ব্যাটারিচালিত রিকশা কি সত্যিই“গরিব মানুষের উপার্জনের পথ?
তারিখ: ৯ এপ্রিল ২০২৬
ব্যাটারিচালিত রিকশাকে আমরা অনেক সময় “গরিব মানুষের উপার্জনের পথ” বলে দেখি। কিন্তু একটু গভীরভাবে তাকালে দেখা যায়, এটি আসলে এক নির্মম শোষণের চক্র।
চালক সারাদিন রোদে-বৃষ্টিতে শ্রম দেয়, কিন্তু দিনের শেষে তার আয়ের বড় অংশ চলে যায় গ্যারেজ মালিক, কিস্তি, সুদ আর ঋণের পেছনে। যে মানুষটি রিকশা চালায়, সে আসলে নিজের জন্য যতটা না কাজ করে, তার চেয়ে বেশি কাজ করে অন্যের লাভ তোলার জন্য। এ কেমন অর্থনীতি?
গ্রাম থেকে উচ্ছেদ হওয়া, জমি হারানো, বা কাজ হারানো মানুষ শহরে এসে সম্মানজনক কোনো আনুষ্ঠানিক চাকরিতে ঢুকতে পারে না। কারণ সেই দরজা তাদের জন্য খোলা নয়। ফলে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় এই অনিরাপদ, ঋণনির্ভর, অস্থায়ী জীবিকার দিকে। অর্থাৎ এই পেশা অনেকের “পছন্দ” নয়, বরং “বাধ্য হওয়া”।
প্রযুক্তির কথা বলে আমরা খুব গর্ব করি। বলা হয়, ব্যাটারিচালিত রিকশা আধুনিকতার প্রতীক। কিন্তু বাস্তবতা হলো—প্যাডেলের শারীরিক কষ্ট কমলেও তার জায়গা নিয়েছে ঋণের বোঝা, চড়া সুদ, আর প্রতিদিনের দুশ্চিন্তা। শরীরের ঘাম কমেছে, কিন্তু জীবনের চাপ বেড়েছে বহুগুণ।
সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এই পুরো ব্যবস্থাকে রাষ্ট্রও এক অদ্ভুত ভঙ্গিতে চালতে দিচ্ছে। পুরোপুরি বৈধও করছে না, আবার বন্ধও করছে না। কারণ সস্তায় “লাস্ট মাইল” পরিবহন পাওয়া যাচ্ছে, মানুষ কোনোভাবে বেঁচে থাকছে, শহরও চলছে। কিন্তু নিরাপত্তা, বীমা, শ্রমিক অধিকার, সড়কনিয়ম, জবাবদিহি—এসবের দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। লাভ আছে, দায় নেই—এটাই কি নীতি?
আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে গরিব মানুষের শ্রম মানেই হবে ঋণের ফাঁদ, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা, আর আইনের বাইরে থেকে বেঁচে থাকার সংগ্রাম?
একটি সভ্য রাষ্ট্রে পরিবহনব্যবস্থা শুধু সস্তা হলেই চলে না, ন্যায্যও হতে হয়। শ্রমিক শুধু টিকে থাকলেই হয় না, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার সুযোগও পেতে হয়।
ব্যাটারিচালিত রিকশার এই পুরো ইকোসিস্টেম আসলে উন্নয়নের গল্প নয়; এটি আমাদের বৈষম্য, অব্যবস্থা, এবং নীতিগত ভণ্ডামির আয়না।
