লিথগ্রাফি প্রযুক্তিঃ ইলেক্ট্রনিক্স সার্কিট যে কারণে এতটা ছোট হল
ড. মশিউর রহমান
আপনারা নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন যে প্রতি বছরই আমাদের চারপাশের ইলেকট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হচ্ছে। তার মূল কারণ হল ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতি যে সব সার্কিট দিয়ে তৈরী হয় সেই সার্কিটের আকার প্রতি বছরই ক্ষুদ্র হচ্ছে। শুধু ক্ষুদ্রই নয় এর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুত শক্তির পরিমানও কম লাগছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় ৮০ এর দশকের ওয়াকম্যান এখন কত ক্ষুদ্র হয়ে গেছে. এখন আমাদের হাতে থাকছে iPod Nano এর মত ক্ষুদ্র ওয়াকম্যান যা শুধু পূর্বের সাধারণ ওয়াকম্যানের থেকে ক্ষুদ্রই নয়, তাতে থাকছে হাজারগুন বেশী গান আর তা চলছেও আগের থেকে দীর্ঘ সময় ধরে। যে প্রযুক্তির কারণে ইলেক্ট্রনিক্সের সার্কিটের আকার ক্ষুদ্র থেকে আরো ক্ষুদ্রতর হচ্ছে তা হল “লিথগ্রাফি”।
ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি লিথগ্রাফি (lithography) ৷ মূলত ইলেক্ট্রনিক্সের সার্কিট তৈরী করার জন্য যে সমস্ত উপাদান (ট্রানজিস্টর, রেজিস্টার, ক্যাপাসিটর ইত্যাদি) প্রয়োজন হয় তা সাধারণত সিলিকন এর উপর বিভিন্ন ধরনের প্যাটার্ন বা নকশা তৈরী করে প্রস্তুত করা হয়। এই সমস্ত নকশা তৈরীর করার প্রক্রিয়াকে লিথগ্রাফি বলে। কিছুদিন আগ পর্যন্ত লিথগ্রাফি শুধু মাত্র ইলেক্ট্রনিক্স এর সাথে সম্পর্কযুক্ত ইঞ্জিনিয়াররাই জানতেন, কিন্তু লিথগ্রাফি এখন শুধু ইলেক্ট্রনিক্স এর জগতেই সীমাবদ্ধ নেই এটি ব্যবহার হচ্ছে বায়োটেকনলজি সহ অন্যান্য ক্ষেত্রগুলিতেও। কেননা ন্যানোপ্রযুক্তির কল্যাণের বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখাগুলিতেও প্রয়োগ হচ্ছে এই ক্ষুদ্র আকারের জিনিস তেরী করায়।
ইলেক্ট্রনিক্স যন্ত্রপাতির উপাদানগুলির ক্ষুদ্র হবার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল ১৯৪৫ সনে বেল ল্যাবের ট্রানজিস্টর আবিষ্কারের মাধ্যমে। এর পরেই ইলেক্ট্রনিক্স এর যন্ত্রপাতি ছোট করার উপায় নিয়ে ইঞ্জিনিয়ার-রা উঠে পড়ে লাগেন। ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে লিথগ্রাফি এর শুরু ৭০ দশকের দিকে। অবশ্য এই লিথগ্রাফি প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল প্রায় দু'শ বছর আগে ১৭৯৮সনে। তখন মূলত পাথর দিয়ে ছবি তৈরীর জন্যই এই লিথগ্রাফি প্রযুক্তির উদ্ভব হয়েছিল। ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে প্রথম দিকে সাধারণ আলো দিয়ে এই কাজ করা হত বলে এটি ফটোলিথগ্রাফি নামেও পরিচিত। তবে যুগের পরিবর্তনে লিথগ্রাফি অনেক উন্নত হয়েছে। পরবর্তিতে ultraviolet কিংবা অতিবেগুনি রশ্মি এবং এক্সরে লিথগ্রাফিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কেননা এই রশ্মিগুলির আলোক তরঙ্গদৈর্ঘ্য সাধারণ আলোর থেকে অনেক কম। তাই অতিবেগুনি কিংবা এক্সরে দিয়ে আরো ক্ষুদ্র নকশা তৈরী করা সম্ভব।
সময়ের সাথে সাথে লিথগ্রাফি প্রযুক্তি অনেক উন্নত হয়েছে। তার মূল কারণ হলে ব্যবসায়িক ভাবে এই প্রযুক্তি খুব বেশী পরিমানে ব্যবহৃত হয়েছে। এই প্রযুক্তিটির সাথে "অর্থ" অতঃপ্রোতভাবে জড়িত রয়েছে। কেননা বড় সার্কিট তৈরী করতে বেশী উপকরণ লাগবে এবং খরচও হবে বেশী। প্রতিটি কম্পানি চেয়েছে আরো সূক্ষ ও ক্ষুদ্র সার্কিট তৈরী করে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে টিকে থাকতে। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবে এই প্রযুক্তি নিয়ে অনেক গবেষনা হয়েছ।
সাধারণভাবে লিথগ্রাফি মূলত দুইধরনেরঃ (১) পজিটিভ বা ধনাত্মক লিথগ্রাফি (২) নেগেটিভ বা ঋণাত্মক লিথগ্রাফি
লিথগ্রাফি দিয়ে কিভাবে প্যাটার্ণ তৈরী করা হয় তা নিম্নের চিত্রে দেখান হল।

চিত্রঃ লিথগ্রাফি এর পর্যায়ক্রম (a) ধনাত্মক লিথগ্রাফি ও ঋণাত্মকলিথগ্রাফি (b) লিফট অফ (লেখকের ডক্টরেট থিসিস থেকে সংগৃহীত)
কিভাবে প্যাটার্ণ তৈরী করা হয়?
-
প্রথমে যে উপকরণের উপর প্যাটার্ণ তৈরী করা হবে তার উপরিভাগে তরল রেজিস্ট (resist)এর আবরণ ফেলা হয়। এই আবরণ তৈরী করার জন্য স্পিনার (spinner) ব্যবহার করা হয়, যা প্রচন্ড গতিতে ঘুরে (সাধারণত প্রতি মিনিটে ৪ থেকে ৫ হাজার ঘূর্ণন)। ফলে অতিরিক্ত তরল পদার্থটি পড়ে যায় এবং উপকরণের উপরিভাগে প্রায় সমান গভীরতার রেজিস্টের আবরণ পড়ে, যার বেধ সাধারণত ১ থেকে ১০ মাইক্রোন হয়ে থাকে। তবে বেধ কতটুকু হবে তা রেজিস্টের ঘনত্ব ও ঘূর্ণন গতির উপর নির্ভর করে। রেজিস্ট হল আলোতে সংবেদনশীল এক ধরনের পলিমার জাতীয় রাসয়নিক দ্রব্য।
-
এরপরে তা ওভেনে বা হটপ্লেটে গরম করা হয়। এর ফলে রেজিস্টের তরল আবরণটি শক্ত হয়ে কঠিন আবরণে রূপান্তরিত হয়।
-
তারপরে যার প্যাটার্ণ তৈরী করা হবে তার মূল একটি প্যাটার্ণ অঙ্কিত মাস্ক (mask বা photo mask) এই রেজিস্টের উপর রেখে অতিবেগুনিরশ্মী ফেলা হয়। সাধারণত বিশেষ ধরনের কাচের উপর ক্রমিয়ামের প্যাটার্ণ অঙ্কিত থাকে। কাচের ভিতর দিয়ে যে অংশ দিয়ে আলো যায় সেই অংশের রেজিস্টের অংশে রাসয়নিক বিক্রিয়া ঘটিত হয়। যেহেতু এইধরনের মাস্কটি সরাসরি রেজিস্ট আবরণের সাথে স্পর্শ করা হয় তাই একে কনটাক্স মাস্ক (contact mask) বলে।
