মশিউরের খেরোখাতা

সিঙ্গাপুরের ডাইরি: শিক্ষাকার্যক্রমে কম্পিউটারের প্রয়োগ (২০২০)

তারিখ: ২২ জানুয়ারি ২০২০

(১)

করোনাকালিন সময়ে বাসা থেকেই অফিস করছি। বাচ্চারা স্কুলে গেছে, গিন্নি রান্না ঘরে। এমন সময় কলিংবেলটি বেজে উঠলো। দরজা খুলে দেখি অ্যাপল কম্পিউটার প্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে একটি জিনিস পৌছে দিতে। মাত্র দুই দিন আগেই আমার দ্বিতীয় ছেলে মাশরাফি এর জন্য কম্পিউটারের অর্ডার দিয়েছিলাম। এত দ্রুত তা পৌছাল দেখে অবাক হলাম। সিঙ্গাপুরের ইকমার্স এর সার্ভিসগুলি দিন দিন আরো ভালো হচ্ছে। সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রিতে মানউন্নয়ন করা বেশ কঠিন তারপরেও ভালো প্রতিষ্ঠানগুলি সবসময়ই তাদের মানউন্নয়নের জন্য সচেষ্ট। একজন ভোক্তা হিসাবে সেটা বোঝা যায়।

কম্পিউটারের পার্সেলটি হাতে আসলেও না খুলে রেখেই দিলাম। মাশরাফি এসেই খুলুক। নিজের কম্পিউটার নিজেই খুলুক। মাত্র ১২ বছর বয়সে একেবারেই নিজের ব্যবহারের জন্য  কম্পিউটার পাচ্ছে দেখে সত্যিই খুব হিংসে হচ্ছে।

আমার প্রথম কম্পিউটারে হাত ১৬ বছর বয়সে, তাও ঢাকার একটি সেন্টারে ওয়ার্ডস্টার নামের একটি এডিটর শিখতে যেয়ে। আজকের যুগে কেউ আর এডিটর শিখে না, এমনিতেই শিখে নেয়া যায়। সেই সময়ের কথা আজকের প্রজন্মরা বোধদয় করতে পারবেনা। কত কাঠখড়ি পুড়িয়ে আমাদেরকে কম্পিউটার শিখতে হয়েছে। এরপরে নিজের কম্পিউটার কেনার সৌভাগ্য হয় ২০ বছর বয়সে, তাও জাপানে স্কলারশিপে পড়ার সুবাদে। জাপান থেকে বাংলাদেশে বেড়াতে যাবার সময় বাসার জন্য একটি কম্পিউটার কিনে ভাইদের হাতে তুলে দিয়েছিলাম তাও তাদের ১৮ বছর বয়সের দিকে।

সেই হিসাবে আমার সন্তানরা অনেক আগেই এই সুযোগটি পাচ্ছে। তার কারন হল সিঙ্গাপুরের নতুন জাতীয় ডিজিটাল শিক্ষা কার্যক্রম (National Digital Literacy Program) এর কারনে। ১৭ জুন ২০২০ সনে এর কার্যক্রম শুরু হয় যেখানে ২০২১ এর ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিটি মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থিদের নিজস্ব কম্পিউটার দেবার লক্ষ্য নির্ধারন করে। ২০২১ এর শুরুর দিকে ৫ টি স্কুলে এটি নিয়ে একটি পাইলট প্রোজেক্ট করে এবং তার ভালো ফলাফল দেখে তা অন্যান্য স্কুলগুলিতেই ধীরে ধীরে কয়েকটি ধাপে প্রয়োগ করে। প্রথম পর্যায়ে ৮৬ টি স্কুলে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬৬ টি স্কুলে কম্পিউটার বিতরণ ও প্রয়োগের কাজগুলি করে।

ছবি সিঙ্গাপুরের ক্লাশরুমের একটি দৃশ্য (অনলাইন থেকে সংগ্রীহিত)

