মশিউরের খেরোখাতা

শরীর তথ্য সংগ্রহ


আজ একটু অন্যরকমের আলোচনা নিয়ে আপনাদের সামনে উপস্থিত হচ্ছি। হয়তো যে কথাগুলি এখন লিখছি, সেগুলি খুবই বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে। সেগুলি হয়তো কোন ভিত্তিহীন মনগড়া কল্পনা বা কোন কল্পকাহিনীর মত শোনাতে পারে, তবুও কথাগুলি মনে করতে করতে এক মনে চলে এল যা আমি নিজই অবাক হলাম। তবুও ইচ্ছা হল শেয়ার করতে আমার এই সই মনের কথাগুলি।


আমরা ছোটবেলা থেকেই শুনে আসছি যে, আমাদের ঘাড়ের দু পাশে দুই ফেরেশতা আছে। কিরামুন কাতিবীন (করিম লেখক) নামের দুই ফেরেশতা আমাদের প্রতিটি কর্মের লিপিবদ্ধ করছেন, যা শেষ বিচারের দিন হাজির করা হবে। কোরআন লেখা আছে:

وَكُلُّ صَغِيرٍ وَكَبِيرٍ مُسْتَطَرٌ

"Every matter, small and great, is on record.”

"প্রত্যেক ছোট-বড় বিষয়ই লিপিবদ্ধ রয়েছে।"

— সূরা আল-কামার (চন্দ্র), ৫৪:৫৩

একজন বিজ্ঞানী হিসেবে এই ব্যাপারটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব? আমাদের শরীরের ভিতরে কেউ কিছু লিখছে, মানে হল - সেই তথ্যগুলিকে কেউ কোথাও সংরক্ষণ করছেন। ব্যাপারটা অনেকটা কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কের মত। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্ক ম্যাগনেটিক ফিল্ড ব্যবহার করে অসংখ্য তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। এবং দিনদিন সেই ধারণ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। ঠিক তেমনিভাবে শরীরের ভিতর কোথাও হয়তো সেই তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে। আমাদের মস্তিষ্ক হল বিশাল একটা তথ্য ভান্ডার। ছোটবেলার স্মৃতি থেকে শুরু করে অসম্ভব রকমের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় তথ্য মস্তিষ্কের নিউরনে সংরক্ষিত থাকে। শরীরের ভিতর এই তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি শুধুমাত্র মস্তিষ্ক নয়, আরও অনেক কিছুই সম্ভব। শরীরের ভিতর আছে কাটি কাটি অ্যামিনো অ্যাসিড সহ জটিল বিভিন্ন ধরনের জৈব পদার্থ যেগুলিতও মস্তিষ্কের মত তথ্য সংরক্ষণ করতে পারে। আর ডিএনএ নিয়ে তা বিজ্ঞানীদের আগ্রহের শেষ নেই। বংশপরম্পরায় এটা যভাবে অভূত ভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে রাখতে পারে, তার সীমা আজও আমাদের অজানা। তুলনা করতে গেলে বলা যায় যে ১০০০ লিটার ডিএনএতে আজ পর্যন্ত যত কম্পিউটার তৈরি করা হয়েছে সেই সংখ্যক তথ্য মজুদ করে রাখতে পারে। ডিএনএর মত হয়তোবা আমাদের শরীরে এমন কিছু আছে, যেখানে প্রতিনিয়ত তথ্য সংগ্রহীত হচ্ছে, যার অস্তিত্ব আমাদের অজানা।


কয়েক দিন আগে Nature এর Science Update-এ "বিশ্ব জগৎ একটি বিশাল কম্পিউটার" নামের একটি প্রবন্ধ পড়ছিলাম। যেখানে MIT এর Seth Lloyd নামের এক বিজ্ঞানী, এই বিশ্ব জগৎকে একটি বিশাল তথ্যকেন্দ্র হিসেবে তুলনা করছেন। তিনি মনে করেন, বিশ্ব জগত সৃষ্টির পর থেকেই প্রকৃতির চারপাশে বিভিন্নভাবে তথ্য সংরক্ষিত হচ্ছে। অণু পরমাণুর মধ্যে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের মত করে বিভিন্ন ভাবে কোন অণু-পরমাণুর ভিতর অসংখ্য তথ্য সংরক্ষণ করে রাখা সম্ভব। যেখানে ইলেকট্রন, নিউট্রন কিংবা অন্য কোন কণার অবস্থানের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক ভাবে তথ্য সংরক্ষণ করা সম্ভব। আর অণুর মধ্যে ঠিক কত ধরনের কণা আছে তা আজও নতুন নতুন ভাবে প্রতিনিয়ত আবিষ্কার হচ্ছে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমাদের পরিচিত ইলেকট্রন প্রোটন কিংবা নিউট্রনকে আমরা অবিভাজ্য ভাবলেও তা মূলত ছয়টি কোয়ার্ক নামক কণা দিয়ে তৈরি। এমনিভাবে কোয়ার্কের ভিতরও হয়তো আরও কণা থাকতে পারে, কিংবা তার ভিতরও তথ্য সংরক্ষণ হতে পারে। অণু-পরমাণুর মধ্যে তথ্য সংরক্ষণ কীভাবে করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছে IBM এর মত বড় বড় কোম্পানিরা। তারা বর্তমান মানের হার্ড ডিস্ক আরও ক্ষুদ্রতর করতে চায়। তার ফল হালকা হাতঘড়ির মধ্যেই একটি বিশাল কম্পিউটার প্রবেশ করিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। আর সেখান থেকেই কোয়ান্টাম কম্পিউটারের সূচনা।


