কোনটা ঠিক: পৃথিবীর সবথেকে দূর্নীতিগ্রস্থ দেশ
অবশেষে বাংলাদেশকে পৃথিবীর সবথেকে দূর্নীতিগ্রস্থ দেশের উপাধি দেয়া হল৷ এত দিন পর্যন্ত বলা হয়েছিল গরীব দেশ, ভিখারী দেশ ইত্যাদি ইত্যাদি৷ কিন্তু এইবার সেই সাথে নতুন একটা নাম যোগাড় হল৷ কিন্তু আমাদের সরকারীমহল মোটেও এটা মেনে নিতে রাজি না৷ নিজেরা লন্ডনে ভিক্ষা চাইতে যেতে পারেন তাতে দেশের ভাবমূর্তী ক্ষতির কোন অসুবিধা নেই৷ কিন্তু দূর্নীতির কথা বললে গায়ে লাগে বৈকি৷ পৃথিবীর খুব একটা দেশ দেখা হয়নি বলে পৃথিবীর সবথেকে দূর্নীতিগ্রস দেশ কিনা তা বলতে পারবোনা৷ জাপানে পড়াশুনার সুবাদে বেশ অনেকদিনই থাকা হল এখানে৷ তুলনা মূলক ভাবে বললে আমি হয়তোবা দুটো দেশের তুলনা করতে পারবো৷ যাই হোক যা বলছিলাম, প্রথম জাপানে যখন এসেছিলাম তখন একবার জাপানের স্থানীয় সিটি অফিসে গিয়েছিলাম অফিসের কিছু কাজ করতে৷ আমার কাজে সাহায্য করবার জন্য তাদের অনেকেই ছুটে এসেছিলেন৷ যদিও তারা খুব একটা ইংরেজী বলতে পারছিলনা৷ কিন্তু তাদের এই আন্ত রিক চেষ্টা খুব পরিষ্কার বুঝা যাচ্ছিল৷ পরে বিভিনড়ব কারণে যতবারই গিয়েছি ততবারই মধুর ব্যবহার পেয়েছি৷ এইবার একটু অন্যদিকে যাওয়া যাক৷ সেবার বুয়েটের ভর্তি সংক্রান্ত ব্যাপারে শিক্ষাবোর্ড থেকে সার্টিফিকেট তুলতে রাজশাহী বোর্ডে যেতে হয়েছিল৷ আমার আজকের গল্পের পটভূমি সেখানেই৷ যদি লম্বা লাইন হয়, সেই ভেবে সাত সকালে বোর্ড অফিসে যেয়ে হাজির হলাম আমরা কয়েক বন্ধু৷ কিন্তু আমরা হাজির হলেই তো হবেনা৷ যিনি আমাদের এপ্রিকেশন জমা নিবেন তার সরকারী কর্মসূচী আমাদের মত ঘড়ির কাটা ধরে চলেনা৷ তিনি বড় ক্লান্ত হয়ে, পান চিবাতে চিবাতে দুপুর এগারটার দিকে এলেন৷ দেখে মনে হল উনি যে কষ্ট করে সেদিন শশুরবাড়ী (অফিসে) এসেছেন সেটাই আমাদের জন্য কৃতজ্ঞতার বিষয়৷ তার কাজে জমা দিবার পরই দেখি আমাদের ফাইল এই টেবিল থেকে ওই টেবিল৷ হটাত্ করে জানতে পারলাম যে ব্যাংকে টাকা জমা দিতে হবে৷ যদিও এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটি কোথাও লিখা নেই৷ একদিনের মধ্যে সার্টিফিকেট তুলে ঢাকায় ফিরে যাব এই ভেবে তড়িঘড়ি করে ব্যাংকে দৌড় মারলাম৷ ব্যাংক থেকে ফিরে এসে দেখি দুপুরের ছুটি৷ ফলে এক টেবিলে আমাদের ফাইল আটকে থেকে গেল৷ দুপুরের পর দেখি সেই টেবিলের অফিসারের দুপুরের ছুটি শেষ হয়নি৷ কি আর করার আমরা বাহিরে বসে আড্ডা মারতে লাগলাম৷ সেই টেবিলে আটকা থাকার
