মশিউরের খেরোখাতা

ভারতের মনিপাল হাসপাতালে অভিজ্ঞতা

কিছুদিন আগে কম্পিউটারের পুরোনো ব্যাকআপ ফাইলগুলি দেখতে যেয়ে এই লেখাটি পেলাম। ১৯৯৮ সনে জুলাই-আগস্ট এই দুটি মাস বাবার হৃদরোগ অপারেশনের জন্য ভারতের ব্যাঙ্গালোরে নিয়ে যাই এবং সেখানে প্রায় দুই মাস থাকি। তার উপরেই এই লেখাটি। অপরিপক্ক হাতের লেখা হলেও কিছু স্মৃতি এতে মিশে রয়েছে বলে পাঠকদের জন্য তা অনলাইনে তুলে ধরলাম।


অপেক্ষা

"অপেক্ষা" - জিনিসটা খুবই বিষণ্ণ। অথচ দেখা যায় আমাদেরকে এই তিক্ত অভিজ্ঞতার মাঝ দিয়ে যেতে হয়। অপারেশন থিয়েটারের পাশে বাবার অপারেশনের সমাপ্তির জন্য অপেক্ষা করতে করতে এটা বেশি করে মনে পড়ছিল। বাবাকে ভালোবাসি। ছোটবেলায় যখন বাবা-মা দুষ্টুমি করে বলতো - "কাকে বেশি ভালোবাস?" আমি বলতাম "বাবাকে"। অথচ আমি আমার জীবনে মায়ের আদরই বেশি পেয়েছি। বাবার কঠোর শাসনের পরও বলেছি বাবাকে ভালোবাসি। আজ অপারেশন থিয়েটারে বাবার ওপেন হার্ট অপারেশন চলছে। আর আমি হাসপাতালের করিডোরে হাঁটাহাঁটি করছি। বাবার সাথে কাটানো মজার অভিজ্ঞতার কথা মনে করে সময়টা কাটাচ্ছি। কখন অপারেশন থিয়েটার থেকে ডাক্তার বেরিয়ে আসবেন এবং বলবেন "অপারেশন সফল, রোগী ভালো আছে"? এই কথাটা শোনার অপেক্ষায় রয়েছি।

সময়ের কাঁটা বয়ে চলেছে। সেই ভোর ছয়টায় বাবাকে অপারেশনের রুমে ঢুকানো হয়েছে। বড় পুত্র হিসেবে হাসপাতালের বন্ড সাইন করার সময় হাতটা কেঁপে উঠেছিল। যদি বাবা না ফিরে আসে? জটিল অপারেশন... কত দুর্ঘটনাই তো হতেই পারে। অথচ আমাদের সকলের সীমানা আল্লাহ্‌তায়ালা বেঁধে দিয়েছেন। সেই সীমানায় গিয়ে প্রভুর হাতে সম্পূর্ণ কিছু তুলে দিয়ে প্রার্থনা ছাড়া হয়তো কিছু করা থাকে না আমাদের। আমরা যে হাসপাতালে এসেছি, তা ভারতের অন্যতম বিখ্যাত হাসপাতাল, ব্যাঙ্গালোরে অবস্থিত - মনিপাল হাসপাতাল। তবে এই হাসপাতালটি ভারতে যতটুকু না বিখ্যাত তার চেয়ে বাংলাদেশে হয়তো তারও বেশি বিখ্যাত। বাংলাদেশে হৃদরোগীদের চিকিৎসার জন্য ভালো কোন হাসপাতাল নেই। তাই বেশিরভাগ রোগীই ছুটে যায় ভারতের বিখ্যাত হৃদরোগের হাসপাতালের জন্য। আর সেই সব হাসপাতালের মধ্যে এই মনিপাল হাসপাতালটিও বিখ্যাত। বাবার সাথে আমি, মা ও আমার ছোট ভাই মাসুদ এসেছিলাম।


