মশিউরের খেরোখাতা

প্রযুক্তি সমস্যা নয়, সমস্যা হয় একে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে (২০০৭)

তারিখ: ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭


অনেকেই বলে থাকেন, আমাদের দেশ প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে আছে অথবা প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। আসলে দেশের উন্নয়নের জন্য প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয়। প্রযুক্তি আমাদের চারপাশেই আছে, সেটিকে সঠিক জায়গায় সঠিকভাবে প্রয়োগ করার ব্যাপার প্রয়োজন। অনেকেই হয়তো এই কথার সাথে দ্বিমত গ্রহণ করবেন। এই যে আমাদের দেশেও মোবাইল প্রযুক্তির এত বিস্তৃতি ঘটেছে, অনেক কর্মসংস্থান হয়েছে, তা কিভাবে হয়েছে? এতে কি শুধুমাত্র প্রযুক্তিই ভূমিকা রেখেছে? প্রযুক্তির চেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে সেই সব মানুষ, যারা এই ধরনের উচ্চ প্রযুক্তিকে কিভাবে সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে নিয়ে আসা যায় এবং এটি দিয়ে ব্যবসা তৈরি করা যায়, সেই সব মানুষের কল্যাণে। আসলে আমাদের চারপাশে এত অনেক প্রযুক্তি আছে যে মোবাইলের মতোই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে এর ফল পাওয়া যায়।

ইলেকট্রনিক্সের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গবেষণা হয়েছে সিলিকন নিয়ে। আপনি যে মোবাইলে কথা বলছেন অথবা টেলিভিশন দেখছেন এ সবই প্রতি বছর ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। কারণ সিলিকন দিয়ে খুব ছোট ছোট সার্কিট তৈরি করা যায়। সিলিকন নিয়ে এত কাজ কেন হয়েছে জানেন? কারণ এতে ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি অর্থ লগ্নি করেছেন। ১৯৬০ সালের পর থেকে সিলিকনের এমন কোন বৈশিষ্ট্য নেই যেটি নিয়ে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করেননি। অন্যান্য উপাদানের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের তেমন আগ্রহ নেই। ব্যবসায়টি হলো এই রকম, আমরা যদি কোন কিছু থেকে ব্যবসা করতে পারি তাহলে সবাই আগ্রহী হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞানের জগত থেকে একটু ফিরে তাকানো যাক আমাদের দেশের দিকে। সেখানেও দেখা যাবে আমাদের পোশাক শিল্পকে লাভজনক শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ এটি ভালো ব্যবসা তৈরি করেছে। তাই ব্যবসায়ীরা এই খাতে টাকা বিনিয়োগ করতে সংকোচ করেন না। সেই রকম আমাদের অন্যান্য প্রযুক্তিগুলিকে ব্যবসা রূপান্তরিত করার চেষ্টা করতে হবে। যারা নিজ নিজ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন তাদের প্রযুক্তিগুলি শুধুমাত্র প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আলোচনা করা যেতে পারে ব্যবসায়ী পরামর্শদাতা বন্ধুর সাথে। তাতে দেখা যাবে আপনার প্রযুক্তি ব্যবসা তৈরি করছে। এই কথা ঠিক যে, আমরা উন্নত দেশের তুলনায় প্রযুক্তিতে পিছিয়ে আছি। তবে তারা যে সব ক্ষেত্রে ভুল করে শিখেছে অথবা শিখছে, আমরা সেখান থেকেই শিক্ষা নিতে পারি। একই রকম ভুল যাতে আমরা না করি সেটা অন্তত তাদের কাছ থেকে শিখতে পারি। তবে এটি ঠিক নয় যে, সব প্রযুক্তিই বাংলাদেশের জন্য উপকার এনে দেবে এর কোন মানে নেই। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ই-লার্নিংকে কিভাবে ব্যবহার করা যায় সে নিয়ে কাজ করা উচিত।

আমাদের সামনে একটি বড় জরুরি সমস্যা হলো বিদ্যুৎ সংকট। এই সমস্যা হয়তো উন্নত বিশ্বে নেই কিন্তু তারাও বিকল্প বিদ্যুৎ উৎসের সন্ধানে গবেষণা হয়ে গেছে। আমরা অন্যান্য দেশের মতো বড় অর্থ ব্যয় করে বিজ্ঞানীদের কাজে লাগাতে পারব না, তবে উন্নত বিশ্বের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে যা শিখেছেন তা আমরা শিখতে পারব। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বিজ্ঞানীদের এই সব গবেষণা জ্ঞান খোলা আছে। পৃথিবীতে এমন কোন নিয়ম নেই যে, উন্নত বিশ্বের গবেষণা বা খোলা জ্ঞান আমরা জানতে পারব না। আমরা এই সব খোলা জ্ঞানকে আমাদের প্রয়োজনে লাগাতেই পারি।

