মশিউরের খেরোখাতা

আইপি টেলিফোন

বিশেষজ্ঞ কলাম

ড. মশিউর রহমানসহকারী অধ্যাপক, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়


আইপি টেলিফোন কি

আপনারা জানেন যে, কম্পিউটার ও ইন্টারনেটর মধ্যে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে তা হলো 'প্যাকেট' যোগাযোগ, অর্থাৎ এখানে তথ্যগুলোকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্যাকেটে রূপান্তর করে তা প্রেরণ করা হয়। আর আমরা টেলিফোনে যেভাবে যোগাযোগ করি তাকে বলা হয় 'সার্কিট' যোগাযোগ। অর্থাৎ এখানে দু'জনের মধ্যে একটি ডেডিকেট সংযোগ স্থাপন করা হয়। ৯০ শতকের পরের দিক থেকে আমাদের বাসাগুলোতে সংযোগের জন্য এই দুটি আলাদা আলাদা সংযোগ ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা হলো আমরা কম্পিউটার ও ইন্টারনেটের সংযোগের জন্য যে ডাটা সংযোগ ব্যবহার করি তা অনেক দ্রুত। এমনকি শুধুমাত্র এই সংযোগ কম্পিউটারের ডাটা প্রেরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ভয়েস (কথা) ও মাল্টিমিডিয়া প্রেরণের জন্য ব্যবহার বেড়ে গেল। কম্পিউটারের এই ডাটা প্রেরণের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় তার নাম আইপি, বা ইন্টারনেট প্রোটোকল। তাই ইন্টারনেটের মধ্য দিয়ে এই ভয়েস পাঠানোকে আমরা বলি ভয়েস ওভার আইপি বা ভিওআইপি। আইপি-এর সংযোগকে ব্যবহার করে যে টেলিফোন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয় তা আইপি টেলিফোন। বাংলাদেশে এটিকে এক ধরনের অসাধু ব্যবসার সাথে সংযুক্ত করার ফলে এটি সম্পর্কে একটি ভ্রান্ত ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।

সুবিধাসমূহ

আইপি টেলিফোন যেহেতু কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাই অনেক প্লাটফর্মে ও সফটওয়্যারের মাধ্যমে অনেক কিছু করার সুবিধা রয়েছে যা সাধারণ টেলিকমিউনিকেশনে পাওয়া যায় না। সাধারণ টেলিফোন শুধুমাত্র মোবাইল ফোন ও ল্যান্ড ফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ কিন্তু আইপি টেলিফোন যে কোনো প্লাটফর্মে হতে পারে এবং দিন দিন এর ব্যবহার বিস্তৃতি বাড়ছে।

![Figure: সফটফোন সফটওয়্যারের (X-Lite) স্ক্রিনশট]

সফটফোন

আপনার কম্পিউটার, মোবাইল কিংবা পিডিএ তে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আপনি টেলিফোনের সুবিধাগুলো পাবেন।

![Figure: একটি আইপি টেলিফোন সেট]

হার্ডফোন

দেখতে সাধারণ ফোনের মতো দেখতে হলেও এটি আইপি প্রোটোকলে কাজ করে।

![Figure: একটি হার্ডফোন ডিভাইস]

ATA ডিভাইস

সাধারণ টেলিফোনকে এই ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত করে আইপি টেলিফোন হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

![Figure: একটি GSM-WIFI মোবাইল হ্যান্ডসেট]

ওয়াই-ফাই টেলিফোন

কিছু মোবাইল ফোন জিএসএম ও ওয়াই-ফাই দু'টি মাধ্যমেই কাজ করতে পারে। এই ধরনের ফোনগুলোকেও আইপি টেলিফোন হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

উপরের গ্রাফে দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও ইউরোপে আইপি টেলিফোন ব্যবহার সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথ্যসূত্র : টেলিগ্রাফি রিসার্চ

উপরের গ্রাফে দেখা যাচ্ছে আমেরিকার আইপি টেলিফোন সার্ভিসের কোম্পানিগুলোর গ্রাহকের সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে। তথ্যসূত্র : টেলিগ্রাফি রিসার্চ

