আমার পিএইচডিতে গবেষণার অভিজ্ঞতা (২০০২)
গবেষণাগারে প্রথম দিন
২০০১ সনে আমি যখন মাস্টার্সের দ্বিতীয় বর্ষে তখন ব্যাচমেট সবাই মাস্টার্সের পরে কি করবে সেই সিদ্ধান্তটি নিতেই ব্যস্ত। তবে বেশিরভাগ বন্ধুই মাস্টার্সের পরে চাকরিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি পিএইচডিতে যেয়ে গবেষণা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিই। ছোটবেলা থেকেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ছিলাম যে যদি কখনও সুযোগ ঘটে তবে পিএইচডিতে যাব। তবে সমসাময়িক সবার চাকরির পিছনে ছোটা দেখে একটু সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম। তার প্রধান কারণ হল, তোয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সের পরে চাকরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও যে প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে কাজ করি, তিনিই এই ব্যাপারে চেষ্টা করেন। পিএইচডির পাশের থেকে মাস্টার্সের পরে চাকরির সুযোগ সুবিধা বেশি। এত বড় একটা সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে কিন্তু আবার ছোটবেলা থেকে এতদিন ধরে পুষে আসা লক্ষ্যকে ফেলে দেওয়াও সম্ভব নয়। ব্যাপারটা নিয়ে বাবার সাথে কথা বলি। তিনি পিএইচডিতে যাওয়ার কথাই বলেন। পরিশেষে পিএইচডিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম। প্রথমে আমি যে প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে মাস্টার্স করি সেখানেই পিএইচডি করার কথা ভাবলাম। তিনি সানন্দে রাজি হলেন। কিন্তু বেধে বসল আমাদের ডিপার্টমেন্ট। তার প্রধান কারণ আমি যে শিক্ষকের কাছে ঢুকতে চাচ্ছি তিনি জুনিয়র টিচার। এখনও ফুল প্রফেসর হননি। আসলে একটু খুলে বলতে হয়, তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার আগে সেই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, দেরিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার জন্যই জুনিয়র হয়ে আছেন। একদিন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, তখন তিনি ডেকে জানালেন, "মশিউর তোমাকে আমি নিতে পারছি না।" আসলে যে বিষয়টার উপর কাজ করি তখন সেটি আমার খুবই পছন্দের ছিল তাই সেটি সম্পর্কে আরো কাজ করার ইচ্ছা ছিল। নিজের অজান্তেই আমার চোখে পানি আসল। তিনি অনেক্ষণ চুপ করে থাকলেন। বুঝতে পারছিলাম, ডিপার্টমেন্টের কারণেই তিনি নিতে পারছিলেন না। শুধু বলেন, "আমি দুঃখিত। তবে তুমি যে ধরনের কাজ করতে চাও, সেই ধরনের কোন প্রফেসরের সাথে আমি পরিচয় করিয়ে দেব।"
একদিন তিনি আমাকে তার রুমে ডেকে বলেন যে এখান থেকে পাশের শহরে এক প্রফেসর আছেন যিনি তোমার মতই সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে বায়োটেকনোলজি নিয়ে কাজ করতে চায়। আমি প্রথমত দেখা করতে চাইলাম। পরে একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে ওকাজাকিতে গেলাম। সেই শিক্ষকের নাম, উরিসু।