বাসার খোঁজ

আমরা ব্যাঙ্গালোরে এসেই প্রথম যে অসুবিধার মুখোমুখি হলাম তা হল থাকার সমস্যা। বাবার অপারেশনের জন্য অনেক দিন লাগবে অথচ এত দীর্ঘ দিন হোটেলে থাকা খুবই কঠিন। আমরা আগে থেকে শুনে এসেছিলাম যে হাসপাতালের আশেপাশে ফার্নিচার সহ বাসা পাওয়া যায়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধানে আছে শান্তি-নিকেতন বলে একটি বাসা। সেখানে একটা রুম প্রতিদিন ২০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। অথচ আমাদের ভাগ্যটাই এত খারাপ যে সেখানে জায়গা পেলাম না। কী আর করার, আমার ছোট ভাইকে পাঠালাম আশেপাশে কোন বাসা পাওয়া যায় কিনা। প্রথম দিন এসে অনেক কিছু বুঝে উঠতে বেশ বেগ পেতে হল। তবে সবথেকে ভালো লাগল বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসার উদ্দেশে আগত বাঙালিদের সংখ্যা প্রচুর। আগে যারা এসেছেন তারা নতুন আগত বাঙালিদের তথ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রচুর সাহায্য করছেন। প্রথম দিনেই বুঝলাম যে দেশের বাইরে এসে বাঙালিরা খুব পরোপকারী। অবশ্য আমার ব্যক্তিগত প্রবাস জীবনে এর চেয়ে আরও গভীর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছি বলে বাঙালিদের এই দিকটা আমার জানা ছিল। যাই হোক, প্রথম দিনে এসেই ডাক্তারের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে নিলাম। আমাদের কনসালটেন্ট ডাক্তার হলেন ড. শেঠি। এই ডাক্তারের সম্পর্কে একটু কথা না বললেই নয়।


ড. শেঠি - এক বিশাল ব্যক্তিত্ব

ড. শেঠি গত বছরের দিকে কলকাতার বিড়লা হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। সেখান থেকে ৯৮ সালে তিনি ব্যাঙ্গালোরে মনিপাল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান হয়ে আসেন। তার এই আসার পিছনে একটু গল্প আছে। তিনি কলকাতায় থাকাকালীন সময়ে বিনামূল্যে অনেক শিশুর চিকিৎসা করতেন। আর সেই সূত্রেই বিড়লা হাসপাতালের পরিচালনা পরিষদের সাথে তার মতানৈক্য হয়। বিড়লা হাসপাতাল একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। আর এই মনিপাল হাসপাতাল একটি সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠান। মনিপাল হাসপাতালে ঢুকলেই চোখে পড়বে একটি বড় পোস্টার যেখানে শিশুদের ফি মওকুফ করার জন্য ফান্ড সংগ্রহ চলছে। প্রথম দেখায় ডাক্তারকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। এরকম একটা সুপুরুষকে দেখে ঈর্ষা হয় বৈকি। উনি অল্পস্বল্প বাংলাও বলতে পারেন।

হাসপাতালে ঢুকেই বুঝলাম রোগীদের মধ্যে বাঙালিদের সংখ্যাটা একটু মাত্রারিক্তভাবে বেশি। অবশেষে থাকার সমস্যার একটা সমাধান হল। হাসপাতালের পাশেই অক্সফোর্ড কটেজে আমাদের জায়গা হল। তবে খরচটা একটু বেশি হল - প্রতিদিন ৩৫০ টাকা। তবে রুমে ফোন এবং টিভি থাকার লোভে উঠে গেলাম। টিভি দেখে সময় কাটানো যাবে। পরবর্তিতে শান্তি-নিকেতনে জায়গা পেলে সেখানে চলে যাব ভেবে অক্সফোর্ডে এই একটা রুম ভাড়া নিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটে আরেকটি বাংলাদেশের পরিবার এসেছেন। তাদের ছোট ছেলের হৃদয়ের অপারেশন করাতে নিয়ে এসেছেন। ছেলেটি বুয়েটে পড়ে। আমাদের খুব সুবিধা হল যে তারা আমাদের আগে এসেছেন বলে আমাদেরকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়ে সাহায্য করলেন। বিকালের দিকে ডাক্তারের সাথে আমাদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকলেও রাতে আমাদের সাথে কথা হল। হার্ট হাসপাতাল বলে ডাক্তারদের সবসময় অপারেশন থিয়েটারের পোশাক পরে জরুরি অবস্থার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। আমার বাবা অ্যাসপিরিন বলে একটি ওষুধ নেওয়ার কারণে বাবার অপারেশন সাত দিন পরে হবে। কেননা অপারেশনের আগে সেই ওষুধটির ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হয়।

আর চার দিন পরে বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি নিতে হবে। আমার বাবা খুব আপসেট হয়ে গেলেন। কেননা উনি একজন সরকারি কর্মচারি, তাই অনেকদিন ভারতে অবস্থান করা সম্ভব নয়। তবে যাই হোক, এসে যখন পড়েছি তখন আর পিছিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তবে দেশ থেকে এই তথ্যটি জেনে আসলে হয়তো এইভাবে সময় নষ্ট হতো না। আমরা অক্সফোর্ডে এই কয়েকদিন কাটাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।


ব্যাঙ্গালোর শহর ভ্রমণ

বাবা হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত হাতে কয়েকদিন সময় পেলাম। সেই সময়টি কাজে লাগানোর জন্য ব্যাঙ্গালোর শহরটি ঘুরে বেড়ালাম। প্রথমেই ব্যাঙ্গালোরের বিধান সভা দেখলাম। বিধান সভাটি বেশ সুন্দর, ছিমছাম, গোছানো, ইংরেজদের স্থাপত্যে তৈরি। আমার ছোটভাই মাসুদ ছবি তোলার পাগল বলে সে বেশ ছবি তুলতে লাগল। বিধান সভার পাশেই হাইকোর্ট দেখলাম। বাইরে গেলেই স্থানীয় খাবার না খেয়ে উপায় নেই। ব্যাঙ্গালোরের স্থানীয় খাবারের মধ্যে ঢোসা আমার খুব ভালো লাগল। টেকনিক্যাল মিউজিয়াম দেখলাম। শিশু-কিশোরদের আকর্ষণীয় অনেক জিনিসই আছে। আমাদের দেশে এই ধরনের একটি মিউজিয়ামের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলাম। বিজ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলি খুব সুন্দরভাবে ছোটদের উপযোগী করে উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যাঙ্গালোরে আসার আগে আমি ভাষা নিয়ে বেশ ভয় পেয়েছিলাম। আমাদের দেশে আমার বয়সি ছেলেমেয়েরা অল্পস্বল্প হিন্দি বলতে পারলেও আমার হিন্দির জ্ঞান শূন্যের কোঠায়। আমার ছোট ভাই মাসুদ খুব সুন্দর হিন্দি বলতে পারে, তাই তাকে নিয়ে বাইরে বের হলে এ ব্যাপারে কোন সমস্যা থাকে না।

প্রথম কিছুদিন আমরা ট্যাক্সিতে বের হলেও পরে স্থানীয় বাসের ব্যবহার শিখে নিলাম। টাইম টেবিল ও বাস স্ট্যান্ডের খবর নিয়ে নিলাম। আমরা প্রচুর হাঁটতাম। হেঁটে হেঁটে অনেক জায়গা ঘুরেছি। একদিন আমরা কম্পিউটার পাড়া বেড়াতে গেলাম। ব্যাঙ্গালোর তখন আইটির জন্য আলোচিত হতে শুরু করেছিল। বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরে আসলাম। কিছু প্রোগ্রামার শেখার বই কিনলাম।

এর পরে কিছুদিন পরে বাবা হাসপাতালে ভর্তি হয়ে গেলেন। আমি বাবার অফিসে ফ্যাক্স পাঠিয়ে বাবার ছুটি বর্ধিত করলাম। বাবার অপারেশন ভালোমতো হয়ে গেল। করিডোরে আমাদের উদ্বিগ্ন সময়গুলি অতিক্রম করে বাবা সুস্থ হয়ে উঠল। হার্ট অপারেশন বেশ জটিল এবং তার পরে রোগীর উপর বেশ চাপ পড়ে। অপারেশনের ধকল সহ্য করে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে বাবার বেশ সময় লাগল। এই সময়ে মা খুব বাবার দেখাশোনা করছিলেন। বিপদের সময় এইভাবেই পরিবারের সবাই পাশে এসে দাঁড়াই। জীবনের একটা বড় অংশ প্রবাসে কাটানোর কারণে পরিবার থেকে অনেক দূরে থাকাতে এই সব অনুভূতিগুলি আবার অনুভব করতে পারলাম। এইভাবে সবাই মিলে বাবার পাশে থাকাতে - এই যে ভালোবাসা ভরা জীবন তাই তো আমাদের কাম্য।


মনিপাল হাসপাতালে যোগাযোগের তথ্য

আখণ্ড হাসপাতাল

অথর্ভা রোড,

ব্যাঙ্গালোর-৫৬০ ০১৭

কর্নাটক

টেলিফোন: ৫২৬৬৬৪৬

ইমেইল: info@manipal.com


ব্যাঙ্গালোর, ভারত, ৭ই জুলাই ১৯৯৮