ছোট কলসেন্টার মডেল ও আইপি সংযোগ প্রয়োজন
ড. মশিউর রহমান
সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়
একথা অনস্বীকার্য যে কলসেন্টার একটি সম্ভবানাময় ক্ষেত্র। গার্মেন্টস শিল্পের মত এই শিল্পটিকে ঠিক মত কাজে লাগাতে পারলে আমরা অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারব। আমি সহ যারা এই ক্ষেত্রে কাজ করেন তারা সবাই মনে করেন কলসেন্টার খুবই সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। কিন্তু এই সম্ভবনাকে কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই আমাদের গঠনমূলক ভাবে কাজ করতে হবে। গতবছর BTRC এই ক্ষেত্রে লাইসেন্স প্রক্রিয়াটি সহজ করে সবার দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছিল। গত এক বছর কাজ করে আমি দেখেছি দুই ধরনের লোকজন এই ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন এবং কলসেন্টার তৈরীতে উদ্দ্যোগ নিয়েছিলেন ,
১. এক দল মনে করেছিল যে কলসেন্টার দিয়েই বড়লোক হওয়া যাবে। সেই স্বপ্নে বিভোর হয়ে অনেকেই এই ব্যাপারে কাজ শুরু করেছিল।
২. এটি দিয়ে সহজে ভিওআইপি করা যাবে এবং কলসেন্টারেরর পাশাপাশি তা থেকে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন।
৩. যারা কোন কিছু না বুঝেই লাইসেন্ট নিয়েছেন এই ভেবে যে পরবর্তিতে এই লাইসেন্স অন্য কারো কাছে বিক্রি করা যাবে।
৪. যারা আসলেই এটি নিয়ে কাজ করেন এবং অন্যান্য দেশের পাশাপাশি বাংলাদেশে তাদের ব্যবসাকে বিস্তৃত করতে চান।
প্রথম তিনটি শ্রেণীর লোকই বেশী এবং তারাই এই ক্ষেত্রটিকে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মধ্যে নিয়ে যাচ্ছেন। আমি পাঠকের সাথে আমার কিছু অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে শেয়ার করতে চাই। আমি আজকের লেখাতে ফোকাস করব আমরা কি করতে পারি? কিভাবে এই সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রকে কাজে লাগাতে পারি। কোন অনুযোগ নয়, বরং সার্বিক মঙ্গল ও বৃহত্তর দেশের স্বার্থে কি করা সম্ভব তাই এইখানে তুলে ধরব।
নতুন কলসেন্টার উদ্দ্যোক্তা:
যারা কলসেন্টার সম্ভবানর কথা শুনে ব্যবসা করার উদ্দ্যোগ নিতে চাচ্ছেন, তাদের জন্য নিন্মের কিছু সাজেশন দিব।
-
যে কোন ব্যাবসা শুরুর আগে যেরকম SWAT বিশ্লেষন করা দরকার, তেমনি কলসেন্টারে ব্যবসা শুরু করার আগে আপনি আপনার মত SWAT বিশ্লেষন করে নিন। শুধু মাত্র কারো কথার উপর ভিত্তী না করে এই ব্যাপারে অভিজ্ঞজনের পরামর্শ নিন।
-
অর্থ লগ্নি করার আগে, Break even point কখন হবে তা দেখে নিন। এবং সেই মোতাবেক আপনার ব্যবসাকে সাজিয়ে নিন।
-
হাতে অন্তত এক বছরের মূলধন রেখে কলসেন্টারের ব্যবসাতে আসা উচিত।
-
