ১০০% সিপিইউ ব্যবহার করছেন না। বেশীরভাগ সময়ই (যখন মাইক্রোসফট ওয়ার্ড বা ইন্টারনেট দেখছেন) আপনার কম্পিউটারের সিপিইউ এর মাত্র ৩০% ব্যবহার করছেন। বাকি ৭০% এর মত ক্ষমতা আপনি ব্যবহার করছেননা। গ্রীড কম্পিউটার এই না ব্যবহার করা অংশটি ব্যবহার করে অন্য কোন কাজ করে। এই অসংখ্য কম্পিউটারকে খুব সহজেই গ্রিড নেটওয়ার্কের আওতায় এনে উচ্চগণনা সম্পন্ন কাজগুলো সম্পাদনের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব একটি ভার্চুয়াল সুপার কম্পিউটার। প্যারালাল কম্পিউটিং বা ডিস্ট্রিবিউটেড কম্পিউটিং পূর্বে থেকেই প্রচলিত। গ্রিড কম্পিউটিং এক ধরণের বিশেষ প্যারালাল কম্পিউটিং যেখানে কম্পিউটিং কার্যক্রম নির্ভর করে সকল পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার এর উপর যেগুলো কনভেনশনাল নেটওয়ার্কে ইন্টারফেসের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকে।

গ্রীড কম্পিউটিং এর ব্যবহার:

গ্রীড কম্পিউটিং এর ধারণাটি শুরু হয় ১৯৯০ এর পর থেকে তবে সবথেকে বেশী জনপ্রিয়তা পায় ১৯৯৯ সনে  SETI@home এর প্রোজেক্টের মাধ্যমে। সেটি@হোম একটি বিশাল প্রোজেক্ট যেটি মূলত মহাকাশের রেডিও তরঙ্গগুলিকে পরিক্ষা করে দেখে যে সেখানে বর্হিবিশ্বের কেউ (অন্য গ্রহের জীব) তথ্য পাঠাচ্ছে কিনা। সেটি@হোম মহাকাশের বিভিন্ন সময়ের ও বিভিন্ন স্থানের রেডিও তরঙ্গগুলিকে ছোট ছোট ভাগ করে সেটি@হোম এর স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে পাঠিয়ে দেয়। স্বেচ্ছাসেবকদের কম্পিউটারে সেই অংশটির ক্যালকুলেশন করার পরে তখন তা সেটি@হোম এর সার্ভারে পাঠিয়ে দেয়। এইভাবে স্বেচ্ছাসেবকদের কম্পিউটারের রিসোর্স ব্যবহার করে সেটি@হোম প্রোজেক্টটি চলছে। আর এটি সম্ভব হচ্ছে গ্রীড কম্পিউটিং এইখানে ব্যবহার করে। একরকম ভাবে বেশ কিছু প্রোজেক্ট হল, XtermWEB, CONDOR, GLOBUS  ইত্যাদি।

গ্রীড এবং অ্যলকেমি:

গ্রিড কম্পিউটিং এর জন্য প্রতিষ্ঠিত যে সকল প্লাটফর্ম বা সিস্টেম প্রচলিত রয়েছে সেগুলো বেশিরভাগই ইউনিক্স কিংবা লিনাক্স নির্ভরশীল। উক্ত সিস্টেমগুলোর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রয়োজন LINUX অথবা WIN32  এবং কোন না কোন বিশেষ প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ। কিন্তু এক সমীক্ষায় দেখা যায় বিশ্বে ৯০ ভাগেরও বেশি কম্পিউটার ব্যবহৃত হচ্ছে উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম। যেখানে গ্রিড কম্পিউটিং এর মূল মন্ত্রই হল অব্যবহৃত রিসোর্সের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার, সেখানে অবশ্যই প্রয়োজন একটি উইন্ডোজ নির্ভরশীল গ্রিড সিস্টেম। অ্যালকেমি একটি ওপেন সোর্স .NET এর উপর তৈরী করা গ্রিড-ফ্রেমওয়ার্ক যার মাধ্যমে যে কোন উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমেই গ্রিড ব্যবহার করা সম্ভব। অ্যালকেমির অ্যাপ্লিকেশন নির্মাণের জন্য .NET সাপোর্ট করে এমন যে কোন ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করা সম্ভব। মূলত অ্যালকেমির মাধ্যমেই আমরা খুব সহজে গ্রিড এর সাথে যুক্ত হতে পারি।আরো বেশ কিছু কারণে অ্যালকেমি গ্রিড ব্যবহারকারীদের জন্য আধিক গ্রহণযোগ্য। এর আছে নিজস্ব থ্রেড প্রোগ্রামিং মডেল যা আর কোন সিস্টেম এখনো তৈরি করতে পারেনি। এর সবথেকে বড় সুবিধা হল ক্রস প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজারের মাধ্যমে অ্যালকেমির সাথে আমরা ওয়েব সার্ভিস ইন্টারফেস তৈরি করতে পারি।এর মাধ্যমে এর গ্রিড নেটওয়ার্ককে লোকাল পরিসর থেকে অনেক বড় ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীড কম্পিউটিং:

নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই গ্রীড কম্পিউটিং এর উপর কিছু গবেষণা হচ্ছে। গ্রীড কম্পিউটিং ব্যবহার করে আমরা দেখতে পাই যে একটি জটিল ক্যালকুলেশন করার জন্য সাধারণ কম্পিউটারের থেকে গ্রীড কম্পিউটারের মাধ্যমে  সংযুক্ত করা কম্পিউটারের রিসোর্স ব্যবহার করে অনেক দ্রুত ক্যালকুলেশন করা সম্ভব।

