কোয়ান্টাম কম্পিউটার বেশি দূরে নয় (২০০৭)
তারিখ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০০৭
কোয়ান্টাম কম্পিউটার হলো ভবিষ্যতের কম্পিউটার, যা কোয়ান্টাম মেকানিকসকে ভিত্তি করে অণু-পরমাণু দিয়ে কাজ করবে। আর এই অণু-পরমাণুর মধ্যেই সংক্ষিত থাকবে তথ্য। কোয়ান্টাম কম্পিউটার নিয়ে বিশাল স্বপ্ন দেখছেন বিজ্ঞানীরা। আর এটি বাস্তবায়ন হলে এর আকার হবে ক্যালকুলেটর, কলম বা একটি ট্যাবলেটের সমান।
গত আগস্ট মাসের সায়েন্স জার্নাল-এর দুটি প্রবন্ধ পড়ে মনে হলো, এই কোয়ান্টাম কম্পিউটার আর দুর ভবিষ্যতের কল্পনা নয়, খুব শিগগিরই তা বাস্তব রূপ পেতে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের কাছে সায়েন্স জার্নাল অত্যন্ত নামকরা ও একটি উঁচু মানের জার্নাল, যা প্রকাশিত হয় আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দি অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স থেকে। অনেক বিজ্ঞানীই তাঁর জীবনে অন্তত একবার হলেও নিজের কাজ প্রকাশ করতে চান এই জার্নালে।

চিত্র: অনুকেই ব্যবহার করা যাবে তথ্য সংগ্রহ করে রাখার জন্য
প্রথমেই বলতে হয় ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস (আইবিএম) করপোরেশনের সাইরাস এফ. হিরজেবেহেডিন গ্রুপ এমন একটি পদ্ধতি আবিষ্ককার করেছে, যার মাধ্যমে একটি অণুর মধ্যেই ‘০’ ও ‘১’কে লেখা ও পড়া যাবে। যাঁরা কম্পিউটারের কাজের পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত, তাঁরা জানেন যে কম্পিউটারে সব কিছুই লিপিবদ্ধ থাকে বাইনারি পদ্ধতিতে, যেখানে এই দুটি সংখ্যাকে দিয়ে সব কিছু সংরক্ষণ করা যায়। এই আবিষ্ককার যে হঠাৎ করেই এসেছে, তা নয়। অনেক বছর আগে থেকেই এভাবে অণুকে ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করে রাখার কথা ভাবা হচ্ছিল। তবে আইবিএমের বিজ্ঞানীরাই প্রথম এটিকে সফল করতে সক্ষম হলেন। অনেকে বলতে পারেন, আমরা কম্পিউটারের হার্ডডিস্কেই তো তথ্য রাখছি, অণুতে রাখার প্রয়োজনটাই বা কী? আসলে দিন দিন মানুষ চাচ্ছে−তার কম্পিউটারসহ ইলেক্ট্রনিক জিনিসপত্র আকারে ছোট হোক। যে যত ছোট জিনিসপত্র বানাতে পারছে, সে-ই বাজার দখল করছে। পাঠক নিশ্চয় জানেন, আই-পড কী করে সফলভাবে ব্যবসা করতে পারছে। ম্যাক ছাড়া কি কেউ গানের এমপিথ্রি প্লেয়ার বিক্রি করছে না? অবশ্যই করছে। কিন্তু আকারে ছোট আর বিভিন্ন সুবিধা নিয়ে ফোন, এমপিথ্রি প্লেয়ার ইত্যাদি ম্যাক বাজারে নিয়ে আসতে পারছে বলেই, বাজার তাদের দখলে।
যা বলছিলাম, আপনার কম্পিউটারে তথ্যগুলো যে হার্ডডিস্কে রাখা হয় তা আরও ছোট কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বিজ্ঞানীরা টার্গেট করলেন অণুকে। একটি অণুর মধ্যে যদি একটি ডিজিটকে রাখা সম্ভব হয়, তাহলে বর্তমানে আপনার পুরো হার্ডডিস্কে যে পরিমাণ তথ্য রাখতে পারবেন−তা আপনার কল্পনার বাইরে। এবারই আইবিএমের বিজ্ঞানীরা এই কাজটি কিছুটা হলেও বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছেন। এটি একটি বড় আবিষ্কার বৈকি।
দ্বিতীয় গবেষণাপত্রও একই গবেষক দলের, যেখানে তাঁরা উল্লেখ করেছেন অণুকে কীভাবে ট্রানজিস্টারের মতো করে ব্যবহার করা যায়। এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলার আগে জানা দরকার ট্রানজিস্টর আসলে কী? ট্রানজিস্টর হলো একটি সুইচের মতো যা ‘০’ কিংবা ‘১’ হবে কি না তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ইলেক্ট্রনিকস যন্ত্রের সব সার্কিট ছোট হয়েছে এই ট্রানিজস্টরের কারণে। ১৯৪৭ সালে জন বার্ডেন এবং ওয়ালটার ব্র্যাটেইন ট্রানজিস্টর আবিষ্ককার করেন। এই ট্রানজিস্টর আবিষ্ককারের পরপরই ইলেকট্রনিকসের সার্কিটগুলো ছোট হতে শুরু করে।
কোয়ান্টাম কম্পিউটার বা অণু-পরমাণুকে ব্যবহার করে কম্পিউটার তৈরি করা যে আর বেশি দুরে নয়−তা এ দুটি গবেষণাপত্রই বলে দেয়, যেখানে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয় যে অণুকে ব্যবহার করা যেতে পারে সংখ্যাকে লেখা ও পড়ার জন্য। এমনকি অণুকে ব্যবহার করা যেতে পারে ট্রানজিস্টরের কাজেও। সে দিন আর বেশি দুরে নয়, যখন আপনি কম্পিউটার কিনতে গেলে বিক্রেতা আপনাকে বলবেন, “স্যার, আমাদের কাছে এক ধরনের অত্যাধুনিক কম্পিউটার এসেছে, যার নাম কোয়ান্টাম কম্পিউটার”।