জাপানের সংস্কৃতি :: নববর্ষের কার্ড
প্রতিটি দেশেরই একান্ত নিজস্ব কিছু সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট রয়েছে৷ যাতে সেই দেশের সংস্কৃতি ও কৃষ্টির পরিষ্ফুটন ঘটে৷ জাপান তার ইলেকট্রনিক্স দ্রব্যের জন্য পৃথিবী জোড়া বিখ্যাত৷ শুধু ইলেকট্রনিক্স নয় জাপান তার নিজস্ব কিছু সংস্কৃতির জন্যও পৃথিবী জোড়া বিখ্যাত৷ জাপানের নতুন বছরে বিশেষ ধরনের নববর্ষের কার্ড দেবার প্রচলন রয়েছে৷ নববর্ষের কার্ডের এই বিশেষ বৈশিষ্ট হয়তো অনেকের কাছেই অজানা৷ আজকে এই কার্ডের কথাই আপনাদের বলব৷ দীর্ঘদিন জাপানে থাকার কারনে প্রতিবছরই আমি এই কার্ড উপহার পেয়ে আসছি জাপানীজদের থেকে৷ প্রথম বছরে এই ব্যাপারটা খুব একটা বুঝতে পারিনি৷ কিন্তু পরের বছর ১লা জানুয়ারীতে দেখি আমার পোষ্টবাক্সেএই নববর্ষের কার্ডে ভরে আছে৷ তখনও খুব একটা জাপানীজ লোকদের সাথে পরিচিত হয়ে উঠতে পারিনি, তারপরেও অর্ধ পরিচিতদের কাছ থেকে কার্ড পেয়েছি৷ ব্যাপারটা টের পেলাম যখন কিছুদিন পরে এক সিনিয়র ভাই এর সাথে গল্প করছিলাম৷ উনিই তখন খুলে বললেন যে জাপানীজরা ১লা জানুয়ারীতে সবাইকে এই বিশেষ ধরনের কার্ড পাঠায় এবং এটা তারা খুব ঘটা করে পালন করে। বছরে যাদের সাথে পরিচিত হল তা থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন সবাইকে এই কার্ড পাঠাবে৷ পরে লাইব্রেরীতে যেয়ে এই কার্ড সমন্ধে আরো বিস্তারিত জানতে পারি৷ বর্তমানে জাপানে ১লা জানুয়ারীকে নতুন বছরের দিন হিসাবে পালন করা হয়৷ যদিও প্রাচিন কালে এদেরও আমাদের মত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে বাংলা ক্যালেন্ডারের মত নিজস্ব একটা বর্ষপঞ্জি ছিল৷ সাধারণত, ফসল কাটার উপর নির্ভর করে তৈরী হয়েছিল সেই বর্ষপঞ্জি৷ প্রাচীনকালে জাপান কৃষি নির্ভরশীল ছিল৷ জাপানে ঠিক কবে থেকে এই নববর্ষের কার্ড প্রচলন হয়েছিল তা বলা বেশ কঠিন৷ তবে হেইয়ান এর শাসনামল (৭৯৪ থেকে ১১৯২) এর সময়ে রাজপরিবারদের মধ্যে এই নববর্ষের কার্ডের প্রচলন দেখা যায়৷ তত্কালীন সময়ে সাধারণ মানুষরা লিখতে পড়তে পারতনা৷ শুধু মাত্র রাজপরিবারে মধ্যেই শিক্ষার প্রচলন ছিল৷ এদো শাসনামলে (১৬০৩ থেকে ১৮৬৮) এর সময়ে সাধারণ মানুষেরাও বর্ণমালা লিখা শিখতে থাকে এবং নববর্ষের কার্ডেরও প্রচলন দেখা যায়৷ মেইজি শাসনামলে ১৮৭৩ সালে সরকারি পোষ্টঅফিসে নববর্ষের কার্ড বিক্রি শুরু হয়৷ এক হিসাবে দেখা যায়, সরকারি পোষ্টঅফিসে ১৯০৫ সালে প্রায় ১০ লাখ কার্ড বিক্রি হয়৷ ১৯৪৯
সালে এই কার্ডের সাথে লটারির ব্যবস্থা হয়৷ লটারির পুরষ্কার হিসাবে দেয়া হয় সেলাইমেশিন, রেডিও টিভি ইত্যাদি৷ সাধারণ নববর্ষের কার্ডগুলি অনেকটা পোষ্টকার্ডের মত৷ তবে তাতে নববর্ষ কথাটি লিখা থাকে৷ জাপানিরা তুলি দিয়ে নিজ হাতে লিখে নতুন বছরের শুভেচ্ছাবাণী লিখে৷ তবে সবথেকে বেশি পরিচিত কথা হল, আকেমাসতে ওমেদেতো গোজাইমাস” যার অর্থ হল, নতুন বছরের শুভেচ্ছা”৷ অল্পপরিচিত থেকে শুরু করে খুব পরিচিত আত্মীয় সবাইকেই এরা নববর্ষের কার্ড উপহার দেয়৷ এমনকি কয়েকবছরধরে দেখা না হলেও তাকে কার্ড উপহার দেয়ার রেওয়াজ জাপানে৷ এর ফলে পারষ্পরিক যোগাযোগ বজায় থাকে৷ সবথেকে বেশী সুবিধা হয় কেউ ঠিকানা পরিবর্তন করলে, নববর্ষের কার্ডে তার নতুন ঠিকানা জানার যায়৷ সরকারীভাবে এই কার্ড বিক্রি শুরু হয় ডিসেম্বর থেকে৷ ১লা জানুয়ারীর আগে নববর্ষের কার্ড পোষ্ট করলেও প্রাপকের কাছে ১লা জানুয়ারীতে পৌছে দেয় ডাক বিভাগ৷ কখনও কখনও বড় শহরে রাস্তার পাশের সাধারণ পোষ্টবাক্সের পাশে বিশেষ নববর্ষের কার্ডের জন্য চিঠির বাক্সের ব্যবস্থা করে৷ প্রতিটি কার্ডের সাথে একটি লটারির ব্যবস্থা থাকে৷ সাধারণত ১৫ই জানুয়ারী ডাকবিভাগ এই লটারির ব্যবস্থা করে থাকে৷ প্রতিবছর বছরের একটি বিশেষ প্রতীকের মাধ্যমে বছরকে উত্যাপন করা হয়৷ যেমন ২০০২ সালের প্রতীক ছিল,বিড়াল৷ এই বছরের প্রতিক হল, খরগোশ৷ নববর্ষের কার্ডে এই প্রতীকের ছবিও থাকে৷ কিশোর কিশোরীরা নিজে ডিজাইন করে কার্ড উপহার দিয়ে থাকে৷ অনেক সময় নিজের ছবি লাগিয়েও কার্ড উপহার দিয়ে থাকে৷ ডিসেম্বরে বড় বড় ডিপার্টমেন্ট গুলিতে নববর্ষের কার্ডের ডিজাইনের সামগ্রী পাওয়া যায়৷ নিচে কিছু জাপানি নববর্ষের কার্ডের ছবি দেয়া হল৷
ওকাজাকি, জাপান ৩০শে আগষ্ট ২০০৩