জাপান :: ই-সিল্করোড
গত ৪ ও ৫ ই সেপ্টেম্বর ২০০১ হোক্কাইডো এর সাপ্পোরো তে অনুষ্ঠিত হল ই-সিল্করোড এর প্রথম কনভেনশন৷ একবিংশ শতাব্দির এশিয়ার বড় বড় শহরগুলি, যেখানে আই.টি ইন্ডাস্ট্রি একটি বড় ভুমিকা রাখছে সেসব দেশগুলিতে প্রাচীন সিল্করোডের মত সেতুবন্ধনে বাঁধবার উদ্দেশ্যে এই সাপ্পোরো তে শুরু হল ই-সিল্করোড৷ এই মাধ্যমে শুধুমাত্র টেকনলজি নয়, পরষ্পরের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সমন্ধে জানার সুযোগ হবে৷ এবার ইন্টারনেট স্পিচ এর আমন্ত্রণে আমার এই কনভেনশনে অংশ নেবার সৌভাগ্য হয়েছিল৷ সাপ্পোরো, সিউল, বেইজিং, সেনইয়াং, হংকং, সেনজে, সাংহাই, সিঙ্গাপুর, ঢাকা, ব্যাঙালোর এই শহরগুলি একটি সেতুবন্ধনে আসবে এই ইসিল্ক রোড এর সুচনা৷ সাপ্পোরো হল জাপানের উত্তরে হোক্কাইডো প্রদেশের একটি শহর এবং এটা মূলত পর্যটন কেন্দ্রই হিসাবে মেইজি কাল থেকেই বিখ্যাত৷ কিন্তু এই সাপ্পোরো শহরে ১৩ বছর আগে টেকনো পার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়, যেখানে আই.টি এর অনেক কম্পানি সেখানে আছে এবং জাপানের আই.টি এর ক্ষেত্রে এই টেকনো পার্ক বেশ ভূমিকা রাখছে৷ তাই সাপ্পোরোকে সাপ্পোরোভ্যালি বলা হয়৷ জাপান, কোরিয়া, বাংলাদেশ, ভারত থেকে মোট ৮৬ টি কম্পানি এবার এই কনভেনশন এ অংশ নিচ্ছে৷ শুধু মাত্র কম্পানিগুলির বুথগুলিতে কম্পানির পরিচয়ই নয়, পাশাপাশি সেমিনার, প্যানেল সেসন, লেকচার এর ব্যাবস্থাও ছিল৷ সারা বিশ্বব্যাপী এই আই.টি নিয়ে হৈচৈ কম হয়নি৷ বর্তমানে এই ইন্ডাস্ট্রিগুলির অবস্থা তেমন সুবিধাজনক না হলেও এটা নি:সন্দেহ যে যে কোন দেশই তাদের অর্থনীতির একটা অন্যতম প্রধান শক্তি হিসাবে এই আই.টি কে চিহ্নিত করবে৷ এতদিনের অবহেলিত এশিয়া নতুন করে এই আই.টি এর মাধ্যমে জেগে উঠছে এবং বিশ্ববাজারে সবার দৃষ্টি অর্জনে সক্ষম হয়েছে৷ এর মধ্যে চীন কোরীয়া ও ভারতের কথা প্রথমেই বলতে হয়৷ এবার এশিয়ার আই.টি এর জন্য সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই ই-সিল্করোড কনভেনশনটি৷ এবারের এই কনভেনশনটিতে সরকারের নীতি নির্ধারণ এর সাথে জাড়িত লোকদের সাথে সাথে ব্যাবসায়ীরাও জড়িত আছে৷ কেননা বেশীর ভাগে দেশেই দেখা গেছে যে সরকারের আগে ব্যাক্তিগত পর্যায়ে কিংবা ব্যবাসায়িক ভাবেই আই.টি বিপ-ব হয়েছে৷ এবারের কনভেনশনে তাই এই দুই দলের মাঝের দূরত্বকে কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে৷ এছাড়াও জাপান, চীন, কোরিয়া, বাংলাদেশ এবং ভারতের আই.টি লিড
