জ্ঞানপাপী
আজ আমি আপনাদের সরাসরি একটু গালমন্দ করবো৷ আমরা যারা প্রবাসে আছি তাদের একটা বড় অংশই জ্ঞানপাপী৷ কি মাইন্ড করলেন? জানি আমার এই কথা হয়তো অস্বীকার করবেন৷ ভাববেন, কি ব্যপার লেখক হটাত্ করেই বা কেন এমন কথা বলল৷ বিভিনড়ব যুক্তি তর্ক দিয়ে তা খন্ডন করবার চেষ্টা করবেন৷ আপনারা আপনাদের অবস্থানে থেকে যে সব কর্মকান্ড করছেন তা হয়তো তুলনা করে বলবেন৷ ব্রেণড্রেন কথাটি আমরা অনেকেই অস্বীকার করি৷ পরিবার পরিজনের কথা ভেবে ভাল একটা অবস্থানে থাকার জন্যই আমরা প্রবাসে আছি.. যে কাজ করতে চাই তা দেশে থেকে করা সম্ভব নয়… দেশে কাজ করার পরিবেশ নেই… ইত্যাদি ইত্যাদি যুক্তি দিয়ে তা খন্ডন করবেন৷ কিন্তু আমরা প্রবাসে বসে যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করছি যে জ্ঞান অর্জন করছি তা আমরা কতটুকু দেশবাসিকে জানাতে পারছি৷ জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা আর্জন করার পরে, একটা দায়িত্ব আমাদের চলে আসে, দায়িত্ব থাকে সেই জ্ঞানটা অন্যকে পৌছে দিতে৷ আর সেই দাবিটা প্রথমেই বেশী করবে সে, যে দেশ আপনাকে গড়ে তুলেছে৷ হুম এটা ঠিক যে সেই বাংলাদেশ হয়তো আমাদের চাহিদা মোতাবেক পরিবেশ দেয়নি৷ নেতারা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত৷ মাস্তান তন্ত্রে দেশটি চলছে৷ গতবছর বাংলাদেশে যেয়ে বন্ধুদের সাথে সময় কাটাচ্ছিলাম, হটাত্ দেশনিয়ে কথা উঠাতে এক বন্ধু বলছিল, “দেশটা খালেদা হাসিনা নয় সয়ং আল্#৮৭২২;াহই চালাচ্ছে তাইতো কোনমতে চলছে৷” কথাটি কিন্তু মিথ্যা না৷ আজ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে৷ এই দেশটাকে আমাদের এখন জাগান প্রয়োজন৷
বাংলাদেশে থাকতে আমরা একটা ছোট কুয়াতে বসবাস করতাম৷ বাহিরে এসে জানতে পারলাম, কত ছোট্ট একটা জায়গায় ছিলাম৷ কোন দেশ থেকে এসেছি বললে বুঝিয়ে বলতে হয়৷ অনেকক্ষণ তাকাবার পরে বলে ও ভারতের পাশের দেশ৷ কিছুদিন আগে আমার স্ত্রী জাপানী ভাষা শিখতে যেয়ে প্রথমেই তাকে এই ধাক্কাটি খেতে হয়েছিল৷ বাংলাদেশের নাম শুনে তার শিক্ষক বলছিল ঠিক আছে বুঝলাম ভারতের পাশের এক দেশ তাই আমি তোমাকে ভারতীয় ডাকবে৷ আমার স্ত্রীর তাতে আতে লাগে তাকে বুঝিয়ে বলে যে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ এবং সে বাংলাদেশী৷
আমরা বাহিরে এসে বুঝেছি শুধু মুজিব জিয়াকে নিয়েই পৃথিবী চলেনা৷ কোন ভার্সিটির ছাত্রাবাসের নামকরণের জন্য কোথায় ভার্সিটি বন্ধ হয়ে থাকেনা৷ পৃথিবী চলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নিয়ে, অর্থনীতি নিয়ে৷ সারা পৃথিবী ব্যস্ত বায়োটেকনলজি ও নানোটেকনলজি এসব প্রযুক্তিতে নিজেরা একটা ভাল অবস্থানে থাকার জন্য৷ সামনের দিনগুলিতে টিকে থাকার জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহন করছে৷ অথচ আমরা কোথায়! আমাদের পাশের দেশ আইটি কে ঠিকমত ব্যবহার করে কত ভাল অবস্থানে চলে গেছে৷ আমরা তাদের সিনেমা, গল্প, গান সবই নকল করতে পারি, সেসব উপভোগ করতে পারি, কিন্তু তাদের কাছ থেকে এই ছোট প্রয়োজনীয় জিনিসটা শিখতে পারলামনা৷ অপ্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে নাচানাচি করছি৷ আর আমরা তাদের মত অবস্থানে না