কোয়ান্টাম কম্পিউটার

আমরা বর্তমানে যে কম্পিউটার ব্যবহার করছি তা ১৯৪১ সন জার্মান ইঞ্জিনিয়ার Konrad Zuse এর হাত ধরে যাত্রাপথ শুরু করে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০ এর দিক Charles H. Bennett, Paul A. Benioff বিজ্ঞানীরা প্রথম কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারণা উপস্থাপন করেন। তারপর এ সম্পর্কে সারা বিশ্ব গবেষণা হচ্ছে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার সম্পর্কে বুঝতে হল একটি অণু-পরমাণুর গঠন সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। আমরা জানি যে, সাধারণত পরমাণুর ভিতর ইলেকট্রন, যা নিউক্লিয়াসের চারিদিক ঘোরে, তা দুটি দিক (ঊর্ধ্বমুখি ও নিম্নমুখি) ঘোরে, যাকে স্পিন নামক কোয়ান্টাম সংখ্যা দিয়ে প্রকাশ করা হয়। ঊর্ধ্বমুখি যে স্পিন তা দিয়ে শূন্য (০) কিংবা নিম্নমুখি স্পিন দিয়ে এক (১) কে প্রকাশ করা যেতে পারে। বাইনারি এই দুইটি ডিজিট হল কম্পিউটারের মূল ভিত্তি, যা দিয়ে কম্পিউটার তার সমস্ত ডাটা সংরক্ষণ করে রাখে। এই ভাবে অণু-পরমাণু সংগ্রহ করে রাখতে পারে এবং কম্পিউটারের লজিক কাজ করে। এর মাধ্যমে কম্পিউটার তার তথ্য সংগ্রহ করে রাখতে পারে এবং লজিক্যাল কাজ করতে পারে।


ফেরেশতা এবং তথ্য সংগ্রহ

যা বলছিলাম, ফেরেশতা তবে কীভাবে তথ্য সংগ্রহ করে, আর শেষ বিচারের দিন কীভাবে সেই তথ্য বর করা হবে? প্রশ্ন উঠতে পারে আমাদের মত প্রত্যেকের পর তা আমাদের শরীর নষ্ট হয়ে যাবে, কীভাবেই বা তা উদ্ধার করা সম্ভব হবে? কি আসলেই কি আমাদের শরীর ধ্বংস হয়ে যায়? শরীরের লাশ হয়তোবা গল প্রকৃতিতে মিশে যায়, কি সেই তথ্য কি উদ্ধার করা মহান আল্লাহতায়ালার পক্ষ অসম্ভব? কখনোই না।

কিংবা এমনও হতে পারে যে, যভাবে সাধারণভাবে তথ্য সংগ্রহের কথা বললাম, তা নাও হতে পারে। হয়তো অন্য কোন মাত্রায় (dimension) তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে যার অস্তিত্ব আমরা জানিনা। আমরা যে চতুর্থ মাত্রায় বিচরণ করছি, সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়, হয়তো পঞ্চম মাত্রা আছে, কিংবা তার থেকেও বেশি মাত্রার জগত আমাদের চারদিকই আছে, যা আমরা উপলব্ধি করতে পারছিনা। মনে করা যাক ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ডের কথাই, আমরা তা উপলব্ধি করতে পারছিনা, কি রেডিও কিংবা টিভির মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য পাচ্ছি। ঠিক এমনিভাবে অন্য কোন জগত থাকতে পারে। আর যারা এই তথ্য লিপিবদ্ধ করছেন সেই কিরামুন কাতিবীন হল ফেরেশতা, যাদের সম্পর্কে ইসলাম বলে, তারা আল্লাহ দিয়ে তৈরি। তাদের অস্তিত্ব আমাদের মত সাধারণ মানুষের চোখ অগোচর। হয়তো তারা একটা ভিন্ন মাত্রায় অবস্থান করে ফলে আমরা তাদের দেখতে পাই না। হয়তো সেই মাত্রায়েই তারা প্রতিনিয়ত লিখে চলেছে, আমরা প্রতি মুহূর্তে কি করছি, যা শেষ বিচারের দিন সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করা হবে।