কারণে কিছু করা হলনা৷এই দিকে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল৷ কিন্তু ভদ্রলোকের কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা৷ টেবিলের উপরে আমাদের কাগজগুলি আটকে আছে৷ বাহিরের পিয়নের কাছে জিজ্ঞাস করায় জানা গেল যে তিনি দুপুরের পর নামাজ পড়তে যান এবং তারপর প্রায়ই তিনি ফিরেন না৷ আপাতত সেই দিনের জন্য নাখে খস্ত দিয়ে ফিরে এলাম৷ দ্বিতীয় দিনে আমরা আবার বারান্দায় দাড়িয়ে দাড়িয়ে আড্ডা মারতে লাগলাম৷ একটু পরেই এক কর্মকর্তা আমাদের আড্ডায় বাধ সাধলেন৷ গুরুগম্ভীর স্বরে বললেন, ”কি ব্যাপার? এটা অফিস৷ তোমরা নিচে যাও৷” আমরা আমাদের অপেক্ষার কারণ বলাতে উনি বললেন, ”সব কিছুর একটা প্রসিডিউর আছে৷ তোমরা তো আর রাজা নয় যে তোমাদের জন্য এখনই করতে হবে৷ আমাদের সব সময় কিছু নিয়ম কানুন ধরে কাজ করতে হয়৷ ” ফিরে যাবার সময় আমাদের এই জেনাশেন দিয়ে যে কিছুই হবেনা তা বুঝিয়ে বলতে লাগলেন৷ আমরা ভগড়ব মন নিয়ে নিচে নেমে এলাম৷ আমাদের মধ্যে একটু রগচটা ধরনের এক বন্ধু মেজাজ গরম করে চিত্কার শুরু করলো৷ যদিও তার চিত্কার চেচামেচি কারোরই তেমন দৃষ্টি আকর্ষন করলোনা৷ সেদিন এই টেবিল থেকে ওই টেবিলে যেয়েও কোন কাজ এগুলোনা৷ রাতে মন খারাপ করে মেসে ফিরে এলাম৷ মেসের মামা (রাজশাহীতে মামা ডাকের খুব চলন ) আমার কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি৷ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মামা বললেন, ”আরে ভাগেড়ব গেটের কাছের পিয়নকে ১০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দাও তোমার সার্টিফিকেট এক ঘন্টার মধ্যে হাজির৷ ” পরের দিন সেই মোতাবেক কাজ করলাম৷মনে হল যে আলাউদ্দীনের চেরাগে হাত দিয়েছি, কোথা থেকে এক ঘন্টার মধ্যে আমার সর্টিফিকেট হাজির৷ সেদিনে আসলেই কিন্তু আমি এই আলাউদ্দীনের চেরাগের সন্ধান পেয়েছিলাম যা দিয়ে বাংলাদেশে খুব সুন্দর ভাবে আপনার সব কিছুই হাজির হবে৷ পাঠকদের বলছি ভুলেই কিন্তু এই চেরাগ অন্য কোন দেশে প্রয়োগ করতে যাবেন না৷ এর পরের ছয় বছর পরের ঘটনা৷ জাপানের এক স্কলারশিপের আবেদন পত্রের জন্য আমার প্রাক্তন ভার্সিটির সার্টিফিকেট দরকার হয়ে পড়েছিল৷ পরের দিন নারাতে আবার যেতে হবে কিনা তাই ভেবে সেখানে ফোন করলাম৷ রেজিষ্টার অফিসের কর্মকর্তা ফোনে আমার বিস্তারিত জেনে নিলেন৷ বললেন আমাকে যেতে হবেনা৷ কয়েকদিন পরে ডাক যোগে আমার সার্টিফিকেট এসে হাজির৷ এইবার পাঠকদের কাছে আমার আবেদন৷ আপনারাই
বলেন কোনটা ঠিক ৷
তারিখ
২৯ জুন ২০০১