মশিউরের খেরোখাতা

জীবনের গল্প: আমি যেভাবে প্রস্ফুটিত শব্দটি শিখলাম

ছেলেবেলার একটি গল্প দিয়েই শুরু করি। এইচএসসি পরীক্ষার পরে কোথায় ভর্তি হবো, কি বিষয় নিয়ে পড়বো? এইগুলি নিয়ে তখন ভীষন রকমের দিশেহারা অবস্থা। বাবা’র কাছে জানতে চাইলেই তিনি বলতেন, “যেটা তোমার জন্য ভালো হয়, সেটাই পড়”। কিন্তু সমস্যা হল, আমি নিজেই তখন নিজেকে চিনি না। নিজের কোন বিষয়টি ভালো লাগে - তাই বুঝতে পারছিনা। তাই একটা গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেলাম।

ক্যাডেট কলেজে পড়াশুনার কারণে বিভিন্ন পেশার বড় ভাইদের সাথে পরিচয়ের সুযোগ হয়েছিল আমার। একদিন মনে হল যে মেরিন ইঞ্জিনিয়ার হবো, দেশ বিদেশ ঘুড়ে বেড়াব আর টাকা কামাই করবো। তার দুইদিন পরে কথা হল আমাদের কলেজের সাইফ ভাই (সঙ্গীত শিল্পী, তার বিখ্যাত গান: কখনও জানতে চেওনা) এর সাথে। তার সাথে কথা বলে মনে হল আর্কিটেক্ট বিষয়টাও তো চমৎকার। আবার কিছুদিন পরে আমার মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার আত্মীয়ের সাথে কথা বলে মনে হল - এই বিষয়টাও তো চমৎকার। এইভাবে যখন যেই বিষয়ের লোকজনের সাথে মিশছিলাম ঠিক তখনই সেটিই হতে ইচ্ছে করা শুরু করলো।

ক্যাডেট কলেজে পড়ার কারনে আমাদের তখন প্রতিরক্ষাবাহিনীতে (আর্মি) যোগ দিতে উৎসাহ দেয়া হত। তাদের সুবিধা, থাকার বাড়ি-গাড়ি দেখে মনে হল এই ক্ষেত্রটাতে অন্তত চাকুরির নিরাপত্তা আছে। অন্য বিষয়গুলি নিয়ে পড়লে চাকুরির সম্ভবনা অনেক কঠিন হবে বলে- মনে মনে আর্মিতে যোগ দেবার কথাই ভাবলাম।

ছেলেবেলা থেকেই মানুষদের সাথে মিশতে তাদের কথা শুনতে ভালো লাগতো। সেই সুবাদে একদিন হানা দিলাম আমার মামি’র বাসায়। আমার এই মামি এর গল্প মনে হয় আপনাদের অনেক বলেছি, তারপরেও আবার বলছি। তিনি হলেন অনামিকা হক লিলি, যিনি বেগম গুল বাহার নামেও পরিচিত। ছেলেবেলাটা কেটেছে তারই লেখা বইগুলি পড়ে। কারণটা হল ছেলেবেলায় ঢাকার মোহাম্মদপুরের যে বাসাতে আমরা থাকতাম- সেটাই ছিল সেই মামির ঠিকানা। তাই প্রকাশকরা তার নতুন বই প্রকাশ করলে- সেই ঠিকানায় পাঠাতো। আবার নতুন কোন লেখকরা তাদের বই ছাপার পরে, খ্যাতনামা লেখকদের পাঠাতেন। বইগুলি রিভিও করে দেবার জন্য। এখন লেখকদের আর সেই চলটি নেই। মামির হাতে যাবার আগে, সেই বইগুলি আমার হাতেই এসে পড়তো। ছেলেবেলায় স্কুল থেকে ফিরেই ছাদে চলে যেতাম। আকাশে ঘুড়ি উড়ছে আর আমি মামির ভ্রমণ কাহিনি পড়ে বড় হচ্ছি। আমার লেখক হয়ে উঠার পিছনে এই বেগম গুল বাহার-ই মুল প্রভাবকের মতন কাজ করেছে। তার ভ্রমণ কাহিনি পড়ে মনে হতে লাগলো- একদিন এইভাবে দেশ বিদেশে ঘুড়ে বেড়ালে মন্দ হয় না।

মূল গল্পে আসা যাক- একদিন ধানমন্ডিতে লিলি মামির বাসায় হানা দিয়েছি, তার প্রকাশিত নতুন বইটি নেবার জন্য। আমার এই আবদারগুলির সাথে তিনি পরিচিত। তার প্রকাশিত নতুন বইটি দিলেন। মামি খুব পরিপাটি করে ঘর গুছিয়ে রাখতেন। দেশ বিদেশে ঘুড়ে ঘুড়ে বিভিন্ন ধরনের সৌখিন সুভেনিয়র এবং সুদর্শনীয় শোপিস নিয়ে ঘর সাজাতেন। আমি অবাক হয়ে তার নুতন সুভেনিয়রগুলি দেখছি। চীন থেকে আনা একটি কাঠের পুতুলটাকে অবাক বিষ্ময়ে দেখছিলাম। কাচের গ্লাসে শরবত ঢালতে ঢালতে মামি জিজ্ঞাসা করলেন,

“উজ্জ্বল, কি হবে ঠিক করলে?”

