মশিউরের খেরোখাতা

রাজনীতি কি সবই নিয়ন্ত্রণ করবে?

তারিখ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬

গতকাল কবিতা আবৃত্তির সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম। কবিতা শুনব বলে গেলাম, কিন্তু এক ভাই যে গল্পটি শোনালেন, সেটি শুনে মনে হলো কবিতার চেয়ে বাস্তব কখনো কখনো অনেক বেশি কাব্যিক — অবশ্য সেই কাব্যের ছন্দটা বড় বিষণ্নের।

আমার ছোট ভাই ব্যারিস্টার মিলন বহু বছর আগে বলেছিল একটি কথা, যা আমার মাথায় পেরেক ঠুকে বসে আছে। বলেছিল — "ভাইজান, আমাদের দেশে সবকিছুর মূলে রাজনীতি। টপ টু বটম। একদম আগাগোড়া।" আমি তখন ভেবেছিলাম, বাড়িয়ে বলছে। ব্যারিস্টাররা একটু বাড়িয়ে বলেন — এটা বোধহয় পেশাগত অভ্যাস।

কিন্তু না। মিলন একটুও বাড়ায়নি।

অন্যান্য সভ্য দেশে — ধরুন জার্মানি, জাপান, কিংবা সুইজারল্যান্ড — লোক নিয়োগে প্রশ্ন করা হয়, "আপনি কী পারেন?" আমাদের দেশে প্রশ্নটি সূক্ষ্মভাবে ভিন্ন — "আপনি কাদের লোক?" পার্থক্যটি ছোট, কিন্তু ফলাফলটি বিশাল। প্রথম প্রশ্নে ব্রিজ তৈরি হয়, দ্বিতীয় প্রশ্নে ব্রিজের ঠিকাদার নির্ধারিত হয়।

এইবার আসি সেই ভাইয়ের গল্পে।

ভদ্রলোক নির্বাচনের ঠিক আগে টিএসসিতে গিয়েছিলেন — ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই বিখ্যাত সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ, যেখানে একসময় রবীন্দ্রনাথ-নজরুলের চর্চা হতো, এবং যেখানে প্রেমিক-প্রেমিকারা বেঞ্চে বসে দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতেন — অন্তত নিজেদের ভবিষ্যৎ।

গিয়ে দেখলেন, চারিদিকে "হালাল সংস্কৃত" এর জয়জয়কার। বাঙালিয়ানা তখন কিঞ্চিৎ লজ্জিত ভঙ্গিতে কোণে দাঁড়িয়ে, যেন অপরাধী সাক্ষী — জানে সব, বলতে পারছে না।

ভাই ভাবলেন, বোধহয় এবার সত্যিই এক নতুন যুগের সূচনা।

কিন্তু নির্বাচনের পরদিন সকালে তিনি আবার টিএসসির পাশ দিয়ে গেলেন।

রাতারাতি (“রাতারাতি" শব্দটি এখানে একদম আক্ষরিক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে) জাসাসের পোস্টারে ছেয়ে গেছে চারদিক। হালাল সংস্কৃতি বিদায় নিয়েছে, জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি এসে গেছে।

ঘটনার গতি দেখে মনে হলো, এঁরা বোধহয় পোস্টারগুলো আগে থেকেই ছাপিয়ে রেখেছিলেন — ঠিক যেমন বিজ্ঞ মানুষেরা ছাতা সঙ্গে রাখেন, বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করেন না।

পুরো ব্যাপারটা দেখে মনে হলো, এ যেন এক অদ্ভুত যাদুকরের খেলা — মঞ্চের পর্দা পড়ল, পর্দা উঠল, দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেল। শুধু যাদুকরের নামটুকু পাল্টেছে। সহকারী যাদুকরের পোশাকও বদলেছে — একজন পাঞ্জাবি ছেড়েছেন, আরেকজন পরেছেন। মঞ্চটি একই, দর্শকরাও একই, কেবল আমরা প্রতিবার হাততালি দিই নতুন উদ্যমে।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে — "The more things change, the more they stay the same."

ফরাসিরা বলে — "Plus ça change, plus c'est la même chose."

আমরা বাংলায় বলি — "আগে আওয়ামী লীগ, এখন বিএনপি।" মর্মার্থ অভিন্ন।

সমস্যাটা হলো, আমরা যে বিছানায় শুই সেটা বদলাই, কিন্তু যে পিঠব্যথা নিয়ে শুই সেটা বদলাই না। চিকিৎসক পরিবর্তন হয়, রোগ থাকে। এবং রোগী? রোগী প্রতিবার নতুন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে বলেন — "এইবার নিশ্চয়ই ভালো হবো।"

তাই যখন কেউ বলেন পট পরিবর্তন হয়েছে, আমি মৃদু হেসে বলি — হ্যাঁ, হয়েছে বৈকি। পটের রঙ বদলেছে। পটের ভেতরে যা রান্না হচ্ছে, সেটা আগের মতোই।

নুনটা একটু বেশি কি কম — সেটাই কেবল বিচার্য।

এবং সেই বিচারের ভার আমরা পাঁচ বছর পরপর জনগণের হাতে তুলে দিই — যে জনগণ ততদিনে ক্ষুধার্ত, ক্লান্ত, এবং এতটাই আশাবাদী যে মানবজাতির ইতিহাসে তাঁদের তুলনা কেবল তাঁরা নিজেরাই।