যেতে পেরে হিংসায় ছটফট করছি৷ বাংলাদেশের আইটি তে কাজ করে এমন অনেককেই দেখেছি তারা এই ভারতীয়দের কত হিংসায় জ্বলে পুরে মরছে৷ বাংদেশের একজন প্রোগ্রামার ভারতীয়দের থেকে কম মর্যাদা পাচ্ছে ইত্যাদি নিয়ে হৈ চৈ করছে৷ কিন্তু তার জন্য যে সে নিজেই দায়ি তাই অস্বীকার করছে৷ আজকে সারা পৃথিবী ভারতীয়দের পাত্তা দিচ্ছে আর বাংলাদেশীদের পাত্তা দিচ্ছে না তার কারণ কি? তার কারণ ভারতীয়রা কষ্ট করে বিভিনড়ব ক্ষেত্রে তাদের অবস্থান ভাল জায়গায় নিয়ে এসেছে৷ অথচ আমরা সেটা পারিনি৷ আর সেটি না করতে পেরে আমরা হৈচৈ করছি৷ আইটি ক্ষেত্রে অোমাদের পদচারণা হল আমাদের মেধাবী কিছু ছেলে বিদেশে যেয়ে প্রোগ্রামিং কনটেস্টে কিছু সোনার মেডেল নিয়ে আনছে, কিন্তু আমরা জানতে পারছিনা, তারা পরবর্তীতে কি করছে৷ দেশের মূল স্রোতে কোন ভূমিকা রাখছে নাকি আমেরিকা কিংবা অন্যকোথায় যেয়ে সুখে সাচ্ছন্দে একটা জীবন কাটাচ্ছে৷ দেশ শুধু সোনার মেডেল চায় না, দেশ চায় তারা পরবর্তিতে দেশের উনড়বতিতে কতটুকু ভুমিকা রাখছে৷
আমদের দেশের মেধাবী ছেলেমেয়ের একটা বড় অংশই স্বপড়ব দেখে – ফার্স্ট ক্লাস পেয়ে ভার্সিটিতে শিক্ষক হিসাবে জোগ দিতে৷ তাতে বউ বাচ্চা নিয়ে সুখে জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারে৷ কিন্তু আমার মনে হয় আমাদের ঠরংরড়হ এর অভাব রয়েছে৷ আমাদের চিন্তা করতে হবে কিভাবে আরো সামনে এগিয়ে যাবার জন্য কি কি করা যায়৷ নতুন কিছু না করলে কিছুই হবেনা৷ আমি সেজন্য সব সময় নবীনদের বলি, নতুন করে ভাবতে শিখ৷ যা প্রচলিত তা নয়.. নতুন কিছু চিন্তা না করলে সামনের জীবনে টিকে থাকতে পারবেনা৷ যদি কিছু একটা করতে চাও তবে তেমনি নতুন কিছু কর৷
আমাদের পাশেরই একটা দেশ, মালয়েশিয়া একসময় আমাদের মত একই কাতার এ ছিল৷ অথচ আজ তারা কত এগিয়ে গেছে৷ আজ মালয়েশিয়াতে গেলে আপনারা দেখতে পাবেন যে সেখানে উনড়বতির জোয়ার বয়ে যাচ্ছে৷ আমরা ধুমধারাক্কা গান বাজনা নকল করতে পারি কিন্তু কেন ভাল কিছু নকল করতে পারিনা৷
আজ আমি আপনাদের জাপান এর কথা তুলে ধরবো৷ বাংলাদেশের মত জাপান এর অভ্যান্তরীন সম্পদ কিছু নেই৷ কিন্তু তারা সব সময় অন্য জাতি থেকে অনেক কিছু নিজেদের মত করে গ্রহন করে৷ যেটা প্রয়োজন যেটা তার অস্তিত্বের জন্য ভাল তা সে গ্রহন করে৷ আপনারা যদি জাপানি বাড়ীতে যেয়ে থাকেন তবে দেখবেন যে তারা ইউরোপীয়ান অনেক প্রযুক্তি বাড়ি তে ব্যবহার করেছে৷ কিন্তু তারা প্রাচীনকাল থেকে যে মাদুর জাতিয় মেঝে ব্যবহার করে যাকে তাতামি বলে, তা কিন্তু উনড়বত করে ব্যবহার করছে৷ তারা বাহিরে প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখবার জন্য৷ বাহিরে কোন বই বিখ্যাত হলে সাপ্তাহখানেকের মধ্যে তা জাপানী ভাষায় অনুবাদ হয়ে যায়৷ বিজ্ঞানের প্রায় সব বিখ্যাত বই এর জাপানি অনুবাদ আপনি পাবেন৷ অথচ আমরা সবদিকে এত মাতৃভাষার প্রতি জোর দিই, জাতিসংঘে আমাদের নেতার বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিয়ে ভাবেন যে বাংলাভাষার জন্য তিনি একটা মাইলফলক গড়লেন৷ অথচ সেইভাবে ভাষাকে সমৃদ্ধ করা যায়না৷ ভাষাকে সমৃদ্ধ করবার জন্য আমাদের প্রয়োজন বাহিরের জ্ঞানকে নিজেদের ভাষায় অনুবাদ করা৷
