মশিউরের খেরোখাতা

ইন্টার্নশিপ এর অভিজ্ঞতা: টোকিও পাওয়ার প্ল্যান্ট

টোকিও বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্পোরেশন


১১ ই জানুয়ারি ১৯৯৮

আজকে আর বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আজকের দিনটি আমার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ। সেই ছোটবেলায় একবার পড়েছিলাম একটি ছোট বালকের প্রথম দূরে যাওয়ার ঘটনা। কিরকম দুরন্ত বুক কত মধুর দৃশ্য দেখে সে তার জীবনের প্রথম দূরে চলে গিয়েছিল। তার বাবা তাকে করে ভর্তি করে দিয়েছিল দূরে। সেই ছেলেটির মত আমিও, ছোটবেলার দূরে পাড়ি শেষ করে, এই দূরে, সেই কলেজ পাড়ি দিয়ে, শেষে দেশও পাড়ি দিলাম। অথচ আজো কোথায় নতুনভাবে যেতে হলে বারবার সেই প্রথম দূরে যাওয়ার বালকটির কথা মনে পড়ে যায়। আজো যেন আমি সেই বালকটির মত দুরন্ত বুকে অজানা দৃশ্য দেখি। আমাকে আজ থেকে একটি কর্পোরেশনে দুই মাসের জন্য কোর্স করতে হবে। মধ্যে সাড়ে তিন বছর যাওয়ার আগে, জাপানের পড়াশোনার সম্পর্কে একটু না বলেই নয়। জাপানে বিশ্ববিদ্যালয়ের বছরব্যাপী কোর্স শেষ করার শেষ দুটি মাস একটি কর্পোরেশনে যেয়ে হাতে কাজ শিখতে হয়। অন্যান্য পড়াশোনার ক্রেডিট তোলার পর এই বিশেষ কোর্সের ক্রেডিটটি তুলতে হয়। ব্যাপারটি অনেকটা ইন্টার্নশিপ করার মত। জাপানে ব্যবহারিক শিক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেয় বলে, শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের বইয়ের থিওরি পড়লেই চলবে না। বড় বড় কর্পোরেশনে যেয়ে হাতে কাজ শিখতে হয়। জাপানের বিখ্যাত বড় বড় কর্পোরেশন যেমন, হিটাচি, মিৎসুবিশি, টয়োটা থেকে শুরু করে নতুন করে ছোট খাট কর্পোরেশনও নতুন স্নাতকদের এই শিক্ষানর্থী ভারটি নেয়। এমনিতেই বিভিন্ন কর্পোরেশন ঘুরে দেখা আমার একটি শখ বলে এই পড়াশোনার পাশাপাশি অনেককিছু শেখা যাবে। বাংলায় একই তো দুই পাখি মারা আর কি। সেজন্য খুব অধীর আগ্রহসহ আমি এই বিশেষ কোর্সের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আমার স্নাতক লেভেলের সমদল ক্রেডিট তোলা হয়ে গেল তৃতীয় সেমিস্টারে আমাদের কে এই কোর্সে যেতে হয়। গত ডিসেম্বরে আমার স্নাতক রিসার্চের উপস্থাপনা হয়ে গেল জানুয়ারী থেকে এই কোর্স আমি অংশ নিই।

