ওপেন সোর্স পারে আমাদের সুবিশাল পথ উন্মোচন করতে (২০০৭)
তারিখ: ৯ই ফেব্রুয়ারী ২০০৭
বেশ কয়েক বছর ধরে আমি দেখছি, যখনই বাংলাদেশের আইটি নিয়ে কথা হয়, তখনই সবাই বলে যে আমাদের দেশের ছেলেরা কম্পিউটারে প্রতিযোগিতায় ভাল করছে। অথচ আন্তর্জাতিক বিশ্ব বাজারে আমাদের প্রতিযোগিতায় নাম করতে হলে আমাদেরকে বিশ্বের মানের সাথে যুদ্ধ করতে হবে এবং তাদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
কোন কম্পিউটারে প্রতিযোগিতায় ভাল করা এক কথা আর বিজনেসে সার্থক হওয়া আরেক কথা। আজকাল বিভিন্ন বুদ্ধিজীবী, মন্ত্রী ও আমলারা প্রায়শ বলে বেড়াচ্ছেন আমাদের আইটি সেক্টরের ভবিষ্যত খুবই উজ্জ্বল। কত কোটি টাকার রফতানী হবে তাই নিয়ে হিসেব কষেন তারা।
এ দেখি হাসির ডিমের সেই গল্পটার মতো। মনে মনে শুধু লাভের হিসাব আর কিছু দূরদূ যাবার পরে ডিমগুলিই ভেঙে সব বরবাদ! আমরাও একই রকম ভুল হিসাব কষছি। এই কথা শুনছি অনেক বছর ধরেই, আর আশার কথা শুনানো বেন না, দয়া করে সত্যি চিত্রটা তুলে ধরুন।
আমাদের দেশের মেধাবী ছেলেরা
আমাদের দেশের মেধাবী ছেলেরা যে সমস্ত প্রতিযোগিতায় জিতছে তা নেহাতই এমচার জাতীয় প্রতিযোগিতা। বিশ্বে খুব কম লোকেই সেগুলিকে চিনে। কি আহত হলেন এই কথা শুনে? বিদেশী কোন বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করে দেখুন। সিলিকন ভ্যালিতে ওই প্রতিযোগিতার কথা কেউ জানেন না।
কম্পিউটার জগতের বাজারে যদি দেশের পরিচিতি বাড়াতে চান তবে প্রতিযোগিতায় নয় বরং ভাল সফটওয়্যার তৈরি করে, সুন্দর কোন বাণিজ্যিক আইডিয়া নিয়ে আসতে হবে। আমি আমাদের মেধাবী ছেলেদের কৃতিত্বকে ছোট করে দেখছি না, তবে বলতে চাচ্ছি বিশ্বের বাজারে নাম করতে হলে আমাদেরকে আরো প্রফেশনাল হতে হবে।
আমাদের দেশের কম্পিউটার কোম্পানিগুলি
আর আমাদের দেশের কম্পিউটার কোম্পানিগুলি, যারা কিছু কিছু সফটওয়্যার তৈরি করছে তারা মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিছুদিন পরে তারা হয়তো একটা ওয়েবসাইট তৈরি করল, তারপরেই তারা ভেবে বসল আইটি-তে খুব বড় কিছু করে ফেলল। তারপরে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সেই ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে যায়।
কোন সফটওয়্যার তৈরি করা কিংবা প্রোগ্রামারের কোন কোড লেখাকেই শুধুমাত্র আইটি সেক্টর বলে অনেকেই ভুল করেন। আসলে আইটির ব্যবসার সাথে কোড লেখার প্রোগ্রামারের পাশাপাশি প্রজেক্ট ম্যানেজার, বিপণন, অর্থ, ব্যবস্থাপনা এই গুলি জড়িত। সবগুলির এক্সপার্ট দরকার।
এই ক্ষেত্রে আমার পরিচিত এক প্রতিষ্ঠান বেশ কিছুদিন ধরে বাংলাদেশে প্রজেক্ট ম্যানেজার খুঁজছে কিন্তু তারা যোগ্য প্রার্থী পাচ্ছে না। এই বার বুঝুন আমাদের অবস্থার টা।
আমরা কি দেশের ছোট গণ্ডি থেকে বের হয়ে আরো বড় কিছু করতে পারি না?
