গল্প: ভালোবাসার হাত
মানুষের জীবনে অনেক ঘটনাই তো ঘটে যায়, যার উপর মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। নিয়তির কোন নির্দেশে তাকে ভেসে যেতে হয় - ধ্রুব জানালার সার্সিতে তার ছায়ার সামনে এই কথাগুলিই ভাবছিল। দূরে লম্বা স্কাইস্ক্রেপারগুলি বিশাল আকাশকে ছুতে যাচ্ছে। নিউইয়র্ক শহরের এক ব্যস্ত অফিসের জানালার সামনে আনমনা হয়ে ধ্রুব কথাগুলি ভাবে। ডেস্কে একপালা ফাইল জমা হয়েছে। কিন্তু ধ্রুবর তাতে কোন মন নেই। কাজে কোনভাবেই মন বসাতে পারছে না। জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে তার জীবনে ঘটে যাওয়া ঝড়ের সেই দিনগুলি। অমন পাগলামি করে সে কেনই বা হাজির হয়েছিল সেই মুক্তাপুরে?
মনে পড়ে যায় কোন এক সন্ধার ঘটনা -
বন্ধুদের বাসায় আড্ডার ঘরে ধ্রুব মন খারাপ করে ছিল। আজকের দিনের মতই জানালার দিকে তাকিয়ে সে অন্ধকারে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছিল। ঘরে তাসের আড্ডা বসেছে। কে হয়তো ভুল চাল দিয়েছে তাকে নিয়েই হৈ চৈ পড়ে গেছে। ধ্রুবকে এককোণায় একা একা বসে থাকতে দেখে সোমা ভাবি আসল-
- কি ব্যাপার ধ্রুব! ব্যাপার কি আজকে আড্ডা থেকে দূরে এইভাবে মন খারাপ কেন?
ভাবির কথায় আনমনা ধ্রুব বাস্তবে ফিরে এল। এই সোমা ভাবি আজকের পার্টির হোস্ট। ছুটির দিনে ব্যাচেলররা হামলা দেয় এই বাসায়ই। মারাত্মক মজার রান্না করেন সোমা ভাবি। তাদের সবার মুখে সোমা ভাবির প্রশংসা।
-
তেমন কিছু না। মনটা ভাল না।
-
তা কি করে হয়। ভাল চাকরি করছ। ভাল বেতন পাচ্ছ। সুন্দর একটা জীবন, এর পরেও কি এইরকম আড্ডায় মন খারাপ করে থাকা যায়?
-
ভাবি ওকে বিয়ে করে দাও, দূর থেকে চিৎকার করে মিঠু বলে উঠল।
মিঠু নিউইয়র্ক শহরে এসেছে তা দেখতে দেখতে পাঁচ বছর হয়ে গেল। আর ধ্রুবও বা কি কম হল। তারও তো আট বছর হতে চলেছে। এই প্রবাসে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।
-
না ভাবি। সেরকম একাকিত্ব নয়। অন্য কিছু। তোমরা ঠিক বুঝবে না।
-
ওই সব একাকিত্ব দূর হয়ে যাবে যখন দেখবে তোমার পাশে কোন হুর পরী এসে থাকবে। তা তোমার তো কাউকেই পছন্দ হয় না। কতই তো হুর পরীকে তোমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলাম। আচ্ছা ধ্রুব সেইদিন আমার বাসায় যে মিলি নামের মেয়েটিকে দেখেছিলে তাকে কেমন লেগেছিল?
-
না ঠিক সেরকম নয়। আসলে ভাবি খুব দেশে যেতে ইচ্ছা করছে। হুটকরে একটা কোন গ্রামে যেয়ে হাজির হব। সেরকম কোন সুযোগ কি আছে।
-
আমার কাছে আছে, মিঠু বলল।
-
কিরকম?
-
আমরা একটা গ্রামের স্কুলে কিছু স্কলারশিপ পাঠাই কিন্তু এতদিন পরে জানতে পেরেছি যে সেই টাকা ওই হেডমাস্টারের পকেটে গেছে। আমরা সেই হেডমাস্টারকে বরখাস্ত করে ফেলেছি। তার পরিবর্তে যাবি নাকি?