আমরা দুই সন্তানই সিঙ্গাপুরের সরকারি স্কুলে পড়ে। আমার প্রথম সন্তান মেহরাব সেই কার্যক্রমে মাধ্যমিক স্কুলের দ্বিতীয় বর্ষে গত বছর ২০২০ এর নভেম্বরে তার কম্পিউটারটি পায়। সিঙ্গাপুরে পড়াশুনার জন্য কম্পিউটার প্রয়োগের কাজ শুরু হয় অনেক আগে ১৯৯৭ এর দিকে। তাদের National ICT Masterplan সেই সময়ে তারা গ্রহণ করে যেখানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থিদের তারা প্রস্তুত করবে শিক্ষাকার্যক্রমের মধ্যেই কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করতে এবং মাঝে মধ্যেই ইলার্নিং দিন পালন করবে যেখানে বাচ্চারা বাসা থেকেই পড়াশুনা করবে। সেই সময়ে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল যদি কখনও জরুরী প্রয়োজনে বাচ্চারা স্কুলে না যেতে পারে সেজন্য যেন তারা বাসা থেকেই পড়াশুনা করতে পারে সেই জন্য। অবশ্য তাদের এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপের কারণেই করোনাকালীন সময়ে সিঙ্গাপুরে পড়াশুনা বিঘ্নিত হয়নি।

===========

(২)

২০১৯ সনে সিঙ্গাপুর তাদের শিক্ষাকার্যক্রমে কম্পিউটার কোডিং বা প্রোগ্রামিং কে সংযুক্ত করে। আমি বাসাতেই নিজের উৎসাহেই আমার বাচ্চাদের পাইথন, আরডুইনো এবং রাসবেরি পাইয়ের সাথে পরিচয় করে দিয়েছিলাম। কিন্তু যখন সিঙ্গাপুর সরকার তাদের নিজেদের কার্যক্রমে সেগুলি অন্তর্ভুক্ত করলো তখন অবাক হলাম। মাশরাফি প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই কম্পিউটারে হাতে খড়ি পেল। তখন তার কি বিপুল উৎসাহ। চোখগুলি জ্বলজ্বল করছিল যখন যে একটি করে সমস্যা সমাধান করতে পারছে।

সিঙ্গাপুরে শিক্ষার্থিদের নিজের কম্পিউটারকে বলে Personal Learning Device এবং এই কম্পিউটারগুলি এমন ভাবে সেটআপ করা থাকে যেন পড়াশুনা সংক্রান্ত সাইটগুলিই একসেস করতে পারে এবং পর্নগ্রাফি কিংবা গেম সাইটগুলিতে তারা দেখতে পারবেনা। আমরা যাকে বলি ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট এপ্লিকেশন। সিঙ্গাপুরে সন্তানদের পড়াশুনার জন্য একটি অভিভাবদের একটি আলাদা ফান্ড আছে যাকে এডুসেভ বলে। সেই এডুসেভের ফান্ড ব্যবহার করে এই কম্পিউটারগুলি কিনতে পারবে এছাড়া যাদের অর্থনৈতিক সমস্যা রয়েছে তাদের জন্যও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের স্কিম যেন সব শিক্ষার্থিদের হাতেই পৌছে যায় তাদের নিজস্ব কম্পিউটার।

ছবি: সিঙ্গাপুরের একটি স্কুল Hwa Chong Institution (উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রীহিত)

করোনাকালিন সময়ে হোম বেজ লার্নিং বা বাসা থেকেই পড়াশুনার কার্যক্রম শুরু হয় এবং সেই সময়ে এই কম্পিউটার গুলি মারাত্মক উপকারে আসে শিক্ষার্থীদের। শুধু মাত্র শিক্ষার্থীই নয়, সেই সাথে অভিভাবদেরও এই সংক্রান্ত ব্যাপাগুলির সাথে পরিচিত করান হয়। সিঙ্গাপুর এটিকে বলছে Regulated Digital Environment যেন Cyber Wellness ভালো হয়। অর্থাত শিক্ষার্থীরা যেন সাইবার সিকিউরিটি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে কোন সমস্যায় পড়তে না হয়।

সিঙ্গাপুরের এই উদ্দ্যোগকে আমার এই কারণে ভালো লাগে এই কারণে যে, ইন্টারনেট জগতটি একটি উন্মুক্ত জগত। সেখানে ভালো জিনিস যেমন আছে তেমনি খারাপ জিনিসও আছে। তাই শিক্ষার্থী সহ অভিভাবকদেরও এই বিষয়গুলির সাথে পরিচয়, নিয়মকানুন ও কি কি বিষয়ে সাবধান হতে হবে সেই ব্যাপারে ওয়াকিবাহাল করে।

