মশিউরের খেরোখাতা

বায়োসেন্সর বদলে দিতে পারে আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা

ড. মশিউর রহমান

সহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

আমাদের দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অবস্থাটা অনেকটা এইরকম, ডাক্তারের কাছে আপনি প্রথমদিন যাবার সাথে সাথেই আপনার হাতে ডাক্তার সাহেব ধরিয়ে দিবেন কিছু টেস্ট। টিভির একটি হাসপাতালের বিজ্ঞাপনের মত এই টেস্ট.. সেই টেস্ট.. আরো কত কি! সমস্যা হল টেস্টগুলি যেখান থেকে ইচ্ছা সেখান থেকে করলেই হবেনা, ডাক্তারের নির্ধারিত ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকেই (!) আপনাকে সেই টেস্টগুলি করতে হবে। যারা এই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন তারা বুঝতে পারবেন এই রকম চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা আমাদের জন্য সুফল।

আশার কথা হল, সামনে আসছে অত্যাধুনিক বায়োসেন্সর যা এইরকম তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে দিবেনা। ডাক্তারের সামনে কয়েক সেকেন্ডেই আপনি আপনার টেস্টগুলি করে ফেলতে পারবেন। যদিও এই রকম কল্পনা বাস্তবে রূপান্তর হতে আমাদের আরো বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে, কিন্তু কিছুটা হলেও আমরা এইরকম বায়োসেন্সর ব্যবহার করছি। তেমন একটি বায়োসেন্সর হল ডায়াবেটিক বায়োসেন্সর। বর্তমানে বাংলাদেশেই অনেক ফার্মেসিগুলিতে এই বায়োসেন্সর দিয়ে আপনার রক্তের গ্লুকোজের পরিমান বের করতে পারবেন।

বায়োসেন্সর কি? বায়োসেন্স হল এমন একটি ডিভাইস যা শরীরের বায়োলজিক্যাল উপাদান গুলিকে সনাক্ত করতে পারেন।  ১৯৫৬ সনে অধ্যাপক ক্লার্ক প্রথম বায়োসেন্সরের ধারণাটি দিন এবং অক্সিজেন ইলেকট্রড আবিষ্কার করেন। পরবর্তিতে তিনিই বর্তমানের বহুল প্রচলিত ডায়াবেটিক বায়োসেন্সর তৈরী করেন। বায়োসেন্সরের সবথেকে বড় সমস্যা হল ব্যবহারিক ক্ষেত্রে এটি কত নির্ভূলভাবে সিগন্যাল দিতে পারবে। তাই গবেষনাগারে অনেক বায়োসেন্সর তৈরী হলেও সেগুলি বাণিজ্যিক পণ্য হিসাবে আসতে বেশ সময় লাগে। প্রথমদিকের বায়োসেন্সর মূলত ইলেকট্রিক সিগনাল নিয়ে কাজ করলেও বর্তমানে এটি অন্যান্য সিগনাল এর মাধ্যমেও কাজ করতে সক্ষম। ফলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও এর ব্যবহার বাড়ছে। এছাড়া এই ক্ষেত্রে মাইক্রোফ্লুইডিক প্রযুক্তি, ন্যানোপ্রযুক্তি বায়োসেন্সরকে অনেক বেশী ব্যবহার উপযোগী করে তুলেছে। এই সমস্ত নতুন প্রযুক্তিগুলি বায়োসেন্সরকে অনেক এগিয়ে নিয়ে গেছে।

চিত্র: (বামে) ১৯৬২ সনে ক্লার্ক প্রথম গ্লুকোজ নির্নয়ের বায়োসেন্সর তৈরী করেন এবং

(ডানে) কিছু বাণিজ্যিক বায়োসেন্সর (ছবি উইকিপিডিয়া থেকে সংগ্রীহিত)