আর এই সব খোলা জ্ঞান বিজ্ঞানীরা প্রচার করার জন্য আরও আগ্রহী। আপনি যদি কোন বিজ্ঞানীর গবেষণাপত্র পাওয়ার জন্য তাকে ই-মেইল করে চান, তাহলে দেখা যায় সাধারণত আশি প্রতিশত বিজ্ঞানীই আপনাকে তার গবেষণাপত্রগুলি পাঠিয়ে দেবেন। অর্থাৎ চিন্তা করে দেখুন আমরা উন্নত বিশ্বের খোলা জ্ঞানগুলি বিনামূল্যে কাজে লাগাতে পারি।

কি ভাবছেন তথ্য প্রযুক্তিতে আমরা পিছিয়ে? আমি বলব এর জন্য সমস্যা হলো, আমরা আমাদের সম্পদগুলিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি না। তাই সর্বশেষে বলছি, প্রযুক্তি কোন সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এই গুলি কাজে লাগানোর দক্ষতার অভাব। এখন প্রশ্ন হলো, এই কাজটি কে করবে? ব্যবসায়ী অথবা সাধারণ মানুষ? আমার মতে এটি করতে হবে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেন এমন ব্যক্তিদেরই। উদ্যোগ নিতে হবে বিজ্ঞানী, গবেষক, প্রকৌশলীদেরই। আসুন খুঁজে বের করি কোন প্রযুক্তিগুলি আমরা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করতে পারি।

মূল প্রবন্ধ:


ড. মশিউর রহমান

ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া, আমেরিকা

মন্তব্য

বিপ্লব পাল:

Response to Article: Technology and Economic Development

From: Biplab

Subject: Technology and Economics Cannot Be Separated

Date: 2007


Dear Mashiur,

Thank you for the nice article. Technology and economics cannot be separated.

Indeed, if you look at the last 200 years of human history, several conclusions can be drawn very easily:


1. Society Changes Through Technological Innovation

Society and civilization change only due to technological innovation and its adaptation to the society—or changed mode of production. No society has ever been changed by any philosophy—be it Hinduism, Islam, Communism, or Socialism. Those who believe they can change society by idealism are indeed counterproductive to modernization. Idealism has been the antithesis to civilization.


2. The Indian Subcontinent's Research Infrastructure Challenge

The Indian subcontinent received technology through the British during the colonial era when there were very few institutes of scientific research. After the British left India, Pakistan and Bangladesh were worst hit in terms of research organization because most of the research infrastructures belonged to India's territory.

After that, socialist India invested a lot in R&D centers (such as setting up 47 CSIR labs and 72 DRDO labs), but these centers became white elephants because research could not be tied to business even until 2000. It needed a culture of clean capitalism and risk investment. After the meltdown in USA in 2001 and the easy flow of capital into the Indian market, venture capital funding into India has doubled each year, led by NRIs. Only in the last couple of years have I observed a startup culture in India.


3. Recommendations for Bangladesh's Technological Development

In the context of Bangladesh, to bring innovation to this country, I would suggest the following from my experience (assuming political unrest would not be harming its business):

A. Venture Investment Group

Some Bangladeshis in the USA have made good fortunes in real estate and financial markets. However, whenever I discuss with them, they are very negative about investing in Bangladesh, although they spend quite a lot on charitable activities in Bangladesh.

They should form a group for venture investment in Bangladesh—initially targeting low-risk technology development that has a market in the USA. For example: robotic toys, small household innovations, software games. An unregulated market can be a safer destination.

B. Economic Integration with India

For a long time, I have been a proponent for merging the Bangladeshi market with India. This is absolutely essential for the growth of Bangladesh's economy, as stated by Dr. Yunus. The Bangladesh market is extremely small for any new venture, and therefore, risk investment may not be viable until its market is merged with India. An indigenous market is a critical factor for risk investment in technology. If Bangladeshi products can be linked with the Indian economy, there will be more capital flow into Bangladeshi industries.

Again, this is a trouble area considering anti-Indian sentiment in Bangladesh and the complete destruction of Indo-Bangladesh relations by the BNP-led government. The CTG is trying to improve it, but political leadership should be willing to make it happen.

C. Engineering Institute Incubators

Engineering institutes must form incubators—a setup for young students motivated in new business ventures. In 1993, IIT-KGP started its first incubator in a 7-room building. Today it sprawls over 500 acres of land.

Bangladesh has talent—but they do not have support from the government or from society.


Conclusion

I hope more and more people in Bangladesh and among Bengalis in general try to think like you. Unfortunately, as it is, they are more into political mud and blame games.


Best regards,

Biplab


রাহাত আউয়ুব

ধন্যবাদ নিবন্ধটি শেয়ার করার জন্য। আমার মতে নিবন্ধের ভালো দিক রয়েছে অনেক। যেমন:

  • বাণিজ্যিক যোগের জন্য জোর দেওয়া

  • গবেষণার জন্য বিদেশী গবেষকদের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া

  • মোবাইল ফোন এবং গেমস ব্যবসার ব্যাবহারিক সাফল্য বিশ্লেষণ

তবে সমালোচনার সুযোগও রয়েছে নিম্নোক্ত সেক্টরে:


শিরোনাম সম্পর্কে মন্তব্য

নিবন্ধের শিরোনাম নিয়ে কিছু বলার আছে। "প্রযুক্তি সমস্যা নয়" না বলে "বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা সমস্যা নয়" বলাটা বেশি যথার্থ। খুব কম লোকই প্রযুক্তিকে সমস্যা মনে করে!