===========

(৩)

অনলাইনে পাঠদানের জন্য সিঙ্গাপুর গড়ে তুলেছে তাদের নিজস্ব শিক্ষা প্লাটফর্ম যা Singapore Student Learning Space বা SLS নামে পরিচিত। বিকেলে মেহরাব স্কুল থেকে ফিরে বলল তার কিছু হোমওয়ার্ক SLS এ দিয়েছে। সেখানে লগইন করে দেখতে পেলাম যে তার জন্য দুটি এসাইনমেন্ট শিক্ষক দিয়েছে। তা নিজে নিজে পুরন করে অনলাইনেই জমা দিল।

ছবি: সিঙ্গাপুরের Temasek Polytechnic (উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রীহিত)

আমার দুই ছেলেকে পড়াশুনার ব্যাপারে তেমন একটা গাইড করার প্রয়োজন হয়না। কারণটি হল সিঙ্গাপুর সরকার বর্তমানে Self Directed Learners বা স্বাবলম্বী শিক্ষার্থী তৈরীর ফিলসফি গ্রহণ করেছে। এই সংক্রান্ত বিস্তারিত যা জানলাম তা হল, আমাদের বর্তমান আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট মারাত্মকভাবে পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের তাদের ভবিষ্যতের প্রয়োজনীয় সমস্ত স্কিলসেট দিয়ে তৈরী করা সম্ভব নয়। তাদের এমন ভাবে তৈরী করতে হবে যেন তারা নিজেরাই নিজেদের সমস্যাকে সমাধান করতে পারে, স্বাবলম্বী হয়ে নিজেরাই শিখতে পারে।

সেজন্য সিঙ্গাপুর স্কুলগুলিতে ব্লেন্ডিং লার্নিং বা মিশ্র শিক্ষাপদ্ধতি গহণ করেছে। এই পদ্ধতিতে স্কুলে শিক্ষক কিছু শেখান, কিছু বাসাতেই নিজে নিজেই শিখবার জন্য দেন এবং সেগুলি শিখে তাদের কিছু সমস্যা সমাধান করতে শেখে। এই পদ্ধতি প্রয়োগের ফলে শিক্ষার্থীরা স্বাবলম্বী হিসাবে গড়ে উঠবে।

আমি ব্যাক্তিগত ভাবে আমার দুই সন্তানের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতির মারাত্মক সুফল দেখতে পারছি। তারা নিজেরাই নিজেদের হোমওয়ার্ক করে এবং নতুন নতুন বিষয়গুলি দ্রুত নিজেরাই শিখে ফেলে। আত্মনির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠছে।

===========

(৪)

মাশরাফি গতবছর তার প্রাইমারি স্কুলের পড়াশুনা শেষ করে সেকেন্ডারি স্কুলে ভর্তি হল। তার শিক্ষক আমাদের অভিভাবকদের একটি ওয়েলকাম চিঠি দিয়েছি। তাতে অভিভাবক হিসাবে আমাদের কিছু পরামর্শ দিয়েছে। সেই পরামর্শগুলির সারমর্ম তুলে ধরছি,

  • প্রতিদিন স্কুল কেমন হল তা জানতে চাইবেন এবং পজিটিভ জিনিসগুলি ফোকাস করবেন

  • আপনার সন্তানের কোন বিয়গুলিতে ভালো এবং আগ্রহ সেটি খুজে পাবার চেষ্টা করবেন। জানার চেষ্টা করবেন কোন বিষয়গুলি তাকে উজ্জিবিত করে।

  • একজন অভিভাবক হিসাবে তাকে একটি পড়াশুনার ভালো পরিবেশ দিবেন যেন সে - (১) নিজেই নিজের হোমওয়ার্ক শেষ করেত পারে (২) পড়তে মজা পায়।

  • যেন সে নিজেই নিজের সময়কে ম্যানেজ করতে পারে।

  • সে যেন সুস্বাস্থে থাকে, তার পড়াশুনা, ঘুম ও খেলার সময়ের মধ্যে যেন ব্যালেন্স থাকে।

  • জীবনে সমস্যা থাকবেই এবং সেটা জীবনের একটি অংশ। কিন্তু অধ্যাবসায় হয়ে তা অতিক্রম করা শিখতে হবে।