Lab-on-a-chip বা একটি চিপে একটি ল্যাব: ন্যানোপ্রযুক্তির কল্যানে খুব ছোট একটি চিপের মধ্যেই পুরো একটি গবেষনাগারকে ঢুকান সম্ভব হচ্ছে। অর্থাৎ একটি চিপ দিয়েই বিভিন্ন ধরনের পরিক্ষা নিরীক্ষাগুলি করা যাবে। অর্থাৎ আমাদের গতানুগতিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যে বিশাল ল্যাবটি রয়েছে তাকে একটি চিপের মধ্যে নিয়ে আনা সম্ভব হবে। Lab-on-a-chip এ যদি আপনি আপনার রক্ত দেন তবে সেটি আপনার বিভিন্ন ধরনের পরিক্ষাগুলি একবারেই করে দিবে। প্রথমে আপনার রক্তটি একটি চেম্বারে ঢুকবে এবং সেখানে গ্রুকোজ পরিমাপ করা হবে, এরপরে আরেকটি চেম্বারে ঢুকবে সেখানে আপনার রক্ষে কোন বিপদজনক ভাইরাস কিংম্বা ক্যান্সার আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখবে, এর পরের চেম্বারে টেস্ট হবে আপনার রক্ষে খনিজ উপাদানগুলি ঠিকমত আছে কিনা। অর্থাৎ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আপনাকে পরীক্ষাগুলি করার জন্য যেরকম বিভিন্ন রুমে যেয়ে যেয়ে রক্ত দিয়ে আসতে হত এখন সেরকম হবে কিনা। আবার সবথেকে সুবিধা হল আপনাকে কষ্ট করে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যাবার প্রয়োজন নেই। ডাক্তারের সামনে বসেই খুব কম সময়েই টেস্টগুলি করে নিতে পারবেন।

চিত্র: একটি ল্যাব-চিপ যেভাবে কাজ করবে (Science 282, 1998 থেকে চিত্রটি সংগ্রীহিত)

বায়োসেন্সর যে শুধু মাত্র চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যবহৃত হবে তাই নয়, বরং কৃষিক্ষেত্রও এটি ভূমিকা রাখবে। যেমন বর্তমানে গাছের কোন রোগ নির্ণয়ের জন্য আমাদের অনেক ক্ষেত্রেই এই বিষয়ে অভিজ্ঞলোকের সহযোগীতা নিতে হয়। কিন্তু অত্যাধুনিক বায়োসেন্সরের মাধ্যমে সহজেই খুব দ্রুত গাছ ও ফসলের রোগ নির্ণয় করা সম্ভব হবে। আবার আপনি বাজারে কোন তরকারী বা মাছ কিনতে গিয়েছেন। সেগুলিতে ফর্মালিন জাতীয় কোনো বিপদজনক রাসয়নিক দ্রব্য রয়েছে কিনা তা আপনার অত্যাধুনিক বায়োসেন্সর দিয়ে নির্ণয় করতে পারবেনন। যেমন আপনার ঘড়িতে একটি বায়োসেন্সর লাগানো রয়েছে, সেটিতে স্পর্শ করার সাথে সাথেই আপনি তা নির্ণয় করতে পারবেন।

কথাগুলি কল্পকাহিনীর মত শোনালেও আসলে কিন্ত তা কিছু বাস্তবে রূপান্তর হচ্ছে। আগে এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বায়েসেন্সর তৈরী করতে পূর্বে বিজ্ঞানীদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তা বাস্তবে অসম্ভব ছিল। বর্তমানে ন্যানোপ্রযুক্তির মাধ্যমে তা এখন বিজ্ঞানী সম্ভব করতে পারছেন। ন্যানোপ্রযুক্তি বলতে বুঝায় ন্যানো স্কেল (১ মিটারের ১ বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ) যে কাজগুলি করা হয়।

যে কারণে বায়োসেন্সর উদ্ভাবনের কাজ পুরোমাত্রায় এগুচ্ছে তা শুধুমাত্র চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রেই প্রয়োগের কারণ নয়। এর পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বাহিনী বায়োসেন্সরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসাবে দেখছে। বর্তমানের যুদ্ধ কৌশল অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন সাধারণ গোলা-বারুদের থেকে সবথেকে বেশী বিপদজনক হল রাসয়নিক অস্ত্র। রাসয়নিক অস্ত্র যে কত বিপদজন হতে পারে তা আমরা বুঝতে পারি ১৯৯৫ সনে। সেই সময়ের জাপানের পাতালট্রেনের সারিন আক্রমণ সবথেকে আলোচিত একটি ঘটনা। এই সময় সারিন (Sarin) নামে একটি বিপদজনক রাসয়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ট্রেনের সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। কিন্তু খুব সহজে সারিন আবিষ্কার করা সেই সময় কঠিন ছিল। এই জাতীয় রাসয়নিক অস্ত্র বা পদার্থগুলিকে বায়োসেন্সর দিয়ে নির্ণয় করা সম্ভব হবে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বায়োসেন্সর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে প্রতিরক্ষা গবেষনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বায়োসেন্সর।

শুধুমাত্র উন্নত দেশই নয় আমাদের মত দেশের জন্যও বায়োসেন্সর অনেক ভূমিকা রাখবে বলেই আমার বিশ্বাস।