সুন্দরভাবে ইমেইল অর্গানাইজ করুন
তারিখ: ১২ মার্চ ২০০৬
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইমেইল এখন অতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সম্ভবত টেলিফোনের পরেই ইমেইলই এখন যোগাযোগের জন্য সবথেকে বেশী ব্যবহৃত হয়। অথচ দেখা যায় সুন্দরভাবে এটির ব্যবহার না করার কারণে অনেক সময় এর সুবিধাগুলি থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। বিশেষ করে সঠিক সময়ে উত্তর না দেবার কারণে অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রাপক আপনার সমন্ধে একটা ভাল ধারনা নাও নিতে পারে, যা শুধু ব্যক্তিগত জীবনের নয় কর্মজীবনেও প্রভাব ফেলে। আমি অনেক ম্যানেজারদেরকে দেখেছি, যারা অবহেলা করে ইমেইলের উত্তর দেয়, যার ফলে অফিসে তাদের সমন্ধে ভাল ধারণা নেই। কেউ যদি কোন বিষয়ে আপনার মতামত চায় তবে তা যথাসম্ভব দ্রুত দেয়া উচিত। তা যদি দু সপ্তাহ পরে দেন তবে স্বাভাবিকভাবে প্রাপক আপনার সমন্ধে একটা অন্যরকম ধারণা নিতে পারেন। ভাবতে পারেন যে আপনি তাঁর ইমেইলকে গুরুত্ব দিচ্ছেননা। কিংবা মনে করুন কোথাও আপনি একটি চাকুরির সুযোগ পেয়েছেন। সেইক্ষেত্রে যদি আলসেমি করে অনেকদিন পরে উত্তরটি দেন তবে চাকুরিটি না পাবার সম্ভাবনাই বেশী। কেননা মনে রাখতে হবে, ইমেইলের ক্ষেত্রে প্রাপক আপনাকে দেখতে পাচ্ছেননা। আপনার ইমেইলটিই আপনার একটা ইমেজ গড়ে তুলছে। আপনি হয়তো বাস্তব জীবনে কর্মঠ ও সচেতন, অথচ ইমেইলগুলি অবহেলায় কিংবা দেরীতে দেবার কারণে আপনার একটি অন্য ইমেজ গড়ে উঠছে যার ফলে ভুলবুঝাবুঝির সৃষ্টি হতে পারে।

কিন্তু আপনি যদি প্রতিদিন শতখানেক ইমেইল পান তবে তা কিভাবে অর্গানাইজ করবেন? কিভাবেই বা সুন্দর ভাবে ইমেইলগুলিকে ম্যানেজ করবেন। আজকে আপনাদেরকে তেমন কিছু টিপস দিব সুন্দর ভাবে ইমেইলকে অর্গানাইজ করবার। কিভাবে ইমেইলগুলিকে সুন্দরভাবে ম্যানেজমেন্ট করে ও উত্তর দিয়ে আপনি আপনার ব্যক্তিগত ও প্রফেশনাল ক্ষেত্রের ইমেজকে সুন্দরভাবে দাড় করাতে পারেন। কিছুদিন আগে আমাদের গবেষনাগারে ইমেইল ব্যবহারের উপর একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রকৃতপক্ষে আমরা বিজ্ঞানীদের জন্য বর্তমানে ইমেইল যোগাযোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। গবেষনার প্রায় সব যোগাযোগ হয় এই ইমেইলে মাধ্যমে। তবে ব্যাপারটি শুধু মাত্র আমাদের জন্য নয় আপনাদের সবার জন্যই তা কাজে লাগতে পারে বলে কর্মশালার টিপসগুলিকে সাজিয়ে আপনাদের জন্য আমার এই আয়োজন।
-
প্রথমে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল আপনার "ইমেইল নং"। ব্যাক্তিগত ব্যবহারের জন্য ও কর্মজীবনের (অফিসিয়াল কাজের) জন্য আলাদা ইমেইল নং ব্যবহার করুন। বন্ধুদেরকে সবসময় আপনার ব্যাক্তিগত ইমেইল নম্বরটি দিন, এবং অফিসের ক্ষেত্রে আপনার অফিসের নম্বরটি দিন। ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য যদি কোন ইমেইল নম্বর না থাকে তবে Yahoo কিংবা gmail ব্যবহার করতে পারেন। এইগুলি ফ্রি ও অনলাইনেই ব্যবহার করা যায়। যে কোন জায়গায় ইন্টারনেট থাকলেই আপনার ইমেইল পড়তে পারবেন। প্রশ্ন করতে পারেন, যদি অনেকগুলি ইমেইল একাউন্ট করি তবে বারবার দেখতে সমস্যা হতে পারে। সেইক্ষেত্রে আমি আপনাদের Becky কিংবা Thunderbird ইমেইলের সফট ব্যবহার করার পরামর্শ দিব। দুটিতেই একসাথে অনেকগুলি একাউন্ট ম্যানেজ করা যায়। এছাড়া যারা অনেকগুলি মেইলিংলিস্টে সংযুক্ত আছেন এবং বিভিন্ন গ্রুপের সাথে জড়িত, তারা মেইলিংলিস্টের জন্য আলাদা একটি ইমেইল নম্বর ব্যবহার করুন। সেই ইমেইল নম্বরটি ব্যক্তিগত ইমেইল কিংবা অফিসের ইমেইল থেকে আলাদা করুন। এইভাবে উদ্দেশ্য অনুযায়ী ইমেইলগুলিকে ভাগ করলে দেখবেন সুন্দরভাবে অর্গানাইজ করতে পারছেন। গ্রুপের ইমেইলগুলি একটু পরপরে চেক না করে দিনে কিংবা সপ্তাহের একটি সময় ঠিক করে নিন এবং সেই সময়ে গ্রুপের ইমেইলগুলি পড়ুন। অনলাইনে বিভিন্ন সময়ে রেজিষ্ট্রেশন করবার জন্য ইমেইল নং চায়, সেই ক্ষেত্রে কখনই এই ইমেইল নম্বরগুলি দিবেননা। রেজিষ্ট্রেশনের জন্য আলাদা ইমেইল নং ব্যবহার করুন। কেননা বেশীরভাগ সময় সেই ইমেইলে বিজ্ঞাপন কিংবা অপ্রয়োজনীয় জাংক ইমেইল আসে।
-
ইমেইল নম্বরটি নেবার ক্ষেত্রে ভেবে চিন্তে সুন্দর একটি নামের নিন। কেননা ইমেইলের আইডি আপনার একটি প্রতিচ্ছবি। যদি ঠাট্টা তামাসা করে vhalobashi_tomai@gmail.com কিংবা dil_se_tumi@yahoo.com এর মত নাম নেন তবে অপরজন আপনাকে হালকা মানসিকতার লোক ভাবতে পারে। অনেকে বলে থাকেন যে সহজে মনে রাখার জন্য সুন্দর ইমেইল নম্বরের কথা। আমার যুক্তি হল যিনি আপনাকে ইমেইল দিবেন, তিনি তাঁর এড্রেস বুক থেকে কপি করে ইমেইলটি লিখবেন, সুতরাং সহজে মনের রাখার থেকে ইমেইলটি যে আপনারই তা যেন প্রকাশিত হয়। তবে বন্ধুদের সাথে ঠাট্টা করে মজার নাম ব্যবহার করতে পারেন, তবে প্রফেশনাল জীবনের জন্য নয়। সাধারণত আমি নিজের নামেরই ইমেইল আইডি ব্যবহার করার কথা বলি। যদি আপনার আইডিটি রিজার্ভ কিংবা অন্য কেউ ব্যবহার করে থাকে তবে মাঝখানে "." (ডট) কিংবা "_", "-" এই চিহ্নগুলি ব্যবহার করতে পারেন। যেমন আপনার নাম যদি মাহাফুজুল করিম হয় তবে নামের আইডি নিতে পারেন, mahfuzur.karim, mahfuzul-karim কিংবা mahfuzur_karim।
-
ফোল্ডার ব্যবহার: ইমেইলগুলিকে আপনার কাজের লক্ষ্য বা কাজের উদ্দেশ্য অনুযায়ী ফোল্ডার ব্যবহার করুন। বেশীর ভাগ ইমেইল প্রোগ্রাম, যেমন Eudora, Becky, Outlook, Thunderbird এ ফোল্ডারের ব্যবস্থা থাকে। ইমেইল প্রথমে inbox এ এসে জমা হয়, পরবর্তিতে আপনি এই ফোল্ডারগুলিতে সাজিয়ে রাখবেন। আবার অনেক সফটে অটোমেটিক ফোল্ডারে ভাগ করে রাখার ব্যবস্থা থাকে, তা ব্যবহার করতে পারেন। ইমেইল ফোল্ডারে রাখলে পরবর্তিতে প্রয়োজনে দ্রুত পুরান ইমেইল খুঁজে পাওয়া যায়। এছাড়া কোন কাজের বা প্রোজেক্টের অগ্রগতি কেমন তা ফোল্ডারটি দেখে খুব সহজে বুঝতে পারবেন। গুরুত্ব অনুযায়ী ফোল্ডারের রঙও ব্যবহার করতে পারেন। এছাড়া দুটি বিশেষ ফোল্ডার ব্যবহার করুন।
-
needs response (উত্তর দিতে হবে) : কোন বিষয়ে কেউ আপনার উত্তর বা মতামত চেয়েছে এবং যেসব ইমেইলগুলির উত্তর দিতে হবে সেগুলি এই ফোল্ডারে রাখুন।

-
waiting - followup (উত্তরের অপেক্ষায়): আপনি যে ইমেইল গুলির উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন, সেইগুলি এই ফোল্ডারে রাখুন।
-
