মশিউরের খেরোখাতা

এআই: নিয়ন্ত্রণ না সহযাত্রা?

তারিখ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬

এআই: নিয়ন্ত্রণ না সহযাত্রা? সক্রেটিস বলেছিলেন, "আমি জানি যে আমি কিছু জানি না।" ভদ্রলোক সেই যুগে বেশ সাহসী ছিলেন। আজকের যুগে এই কথা বললে মানুষ বলত, "গুগল করো।" আর এখন? এখন বলে, "এআইকে জিজ্ঞেস করো।" সক্রেটিস বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই ChatGPT-র প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন নিতেন।

তবে নতুন প্রযুক্তিকে ভয় পাওয়াটা মানুষের চিরকালের স্বভাব। পারমাণবিক শক্তির কথাই ধরুন। হিরোশিমা-নাগাসাকির পর পৃথিবী ভেবেছিল — এবার বোধহয় শেষ। মানুষ রাস্তায় নেমেছে, বিক্ষোভ করেছে, কবিতা লিখেছে, কেঁদেছে, আন্দোলন করেছে। কিন্তু তারপর? সেই একই পরমাণু আজ বিদ্যুৎকেন্দ্রে বসে নিরীহভাবে কোটি কোটি ঘরে আলো জ্বালাচ্ছে। বোমা আর বিদ্যুৎ — একই শক্তি, শুধু মানুষের সিদ্ধান্তের ফারাক। ভয়টা ছিল শক্তিকে নিয়ে নয়, শক্তির মালিককে নিয়ে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও গল্পটা ঠিক একই।

তো, এআই আসলে কী করছে?

ট্রাফিক সিগন্যাল চালাচ্ছে। ঢাকার যানজট কমেছে কিনা জানি না — সম্ভবত কমেনি, কারণ ঢাকার সমস্যা অ্যালগরিদমের নয়, মানুষের চরিত্রের।

হাসপাতালে রোগ ধরছে ডাক্তারের আগে। এটা শুনে আমার এক চিকিৎসক-বন্ধু উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, "তাহলে আমি কী করব?" আমি বললাম, "সান্ত্বনা দেবেন। ওটা এখনো এআই পারে না।" তিনি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

মহাকাশযানের পথও ঠিক করে দিচ্ছে। আমি নিজে বাজারে যেতে গিয়ে গলি ভুল করি, সেখানে কোটি মাইল দূরে পথ দেখানো — এ তো রীতিমতো অলৌকিক।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা করেছেন আমার পাড়ার মুদি রহিম ভাই।

"ভাই, এই মেশিন ভুল করলে মামলা দেব কার নামে?"

উত্তর এখনো নেই। ইউরোপীয় আইনপ্রণেতারা মাথা চুলকাচ্ছেন, আমেরিকান লবিস্টরা কংগ্রেসে দৌড়াচ্ছেন, আর সিলিকন ভ্যালি হাসছে — কারণ মামলা হলে তাদের উকিলের ফিতেই আরেকটা বিলিয়ন ডলার যাবে।

নিয়ন্ত্রণ দরকার, অবশ্যই। কিন্তু সে নিয়ন্ত্রণ যেন সেই বাবার মতো না হয় — যিনি ছেলেকে সাইকেল চালাতে দেন না পড়ে যাওয়ার ভয়ে, ফলে ছেলে চল্লিশ বছর বয়সেও ভ্যানে চেপে বিয়ে করতে যায়।

দায়বদ্ধতাও চাই। "অ্যালগরিদম সিদ্ধান্ত নিয়েছে" — এটা উত্তর নয়, অজুহাত। প্রোগ্রামার বলবেন "আমি শুধু কোড লিখেছি।" কোম্পানি বলবে "Terms of Service-এ লেখা ছিল।" Terms of Service কেউ পড়ে না — এটা মানবজাতির সাহিত্য-বিমুখতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

শেষ প্রশ্ন: নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে — মেশিনের না মানুষের?

মানুষের, অবশ্যই। কিন্তু কোন মানুষের? রহিম ভাই? সিলিকন ভ্যালির কোটিপতি? নাকি সেই সংসদ সদস্য, যিনি ইমেইল খুলতেও সেক্রেটারির সাহায্য নেন?

এই তিনজনের মধ্যে কাকে বেছে নেব — এইটুকু ঠিক করতে পারলেই অনেকটা হয়ে যায়।

ভবিষ্যৎ ভয়ের নয়। পরমাণু যদি বোমা থেকে বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে পারে, এআইও বিদ্যুতের মতো হয়ে যাবে — সর্বত্র, অথচ চোখে পড়বে না। শর্ত একটাই — সুইচটা যেন সঠিক মানুষের হাতে থাকে।