আমি এই শিক্ষা কোর্সে অংশ নিল একটি টোকিও বিদ্যুৎ কর্পোরেশন। আমি টোকিওর কাশিমা তাপবিদ্যুৎ কর্পোরেশনে দুমাস কাজ শিখব। ব্যাপারটি ঠিক হয়েছিল অনেক আগে। প্রথমে বিভিন্ন কর্পোরেশন থেকে তাদের আমন্ত্রণ আসে। আমরা নিজেই থেকে একটি পছন্দ করে নিই। অনেক কর্পোরেশির নাম আসলেও আমি বেছে বেছে টোকিও বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্পোরেশির নাম দিয়েছিলাম একটি বিশেষ কারণে। আমরা সবাই জানি যে জাপান পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে অর্থনৈতিক শক্তিশালী দেশ। আমার মতে তাদের এই অগ্রগতির পিছনে প্রধান ভূমিকা রেখেছে এদের বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্পোরেশন। আজ আমাদের দেশ বাংলাদেশ সেই বিদ্যুতের চাহিদা ভীষণ তীব্র। আমার মনে হয় বাংলাদেশকে এগিয়ে আসতে হলে অবশ্যই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে জোর দিতে হবে। এই দিকে জাপানিজদের কাছে আমাদের অনেক শেখার আছে। আমি আর এই সুযোগটাকে হাতছাড়া করতে চাইলাম না। এটা ঠিক যে আমি এখানে কাজ করলেই আমি দেশে ফিরে অনেক ভূমিকা রাখতে পারব, তা কিছু না। কিছু আমার বিশ্বাস ভবিষ্যতে আমার অভিজ্ঞতা একদিন না একদিন আমার কাজে লাগবে। হয়তোবা এই কোর্স আমার জীবনের পথ নতুন পথ খুলে দিবে। ছোট বয়সে নতুন নতুন জিনিস শেখাই তো একজন শিক্ষার্থীর মূল লক্ষ্য। তাই আমার ইলেকট্রনিক্স থেকে একটু ভিন্ন বিষয়ের হলেও এই কোর্সের সিদ্ধান্তটি আমি নিলাম। কিছু চিন্তার ব্যাপার ছিল যে তারা এই বছর মাত্র একজন শিক্ষার্থী নিবে। অন্য কোন ছোট একই জায়গায় তার নাম লিখলে মেধা ভিত্তিক সিদ্ধান্ত হবে, তাই ফলাফলের দিন নোটিস বোর্ডে আমার নামটা দেখে ভীষণ খুশি হয়েছিলাম আমি।

টোকিও আসার আগে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সমদল যোগাযোগ করে দিয়েছিল। আমাকে ১১তারিখ সকালে টোকিও কর্পোরেশির প্রধান কার্যালয়ে সকাল ১০:৫০ এ আসতে হবে। জাপানিজরা সময়ের ব্যাপারে খুব সচেতন। তাই আগের রাতে টোকিওর ট্রেনে চেপে নিলাম। এই ট্রেনটি ভোরের সাড়ে পাঁচটায় টোকিও স্টেশনে পৌঁছাবে। আমি উঠেছিলাম যুহাচিকি বলে একটি বিশেষ টিকিট নিয়ে। এই টিকিট ২৪ ঘণ্টা যেখানে খুশি সেখানে যাওয়া যায়। রাত ১২টার পর তারিখ শেষ হয়ে গেল তা ব্যবহার করা যায় না। সাধারণত ছুটিকালীন সময়ে এই বিশেষ টিকিটটি জাপান রেইলওয়ে বাহির করে। আমরা বড়রা যখন সবাই মিলে দলের কোথাও যায় তখন এই টিকিটটি ব্যবহার করি। অনেক মত ট্রেনে উঠা যায় বলে সেব্যাপারটি বেশ।