-
পরবর্তিতে এটি ডেভেলপ করা হয়। ডেভেলপ করার ফলে আরেকটি রাসয়নিক বিক্রিয়া হয়। পরিশেষে যে অংশে আলো পড়েছে সেই অংশটি উঠে যায় এবং যে অংশটিতে আলো পড়েনি, সেটি থেকে যায়। অবশ্য ঋণাত্মক রেজিস্ট এর ক্ষেত্রে বিপরীতটি ঘটে।
-
ডেভেলপ করার পরে অনেক সময় এটি ওভেনে গরম (সাধারণত ৮০ ডিগ্রী সেন্টিগ্রিড) করা হয়। এটি রেজিস্ট এর আবরণটিকে শক্ত করে।
এখানে উল্লেখ্য যে অতিবেগুনী রশ্মীর লিথগ্রাফি দিয়ে ২০০ নানোমিটারের নকশা তৈরী করা সম্ভব। লিথগ্রাফি এর প্রক্রিয়াটি পড়ে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন যে এটি অনেকটা ক্যামেরায় ছবি তুলা এবং ডেভলপ করার সাথে খুব মিল আছে।
লিফট অফ (lift off)
উপরের প্রক্রিয়াটি হল লিথগ্রাফি, যা দিয়ে কোন কিছুর উপরে রেজিস্ট দিয়ে নকশা বা প্যাটার্ণ তৈরী করা হয়। এই নকশা যে কোন কিছুর হতে পারে এবং পরবর্তিতে নকশাটিকে কাজে লাগান হয়। সাধারণত পরবর্তিতে লিফট অফ নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়। লিফট অফ ব্যাপারটা বেশ সাধারণ। প্যাটার্ণ তৈরীর পরে উপরের পুরো আবরণের উপর কেন ধাতুর(সাধারণত প্লাটিনাম, সোনা, কোবাল্ট কিংবা অন্য কোন মেটাল) আবরণ ফেলা হয়। পরে কোন রেজিস্ট রিমুভার দিয়ে রেজিস্টটিকে তুলে ফেলা হয়। যখন রেজিস্ট এর অংশটি উঠবে তখন রেজিস্টের সাথে সাথে উপরিভাগের ধাতুর আবরণটিও উঠে যাবে এবং যে অংশে রেজিস্ট ছিলনা সেখানে ধাতুর আবরণটি অবশিষ্ট থাকবে। এইভাবে লিথগ্রাফি ও লিফটঅফ দিয়ে কোন কিছুর উপর মেটালের নকশা বা প্যাটার্ণ তৈরী করা হয়। লিথগ্রাফি দিয়ে প্যাটার্ণ তৈরী করার পরে তার চিত্র নিম্নে দেখান হল।

চিত্র: (a) সিলিকনের উপর লিথগ্রাফি দিয়ে তৈরী করা নকশা এবং (b) লিফটঅফ দিয়ে সিলিকনের উপর কোবাল্টের নকশা তৈরী। ছবিগুলি Scanning Electron Microscope (SEM) যন্ত্র দিয়ে তুলা হয়েছে। (লেখকের ডক্টরেট থিসিস থেকে সংগৃহীত)
ক্লিন রুম:
লিথগ্রাফি কিংবা এর সাথে সংযুক্ত কাজগুলি বিশেষ ধরনের ধুলোবালুবিহীন রুমে তৈরী করা হয়। এই কক্ষগুলি ক্লিনরুম নামে পরিচিত। কেননা সাধারণ ঘরের বাতাসে যে সমস্ত ক্ষুদ্র কণিকাগুলি রয়েছে তা এই সমস্ত ক্ষুদ্র নকশার উপর পরে নকশাকে পরিবর্তিত করে দিতে পারে। তাই এই বিশেষ ক্লিন রুমে লিথগ্রাফি এর কাজগুলি সম্পন্ন করা হয়। তবে ক্লিন রুমে ঢুকবার জন্য প্রযুক্তিবীদদের অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। কেননা এই সমস্ত ঘরে ঢুকবার আগে বিশেষ পোশাক পড়তে হয় যেন আমাদের শরীরের ত্বক থেকে কোন ধুলোবালি ইলেক্ট্রনিক্সের অংশগুলির উপর না পড়ে। প্রথমে