মশিউরের খেরোখাতা

GITEX AI: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলায় একটি স্বাভাবিক বাঙালি সন্ধ্যা

তারিখ: ২০ এপ্রিল ২০২৬

গতকাল GITEX AI-এ গেলাম। বিশাল আয়োজন। হাজারো বুথ, হাজারো মানুষ — সবাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে এসেছে। কেউ বলছে "আমাদের LLM কাস্টমাইজড", কেউ বলছে "আমাদের AI পার্সোনালাইজড"।

তবে সবচেয়ে চোখে পড়ল ভারতের আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো। এরা একসময় বলত, "আমরা আপনার কোড লিখে দেব, ডেটা এন্ট্রি করে দেব, কল সেন্টার চালিয়ে দেব।" অর্থাৎ, পৃথিবীর যত নিচু কাজ আছে, সব করতে রাজি — শুধু ডলার দিন। এই ছিল তাদের মহান ব্যবসায়িক দর্শন।

কিন্তু AI আসার পর এদের অবস্থা হলো সেই পুরনো গল্পের মতো — যে মাঝি সারাজীবন নৌকা বেয়েছে, হঠাৎ শুনল সেতু হয়ে গেছে। এখন কী করবে? নৌকা ছেড়ে দেবে, নাকি সেতুর উপর নৌকা তুলে বসবে?

ভারতীয় কোম্পানিগুলো দ্বিতীয়টাই বেছে নিল।

এখন তারা বলছে — "আমরা আর শুধু কোড লিখি না, আমরা আপনার জন্য কাস্টমাইজড LLM বানিয়ে দেব।" আগে বলত, "আমাদের পাঁচশো ইঞ্জিনিয়ার আছে।" এখন বলছে, "আমাদের পাঁচশো AI ইঞ্জিনিয়ার আছে।" লোক একই, শুধু ভিজিটিং কার্ডে "AI" শব্দটা ঢুকে গেছে। ঠিক যেমন পাড়ার মুদি দোকানদার রাতারাতি "সুপারশপ" হয়ে যায় — ভেতরে একই চাল-ডাল, বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ড।

কৌশলটা অবশ্য নেহাত খারাপ নয়। আউটসোর্সিং মানে ছিল — মানুষ দিয়ে কাজ করাও, কম পয়সায়। AI কাস্টমাইজেশন মানে — এবার AI দিয়ে কাজ করাও, কম পয়সায়। মাঝখানে শুধু "মানুষ" সরে গিয়ে "মডেল" এসেছে। মূল ব্যবসায়িক দর্শন অটুট।

এককথায়, ভারতীয় IT কোম্পানিগুলো প্রমাণ করল যে — বেঁচে থাকার জন্য চামড়া বদলাতে হয়, মেরুদণ্ড নয়।

কোরিয়া এসেছে ছয়-সাতটি বুথ নিয়ে। রাশিয়া এসেছে। ভিয়েতনাম এসেছে। নেপালের আমলারা এসেছেন — সরকার ও ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে সেতুবন্ধন করতে। ফিলিপাইনের একজন মহিলা প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা তাঁর দেশের AI স্ট্র্যাটেজি বর্ণনা করছিলেন।

বাংলাদেশ? বাংলাদেশ সরকার আসেনি। তবে পাঁচটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে এসেছিল, যেমন ব্রেইন স্টেশন ২৩। অর্থাৎ, সরকার না থাকলেও বাঙালি থামে না। এটি বাঙালির চিরন্তন বৈশিষ্ট্য — বন্যায় ঘর ডুবলেও মাথায় হাঁড়ি নিয়ে সাঁতার দেয়।

সন্ধ্যায় আমরা বাংলাদেশিরা — প্রায় বারোজন — সিদ্ধান্ত নিলাম যে, "চলুন রাতে কিছু করি।" AI নিয়ে সারাদিন ভাবার পর বাঙালির মাথায় যা আসে — আড্ডা। মোস্তফার ওখানে বসলাম।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জনি ভাই, যিনি গার্মেন্টস সেক্টরে দীর্ঘদিন ধরে আছেন। AI-এর যুগেও তিনি এলেন — সম্ভবত দেখতে যে, AI তাঁর গার্মেন্টস নিয়ে নেবে কিনা। তারপর আজহার ভাই, যিনি একসময় "দেশ টিভি" ও হরেক রকম প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠান চালাতেন।

আর নাজমুল ভাই — যিনি "যথারীতি" ছিলেন। নাজমুল ভাইয়ের উপস্থিতি মাধ্যাকর্ষণের মতো — সর্বত্র, সর্বদা, নীরবে।

আলোচনা হলো বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাত নিয়ে। সবার মত এক — সরকারি উদ্যোগ নেই, a2i বিদেশে গেলে "কনফারেন্স" কম, "ভ্রমণ" বেশি। কিন্তু সবাই হাল ছাড়েনি। এই জায়গাটাই আসল বাংলাদেশ।

অনেক রাত পর্যন্ত আড্ডা হলো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্মেলনে আমরা শেষ পর্যন্ত যা করলাম তা হলো — স্বাভাবিক বাঙালি আড্ডা। প্রমাণিত হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যতই এগোক, স্বাভাবিক বাঙালিত্ব এখনো রিপ্লেস হয়নি।

Azharul Islam Nazmul Khan Brain Station 23