ভোরের সকালে আমি যখন টোকিও এসে পৌঁছালাম তখন টোকিও স্টেশন ঘুমিয়ে ছিল। এর আগে ছয় মাসের মত টোকিওতে ছিলাম বলে টোকিও-র সাথে আমি পরিচিত। কিছু এই সাত সকালে টোকিওকে আমি নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম। যে টোকিও স্টেশন পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত স্টেশন। জনঅর্ণনে হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে পর্যটকরা জায়গাটি এড়িয়ে চলে সেই টোকিও স্টেশন একদম নিস্তব্ধ। স্টেশনে স্টেশন পরিষ্কার এবং মেরামতের কাজ চলছে। জাপানে দিনের বেলা মেরামত করলে চলাচলের অসুবিধা হবে ভেবে সাধারণত রাতের বেলা রাত্রিঘাট মেরামত করা হয়। একটু ভোরের বেলায় চলে আসায় বেকায়দায় পড়ে গেলাম। সব দোকান পাট বন্ধ। কোনটি খোলার জন্য প্রত্যাশিত হলে বেকায়দায় পড়ে গেলাম। এটাতো আমাদের দেশের চায়ের দোকানের মত না যে একটু আগে আগে খাবার আসলেও খুলে দিল। এখানে সমদল দোকান খোলার এবং বন্ধ হওয়ার সময় নিদিষ্ট। সেই নির্ধারিত সময়ের বাহিরে কোন আগন্তুক আসলেও দুঃখিত। কিছুই করার ছিল না বলে পুরান চেনা জানা এলাকায় ঘুরে আসার লোভ সামলাতে পারলাম না। সেই শিবুয়া জরনু এবং স্লিকু জরলঁশঁ কে কিভাবে ভুলি। জাপানি ভাষা শিক্ষা ক্যাম্পাসের পর আমি এলাকাগুলি চেপে বেড়াতাম। ইলেকট্রনিক্সের দোকানগুলি ঘুরে দেখতে বেশ মজা লাগতো। আর ফাঁকতালে জাপানিদের সাথে জাপানি ভাষা প্র্যাকটিস করে এই কঠিন ভাষাটাকে রপ্ত করে ফেলতাম। আমি বই দেখে দেখে যতনা ভাষা শিখেছিলাম তার থেকে বেশি শিখেছি লোকজনের সাথে সরাসরি কথা বলতে বলতে। আর আজ আবার বাজি করতে খুব পছন্দ করি। যাই হোক ভোরের বেলা সেই পুরান জায়গাগুলি বিনাপয়সায় ঘুরে এলাম। আগে বলেছি আমার কাছে বিশেষ টিকিট ছিল, যেহেতু আমি রাত ১২টার ট্রেনে উঠেছি সেহেতু আজ রাত ১२টা পর্যন্ত জাপান রেইলওয়ের যে কোন ট্রেনে আমি উঠতে পারব। তবে ভোরবেলায় জায়গাগুলি এত নিস্তব্ধ ছিল যে সেই চেনা জায়গাগুলিকে নতুন ভাবে আবিষ্কার করছিলাম।

এদিক সেদিক ঘুরেও তবুও সন্ধ্যার উঠলানো, অথচ চোখে Ginza Central Hotel এখনও ঘুমের রেশ। মাথায় এক চমৎকার বুদ্ধি এল। বাহিরের ঠান্ডা আবহাওয়ার থেকে ট্রেনে উঠাই ভাল। টোকিও মধ্যে চক্রাকারে ঘুরছে, ইয়ামানোটে ট্রেন। এই ট্রেনটি পুরা একঘণ্টায় টোকিও-এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলি একবার চক্রাকারে ঘুরে আসে। সেই ট্রেনটিতে উঠে এক ঘুম দেওয়া গেল, ট্রেনের হিটার এবং দুলান খেতে খেতে দৃশ্যে রাজ্য হারিয়ে গিয়েছিলাম। আর ভোরের এই ঘুমটি বেশ মজার হত। হোস্টেলে থাকতে আমার এক বন্ধু আশিক মজার কাজ করতো। সে এলার্ম বাজিয়ে ভোরবেলায় একবার উঠতো, তারপর আবার উঠে ভালোমত কাঁথা মুড়ি দিয়ে আরেকবার ঘুম দিত। সে বলত যে দ্বিতীয়বারের এই ঘুমের নাকি তুলনাই হয় না। সেই আশিক আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন নিয়ে পড়ছে। জানি না আজও সে এমনিভাবে ঘুমায় কিনা। ইয়ামানোটে ট্রেনে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে দেখি ভোর হয়ে গেছে। ঠিক কাটায় কাটায় ১০:৪০ এ আমি টোকিও বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্পোরেশির প্রধান কার্যালয়ে পা দিলাম।