বিষয় সীমাবদ্ধতা

হয়তো নিবন্ধের বিষয়ের ব্যাপ্তি অনেক বেশি থাকার কারণে সীমিত পরিসরে অনেক ব্যাবহারিক বিষয় আলোচনায় আসেনি। যেমন অনেক শাখাশাখা রয়েছে এবং তাদের প্রয়োগ ভিন্ন। উদাহরণস্বরূপ, আমাদের দেশের প্রধান পেশা কৃষি এবং মৎস্য বিধায় আমাদের পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণ, কয়োজাত প্রক্রিয়াকরণ এবং রপ্তানীকরণ খুব প্রয়োজন।


পাট শিল্পের সম্ভাবনা

ভারতের আমের মান আমাদের তুলনায় খারাপ হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বাজারে ভারতের আম প্রাধান্য পাচ্ছে।

আমরা যখন পাটকল বন্ধ করে দিচ্ছি, পাটের উন্নত ব্যবহার দিয়ে কাগজ উৎপাদন করছি তখন সারা পৃথিবীতে কৃষি পরিবেশবান্ধব পণ্য হিসেবে পাটের চাহিদা বাড়ছে। চীন আর ভারত এখন প্রতিযোগিতায় নেমেছে সোনালি আঁশের বাজারে আসার জন্য।

আমি সবাইকে একবার উইকিপিডিয়ায় পাটের ফিচার পড়তে বলি: http://en.wikipedia.org/wiki/Jute

প্রতিটি দেশের যন্ত্র ব্যবহার আলাদা রকম। আমাদের বেকারত্ব এবং বিশাল সীমিত শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কমসংস্থানের জন্য নিবিড় প্রযুক্তি দরকার। টেক্সটাইল বা গেমস এ আমাদের বিশ্বব্যাপী সুবিধাজনক অবস্থান থাকার কারণে সুষম প্রযুক্তি বিকাশ দরকার। প্রথম পর্যায়ে বোতাম, রাসায়নিক, রঙ, প্যাকেজিং, প্লাস্টিক এক্সেসরিজ পরবর্তীতে টেক্সটাইলস, গেমস ইত্যাদি। টেক্সটাইলস গেমসের জন্য সফটওয়্যারের চাহিদা অনেক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, ভারতীয় সফটওয়্যার সেই বাজার দখল করে নিয়েছে যা আমাদের নিজস্ব প্রোগ্রামাররাই করতে পারত।


উন্নত প্রযুক্তির প্রাসঙ্গিকতা

প্রযুক্তি উন্নত দেশের প্রযুক্তি অন্ধভাবে গ্রহণ করার যৌক্তিকতা নেই। চীন যদিও প্রযুক্তিতে দক্ষ কয়লা উৎপাদন করে কিন্তু কয়লা উত্তোলনে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রপাতির বদলে এখনও তারা বিশেষ পদ্ধতি ব্যবহার করে যাতে চরু শ্রমিক কাজ পায়।

সিলিকন বা হাইটেক গবেষণা কাজ হলেও যথেষ্ট না? আমাদের মতো দরিদ্র দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এর কোন ভাব আছে কিনা আমি সন্দিহান। তবে কৃষির উন্নয়নে জেনেটিক প্রযুক্তির জাতীয় উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।

মেধা সম্পত্তি এবং গবেষণার সমস্যা

হয়তো অনেক অধ্যাপক তার তাত্ত্বিক গবেষণা বিনামূল্যে বিতরণ করবেন? বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি সমূহ পেটেন্ট এবং কপিরাইটের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। মহাকল্প ইমুলেশন এবং বিশ্লেষণাত্মক সফটওয়্যার ছাড়া হাইটেক প্রযুক্তির দুনিয়ায় টিকে থাকা সম্ভব কিনা তাও আমার জানা নেই।

ভাষা সম্পর্কে মন্তব্য

নিবন্ধে কিছু কিছু ইংরেজি শব্দ কানে বেজেছে। যেসব ইংরেজি শব্দের সমার্থক বাংলা আছে সেখানে আমি বাংলাটাই পছন্দ করি। যেমন "বিজনেস অপরচুনিটি" এর ভালো বাংলা আছে "ব্যবসায়িক সম্ভাবনা"।

পরিশিষ্ট

(অনেক দিন বাংলায় লিখিনি। আলসের কারণে রয়ে যাওয়া বানান ভুল ক্ষমার যোগ্য!)


শুভেচ্ছা,

রাহাত আইয়ুব