দিচ্ছে এমন সবাই এসেছে৷ কনভেনশনটি উদ্ভোধন করেন সাপ্পোরো এর সিটি মেয়র কাত্সুরা নবুও৷ এবার বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধিত্ব করছেন বুয়েটের সিদ্দিকী হোসেইন স্যার এবং কম্পটেক নেটওয়াক সিস্টেম লি: এর শামীম ভাই৷ এছাড়া ড: খান তার বিখ্যাত ইন্টারনেট স্পিচ নিয়ে এসেছিলেন৷ খান ভাই এর উদ্ভাবিত এই ইন্টারনেট স্পিচ দিয়ে যে কোন ওয়েবপেজ টেলিফোনের মাধ্যমে শোনা যাবে৷ ইতিমধ্যেই তার উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি আমেরিকাতে সারা ফেলেছে এখন জাপানে এই প্রযুক্তি প্রয়োগের চিন্তা ভাবনা চলছে৷ আমি ও আলম ভাই তার বুথের দায়িত্বে ছিলাম৷ জাপানিজরা ইংরেজীভাষাতে ভিষন দূর্বল বলে তা জাপানিতে ডেমো করার দায়িত্বে ছিলাম৷ লালফিতে কেটে উদ্ভোধন করার সাথে সাথে বুথগুলিতে অসংখ্য মানুষের ভীড় দেখা গেল৷ প্রথম দিনে সিদ্দিকী হোসেইন স্যার অতিথি বক্তা হিসাবে তার বক্তব্য রাখলেন৷ তিনি বাংলাদেশে আই.টি এর সম্ভাবনার উপর কিছু বললেন এবং আই.টি এর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা তুলে ধরনের৷ এছাড়া ড: খানও এশিয়া এবং বাংলাদেশে আই.টি এর সম্ভাবনা সমন্ধে তুলে ধরেন৷ এছাড়াও আরো অনেকে বক্তব্য রাখেন, যেগুলির বেশীরভাগই ছিল কিভাবে এশিয়াতে আরো ভালোমত আই.টি এর বিস্তার করা যায়৷ প্রতিষ্ঠিত কম্পানির চেয়ারম্যানরা বক্তব্য রাখলেন কিভাবে ইনভেস্টমেন্টদের কম্পানিতে ইনভেস্ট করতে উত্সাহী করা যায়৷ এছাড়া বাংকিং সেক্টর থেকে অনেকেই বক্তব্য রাখলেন, লোন এবং আই.টি এর ব্যাপারে৷ একটা ঘরে লিগ্যাল এডভাইজাররা নতুন কম্পানি উদ্যোক্তাদের সাথে কথা বলছিলেন কিভাবে কম্পানি খোলা যায়৷ যারা নতুন কম্পানি খুলতে আগ্রহী তাদের জন্য এই ধরনের একটি সেমিনার খুবই গুরুত্বপূর্ণ৷ প্রথম দিনে অসংখ্য লোক আমাদের বুথে আসে এবং যখন তারা জানলো যে অন্ধ লোকেরা যারা কখনও ইন্টারনেট দেখতে পারবেনা তারা এর মাধ্যমে ইন্টারনেট এর পেইজগুলি পড়ে শুনতে পারবে তখন তারা অবাক হয়ে গেল৷ সেদিন অনেক সংবাদপত্র এবং টিভি এর সাংবাদিকরা আমাদের বুথ দেখলো এবং সাক্ষাতকার নিয়ে গেল৷ সেদিন রাতের জাপানের রাতের সংবাদের একটা বড় অংশ এই ই-সিল্করোডের উপর বর্ণনা থাকে৷ রাতে মেয়র আগত অতিথীদের বিশেষ পার্টিতে আয়োজন করেন৷ খুব স্বাভাবিকভাবে জাপানের শুশি এর সাথে অতিথীদের পরিচয় হয়৷ ব্যাঙালোর থেকে আগত ইনফরমেশন মিনিস্ট্রির এর প্রতিনিধী অজয়
