মশিউরের খেরোখাতা

আমরাও পারি (২০০৭)

এইবার বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের প্রমাণ করার সময় এসেছে:

মশিউর রহমান

ঠিক কি কারণে এই লেখাটি শুরু করেছি তা বলতে পারব না। তবে সূচনায় যে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভূমিকা রাখছেন তা আগেই স্বীকার করে নেই। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নোবেল পুরস্কার অর্জনে শুধুমাত্র বাংলাদেশী হিসাবে আমরা গর্ব করছি তাই নয়, এটা প্রমাণিত হয়েছে যে দরিদ্রতা দূর করার জন্য আমাদের চেষ্টাই যথেষ্ট। সারা বিশ্ব এখন তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে, সামনে আমরা আরো কি অবদান রাখতে পারি তার দিকে। এইখানেই আমাদের থেমে থাকলে চলবে না, আমাদের আরো কিছু করার অবকাশ রয়েছে।

সাধারণ বাঙালিরা যে শুধুমাত্র একজনের মৌলিক তত্ত্বকে তাদের জীবনের কাজে লাগিয়ে তাদের অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে, তা তারা এতটি বছর ধরে তিল তিল করে প্রমাণ করেছেন। নেহাত কোন যুদ্ধ বন্ধ করে কিংবা রাজনৈতিক কোন পদক্ষেপ রেখে ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক এই পুরস্কার পাননি। তাদেরকে জীবন যুদ্ধে টিকে থেকে পুরস্কার প্রাপ্তির যথার্থতা প্রমাণ করতে হয়েছে। তাদের পাওয়াকে আমি বাংলাদেশের পাওয়া হিসাবেই দেখছি, কেননা তারা তো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশের বুক জুড়ে।

একটি বড় পাওয়া যেভাবে আমাদেরকে অনুপ্রাণিত করেছে তেমনি সারা বিশ্বের চাওয়া ও কামনার উত্তরও আমাদের দিতে হবে। অর্থনীতি তত্ত্বের ক্ষেত্রে আমরা তা প্রমাণ করতে পেরেছি, কিন্তু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে আমরা পারছি না। সামনের বিশ্বে আমাদের টিকে থাকতে হলে আমাদের অবশ্যই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। অথচ এই সাধারণ ও সত্যিকারের কথাটি আমরা জেনেও না জানার ভান করছি। আমরা ভাবছি কেউ করবে, কিংবা কোন একদিন হবে। কেউ কি উত্তর দিবেন সেই দিনটি সত্যিকার অর্থে কবে আসবে? আমার মনে হয় আমাদের খুব শীঘ্রই মাঠে নামতে হবে।

প্রযুক্তির খুব ছোটখাটো একটি উদাহরণ হলো, তথ্যপ্রযুক্তি। আমরা এই তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দক্ষতা প্রমাণ করতে পারছি না। তার কারণ কি? আমাদের গলদটি কোথায়? আমরা যারা প্রযুক্তিবিদ তারা প্রায় সময় সরকারের দোষ দিই। সরকার কোন স্টেপ নিচ্ছেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। নিজেদের দোষটা আমরা সরকারের ওপর দিয়ে বসে আছি। আসলে এই ধরনের ছোটখাটো উদ্যোগ ব্যক্তিমালিকানার প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকেই নিতে হবে। যখন সেই বিষয়গুলোতে কোম্পানিগুলো ভাল করবে, তখন সরকার বুঝবে কোন কোন ক্ষেত্রে আমরা ভাল করতে পারি। তখনই সরকার সেই ক্ষেত্রগুলোকে সাপোর্ট করবার মতো উদ্যোগ নেবে, যেমনটি হয়েছে আমাদের পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রে।

সাধারণত প্রথম বিশ্বের প্রযুক্তিগুলো হাইটেক বা উচ্চপ্রযুক্তি সংক্রান্ত হওয়ার কারণে অনেকেই বলেন যে, এইগুলো তো হাইটেক ব্যাপার, এইগুলো বাংলাদেশে কিইবা ভূমিকা রাখবে। আমি তাদের সাথে একমত নই। অনেক প্রযুক্তিই আছে যেগুলো বাংলাদেশে ভূমিকা রাখতে পারে। ঠিকমতো আমরা তা বাংলাদেশে পৌঁছাতে পারছি না- সেটাই সমস্যা বলে মনে করি। এই প্রসঙ্গে আমি মোবাইল ফোনগুলোর কথা বলব। প্রথম বিশ্বে যে সমস্ত উচ্চপ্রযুক্তির মোবাইল ফোন বের হচ্ছে, অল্প কয়েকদিন পরেই তা বাংলাদেশের গ্রামগুলোতে পৌঁছে যাচ্ছে। এর কারণ কি? কারণ একটাই- তা হলো ক্রেতার চাহিদা। সেই চাহিদা কাজে লাগিয়ে মোবাইল কোম্পানিগুলো বাজারটি তৈরি করে নিতে পেরেছে। তেমনি উচ্চপ্রযুক্তি বা হাইটেক ক্ষেত্রগুলোতেও অনেক সম্ভাবনাময় বাজার রয়েছে যা হয়তো আমরা নিজেরাও জানি না। আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। আর সেই ক্ষেত্রে প্রথম বিশ্বে অর্জন করা উচ্চপ্রযুক্তির অভিজ্ঞতা ও ধারণাগুলো আমাদের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের সহায়তা করবে। আমি সামনে দুটি প্রযুক্তিকে খুবই সম্ভাবনাময় বলে দেখি, একটি হলো ন্যানোপ্রযুক্তি ও অন্যটি হলো বায়োপ্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি দুটি নিয়ে আমাদের নাড়াচাড়া বা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখতে হবে। দেখতে হবে কোথাও কোনভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এইগুলো ভূমিকা রাখতে পারে কিনা।

প্রবাসীদের একটি বড় অংশই প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের সাথে সংযুক্ত থাকেন। তারা তাদের স্বক্ষেত্রে খুবই মেধার পরিচয় দিয়ে থাকেন। তারা বিজ্ঞান প্রযুক্তির ক্ষেত্রগুলো বাংলাদেশের সাধারণ প্রযুক্তিবিদদের থেকে ভালমতো বুঝবেন, সেটাই স্বাভাবিক। কাজেই প্রবাসী বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদগণই বলতে পারবেন বাংলাদেশকে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে কোন বিষয়গুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে।

তাই আসুন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অর্জনে আমরা যেভাবে নতুনভাবে নিজেদের চিনতে শিখেছি, নিজেদের শক্তি সমন্ধে আত্মবিশ্বাসী হয়েছি, সেইভাবে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে চেষ্টা করে আমরা আমাদের অজানা শক্তিকে নতুন করে চিনি। নিশ্চয় আমরা সম্ভাবনাময় কিছু করতে পারব। আর সরকার কি করবে তার আশায় বসে না থেকে, বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের আহ্বান করছি, আসুন ভেবে বের করি কোন প্রযুক্তি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা যায়।


Mashiur.Rahman@gmail.com

মাঘ ১৪১৩ / Jan-Feb 2007