প্রথম যখন আমার প্রফেসরের সাথে দেখা হয়েছিল সেই দিনটি আজো আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমি যখন ওকাজাকি গবেষণা কেন্দ্রে এসে পৌঁছেছিলাম তখন দুপুর, গ্রীষ্মের তাপে চারিদিক তপ্ত হয়ে আছে। জাপান শীতের দেশ হিসাবে পরিচিত হলেও এখানে গ্রীষ্মের সময় বেশ গরম পড়ে। তখন বাংলাদেশের থেকেও বেশি গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যেতে হয়। গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান ফলকের সামনে লম্বা গাছের ছায়ায় ভরা। আর গাছের ছায়ার নিচে স্নিগ্ধ মিষ্টি বাতাস বয়ে যাচ্ছে। প্রধান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে এই গ্রীষ্মের মধ্যে আরাম পাওয়ার কারণেই কিনা জানি না তবে বেশ মুগ্ধ হয়ে গেলাম। প্রধান ফলকের গার্ড ম্যানের কাছে জেনে নিলাম আমার প্রফেসর এই গবেষণাকেন্দ্রেই কিনা। আসলে গবেষণা কেন্দ্রের অনেকগুলি বিল্ডিং থাকাতে সন্দেহমুক্ত হতে চাচ্ছিলাম। প্রফেসরের সাথে দুপুর একটায় দেখা করার কথা ছিল। আমি বেশ অনেক আগেই এসে পৌঁছেছিলাম। আর তখন ভর দুপুর বলে বেশ ক্ষুধা পেয়েছিল। আবার হেঁটে স্টেশনের দিকে ফিরে গেলাম কোন কিছু খাওয়ার জন্য। তারপরে সময়মত ঠিক একটায় আবার গেটে হাজির হলাম। তার একটু পরেই প্রফেসর হেঁটে গেটের দিকে এগিয়ে এলেন। চুলগুলি পেকে গেছে। বেশ দূর থেকেই বুঝতে পারছিলাম তিনিই উরিসু। প্রথমেই তার রুমে যেয়ে প্রাথমিক পরিচয়পর্বটি হল। তারপরে তিনি তার গবেষণাগারটা ঘুরিয়ে দেখালেন। এই নতুন গবেষণাগারটা ঘুরে বেশ ভাল লাগল। আমি যে গবেষণা করতে চাই তার সাথে অনেকখানিই মিল থাকাতে আরো বেশি আগ্রহ বোধ করলাম।
প্রথমেই এই গবেষণাগারটি সম্পর্কে একটু বিস্তারিত বলি। উরিসু'র গবেষণাগারটা Institute of Molecular Science, সংক্ষেপে IMS। এই প্রতিষ্ঠানটিতে মূলত অনু পরমাণুর কাঠামোর উপরই কাজ হয়। মূলত অনুবিদরাই এইখানে কাজ করে। কিন্তু তার মধ্যে অবস্থিত উরিসু গবেষণাগারে থিউরির গবেষণার পাশাপাশি ব্যবহারিক গবেষণাও করেন। আমি একজন ইঞ্জিনিয়ার তাই ব্যবহারিক গবেষণার প্রতি আগ্রহী ছিলাম। আর সবথেকে বেশি আগ্রহী হওয়ার কারণ হল আমি যে প্রজেক্টে অংশ নিতে চাই তা জেনে।
হাতে তৈরি স্বপ্ন
আমাদের বর্তমান সিলিকন ডিভাইসের উপর কাজ করার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম। এবং এই নতুন গবেষণাগারে সিলিকন ডিভাইসের সাথে বায়োটেকনোলজির মিশ্রণ ঘটবে। ব্যাপারটা একটু খুলে বলা যাক। আমাদের শরীরে স্নায়ু যা নিউরণ নামে পরিচিত তা বিভিন্ন চ্যানেল কারেন্টের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদান করে। শুধুমাত্র স্নায়ুই নয় কোষের বহিরাবরণ মেমব্রেনও এই চ্যানেল বিনিয়ের মাধ্যমে তথ্য আদান প্রদান করে। ক্যালসিয়ামের কণা যখন মেমব্রেনের কাছাকাছি আসে তখন একটা অংশ খুলে এবং বন্ধ হয়। এইভাবেই চ্যানেলের মধ্য দিয়ে বিশেষ অণু যাতায়াত করে। মূল প্রক্রিয়াটি অনেক জটিল। এইভাবেই আমাদের শরীরের বিভিন্ন অংশ তথ্য আদান প্রদান করে। এই সম্পর্কে বায়োলজি বিভাগের গবেষকরা অনেক গবেষণা করেছেন। তার মধ্যে প্রথমেই নাম করতে হয় হডগকিন ও হাক্সলে। তিনি এই চ্যানেল কারেন্ট পরিমাপ করার যন্ত্র আবিষ্কার করেন। বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন গবেষণাগারে এই চ্যানেল কারেন্ট পরিমাপ করে শরীরের বিভিন্ন তথ্য জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এই চ্যানেল কারেন্ট প্রক্রিয়াটি সেমিকন্ডাক্টর দিয়ে তৈরি করে কৃত্রিমভাবে কিভাবে তৈরি করা সম্ভব তাই চেষ্টা করব। উরিসু এই কাজটি করার জন্য আগ্রহী। অবশ্য তার কিছু কথা জেনে আমি আগ্রহী বোধ করলাম। উরিসু আমাকে তার ডক্টরেট ছাত্র হিসাবে নিতে আগ্রহী হলেন। যদিও আমার মাস্টার্স শেষ করতে তখনও ছয় মাসের মত ছিল। আর তখন গ্রীষ্মের ছুটি চলছিল। উরিসু বললেন সময় করে এই নতুন গবেষণাগারে এসে কাজ করতে। এতে আমি ডক্টরেটের কাজ আরো আগে থেকে শুরু করতে পারব যা ভবিষ্যতে আমাকে সাহায্য করবে।