সারা বিশ্বে যেখানে আইটি টেলিফোন ব্যবহার করে এর সুবিধাসমূহ জনগণ ভোগ করছে। কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রযুক্তিকে প্রচণ্ডভাবে অবহেলা করা হচ্ছে। আমাদের দেশের ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে এটিকে এখনো সংযুক্ত করা হয়নি। কিন্তু গত কয়েক বছর বিশ্বের গতিবিধি পর্যালোচনা করে দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের ভবিষ্যতের যোগাযোগ ব্যবস্থাতে এই আইপি জাতীয় যোগাযোগ বিশেষ করে আইপি টেলিফোন খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আর আপনারা জানেন যে, তথ্যপ্রযুক্তিতে আমাদের দেশের বড় সমস্যা হলো জনশক্তি। তাই আমার উপলব্ধি হলো আইপি টেলিফোন নিয়ে বাংলাদেশে কাজ করার জন্য আমাদের শক্তিশালী জনশক্তি দরকার। এই কথাগুলো বিবেচনায় রেখে আমরা নর্থ সাউথ বিশ্বদ্যিালয়ে ২০০৮ থেকে আমাদের মাস্টার্স ও অনার্স পাঠ্যসূচিতে আইপি টেলিফোন সংযুক্ত করি। আমরা এই কোর্সের নাম দিই 'আইপি টেলিফোনি'।

কোর্সটি শুরু করার পরে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আগ্রহ দেখলাম যে, তারা শুধুমাত্র পড়াশোনা নয় সরাসরি এটি নিয়ে হাতেনাতে কাজ করতে আগ্রহী। সেটি বিবেচনা করে আমরা আইপি টেলিফোনের কাজের জন্য নর্থসাউথ বিশ্বদ্যিালয়ে একটি গবেষণাগার স্থাপন করলাম। এই গবেষণাগারে ছেলেমেয়েরা নিজের হাতে কম্পিউটার দিয়েই টেলিফোন সংযোগ স্থাপন ও এই সম্পর্কিত বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তিগত সমস্যা নিয়ে কাজ করা শুরু করল।



*ছবি : নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপি টেলিফোন ল্যাব *http://mashiur.biggani.org

২০০৮ সালে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তিতে সব থেকে আলোচনায় এসেছে কলসেন্টার। কলসেন্টারে মূলত এই আইপি প্রযুক্তি ব্যবহার করার কারণে আমাদের আইপি টেলিফোন গবেষণাগারে ছেলেমেয়েরা কলসেন্টার জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করেছে। আমাদের গবেষণাগারেই ছেলেমেয়েরা কলসেন্টারের কিছু সিস্টেম তৈরি করেছে। কলসেন্টারের জন্য বাহিরের সলিউশনগুলোর পাশাপাশি এখন আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরাও কলসেন্টারের সলিউশন তৈরি করছে। প্রতি সেমিস্টারে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে আইপি টেলিফোন বাংলাদেশে কিভাবে ভূমিকা রাখতে পারে সে নিয়ে তাদের এসাইনমেন্ট দিই। মজার ব্যাপার হলো তারা এই সমস্ত রিপোর্টগুলোতে আইপি টেলিফোনকে বাংলাদেশে কিভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে তার উপর চমৎকার কিছু মডেল ও আইডিয়া তুলে ধরে। রিপোর্টগুলো পড়লে বোঝা যায় আমাদের দেশের ছেলেমেয়েরা কত চমৎকার আইডিয়া দিতে পারে। তেমন কিছু মডেল হলো-

  • আইপি টেলিফোন ব্যবহার করে বাংলাদেশে কিভাবে টেলিমেডিসিনের সিস্টেম তৈরি করা যায়।

  • আইপি টেলিফোন মোবাইল কোম্পানির ব্যবসাকে কিভাবে পরিবর্তন করতে পারে।

  • বাংলাদেশ সরকার কিভাবে আইপি টেলিফোন ব্যবহার করে তার প্রশাসনকে দ্রুত করতে পারে।

  • গ্রামের লোকজন কিভাবে আইপি টেলিফোন থেকে উপকৃত হতে পারে?