পরীক্ষা করার জন্য আমরা গুইড (Guid) কে বেছে নিয়েছিলাম। গুইড হল একটি ১২৮ বিটের একটি random সংখ্যা যা আইডেন্টিফায়ার বা কপিরাইট এর মত কাজে ব্যবহৃত হয়। ৫০০টি গুইড সংখ্যা তৈরি করের এবং তা পরীক্ষা করে দেখতে একটি কম্পিউটারের প্রয়োজন হয় প্রায় ৮০ সেকেন্ড। কিন্তু ৩টি কম্পিউটার দিয়ে গ্রীড কম্পিউটার ব্যবহার করার পর কাজটি শেষ করতে ৩৫ সেকেণ্ড সময় লাগে। এখানে যদি আরো বেশি কম্পিউটার ব্যবহার করা হত তাহলে সময় এবং ক্ষমতা ব্যবহার আরো কমতে থাকত।

গ্রীড কম্পিউটিং এর সম্ভাবনা:

বেশ কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে গ্রিড কম্পিউটিং নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব সুফল বয়ে আনতে পারে। বিশ্বব্যাপী যে চ্যালেঞ্জগুলো গ্রিড কম্পিউটিং জানিয়ে দিয়েছে তার মধ্যে রয়েছে প্রোটিন ফোল্ডিং, ফাইনান্সিয়াল মডেলিং, আর্থকুয়াক সিমুলেশন, ওয়েদার মডেলিং ইত্যাদি। তবে আমাদের চারপাশের নিত্য প্রয়োজনেও এর ব্যবহার সম্ভব। যেমন- ডাটা মাইনিং বা ভিডিও রেন্ডারিং এর মত কাজগুলো সাধারণ কম্পিউটারে সম্পাদন করতে অনেক সময় লাগে এবং চাপ তৈরি হয়। টিভি চ্যানেল গুলো দেখা যায় বেশ কিছু উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটার নিয়েও ভিডিও রেন্ডারিং এর কাজ করতে হিমশিম খাচ্ছে। অথচ গ্রিড কম্পিউটিং এর মাধ্যমে এই কাজ নিজস্ব রিসোর্স দিয়েই নিমিষেই করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ও গ্রীড কম্পিউটিং:

বাংলাদেশ এর শিক্ষা ও গবেষনা খাতে গ্রিড কম্পিউটিং অনেক বড় ভুমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ এ খুব শিঘ্রই BdREN (Bangladesh Research and Education Network) প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে। এটি একটি উচ্চ ক্ষমতা ডাটা কমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক যার তত্ত্বাবধানে থাকবে এরসাথে যুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহ। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো রিসার্চ এবং প্রজেক্ট এর কাজে তথ্য আদান প্রদান করতে পারবে এবং গ্লোবাল রিসোর্স এর সাথে যুক্ত হতে পারবে। BdREN এর একটি দেশব্যাপী ফাইবার ব্যাকবোন থাকবে যার সাথে ক্যাম্পাসগুলো তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক নিয়ে যুক্ত হবে। এছাড়া TEIN3(Trans Euro Asia Information Network) বর্তমানে এশিয়া এবং ইউরোপ এর মাঝে EU’s GEANT –র মাধ্যমে একটি রিসার্চ নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। ইতিমধ্যে এ অঞ্চলের ১১টি দেশ এর সাথে যুক্ত হয়েছে এবং বাংলাদেশ খুব শিঘ্রই যুক্ত হতে যাচ্ছে। এই নেটওয়ার্ক এসিয়া প্যাসিফিক এ শিক্ষা ও গবেষণার জন্য উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন ইন্টারনেট সার্ভিস দিবে। এই নেটওয়ার্কের সাথে যদি অ্যালকেমি গ্রিড যুক্ত করা যায় তাহলে একটি শক্তিশালি গ্রিড নেটওয়ার্ক তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে গবেষণায় উচ্চ গণনা সম্পন্ন কাজে বাংলাদেশও উন্নত বিশ্বের সাথে সমান ভাবে ভূমিকা রাখতে পারবে।

এ ধরণের সিস্টেম বাংলাদেশ এর মত রাষ্ট্রে তথ্য প্রযুক্তি খাতে নিয়ে আসতে পারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সীমিত সামর্থের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে অসীম ক্ষমতার সৃষ্টি হতে পারে আমাদের মূল মণ্র। যেহেতু অ্যালকেমি একটি ওপেন সোর্স গ্রিড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম গবেষণার মাধ্যমে এর যে কোন ধরণের টেকনিকাল ডেভেলপমেন্ট করা সম্ভব। তার সাথে এই সিস্টম নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে একই ধরণের আরো কিছু ভার্চুয়ালাইজেশন কনসেপ্ট যেমন ক্লাউড কম্পিউটিং নিয়ে আসা সম্ভব। যেখানে ভার্চুয়াল জগতে যে কোন স্থান থেকে শুধু ইন্টারনেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ব্যবহার করা যাবে অসীম রিসোর্স এবং প্রসেসিং ক্ষমতা। আশা করা যেতেই পারে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভার্চুয়ালাইজেশন টেকনিকের মাধ্যমে তথ্য প্রযুক্তি বিশ্বে শক্তিশালি ভূমিকা রাখছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির কল্যাণেই পরিচয় দিতে হচ্ছেনা আর তৃতীয় বিশ্বের দেশ হিসেবে।

এই লেখাটির জন্য সার্বিকভাবে সহযোগীতা করেছে আরিফ রহমান। আরিফ বর্তমানে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রীড কম্পিউটিং এর উপর গবেষনা করছে।