কিছুদিন পরে উরিসু বললেন যে কেন তিনি এই কাজ করতে আগ্রহী হলেন। উরিসু মূলত জাপানের একটি বড় সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি এন্টিটি (NTT, Nippon Telegraph and Telephone)-তে কাজ করতেন। তারপরে তিনি সেই কম্পানির চাকরি ছেড়ে দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। তার মূল কারণ হল সেই কম্পানিতে তিনি স্বাধীনভাবে গবেষণা করতে পারছিলেন না। পরবর্তিতে আমি উরিসু'র সাথে তার কম্পানিতে যাওয়ার সুযোগ হয় এবং সেখানে এই জিনিসটা আরো ভালমত উপলব্ধি করার সুযোগ হয়। কথা প্রসঙ্গে যখন চলেই এল তখন সেই ঘটনাটি এইখানে বলি। আমরা যখন আমাদের প্রজেক্ট শুরু করি তখন প্রথম দিকে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে বেশ কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা হচ্ছিল, তার সমাধান পাওয়ার জন্য আমি ও উরিসু একদিন NTT-তে যাই। এটি টোকিওতে অবস্থিত। NTT-তে সেমিকন্ডাক্টরের উপর খুব ভাল গবেষণা হয়। এবং পৃথিবীতে এডভান্স গবেষণাই হয়। সেখানে যেয়ে উরিসু'র সহকর্মিদের সাথে পরিচিত হই। গবেষণাগার দেখার সুযোগ হয় এবং সত্যিই অদ্ভুত গবেষণাগার। পৃথিবীর সবথেকে নতুন কিছু প্রযুক্তি নিয়ে সেখানে গবেষণা হয়। কিন্তু উরিসু'র সহকর্মিরা বলেন যে সত্যিই কম্পানিতে পছন্দমত গবেষণা করা সম্ভব হয় না। সেই দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা কোন জাতীয় গবেষণাগারগুলিতে স্বাধীনভাবে গবেষণা করার সুযোগ থাকে।
জার্মান গবেষক মোরে
ওকাজাকি গবেষণাগারে কাজের শুরুর দিকে আমি মোরে'র সাথে কাজ করি। ড. মোরে একজন জার্মান গবেষক। উনি ওকাজাকি গবেষণাগারেই ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করার পরে উরিসু গ্রুপের সাথে অংশগ্রহণ করেন। তিনি একজন রসায়নবিদ। যেহেতু আমার গবেষণার সাথে রসায়ন খুব জরুরি বিশেষ করে জৈবরসায়নের উপর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। তাই আমি মোরে'র কাছে এই সম্পর্কে শিখি। কিভাবে রসায়নের সাধারণ কাজগুলি হয়। ব্যক্তিগতভাবে মোরে খুবই কথাবহুল। কাজ করার ফাঁকে ফাঁকে অনবরত কথা বলে যান। প্রথমদিকে বেশ বিরক্ত লাগত। পরবর্তিতে তার এই বৈশিষ্ট্যটুকু আমরা মেনে নিয়েছিলাম।
আসলে একটি গবেষণাগারের গ্রুপে অনেকেই মিলে কাজ করি। যেমন মনে করা যাক আমি যে উরিসু গ্রুপে অংশ নিয়েছিলাম, তাতে জাপানিজ মাত্র ৫ জন ছিলেন অন্যান্য ৫ জন ছিলাম বিদেশি। একেকজন একেক দেশের, একেক ধরনের সংস্কৃতি থেকে আসা। তাই কাজ করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্য শোনা হত। আর সবাই নিঃসংশয়ে নিজের বক্তব্য জানাতে পারে। মোরে খুব দ্রুত একসাথে অনেকগুলি এক্সপেরিমেন্ট করে বলে মাঝে মাঝে আমি তাল মিলিয়ে চলতে পারছিলাম না। অবশ্য রসায়নের অনেককিছু খুব