দাম্পত্য জীবনের পাঁচটি স্তর (২০২৫)
তারিখ: ২০ ডিসেম্বর ২০২৫
চাটগাঁর আড্ডায় বসে একদা এক মৌলবী সাহেব বলেছিলেন, "মশাই, দুনিয়াটা আসলে একটা মস্ত বড় সরাইখানা, আর মহব্বত হলো সেই সরাইখানার সবচেয়ে গোলমেলে সুরুয়া।" কথাটি তখন হেসে উড়িয়ে দিলেও আজ পঞ্চাশোর্ধ বয়সে এসে, যখন মাথার চুল পড়ে যেয়ে সাদা মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে, তখন বুঝি—মিথ্যে বলেননি তিনি। সম্পর্কের রসায়ন বুঝতে গিয়ে গালিবের গজল থেকে শুরু করে হাল আমলের ফেসবুক স্ট্যাটাস—সবই তো ঘাঁটা হলো। আমার মনে হয় এই দাম্পত্য সম্পর্কটা পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ হয়ে যায়। আসুন, একটু খোলসা করে বলি।
প্রথম পর্যায়: মধুচন্দ্রিমা শুরুটা হয় যেন এক ফরাসি সেন্টের সুবাসের মতো। একেই আজকালকার ছোকরারা ‘কেমিস্ট্রি’ বলে। আমরা বলতাম ‘দিওয়ানা-পন’। তখন স্ত্রী কিংবা স্বামীর নাক ডাকার শব্দেও মধুর বীণা বাজতে শুনি, আর তার রাগকেও মনে হয় ভৈরবীর তান। ত্রুটি-বিচ্যুতি? সে তো দুরাস্ত! অন্ধ প্রেমে তখন আমরা বাস্তবকে বিসর্জন দিয়ে কল্পনার তাজমহল বানাতে ব্যস্ত। মিলগুলিই শুধু চোখে ধান্দা মেরে, অমিলগুলি পদ্মার আড়ালে থাকে!
দ্বিতীয় পর্যায়: ক্ষমতার মল্লযুদ্ধ মধু ফুরোলে যখন মৌমাছি কামড়াতে শুরু করে, তখনই শুরু হয় আসল খেলা। আদর্শের সেই রঙিন চশমাটা নাক থেকে খসে পড়তেই দেখা যায় পাশের মানুষটি রক্ত-মাংসের—তার দাঁত মাজার ঢং থেকে শুরু করে বিশ্বরাজনীতি নিয়ে তার অদ্ভুত মতামত—সবই তখন খচখচ করে বিঁধতে থাকে। ছোটখাটো তিল তখন তাল হয়ে দাঁড়ায়। কে কারে আধিপত্য করবে তা নিয়ে চলে অদৃশ্য যুদ্ধ।
তৃতীয় পর্যায়: মেনে নেওয়া এখানে এসে মানুষ বুঝতে পারে, সামনের মানুষটি কোনো আস্তিনের জাদুকর নয় যে আপনার কথায় নিজেকে রাতারাতি বদলে ফেলবে। তখন প্রশ্ন জাগে—এই যে ত্রুটিপূর্ণ মানুষটি, যার নাক ডাকার শব্দে পাড়া জাগে, তাকে কি তবুও ভালোবাসা যায়? উত্তেজনা তখন ম্লান, হার্ভার্ডের ইকোনমিকসের মতো নিরস। যারা এই ধাপে টিকে যায়, তারাই প্রকৃত সাধক। কারণ তারা বোঝে, প্রেম মানে শুধু ফাল্গুনের হাওয়া নয়, শ্রাবণের কাদা ঠেলে পথ চলাও বটে।
চতুর্থ পর্যায়: সত্যিকারের অঙ্গীকার বা ‘পোক্ত দলিল’ এটি কোনো সস্তায় পাওয়া চুক্তিনামা নয়। এটি হলো স্বেচ্ছায় কেনা এক ‘দাহিল’ বা দায়বদ্ধতা। যখন আবহাওয়া চমৎকার তখন তো সবাই একসাথে নৌকায় চড়তে চায়, কিন্তু যখন তুফান ওঠে, তখন হাল ধরে থাকাই হলো আসল পুরুষার্থ। আপনারা তখন একে অপরকে বেছে নিচ্ছেন কোনো স্বার্থে নয়, বরং এই জন্য যে—আপনারা একসাথে একটা কিছু গড়তে চান যা অন্তত সময়ের ঝাপটায় ধুলো হয়ে উড়ে যাবে না।
পঞ্চম পর্যায়: একাত্মতা বা ‘ফানা-ফিল্লা’ এখানে এসে অহংকারের পর্দা সরে যায়। আপনি তাকে দেখেন একদম স্বচ্ছ আয়নায়। নিজের আত্মার চেয়েও আপনি তাকে বেশি বুঝতে শুরু করেন। এটি আর সেই কিশোরবেলার প্রজাপতি ধরার চপলতা নয়, এটি হলো জীবনের গভীরতম সত্যকে আলিঙ্গন করা।
শেষে একটা কথা না বললেই নয়। বেশিরভাগ সম্পর্ক ভালোবাসার অভাবে মরে না, মরে মানুষের থমকে যাওয়ার কারণে। মানুষ যখন ভাবেন—‘ব্যাস, পাওয়া তো হয়ে গেছে, আর খেটে কী হবে?’, তখনই পচন ধরে। ভালোবাসা তো কোনো মাটির নিচে লুকানো গুপ্তধন নয় যে একদিন খুঁজে পেলেন আর রাজা হয়ে গেলেন। ভালোবাসা হলো প্রতিদিনের রুটি—যা আপনাকে ঘাম ঝরিয়ে প্রতিদিন সেঁকতে হবে।
তা না হলে, ওই যে ফারসি কবি বলেছিলেন—"ইশক এক আগ কা দরিয়া হ্যায়, অউর ডুব কে যানা হ্যায়।" এখন ডুব দেবেন নাকি সাঁতরাবেন, সেটা কিন্তু আপনারই মর্জির ওপর খোদাতালা ছেড়ে দিয়েছেন!