মশিউরের খেরোখাতা

স্মার্ট গ্রিড: বিদ্যুত বিতরণে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন

ড. মশিউর রহমান

বৈজ্ঞানিক, National Institute of Natural Sciences, জাপান

আমাদের প্রত্যাহিক জীবনের সাথে বিদ্যুৎ এখন অতোপ্রোতভাবে জড়িত। বিদ্যুত ছাড়া আমাদের জীবন যে কেমন দূর্বিষহ হয়ে উঠছে, তা ঢাকা নগরীর লোকজন দিনে-রাত্রিতে টের পাচ্ছেন। লোডশেডিং যেখানে মাঝে মধ্যে হবার কথা, সেটি না হয়ে বরং এখন উল্টোটি হচ্ছে - মাঝে মধ্যে বিদ্যুত থাকছে। এই বিদ্যুতের কি সুষ্ঠ সমাধান হতে পারেনা? তেমন একটি সম্ভাবনার দ্বার নিয়ে আসছে স্মার্ট গ্রিড।

স্মার্ট গ্রিড কি?

গত ১২০ বছর ধরে বিশ্বে বিদ্যুৎ বিতরণের যে সিস্টেমটি গড়ে উঠেছে তার সাথে অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি ও তথ্যপ্রযুক্তির সংযোগ করে বিদ্যুত বিতরণের ব্যবস্থার উন্নয়ন করে বিদ্যুতের অপচয় রোধ করার নতুন সিস্টেমের নাম স্মার্ট গ্রিড (Smart Grid)। কম্পিউটারের জগতে গ্রিড কম্পিউটারের কথা আপনার হয়তো শুনেছেন। স্মার্ট গ্রিড এর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।

আমরা যে বিদ্যুত সিস্টেম তৈরী করেছি, অবাক হলেও সত্যি যে তা আজ হতে ১২০ বছরের পুরাতন প্রযুক্তি যা টেসলা ১৮৯৬ এর দিকে শুরু করেন। প্রথম দিকে বিদ্যুত ব্যবস্থা কেমন হবে তা নিয়ে মারাত্মক স্নায়ু যুদ্ধ হয়েছে। বিখ্যাত এডিসন সাহেব তেরী করলেন DC কারেন্ট আর নিকোলা টেসলার তৈরী করলেন AC কারেন্ট। ১৮৮২ এর পূর্ব পর্যন্ত আমেরিকায় এডিসনের তৈরী DC কারেন্ট দিয়ে কাজ চলছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে মানুষ উপলব্ধি করলো যে বিদ্যুত বিতরণের ক্ষেত্রে DC কারেন্টের তুলনায় AC কারেন্ট অনেক ভাল কাজ করে। এই দ্বন্দ মিটানোর জন্য সবথেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, আমেরিকায় নায়েগ্রা জলপ্রপাত বিদ্যুত কিভাবে উৎপাদন করা হবে এবং AC নাকি DC কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। পরিশেষে AC বিদ্যুতকেই গ্রহন করা হয় এবং টেসলা সাহেবের জয় হল। কিন্তু এডিসন সাহেব বসে থাকেননি, AC বিদ্যুতের ক্ষতিকর দিক সমন্ধে অনেক প্রচারণা চালান। তার প্রচারণা ব্যর্থ হয় এবং ১৯০০ সনের পরে বিদ্যুত বিতরণের জন্য বিভিন্ন দেশ AC বিদ্যুতকেই বেছে নেয়। মজার ব্যাপার হল DC বিদ্যুতের ব্যবহার যে একেবারেই নেই তা কিন্তু নয়। ১৯৪০ সন পর্যন্ত হেলসিংকি শহর DC বিদ্যুত ব্যবহার করতো। এছাড়া ১৯৭০ সন পর্যন্ত স্টকহোম শহরটি DC বিদ্যুৎ ব্যবহার করতো। আমাদের অনেক লিফট DC বিদ্যুত ব্যবহার করে।

বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা যে এরপর অধুনিকায়ন করা হয়নি তা কিন্তু নয়। বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন (বিতরণ) সিস্টেমের ক্ষেত্রগুলিতে অনেক ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন অটোমেটিক মিটার রিডিং সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, এবং শহরগুলি কি পরিমানে বিদ্যুত ব্যবহার করছে তা কম্পিউটারের মাধ্যমে পরিমাপ করা হচ্ছে। বর্তমানে শহরগুলিতে বিদ্যুতের চাহিদার উপর ভিত্তি করে বিদ্যুত বিতরণ করা হচ্ছে। তবে এই আধুনিকায়ন পুরো সিস্টেমটিতে প্রয়োগ করা হয়নি। স্মার্ট গ্রিড হল পুরো বিদ্যুত উৎপাদন থেকে শুরু করে বিদ্যুত বিতরণ সবক্ষেত্রেই একটি একক সিস্টেম দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সিস্টেমটিকে একত্রিত করে কেন্দ্রীয়ভাবে চালু করা হবে।