প্রধান কার্যালয়ে আমার একটা ছোটখাট সাক্ষাৎকারের মত হল। কেন আমি এই কোর্সটি বেছে নিলাম সে সম্পর্কে জানতে চাইল। আর অবশ্যই আমার সম্পর্কে আর আমার দেশ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে চাইল। অনেক জাপানি বাংলাদেশ বললে চিনে না। তাদরকে ভারতের পাশে একটু ছোট দেশ বলে বুঝাতে হয়। অনেকে আবার বাংলাদেশকে আজোও পূর্ব পাকিস্তান বলে জানে। আর যারা একটু সংবাদপত্র পড়ে তারা জানে বর্ষার দেশ। এসব নিয়ে মনটা এতই খারাপ হয় না। তাই বাংলাদেশের উপর ছোটখাট পরিচয় দিতে হল। প্রশ্নকারী থেকে আমাকে মূল কোর্স সম্পর্কে বিস্তারিত জানাল। আমাকে কাশিমা যাওয়ার বাস টিকিট এবং যাওয়ার ব্যাপারে বিস্তারিত বলে দিল। সেখান থেকে বাসে করে আমি যখন কাশিমায় পৌঁছালাম তখন দুপুর আড়াইটা বাজে। আমি কাশিমা সেন্ট্রাল হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করতে লাগলাম। এই হোটেলটির নতুন ভবন তৈরি হল্লিছে। কাশিমা ফুটবল খেলার জন্য বিখ্যাত। ২০০२ সালে যে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা অনুষ্ঠিত হবে তার কিছু খেলা এই কাশিমা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। সেই দর্শক এবং অতিথিদের জন্য এই হোটেলটি নতুন ভাবে প্রস্তুত হল্লিছে। কাশিমার ফুটবল টিম জাপানে বেশ বিখ্যাত।

কিছুক্ষণ পরে কাশিমা তাপবিদ্যুৎ কর্পোরেশির কর্মচারী আমাকে নিতে আসল। কাশিমা তাপবিদ্যুৎ কর্পোরেশনে আমিই প্রথম বিদেশি শিক্ষার্থী। তাই বাংলাদেশি হিসেবে নিজের খুব গর্ব হল। অফিসে আসার পর, কর্পোরেশন প্রধান আমাকে তার সহকর্মীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তবে ওরা সবচেয়ে অবাক হল আমার জাপানি উচ্চারণে। একজন বিদেশির সাথে কিভাবে কথা বলবে তা নিয়ে বেশ চিন্তিত ছিল। আসল জাপানিরা ইংরেজিতে ভীষণ দুর্বল বলে অন্যদের সাথে ইংরেজি কথা বলতে ক্ষিধা করে। ওদের পরিচয়ের রীতটাও বেশ সুন্দর। সবাই তারিফ হয়ে দাড়িয়ে কথা বলছিল। প্রাথমিক পরিচয়ের পর আমাকে ডরম নিয়ে গেল, যেখানে আমি থাকব। ডরমটি বেশ সুন্দর এবং আমার রুমটি দেখে এক ঝলকেই আমার ভালো লেগে গেল। যাক নিরিবিলিতে কিছুদিন কাটান যাবে। গোসল করতে যেয়ে দেখি আমি তেল আনিনি। এত রাতে এখানকার সব দোকান পাট বন্ধ হয়ে গেছে। বেশ সমস্যায় পড়া গেল, আর নিজের উপর খুব রাগ হতে লাগল। আমার সমস্যা জানা ডরমের প্রধান আমাকে তেল দিল। তার আস্পর্শরিকতায় আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। খাবার দাবার সেরে সরাসরি বিছানায় এক ঘুম!!!!!!!!


১২ ই জানুয়ারি ১৯৯৮

আজকে ছিল ২য় দিন। প্রথম হল, সাত সকালে উঠা। সকাল ৭টায় উঠার অভ্যাস নেই, তাই একটু কঠিন হল প্রথমবার? তবে বুঝলাম যে অভ্যাস হয়ে যাবে। সাত সকালে রুটিন মাফিক খাওয়া দাওয়া, রান্নাঘরের ঝামেলা নেই। ডরমের সামনে প্রথমেই কর্পোরেশনের বাস আমাদরকে তুলে নিল। অফিসে পৌঁছেই আমাকে কর্পোরেশনের পোশাক দিল, সেই পোশাক পড়ার পর নিজেকে এই কর্পোরেশনের একজন বলে মনে হল। ৮:३০ থেকে শুরু হল সকালের পিটি। অফিসের এই নিয়মটি ভালোই বলে মনে হল। রেডিওতে মিউজিকের তালে তালে সবাই পিটি করছিল। তারপর আমাকে আমার লকার বুঝিয়ে দিল। সব নতুন নতুন বলে ভালোই লাগছিল। আমি এই সময়টাকে বেশ উপভোগ করছি। চারিদিকে নতুনের ঝক। আজকে প্রথম দিন বলে কারখানার বিভিন্ন প্রাথমিক ব্যাপারগুলি বুঝিয়ে দিল। একজন শিক্ষক আমার জন্য নিয়োজিত করা হয়েছিল।