বহুমাত্রার জগত

আমরা যে প্রকৃতিতে অবস্থান করছি তা মূলত তিনটি মাত্রার। সেগুলি হল - দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং উচ্চতা। এছাড়া সময়কে চতুর্থ মাত্রা হিসেবে গণনা করা হয়। কি এছাড়াও আরও অনেক মাত্রার অস্তিত্ব থাকতে পারে।

একটি কাগজে যদি পঞ্চম মাত্রা অঙ্কন করি তবে তার চিত্রটি কেমন হবে? তা HSM Coxeter নামের এক গণিতবিদ অঙ্কন করেছেন। উপরের চিত্রে, আমাদের পরিচিত এক মাত্রার রেখা, দুই মাত্রার বর্গক্ষেত্র এবং তিন মাত্রার কিউবের চিত্র আছে। এর পর যদি অন্য কোন মাত্রা তাতে যোগ দেওয়া যায় তবে তা হাইপারকিউবের মত হতে পারে। এবং তার বেশি আরও মাত্রা হল তা পলিটোপ হবে।

হাইপারকিউব মাত আটটি কিউব দিয়ে তৈরি। আর একটি ভালমত লক্ষ্য করলে বুঝতে পারব যে এর অস্তিত্ব কি আমাদের চেনাজানা জগত অসম্ভব। কারণ আমাদের মস্তিষ্ক সেই মাত্রা উপলব্ধি করতে অক্ষম। সেই মাত্রার জগতটাই বা কেমন? আর এই পঞ্চম মাত্রাটি কি সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে রয়েছে নানান মতভেদ। তবে অনেকেই পঞ্চম মাত্রা হিসেবে মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকে ধরেন। তবে অন্যান্য শক্তির থেকে এর মানটা বেশ কম, আর তাই এটি নিয়ে বেশ রহস্য পড়ে গেছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন যে অন্য কোন মাত্রায় এই শক্তিটা চলে যায় বলে তা আমাদের চেনা মাত্রার জগতে কম বলে অনুভূত হয়। হয়তো খুব কম দূরত্বের মধ্যে এই মাধ্যাকর্ষণের মান অন্যরকম। সেই কম দূরত্বের মধ্যেই আমরা অন্য কোন মাত্রার জগত আছে। তবে এই মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিয়ে কি অনেক রহস্য রয়েছে। কিছু দিন আগ পর্যন্ত সবথেকে ১ মি.মি. এর ব্যবধানের মধ্যে এই শক্তির পরিমাপ করা হয়েছে। তবে এর থেকে আরও কম ০.২ মি.মি দূরত্বে তা মাপতে সক্ষম হয়েছে ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের Obenberger-Heckl বিজ্ঞানীরা। তারা মনে করেন যে বহুমাত্রা নিয়ে মাধ্যাকর্ষণের যে তত্ত্ব প্রচলিত আছে তা হয়তো ০.২ মি.মি. এর মধ্যে নয়, আরও ক্ষুদ্র পরিমাপ আছে। তারা আরও কম দূরত্বে এই মাত্রা নিয়ে গবেষণা করছেন।

সেই জগতটা আমাদের অজানা। এছাড়া মাধ্যাকর্ষণ শক্তি হিসেবে যাকে আমরা চিনি, তা মূলত ফলাফল বা প্রকাশ মাত্র। এর আসল স্বরূপ সম্পর্কে আমাদের আজও অজানা।


ধর্ম এবং বিজ্ঞান

ধর্ম এবং বিজ্ঞানকে এক হিসেবে দেখা উচিত কিনা তা নিয়ে তর্ক উঠতে পারে। ধর্ম যা বলছে, তা বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা করা সঠিক কি? আজ আমাদের বিজ্ঞান যেখন দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই সমাপ্তি নয়, সামনের দিনগুলিতে নিশ্চয় এই সম্পর্কে আমরা আরও স্পষ্টভাবে কিছু জানতে পারব। বিজ্ঞান পরবর্তনশীল নতুন লব্ধ তথ্যের মাধ্যমে। সেই দিনের অপেক্ষায়।


রেফারেন্স

  1. Lloyd, S. Ultimate physical limits to computation. Nature, 406, 1047-1054, (2000)

  2. Maurice Bucaille, The Bible, The Qur'an and Science [http://home.sixpixnet.se/islam/quran-bible.htm\]

  3. Brane new world, Nature, VOL 411, 28 JUNE 2001

  4. The search for extra dimensions [http://physicsweб.org/article/world/13/11/9\]

  5. Physicists Find Extra Dimensions Must Be Smaller Than 0.2 Millimeter [http://www.spacedaily.com/news/physics-01h.htmls\]

  6. Albert Einstein, Relativity The Special and General Theory [http://www.marxists.org/reference/archive/einstein/works/1910s/relative/index.htm\]

  7. D. Deutsch, A. Ekert, "Quantum Computation," Physics World, March (1998)