যে কথা বলছি লাম, আমরা কি দেশের ছোট গণ্ডি থেকে বের হয়ে আরো বড় কিছু করতে পারি না? অবশ্যই পারি। আমাদের যে বেসমেন্ট আছে তা কে পক্ত করতে হবে। পক্ত না করেই আগেই প্রচারণা নামলে যা হওয়ার তা হয়। মনে করা যাক, একজন শিল্পী, যার কিছু প্রতিভা আছে। কিন্তু তাকে প্রফেশনালভাবে কাজ করতে চাইলে, তাকে অনেক ঘষামাজা করতে হয়।
তা না করেই যদি প্রথমেই প্রচারণার জন্য টিভি, সিনেমায় নেমে পড়ে, তখন দেখা যায় তা দীর্ঘ যাত্রায় টিকে থাকে না। দেখুন যে সমস্ত শিল্পীরা এখনও প্রফেশনালভাবে সমাদৃত, তারা কিন্তু নিজে দের ঘষে মেজে অনেক কষ্টে নিজে দের তৈরি করেছে। আমি আইটির ক্ষেত্রেও একই কথা বলব।
আমাদের মধ্যে হয়তো প্রতিভা আছে, আমাদের ছেলেমেয়েরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় ভাল করছে, তবে তাকে আরো ঘষে মেজে বিশ্ব বাজারে আমাদের টিকে থাকার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। খামা খানাম কামা বারের জন্য আইটি নয়।
ওয়েবসাইট এবং তথ্য উপস্থাপনা
ওয়েবসাইটকে আমরা বিজ্ঞাপনের বিকল্প হিসেবেই দেখি, সেখানে কোম্পানিগুলি কি ধরনের কাজ করছে, কি কি বিষয়ের এক্সপার্ট তাই খুটিনাটি তথ্য উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশে আইটি সংক্রান্ত কোম্পানিগুলি কোন তথ্য উপস্থাপন না করে ভাববাচ্য অনেক কথা লিখে। যেমন লেখা আছে, মাল্টিমিডিয়া এক্সপার্ট। এটি দিয়ে অনেক কিছুই বোঝা যায়।
আর মাল্টিমিডিয়া ক্ষেত্রটিও বিশাল। মাল্টিমিডিয়ার কি ধরনের কাজ তারা করে? কি ধরনের সফটওয়্যার দিয়ে তৈরি করে, কতজন এক্সপার্ট সেই কোম্পানিতে আছে? কেউ ভিডিও এডিট করেও মাল্টিমিডিয়া বলতে পারে, আবার কার্টুনিং বা এনিমেশন তৈরি করেও বলতে পারে তা মাল্টিমিডিয়া। কি কি কাজ তারা করছে তা করে ছে তার উল্লেখ থাকা প্রয়োজন। তা যতই সাধারণ হোক না কেন? তবেই যারা কাজ করাতে চাইবে তারা এগিয়ে আসবে।
যেমন, আমার শহরে খুব ছোট একটা কোম্পানি আছে, তারা শুধুমাত্র লোগো তৈরি করে। তাদের ওয়েবসাইট দেখলে দেখতে পাবেন, তারা কি কি লোগো তৈরি করেছে, কত দিন সময় লাগে লোগো তৈরি করতে এবং তার জন্য কি রকম খরচ হয় তার খুটিনাটি সমস্ত তথ্যই আছে। সেই ওয়েবসাইটটি দেখে, যারা লোগো তৈরি করিয়ে নিতে চান খুব স্বাভাবিকভাবেই তাদের সাথে যোগাযোগ করবেন।
অথচ বাংলাদেশ হলে লেখা থাকবে, আমরা অনেক প্রতিষ্ঠানের লোগো তৈরি করি। কত খরচ? কত দিন লাগবে কি কাজ করেছে - তা কখনই উল্লেখ করবে না। হোক তা দুটিদুই বা তিনটি কাজ। যারা কাজ করিয়ে নিতে চাইবে, তারা তাদের উদাহরণ দেখেই বুঝতে পারবে কে মনে প্রফেশনাল তারা।
ওয়েবসাইট তৈরি করার অভিজ্ঞতা
