বাংলা স্কুলের সাথে নতুন প্রজন্মের সম্পৃক্ততা (২০১৪)
তারিখ: ২৯ আগষ্ট ২০১৪
বিএলএলএস বাংলা স্কুল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত
যাযাবরের মতন অনেক দেশ ঘোরার সুযোগ হয়েছে এবং সব জায়গাতেই দেখেছি নিজের সংস্কৃতির জন্য বাঙালীদের কেমন হাহাকার। জীবন ও জীবিকার তাগিদে প্রবাসে আসা প্রজন্মদের থেকে নতুন প্রজন্ম এসেছে এবং সেই নতুন প্রজন্মরাও সেই দেশে থিতু হয়ে বসেছে। ঘরের বাহিরে অন্য ভাষায় কথা বললেও নিজ বাড়িতে বাংলার চর্চা কম বেশী সব জায়গাতেই আমি দেখেছি। তবে সবথেকে বেশী গুরুত্ব সহকারে এবং মূলধারার শিক্ষার সাথে বাংলা ভাষার চর্চা দেশের বাহিএর আমি সিঙ্গাপুরেই দেখেছি। সিঙ্গাপুরের জাতীয় শিক্ষার কারিকুলামে মাতৃভাষা আবশ্যিক হবার কারণে, মাতৃভাষার প্রতি আবেগের সাথে যুক্ত হয় এতে ভালো নম্বর পাবার স্পৃহা। যদিও বেশি কিছু উদাহরণ আছে যারা মাতৃভাষা না শিখে অন্য কোন লোকাল ভাষা শিখছে, কিন্তু বাবা-মা’দের মাতৃভাষাতেই ভালো দখল থাকার কারণে মাতৃভাষা শিখাতেই বেশী আগ্রহী। মাতৃভাষার প্রতি সিঙ্গাপুরে বসবাসরত এই সমস্ত প্রবাসী বাঙ্গালীদের দেখে সত্যি মুগ্ধ হয়েছে এবং বাঙ্গালী হিসাবে গর্বিত হয়েছি। সিঙ্গাপুরে বাংলা ভাষার চর্চার উপর বেশী কিছু টিভি ডকুমেন্ট্রি তৈরি করেছি, যেখানে এই সমস্ত দিকগুলি তুলে এনেছি। ডকুমেন্টারিগুলি তৈরির সময়ে বাংলা স্কুলগুলির সাথে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছি, এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সাথে অনেক সাক্ষাতকার নিয়েছি। বাংলা স্কুলগুলি পরিচালনা করার জন্য বাঙালী শিক্ষক ও অভিভাবকদের কত কষ্ট, ত্যাগ, তিতিক্ষা তা লিখে শেষ করা যাবেনা। নিজ ভাষার প্রতি দরদ দেখাবে এমন জাতিগোষ্ঠী মনে হয় অন্য কোথাও খুঁজে পাবনা। বাহবা দেবার অনেক কারণ হলেও বেশ কিছু দিক খুঁজে পেয়েছি যা স্কুলগুলির ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত করে তোলে। সেইগুলিই এই প্রবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।
সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি ভাববার মতন তা হল, স্কুলগুলি পরিচালনার সাথে নতুন প্রজন্মরা একেবারেই সংযুক্ত নয়। আমাদের ছেলেমেয়েরা বাংলা শিখছে, তা শুধু শিখবার এবং এত ভালো নম্বর পাবার খাতিরেই। বাংলা স্কুলের পড়া শেষ হবার পরে স্কুল অঙ্গন কিংবা স্কুলের কোন অনুষ্ঠানে পুরাণ শিক্ষার্থীদের দেখা মেলেনা। কেন এমনকি হচ্ছে এ নিয়ে নতুন প্রজন্মের অনেককেই প্রশ্ন করেছিলাম। বেশিরভাগ উত্তর হল নিম্নরূপ:
১. অভিভাবকদের চাপে বাংলা তারা অনেকটা জোর করেই শিখে। শিখবার পদ্ধতিতে কোন মজা তারা পায়না এবং বাংলার প্রতি আগ্রহ অনেক কম।
২. বাংলা শেখানো এবং স্কুল পরিচালনার সাথে তারা কোন ভাবেই যুক্ত নয়।
প্রথম সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে চিন্তা করতে হবে। কিভাবে আগ্রহ বাড়ানো যায়, যেন তারা স্বতর্ফুর্ত ভাবে শিখতে পারে। এটি শুধুমাত্র সিঙ্গাপুরের বাংলা স্কুলের সমস্যা নয়, পৃথিবীর অন্যান্য বাংলা শেখানোর স্কুলগুলিকেও এই সমস্যার সমাধান করতে হচ্ছে। অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে এই নিয়ে আলোচনা করে, প্রশিক্ষণ দিয়ে শিক্ষা পদ্ধতির আরো উন্নয়ন আমরা করতে পারি।
আর দ্বিতীয় সমস্যার সমাধানের জন্য আমাদেরকে নতুন প্রজন্মকেই বাংলা শেখানোর ও পরিচালনা টিমের মধ্যে সংযুক্ত করতে হবে। বড় ক্লাসের জন্য না হলেও ছোট ক্লাসের জন্য সহকারী শিক্ষক/শিক্ষিকা হিসাবে আমরা নতুন প্রজন্মদের সংযুক্ত করতে পারি। নতুন প্রজন্মের জন্য ভাষা শেখার জন্য চ্যালেঞ্জ কি তা তারই ভালো জানে, তাই নতুন প্রজন্মদের থেকেই সেই চ্যালেঞ্জগুলির কৌশল আমরা পেতে পারি। এছাড়া স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য নতুন প্রজন্মকে সংযুক্ত করতে পারি। শুধু উপস্থাপনার জন্য কিছু মুখস্ত করে শিখিয়ে দিলাম, এবং তারা তা পারফর্ম করল - এমনটি নয়। মূল অনুষ্ঠান পরিচালনায় নতুন প্রজন্মেদের সংযুক্ত করে, তাদের মতামত নিয়ে- তাদেরকেই ভাষার নেতৃত্বে নিয়ে আনতে পারি।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে বাংলা বিস্তার করে পরবর্তীতে তাদের পরের প্রজন্মের মধ্যে বাংলা ছড়াতে না পারলে আমাদের এই কষ্ট, এত শ্রম - সবই বৃথা যাবে। আমরা শুধু এক পাক্ষিক ভাবে শিখিয়েই যাবো কিন্তু পরের প্রজন্মের মধ্যে বাংলার বিস্তার করাতে পারবোনা।
এই প্রবন্ধটি লেখার জন্য সহযোগিতা করার জন্য সকল শিক্ষিকা ও শিক্ষার্থীদের কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বাংলা চলতে থাকুক নদীর মতন প্রবহমান, চলতে থাকে প্রজন্ম থেতে প্রজন্মের মাঝে, দেশ থেকে বিদেশে, ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বে এই কামনা করছি।