আজকে একটা ঘটনা ঘটল যা না বলে পারছি না, কাজ করছিলাম হঠাৎ দেখি রুমটা কাঁপছে। প্রথমে ভাবছিলাম কারখানার ভূমিকম্পই বুঝি এমনটা হয়েছে। কিছু বুঝতে দেরি হল না যে এটা একটা ভূমিকম্প। আঁতকে উঠলাম। আমাকে যে ভদ্রলোক শেখাচ্ছিলেন তিনি দেখলাম তড়িঘড়ি করে দরজা খুলে দিলেন। বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে হলে বেরিয়ে যাওয়ার রাস্তা রাখার জন্য। পরে আমাকে বুঝিয়ে বলেলেন যে, সাধারণত ভূমিকম্প দেখা যায় দরজা বন্ধ হয়ে যেয়ে তাতে আটকা পড়েই বেশি লোক মারা যায়। জাপান ভূমিকম্পের দেশ বলে এরা প্রতিটি মুহূর্তে সতর্ক।

কারখানায় নিরাপত্তা খুবই জরুরি বলে আজকে কারখানার নিরাপজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত শেখাল। জরুরি অবস্থায় কার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করতে হবে, ইত্যাদি। আমাকে যে পোশাকটি দিয়েছিল তা ভিন্নের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা। এছাড়া মাথায় পড়ার জন্য হেলমেটও দিল।

বিকালে ডরম ফিরে একটু বাজারের দিকে গেলাম। বেশ ঠান্ডা ছিল। টুটাপ ঠান্ডির মধ্যে ছাতা নিয়ে হাঁটতে বেশ লাগছিল। এমনিতেই আমার ঠান্ডা বেশ লাগে। টুকটাক বাজার করে নিয়ে এলাম। এই শহরটি বেশ চুপচাপ। এরকম নিরব শহর আমি খুবই কম দেখেছি। অনেক ঘুরে ফিরে একটা মাত্র ডিপার্টমেন্ট দোকান পেলাম।


১৩ ই জানুয়ারি ১৯৯৮

প্রথম দিনের পর, একটু চেনাজানা হয়ে গেছে। তাই নিজের ক্যাম্প যেয়ে কারখানার দেওয়া পোশাক পরে নিলাম। মানুষ কি অস্ভুত ভাবেই না তার পরিবেশের সাথে খাপ খেয়ে নিতে পারে। আমার মনে হল আমি যেন এখানকার একজন। অথচ গতকালকেই আমি ছিলাম অচেনা। কর্পোরেশনের লোকজন আমার সাথে কথা বলছে। তবে তারা বেশ আর্য হল এই কথা নিয়ে যে আমাদের দেশ মদ পাওয়া যায় না নিয়ে। জাপানিরা অ্যালকোহল জাতীয় পানীয় ভীষণ পছন্দ করে। তাদের মাথায় ঢুকছিল না যে একটি দেশ মদ না পাওয়া যায়তো পারে। কেউ কেউ এমনই অবাক হল যে তার সামনে ভূত দেখা দিলেও সে এতটা অবাক হত না।

আজকে কারখানার বয়লার এবং টারবাইনের উপর শেখাল। পানি কিভাবে বাষ্প হয় তার বিস্তারিত শেখাল। তবে একটা জিনিস মজা লাগল তা হল, কোন শক্তিরই অপচয় হল নেই, একটা জিনিসের যতটা সম্ভব তার সর্বাধিক ব্যবহার হল নেই। যেমন একটা জায়গায় যদি তাপের প্রয়োজন হয় তবে তার জন্য বয়লারের বাঁচহু ব্যবহার হল নেই। একটু থিওরি পড়ার পর পরই আমাকে মূল জায়গাগুলি ঘুরিয়ে দেখিয়ে আনছিল। এতে থিওরি গুলির ব্যবহারিক প্রয়োগ নিজ চোখে দেখে শিখতে সুবিধা হল নেই। তবে এই বিশাল কারখানার ব্যাপকতাই আমাকে অবাক করে দিল নেই। যতবারই দেখছিলাম ততবারই আর্য হল নেই। মানুষই এমন বিশাল জিনিস প্রস্তুত করে প্রদান কি। এই ছোট ছোট মানুষগুলি কতই না কাজ পারে। আজকে রুমে কিছু নকশা দেখতে পেলাম যেগুলি কারখানার মূল নকশা। দেখতে বেশ লাগছিল। সবগুলি কাগজগুলি বড় পিস্টোলের, সেই কালে জেরক্স কপি ছিল না। দেখলাম সবগুলিই হাতে প্রস্তুত। এরকম একটা নকশা বানাতে নিয়ে অনেকবার বানাতে হয়েছে। আজতা সময় পাতো গেছে। সব কিছুতেই কম্পিউটারের কোডের মাধ্যমে কত সহজেই না নকশা আঁকা যায়। কোন ঝামেলা নেই, যতবার ইচ্ছা এডিট করো, প্রিন্ট করো।