স্মার্ট গ্রিড হল বিদ্যুত বিতরণের অত্যাধুনিক ডিজিটাল পদ্ধতি যা তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে ঘর পর্যন্ত বিদ্যুতের ব্যবহার ও বিদ্যুতের উৎপাদন মনিটর করবে। এই তথ্যগুলি সঠিকভাবে ব্যবহার করে পুরো বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে। অর্থাৎ স্মার্ট গ্রিডের মাধ্যমে আমরা স্মার্ট কম খরচের ও কম বিদ্যুত ব্যবহার করতে পারবো।

স্মার্ট গ্রিডের শরু হয়েছিল বিদ্যুত মিটার এর অধুনিকায়ন করার মাধ্যমে। ’৮০ এর দশকে প্রযুক্তিবিদরা যখন মিটারটি আরেকটু আপগ্রেড করার কথা ভাবছিল, তখন এখানে ইন্টারনেটের সংযোগ দেবার কথা ভাবা হয়। এরফলে ব্যবহারকারিরা দূর থেকেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেখতে পারবে তার বাসায় বিদ্যুতের ব্যবহার। তখন বিদ্যুত বিতরণ প্রতিষ্ঠানগুলি দেখলো এই রকম মিটার তাদেরকেও সহায়তা করবে এবং জানতে সহায়তা করবে সমস্ত ব্যবহারকারিরা কিরকম বিদ্যুত ব্যবহার করছে। সেটি জানলে সেই মোতাবেক তারা বিদ্যুত সরবরাহ করতে পারবে। বিদ্যুত বিতরণের ক্ষেত্রে সবথেকে বেশী বিদ্যুত নষ্ট হয় ট্রান্সফর্মারে। প্রয়োজনমাফিক বিদ্যুত সরবরাহ করতে পারলে ও সঠিকভাবে বিদ্যুত বিতরণ করতে পারলে কম বিদ্যুত নষ্ট করা হবে। এরফলে একটি দেশের সর্বমোট খরচ অনেক কম হবে। এইভাবেই তথ্যপ্রযুক্তি প্রয়োগের সম্ভবানার কথা ভাবতে যেয়ে বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থাকে আরো স্মার্ট করার কথা ভাবা হয়, আর এইভাবেই শুরু হয় স্মার্ট গ্রিডের ধারণা।

২০০৫ সনে প্রথম স্মার্ট গ্রিড প্রয়োগ করা হয় ইতালিতে, যেটি এনার (Enar) নামে একটি কম্পানি স্থাপন করে। এই প্রোজেক্টটির নাম দেয়া হয় Telegestore project। স্মার্ট গ্রিড প্রয়োগ করার ফলে দেখা গেছে ৫০০ মিলিয়ন ইয়রো প্রতি বছরে সেভিংস করা সম্ভব।

বামে: Enel এর তৈরী করা বিদ্যুত মিটার যা দিয়ে ব্যবহারকারী কতটুকু বিদ্যুত ব্যবহার করছে তা স্মার্ট গ্রিড সিস্টেম বুঝতে পারবে। ডানে: Enel এর তৈরী স্মার্ট গ্রিড যেভাবে কাজ করে। গ্রাহকরা কতটুকু বিদ্যুত ব্যবহার করছে তা ইন্ট্রানেটের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সিস্টম পরিমাপ করতে পারবে।

স্মার্ট গ্রিড: কেন্দ্রীয় বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থা। বাজার, অপারেটর ও সার্ভিস প্রোভাইডারদের একটি প্লাটফর্মে অপরদিকে বিদ্যুত উৎপাদন, ট্রান্সমিশন, বিতরণ, ব্যবহারকারিদের একটি প্লাটফর্মে নিয়ে আনবে স্মার্ট গ্রিড।

স্মার্ট গ্রিডের বৈশিষ্ট:

  • নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা: কোন দূর্ঘটায় যদি একটি বাড়ি বা এলাকার বিদ্যুত ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায় তবে সেন্সর ও স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে স্মার্ট গ্রিড খুব সহজেই এই সমস্যাকে বুঝতে পারবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমস্যাকে সমাধান করতে পারবে। একটি এলাকার দূর্ঘটনার কারণে অন্যান্য এলাকার বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থার যেন ক্ষতি না হয় স্মার্ট গ্রিড সে ব্যাপারে সাহায্য করবে।

  • বিদ্যুত এর বাজার: বর্তমানে বেশীরভাগ দেশের বিদ্যুত ব্যবস্থা একটি কম্পানির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। ’৮০ এর দশক থেকে এই মোনোপলি বাজারের কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে একটি দেশের বিদ্যুত ব্যবস্থাতে বিদ্যুত তৈরী, ট্রান্সমিশন ও বিতরণের কাজগুলি সাধারণত বিভিন্ন কম্পানিগুলি করে থাকে। স্মার্ট গ্রিডের ফলে সামগ্রিক এই বিদ্যুতের বাজারে আরো প্রতিষ্ঠান আসতে পারে এবং প্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে আরো বেশী প্রতিযোগীতা বাড়বে। একটি দেশের বিদ্যুত সিস্টেমের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান আংশ নিতে পারে। একজন গ্রাহক ইচ্ছে করলে যে কোন প্রতিষ্ঠান থেকে বিদ্যুত কিনবার স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবে। এর ফলে কর্মসংস্থান যেমন বাড়তে পারে তেমনিভাবে পুরো বিদ্যুত সিস্টেম আরো বেশী সুদক্ষ ও কার্যকর হতে পারে।

  • জনগণের সচেতনতা: আমরা যে বিদ্যুত ব্যবহার করি সাধারণত তার মূল্য দিনের সবসময় একটি নির্দিষ্ট রেটের। কিন্তু স্মার্ট গ্রিডে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দামের ধারণাটি নিয়ে আসা হচ্ছে। ফলে পিক সময়ে বিদ্যুতের দাম বেশী। এর ফলে একজন ব্যবহারকারী যে সময়ে বিদ্যুতের দাম কম সে সময়ে বেশী বিদ্যুত ব্যবহার করতে উৎসাহী হবেন। স্মার্ট গ্রীডে ব্যবহারকারিরা তার প্রতিটি যন্ত্রপাতি কিরকম পরিমানে বিদ্যুত ব্যবহার করছে তা মনিটর করতে পারবেন। তাই বিদ্যুত সাশ্রয়ের চেষ্টা থাকবে। এইভাবে সমস্ত ব্যবহারকারিদের অংশ যোগ করলে পুরো একটি দেশের অনেকখানি বিদ্যুতের সাশ্রয় হবে।

বিভিন্ন দেশে স্মার্ট গ্রিড:

  • ২০০৯ সনে অষ্ট্রেলিয়া সরকার স্মার্ট গ্রিড প্রয়োগের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষনা দিয়েছে। তাদের এই প্রোজেক্টের নাম EnergyAustralia ।

  • ২০০৬ সনে কানাডার সরকার স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের ঘোষনা দেয়।

  • চীন ২০০৯ সনে স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের ঘোষনা দেয়। তবে প্রাথমিক ভাবে তারা সাধারণ বাড়ির পরিবর্তে শিল্প কারখানা জাতীয় বড় প্রতিষ্ঠানগুলিতে স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের কথা ভাবছে।

  • ইউরোপ ২০০৫ সনে স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের জন্য SmartGrids Technology platform নামে একটি প্লাটফর্ম তৈরী করেছে এবং ২০২০ সন নাগাদ তারা স্মার্ট গ্রিড ব্যবহার করবে।

  • কোরিয়া ৬৫ মিলিয়ন ডলারের একটি প্রোজেক্ট হাতে নিয়েছে যা দিয়ে তারা যেশু দ্বীপে পরীক্ষামূলকভাবে স্মার্ট গ্রিড ব্যবহার করবে। ২০৩০ সন নাগাদ তারা স্মার্ট গ্রিড পুরো দেশে ব্যবহার করবে।

  • আমেরিকা ২০০৭ সনে স্মার্ট গ্রিড ব্যবহারের পদক্ষেপ শুরু করে। প্রতিবছর তারা ১০০ মিলিয়ন ডলার এই ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে স্মার্ট গ্রিড:

ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুত বিতরণ ব্যবস্থার কারণে আমাদের বিদ্যুত কতটুকু নষ্ট হচ্ছে সেই সমন্ধে আমাদের কোন ধারণা নেই। এমনকি কোথায় আমাদের কতটুকু লোড শেডিং হচ্ছে সেই সমন্ধে আমাদের পরিপূর্ণ তথ্য নেই। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে আমাদের বর্তমান সিস্টেম সমন্ধে ভাল ধারণা আমরা পেতে পারে। আজ হতে ১০ বছর কিংবা ৫০ বছর পরে আমাদের বিদ্যুত চাহিদা কেমন হবে আর কিভাবেই তা পূরণ করবো তা নিয়ে আমাদের এখন থেকেই প্লান করতে হবে। অদূর ভবিষ্যতে স্মার্ট গ্রিডের মত প্রযুক্তি আমাদের গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু আমরা তার জন্য কতটুকু প্রস্তুত?

http://twitter.com/drmashiur

রেফারেন্স:

Simple Explanation of Smart Grids http://bit.ly/aLXIQ

Smart Grid Newsletter (US centric): www.smartgridnews.com

EPRI's "Intelligrid" Program: www.intelligrid.info

EU Smart Grid Vision and Strategy :  http://tinyurl.com/37npgpr

EU Smart Grid Web site: www.smartgrids.eu

US Department of Energy: www.oe.energy.gov/smartgrid.htm

Ontario (Canada) Smart Grid Forum: http://tinyurl.com/d7jq4f

Smart Grids Africa: http://tinyurl.com/3yubeap