-
মাথা খারাপ হয়ে গেলে আমেরিকার স্টক মার্কেট বন্ধ হয়ে যাবে না? - সোমা ভাবি বলে উঠে চলে গেল।
সেদিনকার মত আলোচনা আর এগুলো না। সবাই তাস খেলা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল। কথার কথা ভেবে তা উড়িয়ে দিল। তার কিছুদিন পরে সত্যি সত্যি তার অফিসে ছয় মাসের ছুটি চাইল। অফিস বাস্তবিক ভাবেই না করে দিলে। এবং ধ্রুব চাকরিটা ছেড়ে দিল। ধ্রুব তার জীবনটা খুব সুন্দর ভাবে কাটায় কাটায় পরিকল্পনা মাফিক কাটিয়ে এসেছে কিন্তু কেন যে এই রকম একটা বিনা অংকে এই কাজটি করল তা ঠিক বোঝা গেল না। আর তারপরেই ধ্রুব এসে হাজির হল মুক্তাপুরে।
যখন মুক্তাপুর ট্রেন স্টেশনে হাজির হল তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে আসছে। দূর আকাশ লাল হয়ে গেছে। ধ্রুব মুগ্ধ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তাকে নিতে কারো আসার কথা। চিঠিতে সেরকমই সে জানত। আসতে হয়তো দেরি হচ্ছে। একটু দূরে স্টেশনের চায়ের দোকানে চা খেতে বসল। এইখানে বেশ কড়া লিকোরে চা খায় নাকি? পাশে এক ভিক্ষুক সুন্দর করে গান গাইছে। অদ্ভুত সুন্দর তার গলা। ধ্রুব যাই দেখছে তাই মুগ্ধ হয়ে দেখছে। দীর্ঘ দশ বছর পরে সে বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছে কিন্তু সবকিছু মনে হচ্ছে যেন সময় কিছু কাটে নি। তার দেখার কিংবা মুগ্ধ হয়ে দেখার চোখটা এখনও সেই রকম রয়ে গেছে।
দূর থেকে একজন ছুটে তার দিকে আসলে। সে যে বাইরের লোক তা যে কেউ দেখেই টের পাবে।
-
আমার নাম মতবর। স্যার নিশ্চয় অনেক সময় ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।
-
না। এইতো এইমাত্র এলাম। তা আমাদের কত দূর যেতে হবে।
-
অনেক দূর। আপনার জন্য ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে এনেছি।
-
কি? ঘোড়ার গাড়ি?
-
জি স্যার। এই খানে এর প্রচলনই বেশি। এক ঘন্টার মত লাগবে।
ঘোড়ার গাড়িতে উঠে ধ্রুবর বেশ মজাই লাগছিল। কি সুন্দর একটা অদ্ভুত দোলানি। শরীরে একটা অন্য ধরনের আমেজ আসে আর সেই সাথে ঘোড়ার পায়ের খুরের শব্দটা বেশ অদ্ভুত। এই মতবর লোকটা বেশ বাচাল। একটার পরে একটা কথা বলে যাচ্ছে। গ্রামের কে কেমন। সবার জন্ম থেকে শুরু করে সব ইতিহাস বলেই চলছে। ধ্রুবর অবশ্য সেই দিকে মন নেই। ধ্রুব তাকিয়ে আছে দূরে অন্ধকারাচ্ছন্ন আম বাগানের দিকে। চারিদিক ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে। আর পাশের ছোট ছোট দোকান গুলির হারিকেনের আলোগুলি অদ্ভুত মায়াবী লাগছে।
ধ্রুব যখন স্কুলে এসে পৌঁছল তখন সেখানে হাফিজ সাহেব স্কুল দফতরে ছিল। পরবর্তিতে এই ভদ্রলোক ধ্রুবকে অনেক সাহায্য করেছিল।
- মতবর, স্যার আজকে ক্লান্ত হয়ে আছে। তার রাতের খাবারের ব্যবস্থা কর। আর স্যার আমি যাই। কাল তাহলে দেখা হবে।
সেদিনের মত ধ্রুবকে একটা বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিল। মতবর খাবার এনে দিল। প্রথম দিন ঠিক মত বুঝতে পারল না। তার পরের কয়েকদিন ধ্রুব বেশ ব্যস্ত থাকল। স্কুলের প্রশাসনের অবস্থা খুব খারাপ। আগের হেডমাস্টার সবকিছুকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তাই ধ্রুবকে পুরো গোড়া থেকে সব শুরু করতে হল। গ্রামের স্থানীয় লোকজন খুব সহজ সরল। একদিন গ্রামের চেয়ারম্যান তাকে বাসায় দাওয়াত দিল। সেখানে যেয়ে কিছুটা বুঝতে পারল যে গ্রামের লোকজন তাকে নিয়ে আসলেই কি ভাবছে। প্রবাস থেকে শখ করে গ্রাম ঘুরবার জন্য এসেছে। কিছুদিন পরে চলে যাবে।