বিকালে বয়লার দেখতে যেয়ে শরীরটা খারাপ লাগছিল। একটু ঠান্ডা লেগে গেছে। আসল কারখানার তাপে শরীরটা উত্তেজিত ছিল, তবে মানিয়ে নিতে পারলাম। রুমে এসেই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লাম।


১৪ ই জানুয়ারি ১৯৯৮

আজকে কারখানার আশেপাশের জায়গাগুলি ঘুরা দেখাল। প্রধানত সমুদ্রের পানি থেকে আবর্জনা আলাদা করে সেই পানি, বাষ্পহুকে ঠান্ডা করে পানিতে পরিণত করতে ব্যবহৃত হয়। সমুদ্রের পানি তোলার স্বৃষ্টিটি দেখলাম। এই প্রক্রিয়ায় যে সমদল আবর্জনা বের হয় তা কিছু আবার পুনরব্যবহারের জন্য অন্য কর্পোরেশনকে দিতে হয়। সাধারণত আবর্জনা হিসেবে ঝিনুকের খোলই প্রধান, এটা দালান নির্মাণের কংক্রিট ব্যবহার হয়। জাপানের সংবিধানের নিয়ম অনুসারে একবার সমুদ্র হতে যে ময়লা তোলা হবে তা সরাসরি সমুদ্রে ফেলা যাবে না। এই সমদল পরিবেশ সংরক্ষণের ব্যাপারে জাপানের নিয়ম কানুন বেশ কড়া। এমনকি এই কারখানা থেকে যে সমদল পানি পরিশোধিত হয় তাও সরাসরি ফেলা হয় না। পাশের সরকারি পানি বিশোধন কেন্দ্রে তা পাঠান হয়। সরকার নিজ দায়িত্বে তা নিরাপদ করে সমুদ্রে ফেলে। এই সমদল পরিবেশ সচেতনার জন্য অনেক অর্থ খরচ হলেও তা প্রতিটি পদক্ষেপে করা হয় এবং এই সমদল দেখা শোনার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করে।

মজা লাগল, আমি যখন মূল খনিজ তৈল সংগ্রহের বিশাল ট্যাঙ্কগুলি দেখতে গেলাম। একটা দরজা অতিক্রম করতে হল, যা হাত দিয়ে সরিয়ে যেতে হয়। অনেকটা আমাদের দেশের ঢাকার শিল্পপার্কের গেটের মত। পরে জানতে পারলাম যে এই দ্বহুশ্বরের ফলে শরীরের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা করা হয়। কেননা বিদ্যুতের অত্যন্ত সামান্য বিদ্যুৎ দুর্ঘটনা থেকেই আকস্মিক জক্কলে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

আজকে আরেকবার বয়লার দেখতে বেরিয়েছি। অনেকবারই কারখানার বিভিন্ন অংশ দেখতে গেছি। কিছু প্রতিবার যাওয়ার আগে বর্ণনা থাকে বলে মনে হল নেই যেন আরো গভীর ভাবে কারখানার অংশ বিশেষগুলি জানতে পারছি।