মেহতা জীবনে প্রথম শুশি খান বলে তাকে বেশ উত্ফুল- দেখাচ্ছিল৷ কিন্তু যখন শুনলো যে শুশি মানে হল ভাতের সাথে কাচা মাছ এর ডলা তখন অবাক হয়ে গেল৷ কোনমতে খেয়ে বললেন, মানুষ এইরকম কাচা মাছ খেতে পারে? পার্টিতে বসে জাপানের আই.টি নিয়ে কথা হচ্ছিল৷ যদিও জাপান মূলত বিভিনড়ব ধরনের ডিভাইস এবং হার্ডওয়ার এর ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে আছে কিন্তু সফটওয়ার এর দিকে তেমন উলে-খযোগ্যভাবে এগুতে পারেনি৷ এর কারণ হিসাবে অনেকেই বলল যে, এতদিন জাপান যেভাবে তার হার্ডওয়ার এর ব্যাবসা চালিয়ে এসেছে, সেই পুরানো স্টাইলেই এই আই.টি তে চালিত করছে৷ এছাড়া জাপানের আই.টি কে যারা পরিচালিত করছে তারা নিজেরাও আই.টি সমন্ধে খুব একটা ভালো বুঝেনা৷ অনেকেই কম্পিউটারের উপর তেমন দখল নেই৷ আর এই আই.টি এর ক্ষেত্রটি খুব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে৷ কয়েকদিন আগেও যে টেকনলজি বাজার দখল করেছে, ছয়মাস পরে তা বাজারে থাকতে পারেনা৷ এই ক্ষেত্রে শামীম ভাইয়ের একটি কথা খুব ভালো লাগলো, যে আই.টি না বুঝে আই.টি কে পরিচালনা করা সম্ভব নয়৷ এবং এখানে সিদ্ধান্ত নিতে হয় খুব দ্রুত এবং এই ইন্ডাস্টিটা সবকিছুর থেকে একদম আলাদা৷ দ্বিতীয় দিনেও বুথগুলিতে অসংখ্য দর্শকের ভীড় ছিল এবং পাশাপাশি সারাদিন ধরে সেমিনার চলল৷ বেশীরভাগই এশিয়ার আই.টি এর উপর৷ বক্তারা বেশীরভাগই এসেছিলেন বড় বড় কম্পানির নীতি নির্ধারকরা এবং পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকেও অনেকে সেমিনারে অংশ নেন৷ তবে হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের আওকি এর বক্তব্য বেশ ভালো লাগলো এবং অনেকগুলি সেমিনার এর কেন্দ্রবিন্দু তিনি ছিলেন৷ দ্বিতীয় দিনে আমাদের বুথেও বেশ ভীড় ছিল৷ অন্যান্য বুথগুলির মধ্যে এন.টি.টি ডোকোমো তাদের নতুন উদ্ভাবিত ফোমা মোবাইল ও এল মোড টেলিফোন নিয়ে এসেছিল৷ ব্রডব্যান্ডের মালটিমিডিয়ার মাধ্যমে এই ফোমা মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যাবে৷ আর এল মোড অনেকটা আই. মোড এর মতই ঘরের টেলিফোনে আই.মোড ব্যবহার করা যাবে৷ এছাড়া এন.ই.সি নতুন ধরনের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট টিভি নিয়ে এনেছিল৷ এছাড়া ফুজিত্সু, অলিম্পাস, হিটাচি, এপসন সহ বড় বড় সব কম্পানি এসেছিল৷ কোরিয়া এর বেশীরভাগ কম্পানিই সফটওয়ার এর কম্পানি এসেছিল৷ এছাড়া ব্র্যাকম নামে একটি কোরিয়ার কম্পানি আঙ্গুলে ছাপের সেন্সর দিয়ে দরজা খোলা এবং ক্রেডিট কার্ড তৈরীর প্রযুক্তি
