একুশে ফেব্রুয়ারী এবং সিঙ্গাপুরে বাংলা স্কুল (২০২৩)
তারিখ: ২৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
চলে এল ফেব্রুয়ারী, ভাষা আন্দোলনের মাস। এই মাসে আসলে একটু বেশী করেই বাংলা ভাষাকে আমরা নতুন করে গুরুত্ব দিই, কোন জায়গাগুলিতে আমাদের আরো বেশী গুরুত্ব দেয়া উচিত এই আলোচনা গুলি এই মাসে একটু বেশীই করি। অনেকেই এই- “ফেব্রুয়ারী মাসে” বেশী গুরুত্ব দেয়াকে কটু চোখে দেখে। তবে আমি ব্যাপারটি ইতিবাচকভাবেই নিই। হোক না হয় একটি বিশেষ মাসেই আলোচনা, তারপরেও তো না হয় সেখান থেকে ভালো কিছু হল, মন্দ তো কিছু হল না। আলোচনা হলে তা বাংলা ভাষার জন্যই ভালো।
এইবার আপনাদেরকে পরিচয় করে দিতে চাই সিঙ্গাপুরে বাংলা স্কুলগুলিকে।
বাংলাদেশের বাহিরে প্রবাসীরা বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটে সেখানে দ্বিতীয়, তৃতীয়, আবার কোথাওবা চতুর্থ প্রজন্ম বসবাস করছে। তবে আমার জানা মতে সিঙ্গাপুরই একমাত্র দেশ যেখানে স্কুল-কলেজের মূল কারিকুলামেই মাতৃভাষা বাংলা শেখে।
সিঙ্গাপুরে মূলত দুই ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, (১) মূল সরকার পরিচালিত (২) বেসরকারি। বেসরকারি স্কুল কলেজগুলি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ভিন্ন ভিন্ন কারিকুলাম অনুযায়ি পড়ায়। তবে সরকারি পরিচালিত স্কুলগুলিতে মাতৃভাষা (বা পিতৃভাষা) শেখা বাধ্যতামূলক (*কিছু বিশেষ ব্যতিক্রম ছাড়া)। সিঙ্গাপুরে সরকারি স্কুলগুলিতে বাংলা ভাষা পড়ান হয় Non-Tamil ভাষার আয়তায় যেখানে মোট পাঁচটি শেখান হয়। সেইগুলি হল: বাংলা, গুজরাটি, হিন্দি, পাঞ্জাবি এবং উর্দু।
শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিয়ন্ত্রনে BTTSAL (Board of Teaching and Testing of South Asian languages) নামে একটি প্রতিষ্ঠান এই পাঁচটি ভাষার জন্য কাজ করে। এই প্রতিষ্ঠান থেকেই শিক্ষক নিয়োগ, ট্রেনিং এবং স্কুল পরিচালনা সহ আনুসঙ্গিক কাজগুলি করা হয়। বর্তমানে সিঙ্গাপুরে বাংলা ভাষা শেখার জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। একটির নাম BLLS (Bangla Language and Literary Society) এবং অপরটি হল Bangladesh Language and Cultural Foundation ।
দ্বিতীয় পর্ব
সিঙ্গাপুরে বাংলা ভাষা শেখানোর জন্য দুটি স্কুল আছে। ২৫ শে ফেব্রুয়ারিতে এই দুটি স্কুলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হলো এবং সৌভাগ্যবশত দুটি স্কুলের অনুষ্ঠানেই যাবার দূর্লভ সুযোগ হয়েছিল আমার। আজকের লেখাটি এই দুটি স্কুলে যাবার অভিজ্ঞতা নিয়ে।
(১) বি.এল.সি.এফ. সকালে গিয়েছিলাম বি.এল.সি.এফ. বা Bangladesh Language and Cultural Foundation এর বাংলা স্কুলে। স্কুলের ভিতরেই ক্যান্টিনে ঘরোয়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল তারা। ঘরোয়া হলে হবে কি?- খুব গোছানো অনুষ্ঠান ছিল। স্কুলের একটি ছেলে (নামটি কারো জানা থাকলে কমেন্টে জানিয়েন) এত সুন্দর করে একটি প্রবন্ধ পড়লো যে আমার চোখে পানি চলে এসেছিল। বাংলা স্কুলের দ্বিতীয় প্রজন্মরা যখন সবাই মিলে গাইলো “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” তখন সত্যিই শিহরিতো হলাম। স্কুলের প্রধান অধ্যক্ষা মিলিয়া সাবেদ আমার দ্বিতীয় বই, “ডিজিটাল জামানায় পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং” বইটি মোড়ক উন্মোচন করেন। তার হাত দিয়েই সিঙ্গাপুরে যাত্রা শুরু করলো এই বইটি। অনুষ্ঠানের শেষে মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের সার্টিফিকেট প্রদান করলো। অনুষ্ঠানের পরে অনেকেই বই কিনলো। তবে মাধ্যমিক শ্রেণীর দুটি ছাত্রী বই কিনতে আসলে এই ক্ষুদে ক্রেতাদের পেয়ে সত্যিই আপ্লুত হলাম। সামনের বিশ্বে তারা সফলভাবে নিজেদের ব্র্যান্ডিং করে সফল হোক সেই দোয়া করলাম।