১৪-১৫ই জানুয়ারি ১৯৯৮

শনিবারির সাধারণ ছুটির দিন। আশে পাশের তেমন কিছু জানি না বলে কোথাও বেরিয়ে পারলাম না। অবশেষ বিকালের দিকে সাইকেলে করে একবার সমুদ্রের দিকে গেলাম। সমুদ্রটি আমার ডরম থেকে খুবই কাছে। আমি সমুদ্র খুব পছন্দ করি, সমুদ্রের বিশালত্বের কাছে হারিয়ে যাই। আজকে চুল কাটতে গিয়েছিলাম। সাধারণভাবে কাটতেই ২০০০ ইয়েনের মত লাগল। বাংলাদেশের হিসেবে প্রায় ৮০০ টাকা। টাকার সংখ্যা দেখে সবার আঁশ্চল গুম হওয়ার কথা কিছু আসলেই এটাই এখানে সাধারণ দাম। আসল ব্যাপার হল, জাপানে একজন লোকের পারিশ্রমিক অনেক খুব বেশি, তাই যেখানে মানুষের প্রয়োজন সেখানেই দাম বেশি। সেই কারণে সেলফ সার্ভিসের রেস্তোরাঁর খাবারের দাম সাধারণ রেস্তোরাঁ থেকে অনেক বেশি।


২৩ ই জানুয়ারি ১৯৯৮

আজকে পড়াশোনার চেয়ে আলোচনাই বেশি হল। আলোচনার মূল বিষয় ছিল, সামনের এপ্রিল থেকে জাপান সরকার তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যাপারে নীতি পরিবর্তন করছে। এতদিন পর্যন্ত শুধু মাত্র বড় বড় কর্পোরেশনগুলি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণের অধিকার ছিল। এখন দেখা যায়, বড় বড় কর্পোরেশনগুলির একচেটিয়া অধিকার। আরে ব্যাপার যে জাপানের সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিই বেসরকারি। বড় বড় ট্র্যাডফর্মের মাধ্যমে তা পরিচালনা করা হয়ে থাকে। প্রতিটি কর্পোরেশনেরই শেয়ার আছে। এপ্রিল থেকে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতি মেনে চলা হবে। এর ফলে যে কোন কর্পোরেশন ২০০,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে।

সাধারণত বড় বড় কর্পোরেশনগুলি যারা এতদিন এর থেকে বেশি বিদ্যুৎ বাহিরের কর্পোরেশন থেকে কিনত, তারা নিজেরাই তাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে এবং ইচ্ছা করলে অন্য কর্পোরেশনেও বিক্রি করতে পারবে। তাই সামনের এপ্রিল থেকে জাপানের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। অবশ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন কর্পোরেশনগুলির ধারণা এত বড় বিশাল কাজ বাহিরের কোন কর্পোরেশন করতে পারবে না। কেননা প্রক্রিয়া বিদ্যুৎ উৎপাদন করা এবং তা বিতরণ করা বেশ বিশাল ব্যাপার। তবে অনিশ্চিত ভবিষ্যতে যে বড় কোন কর্পোরেশনের জন্য নিবে না, তা কিছু বলা যায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলির এতদিনের অভিজ্ঞতাই তাদের বিশাল পুঁজি। কেননা এই দীর্ঘদিন ধরে তা পুরা জাপান বিনা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন না করেই বিদ্যুতের চাহিদা মিটিয়ে এসেছে। আর জাপানের ব্যবসার জগতে এই বিশ্বস্ততা খুব বড় পুঁজি। অনেক কর্পোরেশন সুলভ মূল্যেও বিক্রি করলেও দীর্ঘদিনের গ্রাহকদের সেবার কারণেই এখানকার গ্রাহকরা পুরাতনা বিশ্বস্ত কর্পোরেশনগুলিকেই বেশি পছন্দ করে। সেজন্য জাপানে এতদিন ধরে পুরাতনা কর্পোরেশনগুলির একচেটিয়া বাজার ছিল। কিছু গত দশকে জাপানের বাজারে বিশাল পরিবর্তন হল নেই। বড় বড় পুরাতনা কর্পোরেশির পাশাপাশি ছোটছোট কর্পোরেশনও প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে জয় হল নেই। তাই বড় বড় কর্পোরেশনগুলিকে আরও বেশি প্রতিযোগিতার স্বীকামুখীন হতে হল নেই। "মুক্ত বিদ্যুৎ বাজার" জাপানের অর্থনীতিতে কি রকম ভূমিকা রাখবে তা সামনের দিনগুলির জন্য একটা পর্যালোচনার বিষয়।

কাসিমা, টকিও, তারিখ: মার্চ ১৯৯৮