যে কথা বলছিলাম৷ আমরা প্রবাসে সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে খুব ভাল অবস্থানে আছি৷ আমাদের উচিত বাংলাভাষায় নিজের সেই অভিজ্ঞতা কে দেশবাসীকে জানান৷ তা লিখে হতে পারে কথা বলে হতে হবে৷ লিখে সেই অভিজ্ঞতা প্রকাশের জন্য যে আপনাদের খুব ভাল লেখক হতে হবে তা নয়৷ নিজ ভাষাতেই লিখুন আপনার অভিজ্ঞতা কথা এতদিন ধরে আপনার অর্জিত জ্ঞান যেটা মনে হবে দেশের জন্য জানা প্রয়োজন৷ লিখুন বিজ্ঞানের উপর, লিখুন আপনি যে বিষয়ে গবেষনা করছেন, লিখুন যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, লিখুন আপনার ব্যবসার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কথা, লিখুন আপনার কম্পানির ম্যানেজমেন্ট এর কথা ইত্যাদি ইত্যাদি৷ চিন্তা করে দেখুন আমরা প্রবাসে সবাই যদি একটি করে বিজ্ঞানে বই এর অনুবাদ করি তাহলে আমরাও জাপানের মত করে বাংলাতে আমাদের জ্ঞানভান্ডার বাড়াতে পারি৷ হুম তাতে সপ্তাহ খানেকের মধ্যে দেশে উনড়বয়নের জোয়ার বয়ে যাবে, তা নয়৷ কিন্তু একদিন নিশ্চয় ভবিষ্যত প্রজন্ম আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে৷ এ কথা আমি হলফ করে বলতে পারি৷
প্রবাসীরা হয়তো ভাবতে পারেন, তাতে কি হবে৷ একটু চিন্তা করে দেখুন, দেশের উনড়বতিতে কিন্তু প্রবাসীরা অনেক ভুমিকা রাখছে৷ আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে বড় রিজার্ভ গড়ে উঠছে, যে ডাটা দিয়ে আমাদের নেতারা বড়াই করে৷ গর্ব করে বলে আমাদের সময় বৈদেশিক রিজার্ভ খুব ভাল ছিল… ইত্যাদি ইত্যাদি৷ সেক্ষেত্রে মূল ভুমিকা রাখছে কে? দেশের ঋণখেলাফি ব্যবসায়ীরা নাকি প্রবসীরা৷ মূল ভূমিকা রাখছে আমরা – এই প্রবাসীরা৷
যে দেশ ঘুমিয়ে রয়েছে তাকে জাগান দরকার৷ সেই কাজটা করবে কে? হাসিনা না খালেদা? তাদের কে দায়িত্ব দিয়ে যে কিছু হবেনা তাতো এতদিনে নিশ্চয় বুঝতে পেরেগেছেন৷ তাহলে থাকে কে? তাহলে থাকে আপনি, যে আপনি এই লিখাটি পড়ছেন৷ চলুন আমরা নিজেদের জ্ঞানকে প্রচার করি৷ দেশকে জানতে দিই কিভাবে অন্যদের মত আমরাও এগিয়ে যেতে পারি৷ তাতে অন্তত এই জ্ঞানপাপী শব্দটা মুছতে পারি৷
হুম বলতে পারেন যে, লিখলাম কিন্তু তা কিভাবে জানাব৷ আপনারা হয়তো জানেন না যে বাংলাদেশে বই ছাপাতে খুব খরচ হয়না৷ প্রবাসে থেকে সেইরকম খরচ করবার ক্ষমতা আমাদের সবার আছে৷ আত্মীয় কেউ অসুস্থ হলে আমরা মোটা অংকের টাকা অনেকেই সংগ্রহ করে ফেলতে পারি৷ কিন্তু বই ছাপাতে গেলে হয়তে সেই কিপটা মনে আঘাত আসতে পারে৷ সেই টাকাটা বই ছাপাতে ব্যবহার করুন৷ যদি মনে করেন যে আপনার লেখাটা তেমন ভাল হচ্ছে না৷ তবে ইন্টারনেটে অনেককেই পাবেন, যেখানে অনেকেই রয়েছে আপনার বিষয়ের উপর৷ তাদের সাথে আলোচনা করুন আপনার লিখাটি নিয়ে৷ কয়েকজনের সাথে আলোচনা করলে ভাল কিছু বের হয়ে আসবে৷ তাই চলুন আমরা লিখি৷ আমাদের জ্ঞান আমরা দেশবাসীর কাছে পৌছে দিই৷
এছাড়া ইন্টারনেটে বাংলাদেশের অনেক পত্র পত্রিকা প্রকাশিত হয়৷ ইমেইল এ সরাসরি সম্পাদক কে আপনার লিখাটি পাঠাতে পারেন৷ কিংবা ইন্টারনেটে অনেক জায়গা আছে যেখানে তারা আপনার লেখার সম্মান ঠিকই দিবে৷ এইবার চিন্তা করতে বসুন- আপনার কোন জ্ঞানটি আপনি আরেকজনের কাছে পৌছে দিতে চান৷
১৪ই জুলাই ২০০৩