তয়োহাসিতে দিনগুলি
অনেকের কাছে শুনেছি যে প্রবাস জীবন নাকি বড় কষ্টের, বড় নিরানন্দের। আশেপাশে পরিচিত কেউ থাকে না। আমার এক পরিচিত আমাকে কথাগুলি বলেছিলেন আজ থেকে পাঁচ বছর আগে, যখন আমি সবেমাত্র মনবুশো বৃত্তি নিয়ে এসেছি। জাপান সম্পর্কে কোন জ্ঞানই ছিল না। তারপর কত স্বপ্ন দেখে জাপানে আসলাম। প্রথম প্লেনে চলার অনুভূতি, অদ্ভুত জাপানি ভাষা শেখা, প্রথম নিজে নিজে রান্না করার অভিজ্ঞতা এসব এখানে না আসলে হতই না। তারপর কত দিন রাত কোনদিকে চলে গেল তার আর খেয়ালই নেই। প্রথম দিকে অনেক বাঙালির কাছে জিজ্ঞাসা করলেই বলত পাঁচ বছর হল জাপানে আসা। আবার কারও কারও সংখ্যা দশ থেকে পনের পর্যন্তও শুনেছি। কিন্তু আজ অবাক হয়ে যাই যে আমার আসাই পাঁচ বছর হয়ে গেল। নিজের অজানেই কিভাবে যেন সময়গুলি পার হয়ে গেল। তাই যখন কেউ জিজ্ঞাসা করে, জাপানে আসা কতদিন হল, তখন উত্তর দিতে গিয়ে নিজেই অবাক হয়ে যাই।
যাই হোক মূল কথায় আসা যাক। আমি বর্তমানে তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছি। তয়োহাসি জাপানের খুব একটা বিখ্যাত না হলেও, টোকিও থেকে বুলেট ট্রেনে রওনা দিলে প্রথমে যে স্টেশনটি পড়ে তার নাম তয়োহাসি।
এই তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে আমরা নয়জন বাঙালী আছি। এর মধ্যে আন্ডারগ্রাজুয়েটে তিনজন মাস্টার্সে একজন এবং অন্যরা ডক্টরেট প্রোগ্রামে আছেন। তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়টি মূল শহর থেকে ত্রিশ মিনিটের বাস যাত্রার দূরত্বে আছে। মূল শহরে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম হল বাস। তাই এখানকার ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের গাড়ি আছে।
আমাদের বাঙালিদের মধ্যে সবচেয়ে জমজমাট আসর বসে প্রতি শনিবার বিকালে। যে যতই ব্যস্ত থাকুক না কেন, সবাই ক্যাম্পাসের মাঠে হাজির হয়ে যায়। প্রতি শনিবার ফুটবল খেলার আয়োজনটি বেশ ভালোই জমে। তবে বাংলাদেশিদের সাথে অনেকসময় ভারতীয়, ভিয়েতনামি, কম্বোডিয়ানদেরও অনেকে খেলে। তবে সবাই যদিও খেলোয়াড় হলেও, মাঠে নামলে তা বোঝার উপায় নেই। দলের জন্য পড়িয়ে হয়ে খেলে। আর ফুটবল খেলার পর আমাদের তিন ভাবি আমাদের জন্য খাবার নিয়ে আসে। খাবার খেতে খেতেই আড্ডা জমে। আড্ডা প্রিয় বাঙালি আড্ডায় বসলে আর কোন কিছু খেয়াল থাকে না। আড্ডার বিষয় বস্তু সাধারণত বাংলাদেশের চলতি ঘটনাই বেশি থাকে। হাজার মাইল দূরে থাকলেও নিজের মাতৃভূমির খবরাখবর শুনতে ভালোবাসে। আর আজকের দিনের ইন্টারনেট দূরত্বের ব্যবধান কমিয়ে ফেলেছে। নিয়মিত ইত্তেফাক, জনকণ্ঠ, মুক্তকণ্ঠ, সাপ্তাহিক, অন্যান্য কম্পিউটারের সামনে বসেই পড়া যায়। ইন্টারনেটের যুগ বলেই ব্যাপারটি সম্ভব। আর মহিলাদের আড্ডায় কোন দোকানে কবে কী জিনিস পাওয়া যায়, ইত্যাদি মহিলা আড্ডাই বেশি জমে। আড্ডা মারতে মারতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলে মহিলাদের তাড়াতেই ঘরে ফিরতে হয়। কিন্তু রাত বেশি হলেও পথে বিপদের ভয় নেই। ভীষণ নিরাপদ এখানকার পরিবেশ। কেউ কারও ব্যাপারে কোন মাথা ঘামাবে না। খুব গভীর রাত হলে পরিষ্কার জ্যোৎস্নায় আপনার যদি জ্যোৎস্না দেখতে ইচ্ছা করে পথে নেমে যান। ব্যাপারটা জাপান বলেই সম্ভব।
এছাড়াও প্রায় নিয়মিত আছে দাওয়াত খাবারের পর্ব। কারও বিবাহ বার্ষিকী থাকে, কারও বা জন্মদিন আবার কোন কোন ক্ষেত্রে কোন কারণ ছাড়াই বারো মাসের তেরো পর্ব। তবে ঈদের দিনে মজাই আলাদা। সাত সকালে এখানকার মুসলমান সবাই মিলে একসাথে নামাজ পড়ি। তারপর সবাই তার নিজের হাতে বানার প্রিয় জিনিসটি নিয়ে আসে। তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মিসর সহ অন্যান্য মুসলমান দেশের অনেক ছাত্রছাত্রীই এখানে পড়াশোনা করে।
আপনি যদি তয়োহাসিতে পড়তে আসতে চান, তাহলে জেনে নিন তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয় কিসব বিষয়ের জন্য ভালো। তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয় জাপানে সেমিকন্ডাক্টরের জন্য বিখ্যাত। আসলে তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় বলে ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে পারবেন। তবে শুধুমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং নয়, পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা কাজ হয়ে থাকে। আপনার বিষয় যদি গণিত, রসায়ন কিংবা পদার্থবিজ্ঞান হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রেও আপনি গবেষক হিসেবে যোগ দিতে পারেন। গবেষক হিসেবে যোগ দিতে হলে আপনাকে ন্যূনতম মাস্টার্স পাস করতে হবে। তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ হিসেবে মনবুশো বৃত্তির জন্য আবেদন করা যায়। প্রতিবছর একজন বাঙালি এখানে যোগ দিয়েছেন। সুতরাং আপনি যদি একজন মেধাবী ছাত্র অথবা ছাত্রী হন, তাহলে এখানে পিএইচডি এর জন্য গবেষক ছাত্র হিসেবে আবেদন করতে পারবেন। নিচে তয়োহাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাকঠিকানা দেওয়া হল। এখানে ইমেইল প্রচলিত এবং দ্রুত বলে অনেকসময় ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করা সুবিধাজনক। তাই আপনি আপনার ইমেইল থাকলে যোগাযোগের ঠিকানায় ইমেইল নম্বর দিতে ভুলবেন না।
Toyohashi University of Technology
Email: ryugaku@tut.ac.jp
মার্চ ১৯৯৯