এটি একটি চ্যালেঞ্জিং সেক্টর তাই একটি পাইলট প্রোজেক্ট হিসাবে নিন। কোন কারণে পোজেক্ট যদি ব্যার্থ হয়, সেইক্ষেত্রে যেন পথে না বসেন সেইরকম হিসাব করেই এই ব্যবসাতে অর্থ লগ্নি করুন।
-
বড় আকারের কলসেন্টার শুরু না করে বরং ছোট সাইজের (এজেন্ট ১০ সিটের কম) কলসেন্টার তৈরী করে তা দিয়ে শুরু করুন।
যারা এই ব্যবসাতে রয়েছেন:
-
যেহেতু কলসেন্টার একটি নতুন ক্ষেত্র তাই সরকারের অনেক অসহযোগীতার সাথে আপনারা মুখোমুখি হচ্ছেন। সরকার যেহেতু নুতন কিছু নিয়ম কানুন নিয়ে কাজ করছেন তাই সরকারের কাছেও আপনাদের সমস্যার কথা গঠনমূলক ভাবে তুলে ধরুন। এই ক্ষেত্রে কলসেন্টার ফোরাম ও কলেসেন্টার এসোসিয়েশন গঠন করে সেই প্লাটফর্মকে চাঙ্গা করতে পারেন।
-
প্রতারণা পরিহার করুন: কলসেন্টার নিয়ে সাধারন মানুষের ধারণা কম তাই এই সুযোগ ব্যবহার করে যারা প্রতারণা জাতীয় ব্যবসা করছেন তাদের আহবান করবো দেশের বৃহত্তর স্বার্থে কলসেন্টার নিয়ে প্রতারণা করবেননা। এই সুযোগে কিছু প্রতারণার কথা উল্লেখ করে জনগণকে সচেতনতা বৃদ্ধির কথা বলব:
-
কলসেন্টার তৈরীতে কলসালটেন্ট হিসাবে কাউকে নিয়োগ দেবার আগে তার যোগ্যতা যাচাই করুন। শুধু মাত্র বিদেশী বা বিদেশে থাকার আভিজ্ঞতা আছে তা না দেখে বরং সত্যিকার ভাবে তিনি কলসেন্টার প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত কিনা যা যাচাই করুন।
-
কলসেন্টার সলিউশন বা সফটওয়্যার কেনার আগে, সেই সফটওয়্যার আর কেউ ব্যবহার করছেন কিনা তা যাচাই করে নিন।
-
কলসেন্টার ট্রেনিং ইন্সটিউট খুলে যারা সার্টিফিকেট কোর্স প্রদান করছে, সেই সব সার্টিফিকেট এর গুরুত্ব কলসেন্টার গুলিতে আছে কিনা তা যাচাই করুন। দুঃখের বিষয় যে আমাদে যুব সমাজ সবথেতে বেশী প্রতারিত হচ্ছে কলসেন্টার জাতীয় ট্রেনিং সেন্টারগুলিতে কোর্স করে।
-
কলসেন্টার বিজনেস প্রোপজাল লিখার জন্য কাউকে প্রচুর অর্থ না দিয়ে বরং আপনি নিজেই তা লিখার চেস্টা করুন। এই ধরনের কাগজ তৈরী করাই আপনাকে এই সেক্টরের সুযোগ সুবিধাগুলি সমন্ধে আপনি জানতে পারবেন।
-
সরকারের জন্য করণীয়:
কলসেন্টার যেহেতু নতুন ক্ষেত্র তাই ব্যবাসায়ীদের সমস্যাগুলী সমাধানে আমাদের উদ্দ্যোগ নিতে হবে।
-
IPLC এর সংযোগ মূল্য কমান যায় কিনা সেটা যাচাই করা উচিত। শুধুমাত্র কয়েকটি কম্পানির মধ্যে মনপোলি/সিন্ডিকেট না করে উন্মুক্ত করার মাধ্যমেই আমরা এটি করতে পারব।
-
বিশ্বের প্রায় সমস্ত কলসেন্টারগুলি (বিশেষ করে ছোট খাট কলসেন্টার গুলি) মূলত IP সংযোগের মাধ্যমেই চলছে। আমাদের সরকারের ধারণা কলসেন্টারগুলি IP দিয়ে চললে তা থেকে VoIP কারবে এবং দেশ ক্ষতি হবে। এটি সম্মূর্ণ একটি ভ্রান্ত ধারণা কেননা VoIP এর কল টার্মিনেশন/জেনারেশন খুব সহজেই ট্রাক করা সম্ভব এবং তার পরিমানও অনেক বেশী হবে। কিন্তু ছোট কলসেন্টারগুলি তার যাত্রা শুরুর জন্য IP সংযোগ ছাড়া গতি নেই এবং তাদের ভয়েস ভলিউম অনেক কম হবে। প্রযুক্তির মাধ্যমেই এটি মনিটর করা সম্ভব। যদি IP সংযোগ না দেয়া হয়, তবে আমি বলব, এটি যেন মাথা ব্যাথার ঔষুধ হল মাথা কেটে দেয়া।