স্কুলের অবস্থা আগের থেকে একটু একটু করে ভাল হতে থাকল। তবে শিক্ষকরা তার প্রতি সন্তুষ্ট হল না। তা ধ্রুব খুব ভাল মত বুঝতে পারল। ধ্রুবের দিনগুলি বেশ সুন্দর কাটতে লাগলো। বিকালের দিকে নদীর ধারে ধ্রুব হাটতে যায়। খুব ছোট্ট একটা নদী। কিন্তু ধ্রুবর বেশ ভাল লাগে। এই গ্রামে সপ্তাহে একদিন হাট হয়। ধ্রুব নিয়মিত হাটে যায়। যতটা বাজার করতে তার থেকে বেশি স্থানীয় লোকদের সাথে মিশতে। সবার ছেলেমেয়েকে স্কুলে পাঠানোর কথা বলতে। গ্রামের একটা মাত্র স্কুল বলে দায়িত্বটা একটু বেশি।
ধ্রুব নতুন একজন কম্পিউটারের শিক্ষক নেওয়ার কথা ভাবল। যদিও ধ্রুব এই বিষয়ের একজন এক্সপার্ট কিন্তু তারপরেও ধ্রুব ঠিক করল যে নতুন একজন শিক্ষক নেবে। কেননা সে যদি একদিন সত্যি সত্যি চলে যায় তবে যেন স্কুলটার কোন অসুবিধা না হয়। কিন্তু পত্রিকায় নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিলেও কোন লাভ হল না। আসলে এই অজপাড়াগায়ে কেই বা আসবে। কিন্তু তারপরেও অবাক করার মত কাণ্ড হল। একদিন একটা আবেদনপত্র এসে হাজির। অন্য কোন ক্যান্ডিডেট না থাকায় ধ্রুব তা গ্রহণ করে নিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা এক মেয়ে। হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আসতে চাইছে। তার কিছুদিন পরে এক বিকালে ধ্রুব নদীর ধারে বেড়াতে গিয়েছে। হঠাৎ দেখে মতবর তার দিকে এগিয়ে আসছে। মতবরের সাথে নতুন শিক্ষিকা। মতবরকেই রিসিভ করার জন্য পাঠিয়েছিল। কিন্তু তিনি এইখানে কেন? যখন তারা কাছে আসতে লাগল তখন ধ্রুব অবাক না হয়ে পেল না। সেই চেনা মুখ। এইখানে কেন হাজির। ধ্রুব নিজের অজানে মুখে অস্পষ্ট বলে উঠল - মিলি।
-
কি ব্যাপার, আপনি তো দেখি এইখানে একটা ভালমত রাজ্য গড়ে তুলেছেন।
-
আপনি?
-
হ্যা। কেন শুধু কি আপনি সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে আসতে পারেন। আর কেউ পারে না বুঝি।
-
না। মানে আপনি।
-
তার মানে আমার আসল নামটি আপনি বেমালুম খেয়ে ফেলেছেন।
ধ্রুব অপ্রস্তুত হয়ে গেল।
- মতবর সাহেব। আমার খুব ক্ষুধা লেগেছে আমার জন্য কয়েকটা সিঙ্গারা নিয়ে আনুন তো।
মিলি কি সাবলীল ভাবেই সব কিছুকে কিভাবে গ্রহণ করছে। পরে মিলির কাছে জানতে পারল যে সোমা ভাবিই এই কলকাঠি গুলি নেড়েছে। তবে মিলি কয়েকদিনের মধ্যে এই গ্রামে সবার মনে ঠাই করে নিল। মানুষের সাথে খুব সহজে মিশে যাওয়ার দারুণ ক্ষমতা রয়েছে। মিলি তাদের স্কুলে যোগ দেওয়ার সাথে সাথে ছাত্র-ছাত্রির সংখ্যা বেড়ে গেল। এর জন্য পুরো ক্রেডিট মিলিকেই দিতে হয়।
নিউইয়র্কে যে মেয়েটিকে একদিনের জন্য দেখেছিল, এই পরিবেশে তাকে একটু অন্যভাবে জানার সুযোগ হল। আর যত দিন যেতে লাগল মেয়েটি তার মনকে জয় করে নিতে লাগল। অথচ ধ্রুব অকপট ভাবে কিছুই বলার সুযোগ পেল না।
একদিন ধ্রুব মিলিকে নিয়ে নদীর ধারে হাটতে গেল। এই দিনেই মিলিকে তার মনে কথা বলার জন্য প্রস্তুত হল। মিলি সবুজ একটা শাড়ি পড়ে এসেছিল। অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল।
-
কি ব্যাপার? আজকে এত ঘটা করে যে আমাকে ডেকে নিয়ে এলেন।
-
না কই। এমনি হাটতে ইচ্ছে করল তাই।
-
তাই বুঝি। তা এই দুই মাস ইচ্ছে করল না। আচ্ছা আমাদের মধ্যে আর কিছু না থাক আমরা তো একে অপরের পরিচিত তাই না। আপনি এইভাবে আমাকে দূরে দূরে রাখেন কেন বলুন তো?
কি অকপটভাবেই না এই মেয়েটি সত্সফুর্ত ভাবে কথা বলতে পারে।
- যদি আপন করে নিতে চাই আসবেন?
ধ্রুব বলেই ফেলল। মিলি সাথে সাথে লাজুক হয়ে উঠল। যে মিলি চটপটে কথার পিঠে কথা বলে ফেলে সেই মিলি মুহূর্তের মধ্যে কেমনজানি বদলে গেল। খুব আস্তে আস্তে মাথাটা কয়েকবার নিচু করে ফেলল।
(দুই বছর পরে - নিউইয়র্ক শহরের এক শপিং সেন্টারে)
- মিলি দেখত এই কেকটা তোমার পছন্দের নাকি?
মিলি অবিকল সেই দিনের মত মাথা নেড়ে সায় দিল। একটা বিষণ ভাল লাগা ধ্রুবর শরীর বেয়ে গেল। মিলি ভারি শরীরটা সামাল দেওয়ার জন্য ধ্রুবর হাতটা শক্ত করে ধরল।
তারিখ: ২৫ আগষ্ট ২০০২