এই প্রসঙ্গে একটি অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলি। কিছুদিন আগে আমরা একটা ওয়েবসাইট তৈরি করার কাজ পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম বাংলাদেশের কোন কোম্পানি দিয়ে কাজটি করাব। আমাদের দেশের ছেলেরা কাজ পাবে। ইন্টারনেটে ঘাটাঘাটি করে অনেক কোম্পানি পেলাম, যেখানে সবাই বলছে, তারা ওয়েবসাইট তৈরিতে এক্সপার্ট এবং অনেক বড় বড় কোম্পানির কাজ তারা করেছে।
এই "অনেক" শব্দটির মানে কিন্তু অনেককিছুই হতে পারে। দুটিদু বা তার বেশি হলেও অনেক বলা যায়। সংখ্যার উল্লেখ নেই কেন? উদাহরণ থাকা প্রয়োজন। কয়েকজনকে ইমেইল দিলাম। বুঝতেই পারছেন, কোন উত্তর নেই। আর যাদের সাথে যোগাযোগ হল, তাদের কথাবার্তা শুনে বুঝতেই পারলাম তারা কতটুকু প্রফেশনাল। তারপরে প্রবাসের এক জুনিয়রকে দিয়ে কাজটি করিয়ে নিলাম।
এই থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায়
এই থেকে উদ্ধার পাওয়ার উপায় কি? আসলে যেটি বল্লাম তা হল, আমাদের আরো ঘষে মেজে প্রফেশনাল হতে হবে। যারা প্রবাসে আছেন, বিভিন্ন আইটির কোম্পানিতে কাজ করছেন, তারা এই ক্ষেত্রে গাইড দেওয়ার কাজ করতে পারেন। কেননা তারা জানেন বিশ্ব বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের কি করতে হবে।
আর আমাদের ছেলেমেয়েরা আইটির প্রযুক্তিগত দিকগুলি যতটা শিখছে, ম্যানেজমেন্টের জিনিসগুলি শিখছে না। যেমন প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট কিভাবে করতে হয়, প্লানিং কিভাবে করতে হয়, এই জিনিসগুলি আমাদের ছেলেদের শেখা খুবই প্রয়োজন।
উঠতি কিশোর/কিশোরীদের জন্য সুপারিশ
যারা উঠতি কিশোর/কিশোরী বাংলাদেশে বসে আছে হাতের কাছে ভাল রিসোর্স পাচ্ছে না। কিংবা দিকনির্দর্শনা পাচ্ছে না। তারা দুটিদু কাজ করতে পারেন:
১. প্রবাসে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলিকে কাজে লাগান
প্রবাসের বেশি কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে যারা আপনাদের গাইড করার জন্য হাত বাড়িয়ে আছে। তাদের সাথে যোগাযোগ করে বুদ্ধি পরামর্শ নিতে পারেন। কিভাবে বিশ্ব বাজারের কাজ পাবেন - সেই সম্পর্কে তারা সাহায্য করতে পারেন।
সংস্থাগুলি হল:
-
বাংলা আইটি: http://www.banglait.org
-
BASIS (Bangladesh Association of Software & Information Services): http://www.basis.org.bd/
২. মেইলিং লিস্টে যোগ দিন
আর ইমেইলে পরামর্শের জন্য কিছু মেইলিং লিস্টে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেব। এই সব মেইলিং লিস্টে অনেক প্রজেক্টের জন্য লোক খোঁজা হয়। এছাড়াও অনেক রিসোর্স পাবেন এই মেইলিং লিস্টগুলিতে, যা আপনাদের জীবনকে ঘুরিয়ে দিতে পারে।
মেইলিং লিস্ট:
ICT of Bangladesh: ict_of_bangladesh-subscribe@yahoogroups.com
Banglaict: bangla_ict-subscribe@yahoogroups.com
যোগ দেওয়ার জন্য পাশের ইমেইলগুলিতে ইমেইল দিন।
ওপেন সোর্সে অংশগ্রহণ
আরেকটি সহজ উপায় হল ওপেনসোর্সের কোন প্রজেক্টে অংশ নিয়ে কিভাবে প্রজেক্ট হয়, কিভাবে সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট হয় তা শিখতে পারেন।