(২) বি.এল.এল.এস. বিকেলে ছিল বি.এল.এল.এস. বা Bangla Language and Literary Society এর আয়োজনে অনুষ্ঠানটি। তাদের অনুষ্ঠানটি বেশ বড় ছিল এবং সিঙ্গাপুরের প্রবাসী বাংলাদেশিদের ঢল নেমেছিল অনুষ্ঠানটিতে। প্রধান ফটক দিয়ে ঢুকতেই চোখে পড়লো বইমেলা। প্রতিবছরই তারা বই মেলার আয়োজন করে। তবে এইবার বইয়ের সংখ্যা বেশ ছিল। বই পড়ুয়া আমি কোনটি বাদ দিয়ে কোনটি নেব, তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। বইমেলাতে আমার “ডিজিটাল জামানায় পার্সোনাল ব্র্যান্ডিং” বইটিও তারা রেখেছিলেন। যারা কিনছিলেন তাদের অটোগ্রাফ দিয়ে বেশ ব্যস্ত সময় কাটালাম। তবে ভাল লাগলো আয়োজকদের আন্তরিকতা দেখে।
পাশের ঘরেই আয়োজন করেছিল কাপড়, শাড়ি, খাবার এর স্টল। হাপুস হুপুস করে খেলাম চটপটি, ফুচকা, মুড়ি, খিচুরি সহ হরেক করমের মিষ্টি। আমার বন্ধুবৌ তার জামদানি শাড়ির স্টল দিয়েছিল এবার। একটু পরেই ছোটদের ছবি আঁকার প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হল। বাচ্চাদের প্রতিযোগিতায় বসানোর জন্য বাবা-মা এর আগ্রহটা আমার চোখে পড়েছে। তাদের আগ্রহ থাকলে সন্তানরা বাংলা শিখবেই বৈকি। মাতৃভাষা শেখার চর্চাটা হয় পরিবার থেকেই।
সন্ধ্যা নামলেই অনুষ্ঠান শুরু হল। কিছুদিন আগে থেকে Being in the moment নামে বর্তমানে ডুবে থাকা এবং সেই সময়টাকে উপভোগ করার কৌশল শিখছিলাম। সেই ফিলসফি মেনেই চুপচাপ গভীর মনোযোগ দিয়ে অনুষ্ঠান শুনছিলাম। আয়োজকেরা প্রতি বছরই অনুষ্ঠানের নিত্য নতুন উপস্থাপনার কৌশল নিয়ে আসেন। আর সেই মুগ্ধতায় প্রতিবারই এই অনুষ্ঠানটিতে আমি আসি।
এইবার একটি নতুনত্ব ছিল শতজনকে নিয়ে গাওয়া গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো” আবেগে সত্যিই চোখে পানি চলে এসেছিল। আর এই দুর্লভ সময়টিকে ফ্রেমে তুলে নিলাম।
অনুষ্ঠান শেষে যখন সবাই ফিরছিলাম তখন স্কুলের শিক্ষিকা এবং আয়োজকরা অনুরোধ করলো ছবি তুলে দিতে। ফটোগ্রাফি এর কাজ করতে ভালোবাসি তাই তাদের অনুরোধে ক্যামেরা হাতে নিলাম। কিন্তু বিশাল স্টেজে সবাই দাঁড়িয়ে আর আমার ওয়াইড লেন্সের ক্যামেরাটা আনা হয়নি। তাই কি করবো? আমার ছোট ছেলে ফটোগ্রাফি করে। তার সাথে পরামর্শ করলে সে বুদ্ধি দিল প্যানারোমা মুডে তুলতে। মাঝে মধ্যে ছোটরাও ভাল বুদ্ধি রাখে এবং একটি ফ্রেমে সবাইকে রেখে ছবিটি তুলতে পারলাম। ফেসবুকে আপলোড করার পরে দেখি ছবিটি ত্রিমাত্রিক করে দেখাচ্ছে। ফেসবুক হরের রকমের ভেলকি দেখাচ্ছে বৈ কি।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির মৌলিক কিছু উপাদান রয়েছে, আর একুশ নিয়ে রয়েছে আমাদের একটি আলাদা স্থান। তবে অনুভূতির সেই জায়গাটি পরবর্তী প্রজন্মদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য বি.এল.সি.এফ. এবং বি.এল.এল.এস. বাংলা স্কুলের অবদান সত্যিই অতুলনীয়। এই দুটি স্কুল হাজার বছর টিকে থাকুক এই বিশ্বায়নের যুগে সেই শুভকামনা করি।
পরিশেষে বি.এল.সি.এফ. এবং বি.এল.এল.এস. এর দুটি স্কুলকেই নগন্য এই লেখকের বই প্রদর্শনের সহায়তার জন্য ধন্যবাদ। কৃতজ্ঞ এবং কৃতজ্ঞ। জাপানিজে, "আরিগাতো গোজাইমাস"।