(হ্যা ঠিকই পড়েছেন, সেটাই আমার ডাক নাম)

সেই সময়টাতে আমি ঠিক করে রেখেছিলাম আর্মিতে যাবো।

তাই নির্দ্বিধায় বললাম, “আর্মিতে যাবো মামি”।

মামি আমরা কথা শুনে শরবত ঢালা বন্ধ করে- অবাক বিশ্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তখন তিনি একটি কথা বলেছিলেন, যে কথাটা আমাকে ভীষণ রকমের নাড়া দিয়েছিল। এত বছর পার হয়ে গেলেও সেইদিনের বিকেলের সেই দৃশ্যটি এখনও আমার হৃদয়ে ভাষ্কর হয়ে আছে। মামি বললেন

  • কিন্তু আর্মিতে গেলে তুমি তো প্রস্ফুটিত হতে পারবে না।

আরো কিছু টুকটাক কথা বলে আমি ফিরে এলাম, কিন্তু এই “প্রস্ফুটিত” শব্দটি মাথায় নিয়ে চলে এলাম। অভিধানে দেখলাম লেখা আছে,

প্রস্ফুট, প্রস্ফুটিত [ prasphuṭa, prasphuṭita ] বিণ.

1 পূর্ণ বিকশিত, সম্পূর্ণরূপে ফুটেছে এমন (প্রস্ফুটিত জ্যোত্স্না, প্রস্ফুটিত ফুল);

2 সম্পূর্ণ প্রকাশিত বা ব্যক্ত।

[সং. প্র + √ স্ফুট্ + অ, ত]।

প্রস্ফুটন বি. প্রস্ফুটিত হওয়া, ফোটা; প্রকাশ বা বিকাশ।

কিন্তু আর্মিতে যাবার সাথে এর কি সম্পর্ক? সেটা নিয়ে ভাবতে বসলাম। পরে বুঝলাম যে, নিজেকে কোথায় যেয়ে আমি নিজেকে প্রস্ফুটিত করতে পারবো সেটাই করতে হবে আমাকে। এর পরে চেষ্টা করতে লাগলাম, নিজের একান্ত বিষয় কোনটি? যেটা আমার ভালো লাগে, যেটাতে আমি ডুব দিয়ে থাকতে পারি, সেটাই নিতে হবে আমাকে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত নিলাম, প্রযুক্তিবিদ হব। সেটাই আমার মুল জায়গা, সেটাই ভালো লাগে আমার। সেটাকেই পেশা হিসাবে নিব - এটাই দৃঢ় ভাবে সিদ্ধান্ত নিলাম।

সবার দোয়া এর আল্লাহর রহমতে, এরপরে বুয়েট এ ভর্তি হলাম। তারপরে জাপানে বৃত্তি নিয়ে চলে গেলাম টোকিও-তে। সেখানে নিজেকে প্রস্ফুটিত করবার চেষ্টা করতে লাগলাম। জাপানে পড়াশুনার পাট চুকিয়ে চলে গেলাম আমেরিকায়। নতুন দেশে আবার প্রস্ফুটিত এর চেষ্টা। সেখান থেকে দেশে ফিরে এসে নর্থ সাউথে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা। তারপরে সিঙ্গাপুরে চলে এলাম। কাজ করলাম বিজ্ঞানী হিসাবে। সেখান থেকে চলে এলাম ডিজিটাল হেল্থকেয়ার ক্ষেত্রে। একজন প্রযুক্তিবিদের ভ্রমণ এবং পাশাপাশি একজন লেখকের প্রস্ফুটিত হবার যাত্রা।

মামির সাথে সেইদিনের দেখা হবার পর থেকেই - আমি নিজেকে প্রস্ফুটিত করার ভ্রমনে আছি। এই জীবন চলার পথে চলতে চলতে “প্রস্ফুটিত” শব্দটির অর্থ আমি উপলব্ধি করতে পেরেছি। নিজের ভিতরে ঢুকে যেয়ে - নিজেকে আবিষ্কার করেছি। নিজেকে কোন নির্দিস্ট প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেঁধে ফেলা নয়। নিজের গুণগুলিকে লালিত করে, ঘসে-মেজে নিজেকে প্রস্ফুটিত করা। এইভাবে এই জীবন চলার পথ চলতে চলতে এই শব্দটিকে আত্মস্থ করে, নিজের মতন করে আবিষ্কার করার চেষ্টা।

পাঠকদের কাছে প্রশ্ন, কিভাবে আপনি নিজেকে প্রস্ফুটিত করছেন?

(কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি লিলি মামির কাছে এইভাবেই “প্রস্ফুটিত” শব্দটির সাথে আমার পরিচয় করে দেবার জন্য। এবং আল্লাহ তাআলার কাছে শুকরিয়া এমন বৈচিত অভিজ্ঞতা এর মাধ্যমে নিজেকে প্রস্ফুটিত করবার চেষ্টা এর সুযোগ পাওয়া)

ড. মশিউর রহমান

সিঙ্গাপুর, ২৭ অক্টোবর ২০২২

https://godagari.github.io/