ওপেন সোর্সের ক্ষেত্রে সব ধরনের রিসোর্স, ডকুমেন্ট ও প্রোগ্রামিং এর কোড উন্মুক্ত ও সহজেই পাওয়া যায়। তাই এই ভাবে শেখার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আপনি হয়তো সরাসরি কোড লিখতে পারছেন না, চিন্তা করবেন না। অংশ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখুন তারা কিভাবে কাজ করে।
ওপেনসোর্সের ক্ষেত্রে আরেকটি সুবিধা হল, আপনার যদি ভাল কোন আইডিয়া থাকে, সেটা দিয়ে নিজেই শুরু করতে পারেন কোন প্রজেক্ট। কয়েকদিনের মধ্যেই দেখবেন, সারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনেক বাঘা বাঘা প্রোগ্রামাররা আপনার প্রজেক্টে অংশ নিচ্ছেন। এইভাবে ওপেনসোর্সের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম ছড়াতে পারেন।
আইটির জগতে কাজ পাওয়ার জন্য, সবাই জানতে চাইবে আপনি কি করেছেন। "আপনি কি করতে পারবেন" - তা নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। আপনার আগের কাজগুলি দিয়েই আপনাকে নতুন কাজ যোগাড় করে নিতে হবে। ওপেনসোর্সে যোগ দেওয়ার জন্য নিম্নের সাইটগুলি বেশ তথ্যবহুল:
বাংলাদেশ ওপেনসোর্স নেটওয়ার্ক
এই ক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ওপেনসোর্সকে জনপ্রিয় করার জন্য সবচেয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ ওপেনসোর্স নেটওয়ার্ক, যাদের ওয়েবসাইট হল http://www.bdosn.org/
সমাপনী
তাই বাংলাদেশের উদ্যমী কিশোর/কিশোরী যারা তথ্য প্রযুক্তিতে কাজ করতে চান তাদের আহ্বান জানাই, চলুন আমরা ওপেনসোর্স প্রজেক্টে অংশ নিয়ে নিজে দের আরো প্রফেশনাল ভাবে গড়ে তুলি। একজন বাংলাদেশী হিসেবে কোন ওপেনসোর্স প্রজেক্টে অংশ নিয়ে দেশ বিদেশে বাংলাদেশের সুনাম আরো বাড়াতে পারবেন।
যখনই কোন প্রজেক্টে আপনি ভাল কাজ করবেন তখন দেশ-বিদেশ থেকে কাজের আহ্বান পাবেন। প্রশ্ন তুলতে পারেন বিনামূল্যে কাজ করে কি পাবেন? পাবেন "অভিজ্ঞতা" যা বাংলাদেশের সীমিত পরিসরে পাবেন না। অর্থ দিয়ে যদি কোচিং সেন্টারগুলিতে শিখতে পারেন তবে বিনামূল্যে এইভাবে কাজ শেখার সুযোগ হাতছাড়া করবেন কেন?
বিশ্ব বাজারে টিকে থাকার জন্য আমাদের অনেকদূর পথ চলতে হবে। অনেক কাজ করতে হবে। কোন কাজ না করেই, ফাঁকা মাঠে বুলিছড়িয়ে হয়তো রাজনীতি বিদ হওয়া যাবে। আইটিতে কোন কাজ পাওয়া যাবে না।
আমরা বিশ্বাস রাখি মনে সুন্দর আইডিয়া নিয়ে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা এগিয়ে আসবে।
লেখক বর্তমানে আমেরিকার মার্শাল বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈজ্ঞানিক হিসেবে কর্মরত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বাংলা পোর্টাল biggani.com এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক।