মশিউরের খেরোখাতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আমাদের ভয় কেন? - ১ম পর্ব (২০২৪)

বর্তমান সময়ে আলোচিত একটি বিষয় হল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। কিন্তু আমরা যখনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা করছি, তখন প্রায়শই এটি নিয়ে এক ধরনের সংশয় এবং ভয় আমাদের মধ্যে কাজ করছে। এটি যে শুধু মাত্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়েই হচ্ছে তা নয়, যখনই কোন নতুন প্রযুক্তি আবির্ভাব হয়েছে, তখনই সেটি নিয়ে আমাদের মধ্যে এইটা ভয় কাজ করেছে। প্রযুক্তি নিয়ে এই ভয়কে “টেকনোফোবিয়া” (technophobia) বা উন্নত প্রযুক্তির ভয় বলে। অনেকে এই ভয়কে "automation anxiety" বা আমাদের সমাজ অটোমেশনের কবলে পড়ে বিপদে পড়তে পারে বলে ভয় বলে। (তথ্যসূত্র https://www.forbes.com/sites/davidhenkin/2023/07/06/beware-technophobia-spreading-amid-ai-fears-and-calls-for-delay/ )

ইতিহাসের পাতা ঘাটলে আমরা দেখত পাব, বড় শিল্প কিংবা প্রযুক্তির বিপ্লবের সূচনালগ্নে আমরা সেটি নিয়ে এক ধরনের ভয় পেয়েছিলাম। এখনও সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির মতন, বর্তমানে আমরা যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) বিপ্লবের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি, আমাদের মধ্যে সেই “টেকনোফোবিয়া” আবার মাথা চাড়া দিচ্ছে। বিশেষ করে OpenAI-এর ChatGPT-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতি এক ধরনের ভয় আমাদের মধ্যে গড়ে উঠছে।

============== [[ মজার তথ্য: (১) রোবট শব্দটি এখন ইংরেজি শব্দ হলেও এটি কিন্তু ইংরেজি ভাষাতে ছিল না। প্রথম চেকোশ্লোভাকিয়াবাসী এর চেক ভাষাতে এসেছে। প্রথমে এর অর্থ ছিল "forced labor” বা কাউকে দিয়ে জোর করে কাজ করিয়ে নেওয়া (তথ্যসূত্র: https://en.wikipedia.org/wiki/Robot) । এই শব্দটির অর্থ ছিল যে মানুষের মতন দেখতে কৃত্রিম মানুষ যন্ত্র তৈরি করা যেটি মানুষের কাজগুলি করে দেবে। পরবর্তীতে তা ইংরেজি ভাষাতে গ্রহণ করা হয়।

(২) অদ্ভুত হল "টেকনোভোবিয়া" কিন্তু এক ধরনের মানসিক অসুখ এবং এটি মারাত্মক বেড়ে গেলে তার চিকিৎসা করা প্রয়োজন এবং এর ঔষুধও রয়েছে https://www.choosingtherapy.com/technophobia/ ]]

ChatGPT, একটি ভাষা মডেল যেটিতে “মেশিন লার্নিং” নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। এই প্রযুক্তিটি কিন্তু অনেক পুরান। ১৯৪৩ সনে বিজ্ঞানী Warren McCulloch এটি নিয়ে একটি গবেষনাপত্র লিখেন। পরবর্তিতে ৬০ ও ৭০ এর দশক নিয়ে কাজ হয়। তবে এটি প্রচুরভাগে প্রয়োগ শুরু হয় ৯০ এর দশক থেকে। এই প্রযুক্তিটি বিভিন্ন ধরনের তথ্য উপাত্ত যাচাই করে, মানুষের মতন শিখে, সেটি থেকে ফলাফল দিতে পারে । মেশিনকে দিয়ে লার্ন বা শিখিয়ে সেটি দিয়ে উত্তর বের করার কারণেই একে “মেশিন লার্নিং” বলে।

মেশিন লার্নিং এর জন্য অনেক কম্পিউটারের প্রসেসরের প্রয়োজন হয়। অতীতে এই প্রযুক্তিটির জন্য অনেক শক্তিশালী কম্পিউটার বা সুপার কম্পিউটার এর প্রয়োজন হতো। সময়ের সাথে সাথে কম্পিউটারে হার্ডওয়্যার বা প্রসেসর এর উন্নয়ন সাধন হতে থাকে এবং বর্তমানে এই মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিটি অনেক দ্রুত ফলাফল দিতে পারে, যা ৯০ এর দশকে যা অসম্ভব ছিল।

একটি ছোট উদাহরণ দেয়া যাক। ২০০০ সনে জাপানের তয়োহাসি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করার সময়ে আমি এডিনোসিন নামে একটি অনুর রাসায়নিক গঠন পর্যবেক্ষণ এবং সিম্যুলেশন নিয়ে কাজ করছিলাম, যেটিতে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তিটি ব্যবহৃত করেছিলাম। সেই সময়ে জাপানের সব থেকে শক্তিশালী সুপার কম্পিউটার আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। সেই সিমিউলেশনটি চালু করে আমি গ্রীষ্মের ছুটিতে মাসখানেকের জন্য বাংলাদেশে বেড়াতে যাই। ফিরে এসে দেখি প্রায় এক মাসের শেষে তার ফলাফল দিয়েছিল। এই পুরো মাসখানেকের জন্য পুরো সুপার কম্পিউটারটি আমার দেয়া সমস্যাটি নিয়ে কাজ করছিল। (গবেষনাপ্রবন্ধটি এই লিংকে পাবেন https://www.researchgate.net/publication/263126315\_Structural\_Analysis\_of\_Bio-\_molecules\_by\_SPM\_Observation\_and\_Molecular\_Orbital\_Calculation ) সেই একই পরীক্ষাটি যখন ১০ বছর পরে আমার সাধারণ কম্পিউটার দিয়ে করি, তখন মাত্র কয়েক ঘণ্টায় শেষ হয়েছিল। এই তুলনাতে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য ভালো কম্পিউটারের প্রসেসর এর প্রয়োজন হয়।

অতীতে মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে, কিন্তু এই নতুন ChatGPT এর আউটপুট বা ফলাফল আগেরগুলির থেকে একেবারেই অনন্য। বর্তমানে এটি সম্ভব হয়েছে হার্ডওয়্যার এর উন্নয়ন সাধন এবং আরো ভালো অ্যালগরিদম তৈরির কারণে। বর্তমানে ChatGPT জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার জন্য অনেকগুলি সাইট রয়েছে এবং আমরা বিভিন্ন কাজে এটি ব্যবহার করা শুরু করেছি। যারাই এটি ব্যবহার করেছেন, তারাই এর চমৎকার উত্তর ও ফলাফল দেখে থতোমতো খেয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তিটি জটিল বিষয়ের উপর প্রবন্ধ লেখা থেকে শুরু করে, জটিল সব প্রশ্নের উত্তর মুহূর্তের মধ্যেই উত্তর দিতে সক্ষম হচ্ছে, যা সত্যিই আমাদেরকে অবাক করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে কাজ করে তা বিস্তারিত পরর্বর্তিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করবো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাজের আউটপুট দেখে আমরা একইভাবে যেমন চমৎকৃত হচ্ছি, তেমনি অপরদিকে এটি নিয়ে আমরা আতঙ্কিত হচ্ছি। বিজ্ঞানী মাইকেল জোলোসি (Michael Szollosy) গবেষণা করে দেখান যে, এই ভয়ের পিছনে মূল কারণ হল প্রযুক্তি নিয়ে বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রগুলি যা মিডিয়ার প্রভাবে আমাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে। মেরী শেলী রচিত উপন্যাসের সেই বিখ্যাত ফ্রাঙ্কেনস্টাইন চরিত্র, আধুনিক যুগে জোম্বিয়া এর মতন কাল্পনিক চরিত্র কিংবা শোয়ার্জনেগার এর টারমিনেটর- এই কাল্পনিক চরিত্র গুলি বাস্তবে সত্যি না হলেও মিডিয়ার প্রভাবে এইগুলি আমরা সত্যিকার ভেবে এইগুলিকে বিশ্বাস করি, এবং অজান্তেই রোবোটিক কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জাতীয় নতুন প্রযুক্তি নিয়ে এক ধরনের ভয় বা টেকনোফোবিয়া আমাদেরকে ঘিরে ধরে।

(চলবে) পরবর্তী সিরিজে আমি ব্যাখ্যা করবো কেন আমরা নতুন কোনো প্রযুক্তি নিয়ে ভয় পাই?