  • তারা যেন প্রশ্ন করতে উৎসাহী হয়

  • বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তুলে।

  • অন্যের দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান করতে হবে এবং মতানৈক্যকে বন্ধুত্বপুর্ণভাবে সমাধান করতে হবে।

  • কোড অফ কনডাক্ট শিখতে হবে।

চিঠির পয়েন্টগুলি আমার খুব ভালো লাগলো। আমরা অভিভাবকরা বেশীরভাগ ক্ষেতেই শুধু মাত্র পড়াশুনা বা তার একাডেমিক ফলাফলকে গুরুত্ব দেই কিন্তু সেই সাথে  তার মানসিক বিকাশগুলিতে আমরা জোর দিইনা। শিক্ষকের চিঠিটি আমাকে সেইদিকে গুরুত্ব দেবার জন্যই বলল। এর মধ্যে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে “মতানৈক্যকে বন্ধুত্বপুর্ণভাবে সমাধান করতে হবে”। এই কাজটিতে আমরা বাঙালীরা একেবারেই করতে পারিনা। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী Martin Seligman বলেন যে আমাদের মধ্যে যে পজিটিভ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ার পিছনে শতকরা ৪০ ভাগ আসে পূর্বপ্রজন্মের জেনেটিকস থেকে এবং বাকি শতকরা ৬০ ভাগ আমাদের নিয়ন্ত্রণে। আমার জেনেটিকস নিশ্চয় আমার সন্তানের মধ্যে আছে এবং আশা করি আমাদের বাঙালিদের এই দূর্বলতাকে আমাদের সন্তানরা নতুন পরিবেশে তারা কাটিয়ে তুলতে পারবে।

সিঙ্গাপুরের শিক্ষাকার্যক্রম শুধুমাত্র একাডেমিক বিষয়গুলির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সিঙ্গাপুর মূলত নিম্নের ৮টি ভ্যালু বা গুণকে তাদের শিক্ষা কার্যক্রমে এনেছে:

১. চরিত্র গঠন

২. সেলফ ম্যানেজমেন্ট

৩. সামাজিক ও অন্যকে সহযোগীতার স্কিল

৪. অক্ষর এবং সংখ্যা

৫. কমিউনিকেশ স্কিল

৬. তথ্য সংক্রান্ত স্কিল

৭. চিন্তা করার স্কিল এবং সৃজনশীলতা

৮. জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতা

===========

(৫)

এই নিয়ে যখন আলাপ আলোচনা করছি, তখন মাশারাফি স্কুল থেকে ফিরলো। বাসায় ফিরে নিজের কম্পিউটার দেখে তার খুশি আর কে দেখে। বাক্সখুলে যেভাবে কম্পিউটারকে জড়িয়ে ধরলো মনে হল যেন সে তার প্রিয়তমাকে জড়িয়ে ধরলো। কোন দিকে না তাকিয়েই সে তার কম্পিউটার সেটা করতে মগ্ন হয়ে গেল। অ্যাপল গত বছর তাদের নিজস্ব M1 এর চিপ দিয়ে কম্পিউটার ছেড়েছিল। পার্সোনাল লার্নিং ডিভাইস হিসাবে তাদের স্কুলে অ্যাপল এর কম্পিউটার গ্রহণ করেছে কেননা কম্পিউটারে কোডিং সহ অন্যান্য কাজে এই ধরনের হাইপারফরম্যান্স কম্পউটার ভালো হয়। অবশ্য মেহরাবদের গত বছর দিয়েছিল লেনোভো এর ক্রোমবুক।

রাতে খাবার টেবিলে দুই ভাইয়ের মধ্যে বিতর্ক শুরু হল - কার কম্পিটার ভালো। দুইজনই তাদের সিস্টেমের ভালো ফিচারের কথাগুলি বলছিল। তাদের দুই ভাইয়ের খুনসুটি শুনতে শুনতে অবাক হলাম এই নতুন প্রজন্মদের যারা হাতের নাগালেই কম্পিউটার দিয়েই তাদের শিক্ষাকার্যক্রম করছে।

তথ্যসূত্র:

সিঙ্গাপুর, ১৫ জুলাই ২০২২