inbox থেকে স্পাম কিংবা জাঙ্ক ইমেইলগুলি থেকে সহজে মুক্ত রাখার জন্য কোন স্পামমেইল রিমুভার সফট ব্যবহার করুন। তবে Yahoo, hotmail কিংবা gmail এ স্পার্মগার্ড আছে, তা একটিভ করে রাখুন। inbox খুলার পরে একবার চোখ বুলিয়ে নিন কোন মেইলগুলি স্পাম মেইল। সেইগুলি সাথে সাথেই delete করে ফেলুন।
-
যখনই inbox এ একটি নতুন ইমেইল পড়বেন তখনই নিম্নের কাজগুলির একটি কাজ করুন:
| উত্তর দেয়া: | মেইল পড়বার সাথে সাথেই উত্তর দেবার অভ্যাস গড়ে তুলুন, এতে সময়ের অনেক সাশ্রয় হয়। তবে যদি উত্তর দেবার জন্য চিন্তা ভাবনা করে সময় নিতে চান তবে "needs response" ফোল্ডারে রাখুন। |
|---|---|
| আর্কাইভ করা: | পরবর্তিতে প্রয়োজন হতে পারে সেসব মেইলগুলিকে কাজের উদ্দেশ্য অনুযায়ী সেই ফোল্ডারে রাখুন বা আর্কাইভ করে রাখুন। |
| Delete: | যে ইমেইলগুলির প্রয়োজন হবে না তা সাথে সাথে মুছে ফেলুন। অনেক সময় এই "মুছে ফেলা" বা delete করার কাজটি করতে যেয়ে অনেকে ইতস্থত করেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, তা আদৌ কখনই প্রয়োজন হয়না। তাই দ্বিধা না করে মুছে ফেলুন। আপনার ইমেইল বাক্স যত জঞ্জাল মুক্ত রাখতে পারবেন ততই সুন্দর অর্গাইনজ করতে পারবেন। |
-
প্রতিদিন দিনের শেষে আপনার Inbox কে খালি করুন। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যদি এই অভ্যাসটি গড়ে তুলেন তবে দেখবেন স্বাভাবিকভাবে দ্রুত ইমেইলগুলির উত্তর দিচ্ছেন।
-
"needs response" ফোল্ডারটি যথাসম্ভব খালি রাখুন। এবং মাঝে মাঝে চেক করে নিন কাদের উত্তর দিতে বাকি আছে এবং সেগুলির জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিন।

-
যদি উত্তর দিতে খুব দেরী হবার সম্ভাবনা থাকে কিংবা অন্য কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, সেই ক্ষেত্রে প্রাপককে দুলাইন লিখে জানিয়ে দিন যে আপনি ব্যস্ত আছেন তবে তার ইমেইল পেয়েছেন এবং পরে তাঁর উত্তর দিবেন। এটি অনকে সময় প্রেরককে দুশ্চিন্তায় ফেলেনা যে আপনি সত্যিই ইমেইলটি পেয়েছেন কিনা। অনেক সময় দেখা যায় দুদিন পরে আপনার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে আবার প্রেরক আপনাকে "re-send' করছেন। অথচ আপনি যদি জানিয়ে রাখেন যে ইমেইলটি পেয়েছেন, এবং পরে উত্তর দিবেন তবে অনাকাঙ্খিত এই টেনশনটি প্রেরকের থাকেনা। আর যদি আপনি অনেকদিন কম্পিউটার থেকে দূরে থাকেন বা ইমেইল চেক করতে না পারেন তবে "vacation responder" টি চালু করে রাখুন। এটি অটোমেটিক ভাবে প্রাপককে জানিয়ে দিবে যে কিছুদিন আপনি ইমেইল চেক করতে পারবেননা।
-
অনেকের বাতিক আছে ১০ মিনিট পরপর ইমেইল চেক করার। এইভাবে বারবার চেক করলে অযথা সময়ের অপচয় হয় মাত্র। দিনে একটি সময় ঠিক করে নিন যে সময়ে ইমেইল চেক করবেন। এতে আপনার সময়ের ম্যনেজমেন্ট সুন্দরভাবে হবে।
ইমেইল বর্তমানযুগের যোগাযোগের অতি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাকে অবহেলা না করে সুন্দর ভাবে ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন যিনি আপনাকে ইমেইল দিয়েছেন, তিনি কিন্তু আপনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করছেন।
১২ই মার্চ ২০০৬