নিয়ে এসেছিল৷ ফলে হোটেলগুলিতে আর চাবি রাখার দরকার হবে না৷ নিজের হাতের ছাপ দিয়ে দরজা লক করা যাবে এবং সেই লক খোলা যাবে৷ অনেক কম্পানিই এই ধরনের সিকিউরিটির জিনিস বাহির করছে তবে এখনও ১০০% ব্যাবহারযোগ্য নয় বলে এখনও গবেষনা চলছে৷ আমি বেশীরভাগ সময়ই ইন্টারনেট স্পিচ এর ডেমো শোনাতেই ব্যাস্ত ছিলাম৷ বিকাল বেলাতে অনুষ্ঠান সমাপনী অনুষ্ঠান হল৷ সন্ধ্যাবেলাতে আমরা সবাইমিলে ভারতীয় একটা রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম৷ মূলত অতিথী অনেকেই জাপানীজ বিস্বাদ খাবার খেয়ে সুবিধা করতে পারেননি বলেই এই অবস্থা৷ আমাদের সাথে এশিয়া ভিশন এর সাইমন ছিলেন৷ এই কনভেনশন এর মূল কেন্দ্রবিন্দু তিনিই৷ পুরো অনুষ্ঠানের কো-অর্ডিনেটরই তিনি ছিলেন৷ গত মাসে তিনি বাংলাদেশ ভারত কোরীয়া ঘুরে এই ই-সিল্করোড কনভেনশনটি সার্থক করে তুলেন৷ রাতের খাবারের সাথে সাথে তুমুল আলোচনা হচ্ছিল এশিয়ার আই.টি এর উপর৷ খাবারের পর আমরা সবাইমিলে হাটার সিদ্ধান্ত নিলাম৷ এমনিতেই আমার হাটতে খুব ভালো লাগে আর সেদিন ছিল জোছনা রাত৷ অনেকগুলি ফটোগ্রাফির মডেল পেয়ে গেলাম৷ রাস্তার পাশে অনেককেই দেখলাম গান গাচ্ছে, কোথাও কোথাও বিভিনড়ব ধরনের পসরা নিয়ে বসেছে৷ খুব ভালো লাগলো কেননা কয়েকটি খুব ভালো ছবি তুলতে পেরেছি৷ তবে জোছনা হলেও আকাশে চাঁদের কোন পাত্তা পেলামনা৷ চারিদিকে ঝলমলে শহরের আলোতে সে কোথাও বোধহয় হারিয়ে গিয়েছে৷ আজ হতে ৪ বছর আগেও আমি একবার সাপ্পোরোতে এসেছিলাম৷ অথচ আমি কোন পরিবর্তনের কিছু দেখছিলামনা৷ আজো সেইদিনের মত রাতের সাপ্পোরা সেদিনের মতই উজ্জ্বল৷ পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে এয়াপোর্টে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিতে লাগলাম৷ সিদ্দিকী স্যার এবং শামীম ভাইকে এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়ে সাপ্পোরো রামেন খেলাম৷ এই সাপ্পোরো রামেন জাপানে বেশ বিখ্যাত৷ পুরো এয়ারপোর্টে বেশ টুরিষ্ট এর ভীড়৷ এর পড়ে আমি নাগোয়ার প্লেনে উঠলাম এবং আলম ভাই টোকিও এর পে-নের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন৷ মাত্র দুইদিন কিভাবে দ্রুত কেটে গেল৷ অনেক লোকের সাথে পরিচিত হবার বিরল সৌভাগ্য হয়েছিল৷ ই-সিল্করোড তার যাত্রা শুরু করলো৷ আমার বিশ্বাস, এই শতাব্দিতে এশিয়ার অর্থনীতিতে বিশ্বে সবথেকে আলোচিত বিষয় হবে৷ এবং এশিয়ার আই.টি আরো বিস্তার পাবে৷ আর ই-সিল্করোড এশিয়ার আই.টি তে নিশ্চয় ভূমিকা রাখবে৷ পরবতী
ই-সিল্করোডের কনভেনসনটি হবে চীনে৷ বিস্তারিত জানতে ই-সিল্করোড এর হোমপেজ দেখুন: http://www.e-silkroad-web.com