মশিউরের খেরোখাতা

আবার দেখলাম জাপান (২০১৯)

তারিখ: ১৮ জুলাই ২০১৯

জাপান ভূমিকম্পের দেশ - এই কথাটি আমরা সবাই জানি। যখন আমি জাপানে ছিলাম তখন অনেক-বারই এর অভিজ্ঞতা হয়েছিল। বিশেষ করে ১৭ জানুয়ারীর ১৯৯৫ সনে কোবে-তে যে ভূমিকম্পটি হয়েছিল তার অভিজ্ঞতা হয়েছিল কোবে থেকে অনেক দূরে টকিও থেকে বসে। সেই ভূমিকম্পটির নাম Great Hanshin earthquake যা এখনও এক দুঃসহ অভিজ্ঞতা হিসাবে অনেকেরই মনে আছে। রেকটার স্কেলে তার মাপ ছিল 7 । বেশ হটাৎ করেই এটি হবার কারণে অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয়েছিল। এর পরে অবশ্য পুরো জাপানের বাড়ি ঘর ৯ রেকটার স্কেল রক্ষা করতে পারবে সেভাবে তৈরী করা হয়েছে। এবং পুরান বাড়িঘরগুলি পুনরায় আরো শক্তিশালি করা হয়েছে যেন এটি রোধ করতে পারে।

এর পরে আরো  এর পরে দীর্ঘ সময় কেটে গেছে। মানুষ মাত্রই খুব দ্রুত অনেক কিছুই ভুলে যায়। এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে ভূমিকম্প শব্দটি ভুলে গিয়েছিলাম। ছেলেরা সিঙ্গাপুর থেকে জাপানে বেড়াতে এসেছে এবং ওদের নিয়েই সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু হটাৎ করেই ভূমিকম্পের আবারও অভিজ্ঞতা হোল, যেটা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।

বাচ্চাদের বাহিরে ঘুরাবার জন্য আমি একদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছিলাম। আগের দিন রাতে আমরা একটু দেরীতেই আমরা ঘুমাতে গিয়েছিলাম, যেহেতু পরের দিন ঘুরবো। আমরা সবাই যখন গভীর ঘুমে রয়েছি, ভোরের দিকে তখন হঠাৎ করে পুরো বিল্ডিং টা যখন কেঁপে উঠলো। আমি যেহেতু আগে থেকেই অভ্যস্ত ছিলাম, মুহুর্তের মধ্যেই আমরা শরীরের সমস্ত কোষগুলি জানিয়ে দিল ভুমিকম্প। এটা বুঝতে আর দেরি রইল না যে ভূমিকম্প হয়েছে, কিন্তু ব্যাপারটার দ্রুততায় আমি কোন শব্দই করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমার সারা শরীর যেন বরফ হয়ে অনড় হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার গলা থেকে একটি শব্দই বের করতে পারলাম- ভূমিকম্প! প্রথমেই মিতু উঠলো, এরপরে মাশরাফি, এর পরে মেহরাব। হুড়মুড় করে আমরা ঘরের বাহিরে চলে এলাম। আমার ছেলেরা যেহেতু ভূমিকম্পের সাথে অভ্যস্ত নয় তারা ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না যে কি করবে বাংলাতে যে কে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঘরে যেহেতু টেলিভিশন ছিলনা, বুঝতে পারলাম না কত মাত্রায় হল। সৌভাগ্যক্রমে দেখি ইন্টারনেট কাজ করছে, তখন দেখে নিলাম যে ভূমিকম্প কোথায় হয়েছে এবং এটা কারণে কোনো ভয়ের কিছু আছে

সাধারণত একটি ভূমিকম্প হবার পরে আরেকটি বড় মাপের ভুমিকম্প আসে, তাই আমরা একটু সাবধান হয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পরেও যখন আর কোন কম্পন পেলাম না হখন একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। আমরা সকালের নাস্তা বানাবার ব্যবস্থা করলাম ও নাস্তা করলাম। এর মধ্যে মাশরাফি টয়লেটে গেল। আর একটু পরেই আরেকটি মৃদু কম্পন হলো। তবে এটার ধাক্কাটি অতটা আগের মত জোরে ছিল না। তবে মাশরাফি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। আমার ছেলেদের চোখে একটা আতংক দেখতে পেলাম। মিতু যদিও ২০১১ সনের ভুমিকম্পের অভিজ্ঞতা হয়েছিল, কিন্তু তারপেরও মনে হল বেশ ভয় পেয়ে গেছে। বেচারা। ওরা সিঙ্গাপুর থেকে ঘুরতে এসেছে, আর সেই সময়েই কিনা এমন একটা অভিজ্ঞতা হল।

ভূমিকম্পের কারণে জাপানে সমস্ত বিদ্যুৎ, পানি এবং গ্যাস সিস্টেম অটোমেটিক ভাবে বন্ধ করে দেওয়ার নিয়ম। এটির কারণ হল কোথাও যেন এইগুলোর সংযোগ ভেঙ্গে যেয়ে আগুন না লাগে কিংবা অন্যকোন দূর্ঘটনা না হয়। নাস্তা বানাতে যেয়ে দেখলাম গ্যাস নেই। আমি ভাবলাম- মনে হয় সরকার এটি কেন্দ্রীয়ভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা সেজন্য অপেক্ষায় থাকলাম কখন এটি পুনরায় চালু হবে। কিন্তু অর দুপুর পর্যন্তও যখন দেখলাম গ্যাস আসছে না, তখন একটু সন্দেহ হল।

আমি নিচ তলায় সেই বিল্ডিং এর ম্যানেজমেন্টের অফিসে সেখানে ছিল আমি নিচে যে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম যে কিভাবে এটা অন করা যায় তার আমাকে একটা ম্যানুয়াল প্রিন্ট করে দিল এবং বলল যে ঘরে বাইরে একটা সুইচ রয়েছে সেটা অফ হয়ে গেছে ভূমিকম্পের কারণে সেটা অটোমেটিক বন্ধ হয়ে যায় জাপান যে সত্যিই খুব সেফটি কান্ট্রি বা নিরাপদ নিরাপত্তা দিক দিয়ে জাপান খুবই সচেতন সে জিনিসটা আবারো আমি উপলব্ধি করতে পারলাম

আমরা কিছুক্ষণ পর ধাতস্থ হয়ে বের হলাম সেদিন আমরা প্ল্যান করলাম যে যেহেতু ভূমিকম্পের কারণে অনেক যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকবে তাই আপাতত যেগুলো খোলা রয়েছে সে দিক দিয়ে যে দিকে যাওয়া যায় সে দিকে যাব বাসার সামনে কিছু দূরে একটা বাস স্ট্যান্ড ছিল আমরা সে বাসস্ট্যান্ডে গেলাম এবং একটা বাসে উঠে আমরা সবাই বাইরে বের হলাম আমার ছেলেরা ওরা ঘুরতে যেতে চাচ্ছিল আমি বললামচলো বলে একটা জায়গা রয়েছে সেখানে আমরা যাব আমরা স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তার একটু পরেই দেখি যে পুরোটাই বন্ধ রয়েছে সেই ট্রেনে লাইনগুলো সেফটির কারণে নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করে রেখেছে আমরা এদিক সেদিক একটু পায়চারি করলাম কিন্তু কোন উপায় না দেখে আমরা পরে সিদ্ধান্ত নিলাম যে নদীর দিকে বেড়াতে যাব আমরা বেরিয়ে আসে পাশের বাড়ি গুলো দেখছি এবং একটা ব্রিজের দিকে গেলাম এইখানে একটা জাপানের রাজার একটি বাড়ি রয়েছে বাগান বাড়ি রয়েছে এটার সামনে দৃশ্য গুলো খুব ভালো লাগলো আমরা সেটা পাশ দিয়ে একটা ব্রিজের আমরা দেখলাম দেখার পর বাচ্চারা ক্লান্ত হয়ে গেল আমরা ঠিক করলাম যে বাসায় ফেরা যাক কিন্তু জায়গাটা এমনই একটা জায়গা যেখানে আশেপাশে কোন বাস স্ট্যান্ড ছিল না তো আমরা ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম কিন্তু কোনটাই সেখানে দেখতে পেলাম না আমরা এদিক সেদিক করছি হঠাৎ করে দেখি যে একজন জাপানিজ মহিলা দেখে দেখে দৌড়ে এলো এবং তারা আমাকে বলল যে সামনে বাস স্ট্যান্ড রয়েছে সেখান থেকে আপনি বাস নিয়ে আপনাদের বাসায় ফিরে যেতে পারেন আমরা বাসস্ট্যান্ডে এসে দেখলাম যে বাসায় যাবার জন্য যে বাস সেটা বন্ধ রয়েছে তাই আমরা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম অন্যান্য দেশে যদিও ট্যাক্সি ট্যাক্সি অনেক খরচের তার পরেও সেদিন উপায় না দেখে আমরা ট্যাক্সি নিয়ে বাসায় ফিরলাম তারপর আমরা সন্ধ্যাবেলায় যদিও বের হওয়ার ইচ্ছা ছিল কিন্তু আর কথা বের হতে পারলাম না এভাবে ছুটির দিনে আমরা ছুটির দিনে আমরা ছুটি নষ্ট করলাম শুধুমাত্র ছুটির ভূমিকম্পের কারণে আমাদের ছুটি ছিল সকাল বেলাতেই ভূমিকম্প হবে একটু পরেই দেখি আমার ম্যানেজার আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেস করছিল যে ভূমিকম্পের পর আমরা সবাই ভালো আছে কিনা।

ব্যাপারটা তে বুঝতে পারলাম যে জাপানে তার কর্মচারীদের নিরাপত্তার ব্যাপারে অনেক খোঁজ খবর রাখে এবং প্রতিষ্ঠান মাধ্যমে খেয়াল রাখে যে তাদের কর্মচারীরা সবাই ভালো আছে কিনা।

কিওতো, জাপান, ১৮ জুলাই ২০১৯