-
আমাদের দেশের কলসেন্টারগুলি তার যাত্রা শুরু করবে মূলত SME মডেলের ছোট ছোট কলসেন্টার গুলি দিয়েই, তাই তাদের যথাযথ সুযোগ দেবার মাধ্যমেই আমরা এই ক্ষেত্রে ভাল করতে পারি।
-
ইনবাউন্ড সার্ভিসের থেকে আউটবাউন্ড সার্ভিসের মাধ্যমেই আমরা কলসেন্টারের বাজারে ঢুকতে পারব, তাই তাদের যথাযথ সুযোগ দিতে হবে।
-
দ্রুত সমস্যার নিস্পত্তি করতে হবে: কলসেন্টার যেহুতু দ্রুত সিদ্ধান্ত ও দ্রুত সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করে তাই তাদের কোন সমস্যা দ্রুত সরকারকে নিষ্পত্তি করতে হবে। যেমন সমস্যাগুলি তারা BTRC এর ওয়েবসাইটেই দিতে পারে, এবং Customer support এর অনলাইন টিকেটিং (ট্রাবল শুটিং) এর মত দ্রুত ও আধুনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। আমরা যেহুতু ডিজিটাল বাংলাদেশের কথা বলছি তাই এই জাতীয় ডিজিটাল সার্ভিস আমরা BTRC এর মত প্রতিষ্ঠান থেকে আশা করতে পারি।
কলসেন্টারের কাজ পাবার জন্য করনীয়:
কলসেন্টার তৈরী করার জন্য এজেন্টদের ট্রেনিং ও সেটআপ করলেই চলবেনা। আপনি যদি কলসেন্টারের কাজ না পান তবে আপনার ব্যবসা থমকে যাবে। সেজন্য আপনাকে প্রচুর মার্কেটিং করতে হবে। আপনার জন্য কিছু টিপস:
-
প্রবাসী বাঙালীদের সহযোগীতা নিন। যেহেতু প্রবাসী বাংলাদেশীরা বিদেশ থেকে কাজ নিয়ে আনার ক্ষেত্রে সবথেকে ভূমিকা পালন করে তাই তাদের সহযোগীতা নিন। প্রবাসীদের প্রতিষ্ঠানগুলিরও কাজ আপনারা শুরু করতে পারেন। যেমন কোন বাংলদেশী কাস্টোমার সাপোর্ট সেন্টার বাংলাদেশ থেকে চালু করা যেতে পারে।
-
বিদেশের কলসেন্টার, BPO এর মেলা গুলিতে অংশ নিন। যদি সরাসরি অংশ না নিতে পারেন তবে বিদেশে আপনার কোন রিপ্রেজেন্টেটিভ কে নিয়োগ দিন।
-
অনলাইনে কলসেন্টারের প্রোজেক্ট বিড করার সাইটগুলি নিয়মিত ভিজিট করুন এবং ছোটখাট কোন কাজ দিয়ে আপনার প্রতিষ্ঠানের সুনাম অর্জন করুন।
অভ্যান্তরীন বাজার তৈরী:
- কলসেন্টার যে শুধু মাত্র বিদেশের কাজ করতে হবে তার কোন মানে নেই। আমাদের দেশের অভ্যান্তরীন কাজ দিয়েও আমরা শুরু করতে পারি। যেমন ব্যাংক, হাসপাতাল ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় প্রতিষ্ঠানের কাজ দিয়েও আমরা শুরু করতে পারে। এটি আপনাদের অভিজ্ঞতা বাড়াবে এবং ভবিষ্যতে বিদেশের কাজ পেতে সাহায্য করবে।
আমরা সবাইমিলে সচেষ্ট হলে আমরা এই ক্ষেত্রে ভাল কাজ করতে পারব এবং দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে পারব।