  • স্টক এক্সচেঞ্জে কিভাবে আইপি টেলিফোনকে ব্যবহার করা যায়।

  • প্রাকৃতিক দূর্যোগের সময় কিভাবে আইপি টেলিফোনকে ব্যবহার করা যায়।

  • ট্রেন-বাসের টিকেট কেনার জন্য কিভাবে আইপি টেলিফোনকে ব্যবহার করা যায়।

এই রিপোর্টগুলো আমাদের ল্যাবের ওয়েবসাইট http://mashiur.biggani.org-এ রয়েছে। শুধুমাত্র আইডিয়া তৈরি করাই নয় বর্তমানে আমরা এই মডেলগুলোকে বাস্তবে রূপান্তর করার জন্য কাজ করছি। বাংলাদেশে বসেও এইসব মডেলগুলো আইপি টেলিফোনের সলিউশন দিয়ে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে মুক্ত সফটওয়্যারের কল্যাণে।

মুক্ত সফটওয়্যার ও আইপি টেলিফোন

আইপি টেলিফোন যেহেতু আইপি প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে এবং যে সমস্ত প্রোটোকলগুলো ব্যবহার করে তা উন্মুক্ত মানদণ্ডে তৈরি। তাই এটি খুব সহজে কম্পিউটারে প্রয়োগ করা যায়। আর সব থেকে মজার ব্যাপার হলো এর জন্য যে সমস্ত সফটওয়্যারের প্রয়োজন তার একটি বড় অংশই উন্মুক্ত হিসেবে রয়েছে তাই যে কেউ এটি নিয়ে কাজ করতে পারে। আমাদের ল্যাবেও আমরা এই সব উন্মুক্ত সফটওয়্যার নিয়ে কাজ করছি।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা

ভবিষ্যতে আমরা বাংলা ভাষাকে আইপি টেলিফোনে ব্যবহারের জন্য কাজ করছি। এক্ষেত্রে প্রযুক্তিগুলো হলো Text2Speech এবং Speech2Text। মনে করা যাক আপনি বাংলা ভাষায় একটি চিঠি কম্পিউটারে টাইপ করেছেন Text2Speech প্রযুক্তিটি সেই চিঠিটি আপনাকে পড়ে দিবে। Speech2Text প্রযুক্তি হলো আপনি বাংলাতে কথা বলবেন এবং কম্পিউটার সেটি টাইপ করে দিবে। আইপি ফোন যেহেতু কম্পিউটার প্রযুক্তি দিয়ে চলে তাই এই সমস্ত প্রযুক্তিগুলো প্রয়োগ করার চেষ্টা চলছে। ইংরেজি ভাষাতে এই প্রযুক্তিগুলো তৈরি হয়ে গেছে এবং ভবিষ্যতে আমরা বাংলা ভাষা দিয়েই এই কাজগুলো করতে চাই। এই ক্ষেত্রে সব থেকে চ্যালেঞ্জ হলো বাংলা ভাষাকে ভয়েস বা কথাতে প্রয়োগ করার জন্য কারিগরি অনেক সমস্যা রয়েছে।

'তথ্য'কে ছড়িয়ে দেয়া, প্রচার বা প্রকাশ করার জন্য 'প্রিন্ট মিডিয়া' ও 'ইলেকট্রনিক মিডিয়া' ছাড়াও 'ভয়েস মিডিয়া' ভূমিকা পালন করবে। আর এই ভয়েস সার্ভিসগুলোকে বাস্তবে রূপ দেবার জন্য আইপি টেলিফোন প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অশিক্ষিত জনগণের কাছে তথ্যকে প্রচার করার ক্ষেত্রে ভয়েস সার্ভিসগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই যারা গ্রামাঞ্চলে তথ্যপ্রচার নিয়ে কাজ করেন তারা আইপি টেলিফোন প্রযুক্তি দিয়ে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতে পারেন। নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইপি টেলিফোন ল্যাবে আপনাদেরকে এই ব্যাপারে কারিগরি সহযোগিতা দেবার জন্য প্রস্তুত। বিস্তারিত জানতে যোগাযোগ করুন- ০১৭৩১৬৭০০৬৩ ও ইমেইল ঠিকানা : mashiur.rahman@gmail.com। আমি আশা করব আগামীতে আইপি টেলিফোন সম্পর্কে আমাদের বিভ্রান্তিগুলো দূর হবে। ■


উৎস: টেকনোলজি টুডে, মার্চ ২০০৯, পৃষ্ঠা ১৫-১৬