মশিউরের খেরোখাতা

১৮: প্রত্যাশাগুলো ম্যানেজ করুন (২০ জানুয়ারী ২০২০)

তারিখ: ২০ জানুয়ারী ২০২০

একটি গল্প দিয়েই শুরু করা যাক-

আবির পড়াশুনা করেছে ইকনোমিকস নিয়ে। ঢাকাতে একটি মাল্টিন‍্যাশনাল কম্পানিতে চাকুরিতে ইন্টারভিউ এ চান্স পেয়েছে। শিক্ষাজীবন শুরু করে এটাই তার প্রথম চাকুরি হবে। এর আগে অনেকগুলি ইন্টারভিউ দিলেও কোনটি থেকেই পজেটিভ কোন উত্তর আসেনি। সে ভাবছিল হয়তো ইন্টারভিউতে সে খুব একটা ইমপ্রেস করতে পারেনি, তাই চাকুরিগুলো হয়নি। তাই সে এইবার ঠিক করলো ইন্টারভিউতে যথা সম্ভব ইমপ্রেস করার চেস্টা করবে।

এইবার সাক্ষাতকারটি হল ইংরেজীতে। আবির যেহেতু ইংরেজীতে মিডিয়ামে পড়াশুনা করেছে, ব্রিটিশ কাউন্সিলে নিয়মিত কোর্সগুলো করেছে এবং অনলাইনে সে বিদেশী বন্ধুদের সাথে কথা বলতে পারে, তাই সে ইংরেজীতে খুব সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারে। পরীক্ষকদের খুব ভালো লাগলো আবিরকে।

এই চাকুরির ক্ষেত্রে কাজটিতে বেশ কিছু ডাটা এনালাইসিস নিয়ে কাজ করতে হবে। ইকনোমিকসের ছাত্র হিসাবে তার এই সমন্ধে হালকা ধারনা ছিল, কিন্তু সরাসরি কোন কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল না।

কিন্তু আগের মতন আর সে ভুল করলোনা। এইবার সে পরীক্ষকদের ইমপ্রেস করার জন‍্য একটু বাড়তি কথা বলে ফেলল। সে মূল কোর্সের পাশাপাশি ভালো ডাটা এনালাইসিস করতে পারে এবং কম্পিউটারে সে খুবই দক্ষ। তার বন্ধুর কাছে শুনেছিল ম‍্যাথলাব নামে যে সফটওয়‍্যারের নাম শুনেছিল, তা বলতে দ্বিধা করলোনা। উপরস্ত সে একটি বাড়িয়েই বলল যে ম‍্যাথল‍্যাবে খুবই দক্ষ, অনেক এনালাইসিস সে করে রিপোর্ট করেছে.. ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। আগ বাড়িয়ে আরো যা নয় তা বলে ফেলল। আবির মনে মনে ভাবলো আগে চাকুরিটি তো পাই, তারপরে না হয় দেখা যাবে।

তার বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে ও স্মার্ট প্রেজেন্টেশন করার কারনে তার চাকুরিটি হল। প্রতিষ্ঠানের লোকজন ভাবলো যাক তাদের একজন দক্ষা এনালিস্ট পাওয়া গেল। প্রতিষ্ঠানে যোগ দেবার পরে যা হল তা জন‍্য আবির প্রস্তুত ছিলনা। কয়েকদিন পরে তার ম‍্যানেজার, তাকে একটি ছোট এনালাইসিসে কাজ দিল। বেগতিক দেখে আবির তার এক বন্ধুকে ধরে সেই কাজগুলি করে নিল। এবং এই ধরনের কাজ করা যে আবিরের জন‍্য কোন ব‍্যাপারই নয় তা ম‍্যানেজারকে বলেই দিল।

তার কাজ দেখে তার ম‍্যানেজার খুব খুশি। এর পরে বিশাল ডাটা ও তথ‍্য ধরিয়ে দিয়ে তার এনালাইসিস এর কাজ গুলো দিল। আবির ভাবলো, একটু শিখে নিলেই সে পরবো। তার বন্ধু বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন‍্য চলে যাওয়ায় বেগতিক অবস্থায় পড়লো আবির। সে একটু শেখার চেষ্টা করলো, কিন্তু ব‍্যাপারটা এতটা সহজ ছিলনা। তার বস জিজ্ঞেস করলে সে বলল, হ‍্যা সে কাজটা করছে এবং কাজ ভালো মতনই চলছে। কয়েক সপ্তাহ পরেই সে রেজাল্টগুলি দিবে।

কিন্তু যতই দিন এগুতে লাগলো ততই ব‍্যাপারটি তার জন‍্য কঠিন বলে মনে হতে লাগলো। বেচারা প্রেজেন্টেশনের আগে মোটামোটি অফিস থেকে লাপাত্তা। তার মোবাইল বন্ধ করে গ্রামের বাড়িতে ছুটিতে চলে গেল।

আগ বাড়িয়ে সে তার প্রতি সবার প্রত‍্যাশাটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

আবির শুধু মাত্র অফিসে জয়েন করার সময় এই ভুলটি করেছিল। কিন্তু অনেক সময় কর্পোরেট লাইফে আমরা নতুন কোন প্রোজেক্টে হাত দেবার সময় আমরা এমন করেই নিজেদের সমন্ধে বলতে যেয়ে একটু বেশীই বলে আমাদের প্রতি অন‍্যের প্রত‍্যাশাটা বাড়িয়ে দিই।

আপনার প্রতি টিমের সবার প্রত্যাশা বা এক্সপেক্টেশন করবে সেটাই স্বাভাবিক। কেননা আপনি চাকুরিতে কিছু রোল বা দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু আপনার প্রতি অন‍্যের প্রত‍্যাশাগুলো সুন্দর ভাবে ম্যানেজ করা প্রয়োজন। আপনি যদি সবাইকে খুব বড় বড় আশার কথা বলেন, আমি এটা পারবো, সেটা পারবো, অথচ বছর শেষে দেখা গেল যে আমি তেমন কিছু দিতে পারেননি সেটা এক দিক দিয়ে যেমন খারাপ, আবার অপরদিকে আমি একটু বেশী ডিফেন্সিভভাবে বা সাবধান ভাবে তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ আশার কথা শোনালেননা, সেটাও ভালো ফলাফল আনে না।

এর বিপরীতে অনেক সময় আমরা একটু সাবধানে কম লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করি। তার পিছনে একটি কারণ হল সেই লক্ষ‍্যমাত্রার থেকে একটু বেশি দেখিয়ে সবাইকে খুশী করবো। এই রকম করলেও সেই ক্ষেত্রে আপনার প্রতি প্রত্যাশা একটু কমেই যাবে। বেশী না আবার কমও নয়, তেমন ভাবে আপনার প্রতি প্রত্যাশাটি ম্যানেজ করা প্রয়োজন।

আবার অনেকে গা বাচানোর জন‍্য কোন প্রত‍্যাশায় কাউকে দেননা। খুব ব‍্যস্ত ইত‍্যাদি ইত‍্যাদি। সেই ক্ষেত্রে আপনাকে দিয়ে কিছু হবে না, তেমন ম‍্যাসেজটাই সবাই পাবে। সেটা আপনার ক‍্যারিয়ারের জন‍্য ভালো হবে না।

আপনি যতটুকু পারবেন ঠিক তেমন ভাবেই লক্ষ‍্যমাত্রা ঠিক করা প্রয়োজন। সেই ক্ষেত্রে আপনার প্রতি সবারই কনফিডেন্স বাড়বে এবং আপনার নিজস্ব ব‍্যান্ডিংটি ভালো হবে।