দ্রুত তার কাছে শেখার সুযোগ হয়েছিল। মাসখানেক পরে মোরে একটি ক্লাসের ব্যবস্থা করলেন। তার ক্লাসে আমি ও চীনের গবেষক চ্যাং সান ওয়াং ছিলাম। মোরে আমাদের গবেষণা সম্পর্কিত বিভিন্ন রসায়নের বিষয়গুলি সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতেন। পরে অবশ্য গবেষণা খুব ভালমত শুরু হয়ে গেলে মোরে'র ক্লাসটি বন্ধ হয়ে যায়। মোরে'র যে দিকটি আমার সবথেকে ভাল লেগেছিল তা হল, গবেষণার পিছনে মনপ্রাণ ঢেলে কাজ করা। একজন গবেষকের জন্য এই গুণটি থাকা অতি প্রয়োজনীয়।
প্রথম বছরে বেশ কিছু প্রযুক্তি আমি শিখি এবং সেগুলিতে এক্সপার্ট হওয়ার সাধনা করি। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু প্রযুক্তি এখানে উল্লেখ করা হল।
লিথোগ্রাফি
সিলিকন সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রযুক্তি তার মধ্যে অন্যতম হল লিথোগ্রাফি। মূলত সিলিকনের উপর বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্ন তৈরি করার জন্য লিথোগ্রাফি বহুলভাবে ব্যবহৃত হয়। এবং এই লিথোগ্রাফি দিয়ে কিভাবে আরো সূক্ষ্ম প্যাটার্ন তৈরি করা যায় তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে। আমি প্রথম লিথোগ্রাফি শিখি ওয়াং'র কাছ থেকে। পাশাপাশি কোন সমস্যা হলে আমি নোনোগাকি নামে আমাদের সহায়ক শিক্ষকের সহযোগিতা নিতাম। তিনি বর্তমানে এটা নিয়ে কাজ না করলেও বেশ গভীরভাবে এটি সম্পর্কে জানতেন। লিথোগ্রাফি মূলত দুই ধরনের পজিটিভ লিথোগ্রাফি ও নেগেটিভ লিথোগ্রাফি।
লিথোগ্রাফি দিয়ে কিভাবে প্যাটার্ন তৈরি করা হয়
স্পিন অন গ্লাস:
আমরা সাধারণত উচ্চ তাপে অক্সিজেন চেম্বারে সিলিকনের উপর সিলিকন ডাই অক্সাইড তৈরি করি। এই ক্ষেত্রে ৮০০ থেকে ১০০০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিভাইস তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধাতব স্তর থাকলে, কোন ক্ষেত্রে সিলিকন ডাই অক্সাইড তৈরি করতে চাইলে এইভাবে উচ্চতাপে ডিভাইসকে রাখা সম্ভব হবে না। সেক্ষেত্রে স্পাটারিং মেশিন দিয়ে সিলিকন ডাই অক্সাইড তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু আমাদের ল্যাবে স্পাটার মেশিনের জন্য সিলিকন ডাই অক্সাইডের টার্গেট ছিলনা। তখন স্পিন অন গ্লাস নামে খুব সহজে সিলিকন ডাই অক্সাইডের প্রলেপ তৈরির পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলাম। অবশ্য এই স্পিন অন গ্লাসই আমার গবেষণায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটা ভূমিকা রেখেছিল। আমি এই স্পিন অন গ্লাসের একটি ধর্ম আবিষ্কার করি এবং তা দিয়ে একটি গবেষণাপত্র লিখি।
স্পিন অন গ্লাস মূলত তরল উপাদান। প্রথমে স্পিনার দিয়ে যেভাবে রেজিস্ট লাগানো হয়, একই পদ্ধতিতে সিলিকনের উপর স্পিন অন গ্লাস লাগানো হয়। তারপরে তা উচ্চতাপে কিছুক্ষণ গরম করা হয়। সাধারণত ৮০ ডিগ্রি, ১২০ ডিগ্রি ও ২৫০ ডিগ্রিতে হটপ্লেটে একমিনিট পর্যায়ক্রমে উত্তপ্ত করা হয়। পরে ৪২৫ ডিগ্রিতে ওভেনে গরম করা হয়। এর ফলে স্পিন অন গ্লাসের অর্গানিক উপাদানগুলি বাতাসে বেরিয়ে যেয়ে, সিলিকন ডাই অক্সাইডের প্রলেপ ফেলে। স্পিন অন গ্লাস দিয়ে প্রলেপ দেওয়া সিলিকন ডাই অক্সাইডের মৌলিক গুণাবলী সাধারণ সিলিকন ডাই অক্সাইডের মতই। এবং খুব সহজেই এটি