পরিধেয় পোশাকের উপর সিনথেটিকের তৈরী একধরনের কাপড় পড়তে হয় (অনেকটা রেইনকোট এর মত) এবং জুতার জন্য পড়তে হয় বিশেষ জুতার আবরণ। মুখে পড়তে হয় মাস্ক ও চুলের জন্য টুপি পড়তে হয়। অর্থাৎ সবধরনের সতর্কতা নেয়া হয় যেন শরীর কিংবা কাপড় থেকে কোন কণা ক্লিনরুমে ছড়িয়ে না যেতে পারে। এছাড়া এই ধরনের কক্ষে ঢুকবার আগে এয়ার শাওয়ার (air shower) নামে শক্তিশালি বাতাস দিয়ে শরীরের ধুলোবালিকে ঝেড়ে ফেলা হয়।

চিত্র: নাসা এর গ্লেন গবেষনাকেন্দ্রের একটি ক্রিনরুম
[সূত্র http://www.grc.nasa.gov/WWW/ictd/content/labmicrofab.html]
লিথগ্রাফি হল ক্ষুদ্র স্কেলে নকশা বা প্যাটার্ণ তৈরী করার পদ্ধতি। আমাদের হাতের কাছে যে সমস্ত ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন তা তৈরীর করার সময় কোন না কোন ক্ষেত্রে এই লিথগ্রাফি প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে। যখন এই প্রবন্ধটি লিখছি তখনও পৃথিবীর বাঘা বাঘা বিজ্ঞানীরা কাজ করে যাচ্ছেন কিভাবে আরো ক্ষুদ্র স্কেলে লিথগ্রাফি দিয়ে নকশা তৈরী করা সম্ভব। কেননা যত ছোট নকশা তৈরী করা সম্ভব হবে তত ছোট ইলেক্ট্রনিক্স এর যন্ত্র হবে। আগে লিথগ্রাফি দিয়ে মাইক্রো (এক মিটারের ১,০০০,০০০ ভাগের এক ভাগ) স্কেলে নকশা তৈরী করা যেত এখন সেখানে তারও শত ভাগ এমন কি হাজার ভাগ ক্ষুদ্র নানোমিটার (এক মিটারের ১,০০০,০০০,০০০ ভাগের এক ভাগ) স্কেলেও নকশা তৈরী করার প্রচেষ্টা চলছে। নতুন এই সমস্ত লিথগ্রাফি প্রযুক্তিগুলির নাম হল: Nanoimprint Lithography, Dip-pen nanolithography, Soft lithography। এইগুলি দিয়ে angstrom স্কেলে লিথগ্রাফি করা যাবে। তার মানে দাড়াচ্ছে একটি অনু-পরমানুর আকারে নকশা তৈরী করা যাবে। ভাবছেন, বিজ্ঞানীদের মাথা খারাপ নাকি? এত ক্ষুদ্র দিয়ে হবেটা কি? এত ক্ষুদ্র আকারের দিকে ধাবিত হবার উত্তরটি হল "প্রয়োজন বা চাহিদা"। সবাই চাচ্ছে তাদের ইলেক্ট্রনিক্সের যন্ত্রপাতি আরো ছোট হোক। সেই ছোট হবার শেষ সীমানা পৌছান না পর্যন্ত মানব জাতি থামবেনা। এর বিনিময়ে মানব জাতি পাবে কি? উত্তর ভবিষ্যতই বলবে। তবে ব্যাপারটি হবে এইরকম, আমরা এখন যেমন আশির দশকের কম্পিউটার কিংবা মোবাইল দেখে হেসে উঠি হয়তো সামনের দশকের লোকজন আজকের প্রযুক্তি দেখে হেসে উঠবে।
১৮ জুন ২০০৮
ড. মশিউর রহমান বর্তমানে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতা করছেন এবং পাশাপাশি e-learning, e-healthcare, e-gov, VoIP, call center এর উপর গবেষনা করছেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে লেখকের সম্পাদিত পোর্টাল www.biggani.org।