দিয়ে সিলিকন ডাই অক্সাইডের প্রলেপ দেওয়া হয় বলে সাধারণ সেমিকন্ডাক্টর প্রক্রিয়ায় বহুল ব্যবহৃত হয়। এছাড়া আরেকটি কারণে সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত হয়, তা হল সেমিকন্ডাক্টরের IC তৈরির ক্ষেত্রে অনেকগুলি স্তরে IC তৈরি করা হয়। তখন এই স্তরগুলির ইন্টারলেয়ারগুলি সমতল অবস্থানে নিয়ে আসার জন্য তাদের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে ফেলার জন্য এটি ব্যবহৃত হয়।
আমার আবিষ্কার (ইউরেকা)
আমার গবেষণায় স্পিন অন গ্লাস ব্যবহৃত হবে বলে আমি এটির উপর আরো কাজ করা শুরু করলাম। প্রথমেই, স্পিনার দিয়ে লাগানোর জন্য এর পুরুত্ব নিয়ন্ত্রণ করার প্যারামিটারগুলি বের করলাম। এর পরে একটি ডিভাইস তৈরি করে তা সিনক্রোট্রন, আমাদের গবেষণাগারের ইউভিসর, এর চেম্বারে দিয়ে দেখলাম যে সিনক্রোট্রন বিকিরণ এই স্পিন অন গ্লাসের সিলিকন ডাই অক্সাইডকে তুলে ফেলে। অবশ্য এটি এর আগে আরেকজন গবেষক তা বের করেছিল। কিন্তু আমি যে নতুন জিনিসটা আবিষ্কার করলাম তা হল, এটির উপর যদি কোবাল্টের প্রলেপ দেওয়া হয় তবে কোবাল্টের পুরুত্ব অনুযায়ী সংকোচিত হয়। এটি একদম মৌলিক একটি আবিষ্কার ছিল। এই দিনটির কথা এখনও মনে আছে অক্টোবর ২০০২ সনে যখন আমার ডাটাগুলি আমি মিলিয়ে দেখছিলাম তখন এই জিনিসটা প্রথম দেখি। প্রথমে অবশ্য আমাদের ল্যাবের অন্যান্য সদস্যরা বলছিল কোথাও হয়ত ভুল আছে। তাই এইরকম হয়েছে। কিন্তু আমি দৃঢ় ছিলাম যে আমার ডাটায় কোন ভুল নেই। পরবর্তিতে আরো কয়েকবার এ নিয়ে কাজ করে একই ধরনের ডাটা পায়। এই গবেষণা আমার একান্তভাবে মৌলিক ছিল। পরবর্তিতে ২০০৩ এর মার্চে জাপান ব্যবহারিক পদার্থবিজ্ঞান সোসাইটির কনফারেন্সে আমি অংশ নিই। এবং আমার লব্ধ ডাটাগুলি সেখানে তুলে ধরি।
মার্চের পরে আমি আরো খুঁটিনাটি কাজ করে এর মেকানিজম সম্পর্কে কাজ করি এবং সেপ্টেম্বরে MRS কনফারেন্সে অংশ নিই। এইবার পোস্টার সেশনে অংশগ্রহণ করি। প্রথমবারের মত আমি পোস্টার সেশনে অংশ নিই। আমি সবসময় কনফারেন্সে বক্তৃতা দিয়ে আমার গবেষণার কাজ উপস্থাপন করতাম কিন্তু পোস্টার সেশনে আমার নতুন একটা অভিজ্ঞতা হল। একটা বোর্ডের উপর নিজের কাজগুলি সুন্দরভাবে একটা পোস্টার বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। দর্শকরা যদি সে সম্পর্কে আগ্রহ পায় তবে তারা সরাসরি কথা বলে। বক্তৃতা দিয়ে প্রেজেন্টেশনের ক্ষেত্রে খুব কম সময় থাকে এবং অনেক সময় অনেকের মতামত জানার অবকাশ থাকে না। কিন্তু পোস্টার সেশনে শ্রোতার সাথে সুন্দর যোগাযোগের সুযোগ থাকে।
কনফারেন্সের কিছুদিন আগে আমি মূল পেপার জমা দিই। পেপারের শিরোনাম ছিল, "Shrinking of Spin-on-Glass Films Induced by Synchrotron Radiation and Its Application to the Three-Dimensional Microfabrications"। এই নতুন পদ্ধতিতে স্পিন অন গ্লাস দিয়ে সংকোচনের মাধ্যমে ত্রিমাত্রিক সার্কিট তৈরি করা সম্ভব। ২০০৪ সনের জানুয়ারিতে জানতে পারলাম যে তারা আমার পেপারটি গৃহীত করেছেন।
এই কাজের পাশাপাশি বায়োসেন্সর তৈরির মূল প্রজেক্টের কাজও চলতে থাকে। আমার সাথে পরবর্তিতে চীনের গবেষক ওয়াং ও জাপানিজ তেরো অংশ নেয়। আমরা তিনজন মিলে তিনটি আলাদা দিক নিয়ে কাজ করতে থাকি।
ওকাজাকি মার্চ ২০০৫